ঘোষণা

অ্যালার্জি থাকলেও নেওয়া যাবে ভ্যাকসিন’, যা জানা প্রয়োজন

অনলাইন ডেস্ক | রবিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 232 বার

অ্যালার্জি থাকলেও নেওয়া যাবে ভ্যাকসিন’, যা জানা প্রয়োজন

ফাইজার-বায়োএনটেক ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে এখন পর্যন্ত চার জনের শরীরে অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন হয়েছে। যাদের খাবার, ওষুধ কিংবা টিকায় অ্যালার্জি আছে তাদের জন্য ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনা ভ্যাকসিন না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমএইচআরএ।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া ভ্যাকসিন নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষের জন্যই তেমন কোনো বাধা নয়।

নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, এই সপ্তাহে আলাস্কায় ফাইজারের ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ পাওয়ার পর দুজন স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে অ্যালার্জি দেখা দেয়। এর আগে ব্রিটেনের আরও দুই জনের ভ্যাকসিন নেওয়ার পর অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন হয়। এই চার জনের মধ্যে তিনজনেরই অ্যানাফিল্যাক্সিস হয়েছিল।

অ্যানাফিল্যাক্সিস এক ধরনের তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া যা তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হয়। এটি কখনও কখনও মৃত্যুর কারণও হতে পারে। সাধারণত চুলকানি ফুসকুড়ি, গলা বা জিহ্বায় ফোলাভাব, শ্বাসকষ্ট হওয়া, বমি বমিভাব, হালকা মাথাব্যথা, নিম্ন রক্তচাপের মতো উপসর্গগুলো কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর দেখা দেয়।

অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া ও এর চিকিৎসা

জানা গেছে, ব্রিটেনের দুই স্বাস্থ্যকর্মী যাদের শরীরে অ্যালার্জি দেখা গিয়েছিল তাদের দুজনই এর আগে মারাত্মক অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় ভুগেছেন এবং এর জন্য চিকিত্সাও নিয়েছেন। তবে, ভ্যাকসিনে থাকা কোনও উপাদানের ক্ষেত্রে এর আগে তাদের অ্যার্লাজি হয়নি।

ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে তাদের অ্যানাফিল্যাক্সিস দেখা দিলে এপিনেফ্রিন (অ্যানাফিল্যাক্সিসের সাধারণ চিকিত্সা) এর একটি ইনজেকশন দেওয়ার পর দুজনই সেরে ওঠেন।

অন্যদিকে গত বুধবার আলাস্কার দুই স্বাস্থ্যকর্মীরও ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়ার পর অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন হয়। তাদের মধ্যে একজনের হালকা প্রতিক্রিয়া ছিল এবং অন্যজন, মধ্যবয়সী এক নারী স্বাস্থ্যকর্মীর অ্যানাফিল্যাক্সিস হয়।

জানা গেছে, তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাওয়া ওই স্বাস্থ্যকর্মীর কোনো অ্যালার্জির ইতিহাস ছিল না। এপিনেফ্রিনের ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরেও তাকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল।

তবে চিকিৎসার পর ব্রিটেন ও আলাস্কার চার জনই অ্যালার্জির তীব্র প্রতিক্রিয়া কাটিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।

ভ্যাকসিনে থাকা উপাদান

গত সপ্তাহে, ব্রিটিশ ওষুধ নিয়ন্ত্রকরা কোনো খাবার, ওষুধ বা ভ্যাকসিনের কারণে আগে অ্যানাফিল্যাক্সিস হয়েছে এমন ব্যক্তিদের ফাইজারের ভ্যাকসিন না নেওয়ার পরামর্শ দেন।

বৃহস্পতিবার এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের ভ্যাকসিন এবং এ সম্পর্কিত পণ্যের ক্লিনিকাল বিভাগের উপপরিচালক ডা. ডোরান ফিংক মডার্নার তৈরি ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও অ্যালার্জির সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন।

ডা. ফিংক বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি এ ধরনের আরো কিছু রিপোর্ট আসতে পারে, আমরা সেগুলো দ্রুত তদন্ত করে দেখব।’

তিনি জানান, এই ধরনের ঘটনা শনাক্ত করার জন্য শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এফডিএ ফাইজারের সঙ্গে ভ্যাকসিনের উপাদানগুলো আরেকবার যাচাই করতে ও ভ্যাকসিন সম্পর্কে নির্দেশিকা তৈরিতে কাজ করবে, যাতে জনসাধারণ অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারে এবং এটি হলে কী করতে হবে তা জানতে পারে।

যাদের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে তাদের পর্যবেক্ষণ এবং আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় কিনা তা যাচাই করছেন মার্কিন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের অ্যালার্জিস্ট, ইমিউনোলজিস্ট ও ড্রাগ অ্যালার্জি গবেষক ডা. কিমবার্লি ব্লুমেন্টাল বলেন, ‘যা ঘটছে তা আমার কাছে সত্যিই অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। ভ্যাকসিন থেকে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া সাধারণত বিরল, এক মিলিয়নে প্রায় একজনের ঘটে।’

মাত্র দুটি অঞ্চল- ব্রিটেন ও আলাস্কায় অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার বিষয়টি কিছুটা উদ্ভট বলে জানান তিনি।

ডা. ব্লুমেন্টাল বলেন, ‘দুটি হটস্পটের মধ্যে মিলগুলো খুঁজে বের করতে পারলে সেটি সমস্যার উত্স খুঁজে পেতে গবেষকদের সাহায্য করবে।’

ব্রিটিশ ও মার্কিন সংস্থাগুলো এ নিয়ে তদন্ত শুরু করলেও এ ঘটনায় সরাসরি দুই জায়গার মধ্যে কোনো সূত্র আছে কিনা তা এখনও জানা যায়নি।

তবে ডা. ব্লুমেন্টালের ধারণা, অ্যার্লাজি ভ্যাকসিনের শটগুলোর সঙ্গেই সম্পর্কিত, কারণ প্রতিক্রিয়াগুলো তাত্ক্ষণিক ছিল, ইনজেকশন দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটেছিল।

এছাড়াও ভ্যাকসিনে থাকা কোনও নির্দিষ্ট উপাদানের কারণে এটি হতে পারে কিনা সেটিও এখনও স্পষ্ট না। ফাইজারের ভ্যাকসিনে কেবল ১০টি উপাদান রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ম্যাসেঞ্জার আরএনএ বা এমআরএনএ নামের একটি জেনেটিক উপাদান, যা মানবকোষকে স্পাইক নামক করোনা ভাইরাস প্রোটিন তৈরি করতে নির্দেশ দেয়।

স্পাইকটি একবার তৈরি হয়ে গেলে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে করোনাভাইরাস চিনতে শেখায়, যাতে এটির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে লড়াই করা যায়। ম্যাসেঞ্জার আরএনএ প্রাকৃতিকভাবেই মানুষের কোষে পাওয়া যায়, এতে কোনও হুমকির সম্ভাবনা নেই।

অন্যান্য নয়টি উপাদান লবণ, চর্বিযুক্ত পদার্থ ও শর্করার মিশ্রণ ভ্যাকসিনকে স্থিতিশীল করে। কোনটিই সাধারণত অ্যালার্জেন বা অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া হতে পারে এমন নয়। পলিথিলিন গ্লাইকোল (পিইজি) নামের একটি রাসায়নিক উপাদান অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়ার জন্য দায়ী হতে পারে।

ডা. ব্লুমেন্টাল বলেন, ‘পিইজি থেকে অ্যালার্জির ঘটনা আমি এর আগে কেবল একজনের ক্ষেত্রে দেখেছি। এটা সত্যিই অস্বাভাবিক।’

তিনি জানান, অন্য কোনও কারণেও এই প্রতিক্রিয়া হতে পারে – সম্ভবত ভ্যাকসিনগুলো কীভাবে পরিবহন করা হচ্ছে- এ সম্পর্কিত কোনও কারণেও এটি হয়ে থাকতে পারে।

ক্লিনিকাল ট্রায়ালে অ্যালার্জিজনিত ঘটনা

ক্লিনিকাল ট্রায়ালে অ্যালার্জিজনিত সমস্যা দেখা গিয়েছিল কিনা জানতে চাইলে ফাইজারের মুখপাত্র স্টিভেন ড্যানাহি জানান, ফাইজারের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে স্বল্প সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবীর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। শেষ পর্যায়ের ট্রায়ালে যারা ভ্যাকসিন পেয়েছিলেন, তাদের ১৮ হাজার ৮০১ জনের মধ্যে কেবল এক জনের অ্যানাফিল্যাক্সিস হয়। এই ঘটনাটিকে ভ্যাকসিনের সঙ্গে সম্পর্কিত না বলে ধারণা করা হয়েছিল।

অন্যদিকে যারা প্লেসবো শট পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে কোনও তীব্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

অ্যানাফিল্যাক্সিসের ইতিহাস আছে এমন ব্যক্তিদের ফাইজার ক্লিনিকাল ট্রায়ালে ভ্যাকসিন নেওয়া থেকে বাদ দেয়।

ফাইজারের মুখপাত্র স্টিভেন ড্যানাহি এ প্রসঙ্গে এক ইমেইলের জবাবে বলেন, ফাইজার আলাস্কার পরিস্থিতি যাচাই করতে সেখানকার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে, এবং পরবর্তীতে যে কোনও প্রতিক্রিয়া জানতে নজর রাখছে।

‘হালকা অ্যার্লাজি থাকলে ভ্যাকসিনে ঝুঁকি নেই’

ফাইজার ও মডার্নার দুটি ভ্যাকসিন নিয়ে আলোচনায় অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। তারা এক্ষেত্রে সাবধান থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

স্বাস্থ্যকর্মী যারা ভ্যাকসিন দিচ্ছেন তাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, ভ্যাকসিনটির কোনো উপাদানের প্রতিক্রিয়ায় এর আগে ‘মারাত্মক অ্যালার্জির ঘটনা’ আছে এমন কেউ যাতে ভ্যাকসিনটি না পায়।

তবে, যাদের হালকা অ্যালার্জি আছে, যেটা অধিকাংশের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক, তাদের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন না নেওয়ার মতো তেমন কোনো প্রমাণ নেই।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ফুলের রেণু, চিনাবাদাম, বিড়ালের লোম ইত্যাদির ক্ষেত্রে যাদের হালকা শারীরিক প্রতিক্রিয়া যেমন নাক থেকে পানি ঝরা, কাশি বা হাঁচির মতো উপসর্গ দেখা যায় তাদের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনটি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে প্রমাণিত হয়নি।

আমেরিকান কলেজ অব অ্যালার্জি, অ্যাজমা অ্যান্ড ইমিউনোলজির এক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যাদের সাধারণ অ্যালার্জি আছে তারা যাদের একেবারেই অ্যালার্জি নেই তাদের মতোই নিরাপদ থাকবেন। ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে তেমন অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ব্র্যান্ডন রিজিওনাল হাসপাতালের ক্লিনিকাল ফার্মাসিস্ট উইলিয়াম আমারকোয়ে জানান, যাদের অতীতে অন্য কোনো ভ্যাকসিন নিয়েও কখনও সমস্যা হয়নি তাদের ক্ষেত্রে এই ভ্যাকসিন নিতে বাধা হওয়ার কথা না।

যাদের মারাত্মক অ্যালার্জি আছে তাদের ক্ষেত্রে

এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালার্জি ও ইমিউনোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. ইউন-হিউং লি জানান, অ্যালার্জি আছে এমন বেশিরভাগ মানুষ ভ্যাকসিন নিতে পারার কথা।

রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) থেকে প্রকাশিত গাইডলাইনে কেবল একটি গ্রুপকে ফাইজারের ভ্যাকসিন না নিতে বলা হয়েছে। তারা হলেন, যাদের ওই ভ্যাকসিনে থাকা উপাদানগুলোর কোনোটিতে মারাত্মক অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশনের ইতিহাস আছে।

অন্যান্য ভ্যাকসিন বা ওষুধ কিংবা অন্য যে কোনও পদার্থে অ্যানাফিল্যাক্সিসের ইতিহাস রয়েছে এমন মানুষের জন্যও এখন পর্যন্ত ভ্যাকসিনটি নিরাপদ। তবে ভ্যাকসিন নেওয়ার আগে তাদের অবশ্যই স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। প্রথম ইনজেকশন নেওয়ার পর ৩০ মিনিট পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে।

অন্য সবাইকেই, যাদের হালকা অ্যালার্জি আছে বা একেবারেই নেই তাদেরও ভ্যাকসিন নেওয়ার পর ১৫ মিনিট কেন্দ্রে অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে।

এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ ও ইমিউনোলজিস্ট ডা. মেরিন কুরুভিলা বলেন, ‘সাধারণত এপিনেফ্রিনের প্রয়োজন হয় এমন তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়াগুলো প্রথম ৩০ মিনিটের মধ্যেই ঘটে।’

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:৫৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত