ঘোষণা

আমাদের গল্টু

মিথুন বিবেরু | শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | পড়া হয়েছে 406 বার

আমাদের গল্টু

 

পল্টু আর গল্টু দুই ভাই। পল্টু বড় হলেও গল্টু পল্টুর চেয়ে অনেক চালাক। গল্টু তাদের পুরো গ্রামের মধ্যে যে ব্যতিক্রমী ধরনের এক ছেলে সেটা গ্রামের সকলেই প্রায় জানে। বলা যায় সে খুব দুষ্ট বা চঞ্চল স্বভাবের। বুদ্ধি যেন মাথায় তার গিজগিজ করে। পুরো গ্রামে সে সারাদিন চষে বেড়ায়। এমনকি গ্রামে কার বাড়ির কোন গাছে পাখি বাসা বেঁধেছে আর কোন বাসায় পাখি ডিম দিয়েছে, কোনদিন বাচ্চা ফুটেছে এসবই তার জানা।
প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে বই খাতা নিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে দুইভাই রওনা দিয়ে স্কুল পর্যন্ত যায় ঠিকই কিন্তু মাসের বেশির ভাগ দিন গল্টু আর স্কুলে গিয়ে ক্লাস করে না। তার স্কুলের সময়ও জানা। জানে কখন ছুটি হয়। তাই স্কুলের সময়টুকু গ্রামে টো-টো করে বেড়ালেও স্কুল ছুটি হবার সময় হলে ঠিকই আবার স্কুলের সামনে বইখাতা নিয়ে এসে হাজির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। স্কুল ছুটির ঘন্টা হলে অন্য ছাত্রছাত্রীদের সাথে দলের ভিতর মিশে যায়। সবার সাথে আবার বাড়ি ফিরে যায় ঠিকই। তাকে দেখে বাড়ির কারোরই বোঝার উপায় নেই যে সে স্কুল ফাঁকি দিয়ে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির ভিটায় গাছে গাছে চড়ে পাখির বাসা খুঁজে বেড়ায়।
একদিন পল্টুকে বলল, দাদা চল আজকে আমরা পাখির বাসা দেখতে যাই। বলেই বলল, কস্তার বাড়ির ভিটায় খেজুর গাছে ঘুঘু পাখি বাসা করেছে। বাসায় দেখেছি ঘুঘু পাখি ডিম পেড়েছে।
পল্টু বলল, আমি যাবো না। মা জানলে বকবে।
না বকবে না। মা জানতেই পারবে না। চল যাই।
না, আমি যাবো না। তুই যা।
আমি একা গেলে তো ঘুঘুর ডিম নিয়ে আসতে পারবো না।
কেনো পারবি না?
আমি গাছে উঠলে নিচে তো একজনকে পাহারা দিতে হবে। তা না হলে কেউ যদি দেখে ফেলে?
দেখবে না। আর দেখলে কি হবে? তুই তো আর কারো কোন ক্ষতি করবি না?
আরে চল তো। আমরা না গেলে দেখবি অন্য কেউ জানলে বাসা ভেঙ্গে ডিম নিয়ে যাবে।
তুই কি করে জানলি কস্তার বাড়ির খেজুর গাছে যে ঘুঘু বাসা করেছে?
আমি দেখেছি। সেদিন দেখলাম ঘুঘু বাসায় বসে আছে। ডিম না পাড়লে ঘুঘু কখনও বাসায় বসে থাকবে না।
আরে তুই জানিস না। আমার সাথে চলতো।
স্কুলে যাবি না?
স্কুলে গেলে তো ঘুঘুর বাসায় আর ডিম দেখতে পাবি না। ঘুঘু যদি টের পায় যে আমরা দেখে ফেলেছি তাহলে সব ডিম নিজেই আবার খেয়ে ফেলবে।
স্কুল ফাঁকি দিলে পরে যদি দিদিমনি বাড়িতে মাকে বলে দেয়, তখন দেখবি মা আবার মারবে।
গল্টু পল্টুকে ডান হাত উঁচিয়ে তার বৃদ্ধাঙ্গুল মুখের কাছে নিয়ে বলল, তুমি জানো আমার কচু। বলেই আবার বলল, আমি প্রায়ই ক্লাস ফাঁকি দেই স্কুল। স্কুলের দিদিমনি অনেক ভালো। বাড়িতে আমার কথা বলে না।
পল্টু অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, তুই না আমার সাথে বাড়ি থেকে প্রতিদিন স্কুলে যাস?
তুমি দাদা বোকা। আমি কি আর ক্লাসে যাই? ক্লাসে গিয়া কিচ্ছু হইবো না। তার চাইতে ভালো গ্রামে ঘুইরা ঘুইরা পাখির বাসা ভাঙ্গলে মজা আছে।
আবার যে আমাদের সঙ্গেই বাড়ি ফিরে আসস?
তুমি ক্লাসে ঢুকলেই আমি বাইরে বের হয়ে চলে আসি। তুমি টেরই পাও না। বলেই অনুরোধ করে গল্টু পল্টুকে, চলো না যাই।
তুই কি আজকে স্কুলে যাবি না।
যাবো তো। তবে স্কুলে গিয়ে আর ক্লাসে যাবো না। ক্লাসে গেলে আর বের হতে পারবো না। বই খাতা কোথাও গাছের নিচে লুকিয়ে রেখে চলে যাবো কস্তার বাড়ি। দুপুর বেলা বাড়িতে বড় কেউ থাকে না। আমরা আস্তে আস্তে গাছে উঠে ঘুঘু পাখির ডিম পেড়ে নিয়ে আসবো।
দুইভাই যা পরিকল্পনা করে তাই বাস্তবায়নের জন্য বাড়ি থেকে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সবাই জানে দুই ভাই নিয়মিত স্কুলে যায় একসাথে। তাই তাদের দিকে বাড়ির অন্য কেউ আর নজরদারি করে না। স্কুল থেকে বের হয়ে সামনেই বাঁশ ঝাড়, সেখানে তাদের বইখাতা লুকিয়ে রেখে দুইভাই দেয় দৌড়। কেউ বুঝতে পারে না তারা কোথায় যাচ্ছে এভাবে দৌড়ে। দৌড়াতে দৌড়াতে কস্তার বাড়ির কাছে গিয়ে রাস্তার ধারে তারা দুইভাই পাশাপাশি বসে পড়ে। সেখান থেকে স্কুলের ঘন্টার শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। স্কুল শুরুর শেষ ঘন্টা বাজার শব্দ শুনে তারা দুই ভাই কস্তার বাড়ির আশে পাশে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করে। একসময় তারা দেখে বাড়ির কোনো লোকজন আর দেখা যায় না। সবাই যে যার মতো কাজে গিয়েছে। মহিলা যারা আছে তারা রান্না ঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত।
এসময় গল্টু পল্টুকে বলল, তুই এক কাজ কর, গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দেখবি কেউ আসে কিনা। কেউ আসলে আমাকে আগে থেকে ইশারা দিবি। আমি গাছে উঠবো। ডিম যে কয়টা আছে সব কয়টা পকেটে করে নিয়ে আস্তে করে নেমে আসবো।
পল্টু এর আগে কখনো এমন কাজ করেনি। কিন্তু ছোট ভাই গল্টুর কথায় আজ এসেছে ঘুঘু পাখির বাসা থেকে ডিম চুরি করতে। নতুন হওয়ায় তার ভিতর কিছুটা ভয়ও কাজ করছে।
পল্টুকে গাছের নিচে দাঁড় করিয়ে রেখে গল্টু গাছে উঠতে থাকে। পাখির বাসার ঠিক কাছাকাছি পৌছতে দেখে সেখানে ঘুঘু পাখি নেই। নিচ থেকেই বাসা দেখা যায়। বাসায় কোনো ডিম আছে কিনা সেটাও সে তখনও দেখতে পায় না। সেখান থেকে সামান্য আর একটু উপরে উঠে বাসার দিকে হাত বাড়াতেই এক সাপ ফুস করে তার দিকে তাকিয়ে ফনা তোলে। এ দেখে গল্টু মাগ্গো বলে দিল এক চিৎকার। চিৎকার শুনে বাড়ির কয়েক মহিলা রান্না ঘর থেকে বের হয়ে দৌড়ে আসে। বাইরে আসতে আসতে দূর থেকে খেয়াল করে দেখে পল্টু দৌড়ে পালাচ্ছে। গল্টু তখন গাছের ডাল ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। মহিলারা বাইরে এসে এদিক সেদিক তাকাতে থাকে আর ভাবে কে কোত্থেকে এমন জোরে চিৎকার করেছে। কোনো কিছু না দেখে যে যার মতো করে আবার রান্না ঘরে ঢুকে যায়।
এদিকে গির্জায় প্রতিদিনের মতো দুপুর বারটার ঘন্টা বাজে। ঘন্টার বাজার সাথে সাথে মহিলারা যে যার মতো করে নিজেরা প্রর্থণা করতে শুরু করে। এমন সময় গল্টু আবার উপরের দিকে উঠার চেষ্টা করলে সাপটি কোত্থেকে আবার গল্টুর খুব কাছে এসে আবার তাকে ছোবল দেয়। গল্টু এবার আরো জোরে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারায়। জ্ঞান হারানোর সাথে সাথে গাছের উপর থেকে সাথেই ঘরের টিনের চালে উপর ধপাস করে পড়ে।
গাছের উপর থেকে গল্টুর পড়ার এমন জোরে শব্দ হয় যে, এতে পুরো বাড়ির লোকজন ভুত ভুত বলে চিৎকার চেচামেচি করতে শুরু করে।
এসময় বাড়ির লোকজনের চিৎকার চেচামেচি শুনে এলাকার লোকজন দৌড়ে এসে বাড়িতে ভিড় জমায়। বাড়িতে কি হয়েছে, কেনো এভাবে ভুত ভুত বলে চিৎকার চেচামেচি করছে তা দেখার জন্য আশেপাশের বাড়ির লোকজনও এসে ভিড় করে। এসে দেখে বাড়ির মহিলারা কোনো কিছু না দেখেই বলছে ভুত ভুত। কিন্তু কোথায় কিসের ভুত সে আর কেউ বলতে পারে না।
আশে পাশে খুঁজে দেখে ঘরের চালে শুয়ে আছে বাচ্চা এক ছেলে। সবাই বাচ্চা ছেলেটিকে দেখে বলছে, ভুত কোত্থেকে যেন এই বাচ্চা ছেলেটিকে তুলে এনে এখানে ঘরের চালের উপর ছেলেটিকে ফেলেছে।
তাড়াতাড়ি করে কয়েকজন লোক একসাথে মিলে ঘরের পিছন দিক দিয়ে ঘরের চালে উঠার ব্যবস্থা করে। সবাই আস্তে আস্তে কিছুটা ভয়ে পা টিপে টিপে ছেলেটির কাছে যায়। পরে তাকে ধরাধরি করে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে। পরে তাদের একজন বাচ্চা এই ছেলেটিকে দেখে বলে, আরে কিসের ভুত? এতো রিবেরু বাড়ির গল্টু। গল্টুকে সবাই সনাক্ত করার পর তাড়াতাড়ি করে সবাই মিলে তার মাথায় পানি ঢেলে জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা করে। তখন সবাই বলাবলি করতে থাকে, আরে কোনো ভুন না, এ আমাদের গল্টু।

 

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১:২২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীরব-নিথর অবয়ব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০