ঘোষণা

আবদুল কাদেরকে নিয়ে সহশিল্পীরা

অনলাইন ডেস্ক | রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 310 বার

আবদুল কাদেরকে নিয়ে সহশিল্পীরা

মঞ্চ ও টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা আবদুল কাদের আজ শনিবার সকালে ক্যান্সারের কাছে হার মেনে চিরবিদায় নিয়েছেন। ঢাকার মঞ্চে অসাধারণ কিছু নাটকে তিনি দীর্ঘদিন অভিনয় করেছেন। অসংখ্য টেলিভিশন নাটকে তার ছিল সরব উপস্থিতি। অন্যদিকে চলচ্চিত্র ও মডেলিংও করেছেন।

পরিবারের সদস্যকে হারালাম: ফেরদৌসী মজুমদার

আবদুল কাদেরকে কখনও পরিবারের বাইরের কেউ মনে হয়নি। সবসময় মনে হয়েছে ও আমার পরিবারের একজন, পরিবারের ঘনিষ্ঠজন। আমি আমার পরিবারের এক সদস্যকে হারালাম। আমাকে সে ভাবী ডাকত। কিন্তু আমি তাকে ভাইয়ের চোখে দেখতাম।

মঞ্চে আবদুল কাদেরের মত অভিনয়ের প্রতিভা কম দেখেছি। মঞ্চের সংলাপ বলার ক্ষেত্রে ওর স্মরণশক্তির তুলনা হয় না। মঞ্চে উঠামাত্র দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখত সে।

আবদুল্লাহ আল মামুন ভাই ওকে টেলিভিশন নাটকে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। আমরা মঞ্চে পেরেছিলাম। মঞ্চে ওর সঙ্গে অভিনয় করে অসম্ভব ভালো লাগত। সহশিল্পী হিসেবে যোগ্য ছিল। মঞ্চের প্রতি ওর আলাদা একটা টান ছিল।

ওর মত রসবোধ সম্পন্ন মানুষ কমই দেখেছি। এতটা রসবোধ নিয়ে কম মানুষই জন্মায়। ওর রসবোধ যেকোনো মানুষের মন ভালো করে দিতে পারত।

আবদুল কাদের সবার আগে ওর পরিবারকে প্রাধান্য দিত। ওর ছেলের বউ ওর জন্য যতটা আত্মত্যাগ করেছে, এটা সবার কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে। এদিক দিয়ে ছেলের বউ প্রচণ্ড সহযোগিতা করেছে। এটা ভাগ্য বলতে হবে।

আমাদের নাটকের দল থিয়েটারে বহু বছর ধরে জড়িত ছিল সে। থিয়েটারে ওর জায়গাটা শূন্য থাকবে।

কাদেরকে দেখলেই মন ভালো হয়ে যেত: আসাদুজ্জামান নূর

চেন্নাইয়ের হাসপাতালে থাকার সময় আবদুল কাদের আমার সঙ্গে দুই দিন ভিডিও কলে কথা বলেছিল। খুব আকুতি করে বলেছিল- ঢাকায় ফিরতে চাই। তারপর তো ঢাকায় ফিরে আসে। ঢাকায় এসেও হাসপাতাল থেকে একদিন ফোনে কথা বলেছিল আমার সঙ্গে।

সত্যি কথা বলতে চেন্নাইয়ের হাসপাতাল থেকে বলে দিয়েছিল আর কিছু করার নেই। এ কথা কাদেরের পরিবারের সদস্যরা জানতেন। আমিও জানতাম। আমাদের আসলে কিছুই করার ছিল না অপেক্ষা করা ছাড়া। এটাই বাস্তবতা।

একমাত্র সৃষ্টিকর্তার হাতে সব ছিল। যাই হোক, এত প্রিয় একজন মানুষের চলে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আমার মনটা বিষণ্ণ।

আমি আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে হারালাম। টেলিভিশনে বেশকিছু কাজ একসঙ্গে করেছি আমরা। কোথাও কেউ নেই ধারাবাহিকের মতো আলোচিত নাটকেও একসঙ্গে কাজ করেছি। টিভি নাটকের ক্ষেত্রে বদি চরিত্রটি বহু বছর মানুষ মনে রাখবে।

মঞ্চে ওর অভিনয় দেখেছি। একটা সময় চাকরির কারণে মঞ্চে কম সময় দিত। কিন্তু মঞ্চ ছাড়েনি কখনও। মঞ্চে সক্রিয় ছিল অনেকদিন।

আবদুল কাদের এমন একজন মানুষ, তাকে দেখলেই মন ভালো হয়ে যেত। মন খারাপ করে থাকার কোনো উপায় থাকত না। আমি তাকে কোনোদিনও কারও বিরুদ্ধে কিছু বলতে শুনিনি। এটা ছিল তার বড় গুণ।

সবচেয়ে বড় কথা- বড় হৃদয়ের মানুষ ছিল সে। আর পারিবারিকভাবে ছিল একজন মায়ার মানুষ। স্ত্রী, সন্তান, নাতী-নাতনীদের ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখত।

এ বছর অনেক প্রিয়জনকে হারালাম। আনিসুজ্জামান থেকে শুরু করে আলী যাকের, সর্বশেষ আবদুল কাদের। সব প্রিয়জনরা চলে যাচ্ছেন। মনটা বিষণ্ণতায় ভরে থাকে প্রিয়জনদের মৃত্যুর খবরে।

একটি মঞ্চ নাটকের পুরোটা মুখস্থ বলতে পারত: রামেন্দু মজুমদার

আবদুল কাদের ১৯৭৪ সাল থেকে আমাদের নাটকের দল থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। শুরু থেকেই দলে সে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। কারণ- অভিনয় ও সাংগঠনিক ক্ষমতা দুটিই তার মধ্যে ছিল। যে কারণে দীর্ঘ দিন আমার নাটকের দলে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছে।

মঞ্চে যখন যে চরিত্র তাকে দেওয়া হত সেটাই করত। সব ধরণের চরিত্রে অভিনয় করতে পারত। সব শিল্পী এটা পারে না। সে পারত। অভিনয় গুণটা অসম্ভব রকমের ছিল।

তার বড় একটি গুণ ছিল একটি মঞ্চ নাটকের পুরোটা মুখস্থ বলতে পারত। এটা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কেবল নিজের সংলাপ মুখস্থ পারত তা না। পুরো নাটকের সংলাপ মুখস্থ বলা কঠিন কাজ। এটা সে পারত।

চাকরির কারণে একটা সময়ে দলে কম সময় দিত। কিন্তু যোগাযোগটা রাখত। মঞ্চের খোঁজ খবর নিত। আসলে টানটা মঞ্চে থেকেই গিয়েছিল।

হঠাৎ করেই চলে গেল। কাউকে কিছু করতে দিল না। যেখানে থাকুক, ভালো থাকুক।

নাটকে কাদেরের মতো ভালো মানুষের খুব অভাব: আবুল হায়াত

নাটকের জগতে শিল্পী অনেক আছেন। আবদুল কাদের ছিল অনেক বড় মাপের শিল্পী। তার চেয়েও বড় কথা- সে অনেক ভালো মানুষ ছিল। নাটকের জগতে তার মতো ভালো মানুষ কমই দেখেছি। তার মতো ভালো মানুষের এখানে খুব অভাব।

আবদুল কাদের সবার আপন মানুষ ছিল। কাউকে ছোট করে, কাউকে দোষারোপ করে কিছু বলত না। এটা তার চরিত্রের মধ্যে ছিল না। সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাইত সবসময়।

এই গুণটা তার ছিল, যা আমাকে মুগ্ধ করত।

পরিবার অন্তঃপ্রাণ মানুষ ছিল আবদুল কাদের। স্ত্রী, সন্তান, নাতী, সব সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালন করত শতভাগ।

আর ছিল সরল মানুষ। শিশুর মত সরল ছিল তার ভেতরটায়। দেখা হলেই চিরদিনের সুন্দর হাসি হাসত। সেই হাসিমুখ আর দেখতে পারব না। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

মেয়ের বিয়েতে আমাকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল: দিলারা জামান

সকালবেলা মন খারাপ করা খবরটি শোনার পর কেমন যেনো লেগেছে। মনে হয়েছে খুব কাছের মানুষকে হারালাম। আমরা শিল্পীরা তো সব মিলিয়ে একটি পরিবারই। পরিবারের একজন চলে গেল। আমি বলব বড় অসময়ে চলে গেল।

শিল্পীর বাইরে বড় একজন কর্মকর্তা ছিল। কিন্তু শিল্পের প্রতি মনটা পড়ে থাকত সবসময়। তাই তো অভিনয় কখনও ছাড়েনি। ওর সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। কত স্মৃতি জমে আছে। অভিনয়ে একটু বিরতি পড়লেই ওর হাসিমুখ আর গল্প শুরু হত। এতটাই হাসাতে পারত, যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়।

ওর মেয়ের বিয়েতে দাওয়াত দিয়েছিল। আমি গিয়েছিলাম। মেয়ের বিয়েতে আমাকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল। অনেক কথা বলেছিল।

আমি বলব একজন আবদুল কাদেরের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। বড় মাপের একজন শিল্পীকে আমরা হারালাম।

কাদের ছিল জাত অভিনেতা: ড. ইনামুল হক

আবদুল কাদের ছিল জাত অভিনেতা। যেকোনো চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারত। অভিনয়টাকে খুব ভালোবাসতো। অভিনয়ের ক্ষুধা ওকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়াত। একজন জাত শিল্পী না হলে এমনটা সম্ভব না।

আমি ওর মঞ্চের অভিনয় নিয়ে বলব। মঞ্চে ওর অভিনয় দেখেছি। মেরাজ ফকিরের মা নাটকে মঞ্চে কী অসাধারণ অভিনয় করত। কয়েকবার দেখেছি মঞ্চে ওর অভিনয়।

আবদুল কাদের মেরাজ ফকিরের মা নাটকটি নিয়ে যখন মঞ্চে উঠত, দর্শকদের মাঝ থেকে অন্যরকম সাড়া পাওয়া যেত। এটা সবার ভাগ্যে হয় না। মঞ্চের জন্য নিবেদিত মানুষ ছিল। আমি মনে করি ঢাকার মঞ্চকে বড় কিছু দিয়েছিল সে।

দেখা হলেই ইনাম ভাই বলে সম্বোধন করত। তার মুখ থেকে ইনাম ভাই ডাকটা মিস করব সারাজীবন। কানের মধ্যে ইনাম ভাই ডাকটি খুব বাজছে।

হঠাৎ করে শুনতে পাই আবদুল কাদেরের ক্যান্সার হয়েছে। এত দ্রুত ক্যান্সার তাকে নিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য ভাবিনি।

মানুষকে এত করে আনন্দ দিতে পারত। যতদিন বাঁচব খুব করে মিস করব তাকে।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৫:৩৮ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত