ঘোষণা

অনুগল্পঃ মানুষ

সালাম তাসির | বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 685 বার

অনুগল্পঃ মানুষ

 

কৈশরে যে গাছটির শীর্ষে উঠে নদী দেখতাম
আজ তার দেহে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেল না। পাড়াশুদ্ধ মানুষ জড়ো হলো কেউ কেউ শেকড়ের সন্ধানে মাটি খুড়লো ডাক্তার যেভাবে রোগির মৃত্যু সনদ দেয়ার আগে নি:শ্বাসের গতি পরীক্ষা করেন।
পাশের মসজিদ থেকে ভেসে এলো আজানের ধ্বনি
মন্দিরে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে উঠলো। মানুষ যে যার প্রার্থণাগৃহে ছুটছে। এক পথ এক উদ্যেশ্য নিয়ে দলবেঁধে যাচ্ছে সবাই যে যার পবিত্র গৃহে।
পাশেই সুইপার কলোনি প্রতিদিন কিছু মানুষের অসংলগ্ন আচরণে প্রতিবেশীরা নীরব যন্ত্রনা ভোগ করে। কলোনির সবচেয়ে বয়সি লোকটা গতকাল রিকসা থেকে নেমে রিকসাওয়ালাকে যে গালি দিলো তার সারমর্মটুকুও প্রকাশ করা সম্ভব হলো না। ক্ষমা করবেন প্রিয় পাঠক। তবে রিকশাওয়ালা ভাড়া না নিয়ে মৃদুস্বরে কিছু একটা বলতে বলতে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে গেলো। পাশেই একটা আনলোড ট্রাক দাঁড়ানো ছিলো মাঝ বয়সি একজন ড্রাইভার তার আসনে বসে সব শুনছিলেন আর ভাবছিলেন বয়োবৃদ্ধ মানুষটা এত খারাপ হলো কেমন করে।

সুইপার কলোনির এই মানুষটিকে আমি চিনি দীর্ঘদিন ধরে। নির্দিষ্ট একটা জায়গায় গিয়ে রোজ সন্ধ্যায় বাংলা মদ খায়। তারপর রিকসায় উঠে জনগনের উদ্যেশ্যে অশ্লীল ভাষণ দিতে দিতে বাসার সামনে নামে। কখনো ভাড়া দেয় কখনো রিকসাওয়ালাকে ভাড়া না দিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দেয়। রিকসাওয়ালা ভাড়া নয় সম্মান নিয়ে দ্রুত সরে যায়। আজও একই নাটকের মঞ্চায়ন হলো।
আমি ফ্লেক্সি লোডের দোকান থেকে বের হয়ে ট্রাক ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম দরীদ্র মানুষটি ভাড়া না নিয়ে কি যেন বলতে বলতে চলে গেল আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন? তিনি বললেন পৃথিবীর মানুষ কত বিচিত্র, যে মানুষটি দু’দিন পরে শ্মশানমুখী হবে তার এমন আচরন। আমি বললাম আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি ভাই। বুদ্ধিদীপ্ত কণ্ঠে আমাকে শোনালেন রিকসাওয়ালা বলে গেলো ‘ভিক্ষা চাই না মা কুত্তা ঠেকাও’ টাকার চেয়ে মান সম্মান অনেক বড়। আযান দিয়েছে মসজিদে যাই…

দু’দিন পর সন্ধ্যায় বন্ধুর মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। সামনে শ্মশানঘাট পার হয়ে বামে মোড় ঘুরলেই বন্ধুর বাড়ি, রিকসাওয়ালাকে বলতে বলতে উঠে বসলাম। শ্মশানের কাছে যখন পৌছালাম দেখি মানুষের ভিড় এবং হরি বল বল হরি সমস্বরে বলছে কিছু মানুষ। রিকসাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলাম কে মারা গেছে জানো তুমি? না স্যার আমি আজ এইদিকের কোন প্যাসেঞ্জার পাই নাই তাছাড়া মাইকে প্রচারও শুনি নাই । একথা বলেই রিকসা থামিয়ে বললো স্যার একটু বসেন আমি আসছি। দ্রুত শ্মশানের দিকে এগিয়ে গেলো পাশেই গেরুয়া বসন পড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার সাথে কথা বলে যখন ফিরে আসে তখন ওর চোখে নীরব কান্নার জল দেখেছি। বারবার গামছার আড়ালে চোখ ঢাকার বৃথা চেষ্টা করেও আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারে নাই।
বললাম তোমার আপনজন কেউ মারা গেছে? না স্যার উনি আমার কেউ নন, তাহলে তুমি কাঁদছো কেন? দু’দিন আগে লোকটা আমার রিকসায় উঠেছিলেন। ভাড়া না দিয়ে আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেছিল। আমি ভাড়া না নিয়েই চলে গিয়েছিলাম। স্যার আমি তো লোকটার মৃত্যু চাইনি!
তাহলে কেন এমন হলো?
আমি অবাক বিস্ময়ে স্রষ্টাকে স্মরণ করলাম। মনে মনে ভাবলাম কি অদ্ভূত তার খেলা। কাকতালীয়ভাবে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার কেন্দ্র বিন্দুতে দাঁড়িয়ে বললাম তুমি লোকটাকে মাফ করে দিও।
শ্মশান পার হয়ে বন্ধুর বাসার সামনে এসে রিকসা থামলো।
ভাড়া দিয়ে বললাম তুমি কোথায় থাক, নাম কি? স্যার আমার বাড়ী গোয়ালন্দ, নিউক্লোনীতে ভাড়া থাকি। আমার নাম বজলুর রহমান সবাই বজলা বলেই ডাকে আমি কিছু মনে করি না।

পাশের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে এলে মন্দিরে নামযজ্ঞের অনুষ্ঠান থেমে যায়। বজলা রিকসাটা ঘুরিয়ে মসজিদের দিকে চলে যায়।

সালাম তাসির
রাজবাড়ী,ফরিদপুর

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৫:২১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীরব-নিথর অবয়ব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০