ঘোষণা

একদা শান্তির জনপদ বেগমগঞ্জ এখন ৫০ বাহিনীর কাছে জিম্মি

আনোয়ারুল হায়দার | মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | পড়া হয়েছে 39 বার

একদা শান্তির জনপদ বেগমগঞ্জ এখন ৫০ বাহিনীর কাছে জিম্মি

সংঘবদ্ধ ধর্ষণ আর নারী নির্যাতনের ঘটনায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উঠে এসেছে সংবাদ শিরোনামে। নারী নির্যাতনে অভিযুক্ত দেলোয়ার বাহিনীর প্রধানসহ অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর বেগমগঞ্জ উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন আর একটি পৌরসভার প্রায় ৫০টি সন্ত্রাসী বাহিনীর তথ্যও উঠে আসছে।

তবে নোয়াখালী পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বেগমগঞ্জের সন্ত্রাসী বাহিনীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি বেগমগঞ্জে দুটি সন্ত্রাসী বাহিনী- সম্রাট ও সুমন বা খালাসি সুমন বাহিনী ছাড়া আর কোনো বাহিনী নেই। তবে দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে প্রায় সব ইউনিয়নেই ৪-৫টি সন্ত্রাসী বাহিনী ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেছে। অভিযোগ আছে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়প্রশ্রয় আর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঢিলেঢালা মনোভাবের সুযোগে এসব বাহিনী দাপিয়ে বেড়ায় পুরো উপজেলায়।

বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও নোয়াখালী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ডা. এ বি এম জাফর উল্যা বলেন, ‘একসময় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপজেলা বেগমগঞ্জ এখন অপরাধী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। এজন্য রাজনৈতিক কোন্দল, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, প্রশাসনের শিথিল মনোভাব ও সুশাসনের অভাবকে দায়ী করেন এ রাজনীতিবিদ।

দেলোয়ার বাহিনী:

গত ৪ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বেগমগঞ্জের একলাশপুর ইউনিয়নের নারী নির্যাতনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার। এক সময়ের অটোরিক্সা সিএনজি চালক দেলোয়ার ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় একলাশপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতাদের হাত ধরে যুবলীগে প্রবেশ করে। দলে তার কোন পদবী না থাকলেও এলাকায় দেলোয়ার যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ আছে, ২০১৮ সালে দেলোয়ার জোড়া খুন মামলার আসামি ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ ধরা পড়ে পিটুনির শিকার হলেও দেলোয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তার বিরুদ্ধে আছে ৬টি মামলা।

বেগমগঞ্জের একলাশপুরে নির্যাতনের ৩২ দিন পর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেলোয়ার ও তার সহযোগীরা একে একে গ্রেপ্তার হতে থাকলে বেগমগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের লোকজন সন্ত্রাসী বাহিনী সম্পর্কে মুখ খুলতে শুরু করেন।

কয়েকটি ইউনিয়নের লোকজন জানিয়েছেন, দেলোয়ার বাহিনীর মতো প্রতিটি ইউনিয়নে ৪-৫ টি করে সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। এসব বাহিনী স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই গ্রুপের আশীর্বাদপুষ্ট। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই এসব সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর চাহিদা ও কদর বেশি। আর এর সুযোগ নেয় স্থানীয় থানা পুলিশ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেগমগঞ্জে প্রধান দুটি সন্ত্রাসী বাহিনীর এক পক্ষের নেতৃত্বে ৩৮ মামলার আসামি সম্রাট ও অপর পক্ষের নেতৃত্বে ৩৬ মামলার আসামি সুমন বা খালাসি সুমন বাহিনী। এই দুই জনের বাড়িই চৌমুহনীর পৌর হাজিপুরে। চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এমনকি ভাড়ায় মানুষ হত্যার মতো অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে।

কোন ইউনিয়নে কোন সন্ত্রাসী বাহিনী:

একলাশপুরের পাশের ইউনিয়ন শরীফপুর। স্থানীয়রা জানান, এখানে রয়েছে ইউছুফ ও সোহাগ বাহিনী।

প্রবাসী, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবিসহ, জমি দখল, মানুষ হত্যার অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে। থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

শরীফপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মো. নোমান দাবি করেন, ইউছুফ, সোহাগ, হৃদয়, ফয়সাল, বিজয় এরা শিবির ও ছাত্রদলের সক্রিয় সদস্য। তারা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে এলাকায় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি করে আসছে।

তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও শরিফপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রসুল মিন্টু এসব সন্ত্রাসী বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছেন।

তবে এই অভিযোগ নাকচ করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রসুল মিন্টু। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, সোহাগ ও ইউছুফ যুবলীগ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে তার কাছে কেউ কোনোদিন অভিযোগ করেনি বলেও দাবি করেন তিনি।

ছয়ানী ইউনিয়নে রয়েছে জাহাঙ্গীর, জুয়েল, সোহেল ও মিঠু বাহিনী। আলাইয়ারপুর ইউনিয়নে টিটু, মোহন, বাবু ও মনা বাহিনী। গোপালপুর ইউনিয়নে সক্রিয় রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা ও স্থানীয় ইউপি সদস্য ওজিউল্যা মেম্বার বাহিনী, সাদ্দাম, মাসুম বাহিনী, জামায়াত নেতা মামুন হুজুর ও জসিম হুজুর বাহিনী, জিকু বাহিনী, রকি বাহিনী, দেলোয়ার ও জনি বাহিনী।

গোপালপুর ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা কামরুল হুদা মিন্টু জানান, তার ইউনিয়নে মূলত তিনটি সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। একটি আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেম্বার ওজিউল্যা বাহিনী, সাদ্দাম বাহিনী ও জামায়াত শিবির সমর্থিত একটি বাহিনী। তাদের প্রধান কাজই হলো চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা।

আমানউল্যাহপুর ইউনিয়নে রয়েছে মামুন বাহিনী, পিয়াস, নাইমুল, মুন্সি, বাবু ও মান্নান বাহিনী। ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা খোকনের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে দলীয় কোন্দল রয়েছে বলে জানা গেছে। দুজনের বিরুদ্ধেই বাহিনী পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। দুই দলের কোন্দলে চলতি বছর ৩ মার্চ গুলিতে ছাত্রলীগ নেতা ও চেয়ারম্যানের অনুসারী রাকিব খুন হন।

ঝিরতলী ইউনিয়নে রয়েছে মঞ্জু বাহিনী ও নিজাম বাহিনী। নিজাম বাহিনীর নিজাম ৬টি মামলার আসামি।

রাজগঞ্জে রয়েছে সেন্টু বাহিনী। নরোত্তমপুর ইউনিয়নে পারভেজ ও ফারুক বাহিনী। বেগমগঞ্জ ইউনিয়নে রয়েল বাহিনী। মিরওয়ারিশপুর ইউনিয়নে নাছির, রাজু ও বাহার মেম্বার বাহিনীর আধিপত্য। বাহার একসময় ছাত্র শিবির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় আছেন বলে অভিযোগ আছে।

বেগমগঞ্জের চৌমুহনী পৌর এলাকা নিয়ে বেগমগঞ্জের পূর্বাঞ্চল। এ অঞ্চলে হাজীপুর, শরীফপুর, কাদিরপুর, রসুলপুর ও কুতুবপুর ইউনিয়নে সুমন ও সম্রাট বাহিনীর দাপট। কাদিরপুর ইউনিয়নের লন্ডন মার্কেট এলাকায় শাকিল বাহিনী। কুতুবপুর, রসুলপুর, দুর্গাপুর এবং সেতুভাঙ্গা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে সম্রাট বাহিনী প্রধান সম্রাটের ভাগিনা রায়হান।

নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের দুপাশে ও নোয়াখালী পৌরসভার সীমান্তবর্তী স্থানে একলাশপুর ইউনিয়ন হওয়ায় এখানে মাদক ব্যবসা জমজমাট। দেলোয়ার বাহিনীর পাশাপাশি কাটা রাসেল ও হৃদয় বাহিনীর দাপট রয়েছে এখানে। এসব সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে গত ৯ মাসে ১৩টি খুন ১০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশ ও সংসদ সদস্যের বক্তব্য:

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বেগমগঞ্জ সার্কেল) মো. শাহজাহান শেখ জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো বাহিনী নেই।

তিনি বলেন, বেগমগঞ্জ উপজেলায় সম্রাট ও সুমন বাহিনী ছাড়া আর কোনো বাহিনী নেই। এ দুই বাহিনীর নেতারা স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকায় মাদক ব্যবসা, খুন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে থাকে।

নোয়াখালী পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, সন্ত্রাসীদের শিকড় উপড়ে ফেলতে পুলিশ কাজ করছে। জেলার কোথাও কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীর অস্থিত্ব রাখা হবে না। সন্ত্রাসী যেই হোক না কেনো পুলিশ তার রাজনৈতিক পরিচয় দেখে না জানিয়ে তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামান শিকদার বলেন, তিনি ৫-৬ দিন হয় এই থানায় যোগ দিয়েছেন। বেগমগঞ্জের বাহিনী সম্পর্কে তিনি খোঁজ খবর নিচ্ছেন।

এখানে পুলিশ বাহিনী ছাড়া কোনো বাহিনী থাকবে না বলে জানান তিনি। সেই লক্ষ্যে তিনি কাজ শুরু করেছেন।

নোয়াখালী ৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ কিরণ তার সংসদীয় আসনে সম্রাট ও সুমন বাহিনীসহ কয়েকটি বাহিনী থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাস্তানদের আটক করে শাস্তি দিতে তিনি সব সময়ই পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ সম্রাট ও সুমন বাহিনীসহ অনেক সন্ত্রাসীকে বহুবার গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালেও আইনের ফাঁকফোকড় গলে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে তারা আবার সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়।

এসব বাহিনী কে বা কারা লালন করছেন?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন স্থানীয় প্রভাবশালীরাই আধিপত্য বিস্তার করতে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করছেন। তাদের মদদদাতা, পৃষ্ঠপোষক কারা সেটি বের করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার বলে জানান তিনি।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত