ঘোষণা

এডুকেশন

হরিদাস পাল | বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 673 বার

এডুকেশন

 

সূর্যকান্তবাবুর সংসারে এমনিতে কোন সমস্যা নেই। বছর খানেক হল চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছেন। পেনশনের টাকায় মোটামুটি চলে যায়। শুধু তাঁর চিন্তা ছেলে শুভদীপকে নিয়ে। বন্ধুরা বলেন, ” তুই এতো ভাবিচ্ছিস কেন? ছেলে ম্যাথসে এম. এস. সি, ফার্স্ট ক্লাস, বি. এড্ -ও কমপ্লিট। অন্য কোন চাকুরি হোক আর না হোক, স্কুল মাস্টার একদম হাতের মুঠোয়।এখন শুধু একটু অপেক্ষা। ”
স্ত্রীর মুখেও ওই একই কথা , “অঙ্কের এখনও বেশ ভাল ডিমান্ড, স্কুল টিচারিতে তোমার ছেলের কোন সমস্যাই হবে না। ”

কথাগুলো শুনতে তখন তাঁর বেশ ভালোই লাগত। কিন্তু ছেলে যখন সরকারি অফিসে তিন তিনবার, আর এস.এস.সি -তে দুবার ইনটারভিউয়ে ফেস করেও কোন লাভ হল না, তখন পুরো সংসারের মনোবলটাই ভেঙে গেল। ছেলের মুখের দিকে তাকালেই বুক তাঁর কেঁদে ওঠে। ছেলের মনোবল বাড়ানোর জন্য বলেন, ” একদম চিন্তা করবি না। আমি চাকরির চেয়ে এডুকেশনকে বেশি শ্রদ্ধা করি। এডুকেশন বাড়া। যতদূর পারিস বাড়িয়ে যা। চাকরির চিন্তা এখন না করলেও চলবে। আমি তো আছি। চারপাশে দেখে কিছু বুঝিস না? তোর মতো আরও কত বেকার ঘরে বসে, ওদের কথা ভেবেও তো মনকে সান্ত্বনা দিতে পারিস। অনেকের তো চাকরির বয়সই পেরিয়ে যাবার দিকে, আবার অনেকের চলেও গেছে। তুই তো সবে সাতাশ পেরিয়ে আটাশ, এখনও অনেক সময় আছে।
শুভদীপ সবই বোঝে, তবু ভিতরে একটা টান টান চিন্তা। ও সোজা পথের ছেলে, সোজা পথেই এগিয়ে যাবে এটাই ওর একান্ত ইচ্ছা।কিন্তু সময় যে বড্ড কঠিন, সময় সোজা বোঝে না। ওসব নিয়ে ও অতটা ভাবে না।ভাবে কঠিন সবসময় কঠিনে থাকে না। দেখি না আর দু ‘তিন বছর, তারপরই নয় অন্য কিছু ভাবা যাবে।

সৎ সঙ্গে সৎ ভাবনা। শুভদীপই তার জ্যান্ত উদাহরণ। মোড়ে মোড়ে আড্ডা দেওয়া, নেশা করা, সুন্দরী মেয়ে দেখলেই পিছনে পিছনে ঘুরঘুর করা, এক কথায় বাজে অভ্যাস ওর বন্ধুদের কারওরই ছিল না। একত্রিত হলেই ওই পড়াশোনা আর বর্তমান সময়ের ভালমন্দ নিয়ে আলোচনা। একদিন ওদের বন্ধু প্রিয়তম বলল, “এই শুভদীপ, আমারা যে কলেজ থেকে বি.এড্ করেছি, সেখানেই এম.এড্ খুলেছে। চল্ না, এভাবে সময় নষ্ট না করে এম.এড্ -এ ভর্তি হয়ে যাই। আমারা দু ‘জনেই অঙ্কের। পাশ করে এলে অন্য কোথাও চাকুরি হোক আর না হোক, বেসরকারি বি. এড কলেজগুলোতে কিন্তু আমাদের ডিমান্ড হবেই। ”
শুভদীপ বলল, ” কথাটা মন্দ বলিস নি। বাড়িতে বলে দেখি। ”

মা -ই ছিল শুভদীপের বেস্ট ফ্রেইন্ড। বলা, না -বলা সব কথা সব ও মায়ের সাথে শেয়ার করে। রাতে বিছানায় যাবার আগে মাকে বলল, ” মা, চাকরি বাকরির যা অবস্থা! কবে হবে না হবে কোন নিশ্চয়তা নেই। সময়গুলো এভাবে নষ্ট না করে কাজে লাগাই। বলছি কি, এম. এড্ -টা করেই ফেলি। কী বল? আমার বন্ধু প্রিয়তমও ভর্তি হবে। বাড়ি থেকেই যাতায়াতে। কোন অসুবিধা হবে না। ”
মা হাসি হাসি মুখে বলেন, ” এ তো ভাল কথা। পড়াশোনার মধ্যে থাকলে মনটাও ভাল থাকবে। তোর বাবা শুনেও খুশি হবেন । তুই তো জানিস এডুকেশনের ব্যাপারে ওঁর দ্বিমত নেই। ঠিক আছে, তোর বন্ধুকে বল্ কবে হচ্ছে।আমিও যাব সেদিন।আর ভর্তির ফিসটা শুনে নিস।”

দিনটি ছিল সোমবার। বন্ধুর কথামত ঠিক সময় ধরে শুভদীপ মায়ের সঙ্গে চলে গেল কলেজে। কিন্তু প্রিয়তমর কোন পাত্তা নেই।ফোনে জানতে পারে ও আসছে না। বাবা অসুস্থ। তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে।
” এখন কী হবে,মা? ও তো বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে।কথাবার্তায় যা বুঝলাম ওর ঠিক নেই।আমি কি ভর্তি হব?” শুভদীপ বলল।
“ভর্তির ব্যাপারেই যখন আসা, হয়ে যা। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। ”

বাইরে তখন অল্প অল্প বৃষ্টি। কলেজের ভিতর খুব একটা ছাত্র -ছাত্রী নেই। যারা দাঁড়িয়ে,তারা ভর্তির অপেক্ষায়। হঠাৎ বেশ সুন্দরী একটি মেয়ে লাল চুড়িদার পরা হালকা ভেজা শরীরে হাঁপাতে হাঁপাতে শুভদীপের মার পাশে এসে দাঁড়াল।
” একি মা, তুমি তো ভিজে গেছ! বৃষ্টির জল গায়ে শুকোলে সর্দি জ্বর এসে যাবে। আমার আঁচলটা দিয়ে শরীরটা মুছে নাও, ” শুভদীপের মা বললেন।
ভর্তির ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলেন বড়বাবু। কথাটা শুনেই উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ” দিদি, আপনার আঁচল ভিজাতে হবে না। আমার বাড়ি সামনেই। আমি মেয়েকে ফোন করে দিচ্ছি।ওনাকে নিয়ে চলে যান।ফ্রেস হয়ে আসতে বলুন ,ভর্তি পরে নিচ্ছি।”

শুভদীপকে দাঁড় করিয়ে বড়বাবুর কথা মতো ওকে নিয়ে চলে গেলেন তাঁর বাড়ি।যাওয়া -আসা পথের দু ‘জনের মধ্যে ভালোই আলাপ হল।
” মা, তোমার এত দেরি হল যে? বৃষ্টিতে আটকা পড়েছিলে বুঝি? ”
” না আন্টি। গাড়ি বিভ্রাট। ”
“থাকো কোথায়? ”
” সোনাপুর। ”
” নাম? ”
” সুলেখা, সুলেখা দাম। ”
” এডুকেশন? ”
” ইংলিশে এম.এ। পি এইচ ডি, এবারই শেষ হল। ”
” এত বড় এডুকেশন নেওয়ার পরও আবার এম.এড্, সত্যি অবাক লাগে ! আমার ছেলের মতোই অবস্থা। ”
” কী করব ,তবু ভরসা পাচ্ছি না।চারপাশে যা দেখছি! ভাবলাম, এডুকেশন যত পারি বাড়িয়ে যাই, কখন কোনটা কাজে লাগে,কে জানে! ”
” একদম আমার ছেলের কথা বলেছ, ওর ওই একই
কথা। এম.এস.সি, বি.এড্ করেও বসা। ”
” ছেলেকে আপনিই নিয়ে এসেছেন বুঝি?”
” হ্যাঁ, এডুকেশনের ব্যাপারে ওর বাবার চাইতে আমিই বেশি ভাবি।সবসময় তাঁর কাজ নিয়েই ব্যস্ত। কিছু বললে, বলেন ওদিকটা তুমিই সামলাও, তাই…।”
কথা বলতে বলতে দু ‘জনেই কলেজের ভিতরে। এখন টুকটাক কথা।

শুভদীপ লম্বা ফর্সা সুদর্শন যুবক। যে কোন মেয়েই প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ে যাবে, এতে অবাক হবার কিছু নেই। ও মায়ের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।হাসি হাসি মুখে বেশ কয়েকবার চোখ রেখেছিল ওর দিকে সুলেখা।শুভদীপ কোন আগ্রহ প্রকাশ করে নি।
” আন্টি, এটা কিন্তু স্বীকার করতেই হবে ছেলে মেয়ে বড় হবার পিছনে মা-দের ভূমিকাই সবচাইতে বেশি। আমি যতদূর এসেছি, ওই আমার মায়ের জন্যেই। ”

” আমার ছেলেও বলে,ওর পড়াশোনায় যতটা অগ্রগতি,ও নাকি আমারি কৃতিত্ব । চলো, সামনে এগিয়ে যাওয়া যাক। ভর্তির ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলি। ”

মাঝে আর কোন বিশেষ কথা হয়নি।
এ্যাডমিশনের পর সুলেখা বলল, ” আন্টি, আজ তবে আসি। ”

সুলেখা চলে গেল।কিন্তু এমন একটা অচেনা মুখ শুভদীপের মাকে যে এতটা মায়া ধরিয়ে দেবে ভাবতে পারেন নি। ওর কথার মধ্যে পরকে আপন করে নেবার মতো একটা তীব্র আকর্ষণ আছে, যা অন্যদের খুব কমই দেখা যায়। ছেলেকে বলেন, ” মেয়েটা শুধু রূপসী আর শিক্ষিতই নয়রে, কথাবার্তও বেশ সুন্দর । ওর চোখে মুখে একটা মায়াবী ভাব আছে। ”

শুভদীপ হালকা হাসিতে বলল, ” সুন্দর তো হবেই, তোমার ছেলেকে দেখছে না? এখন একটু আর্ট রেখে কথা বলবেই ।এই সময়টুকুতেই একজনকে চিনে ফেললে? বিয়ের পর আসল রূপ, মানে শিক্ষা, গুণ- সুন্দর সব বোঝা যায়! ”
“তোর যে কথা! মেয়েদের অত নেগেটিভ ভাবিস কেন? সবাই কি সমান? ”

পরের দিন থেকেই চলল শুভদীপের নিয়মিত কলেজে যাওয়া -আসা। প্রায় সময় নেট ঘাঁটাঘাটি।সূর্যকান্তবাবু চিন্তিত।পড়ুয়া ছেলের এত নেটের নেশা কেন? একদিন আড়াল থেকে লক্ষ্য করলেন ও কোন এক প্রোফেসারের লেকচার শুনছিল। টপিক ছিল ” মেন্টাল এবিলিটি “। পরে জানতে পারেন ও সময় পেলেই এডুকেশনাল লেকচার শোনে। অঙ্কের ছেলে এডুকেশনে যেএতটা ডুবে যাবে, ভাবতেও অবাক লাগে!

কলেজে মাঝে মাঝে ওদের কথাবার্তা হয়, সবই পড়াশোনা নিয়ে, প্রেমের সেতু বন্ধনে তখনও শুভদীপ পড়ে নি । একদিন কলেজ শেষে শুভদীপ সুলেখাকে বলল, ” নেটের এ্যাড দিয়েছে। আমি কিন্তু বসছি। তোর ইচ্ছে থাকলে বসতে পারিস। কোয়ালিফাই করতে পারলে মনে করবি অনেকটা ধাপ এগিয়ে গেলাম।”
” তোর ইচ্ছেতেই আমার ইচ্ছে।কিন্তু শুধু বসলেে তো হল না, অনেকটা সময় দিতে হবে। ছাত্র পড়িয়ে পারব কি? অবশ্য তুই যখন আছিস, আশা করি হয়ে যাবে। ”

নেটে দু ‘জনে একই সঙ্গে কোয়ালিফাই করল। তারপরেই একে অপরে ক্রমে ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হতে লাগল।প্রথমে সুলেখাই আসল প্রেমের সূত্রপাত ঘটাল, “এই, আমি কিন্তু তোকে ভালবেসে ফেলেছি রে! তোর যদি আপত্তি না থাকে,আমি অপেক্ষা করব। ”
” দ্যাখ্, এখনও আমি বেকার। জীবনের কোন পথই দেখলাম না, পথের শুধু রেখা দেখছি। মেয়েদের কী, বাবা -মা -রা ভাল পাত্র পেলেই বিয়ে দিয়ে দেবেন,তখন অন্য সব ফুঁ। বেকার যুবকের কথা শুনলেই নানান অশান্তি! কত বেকারের প্রেমিকা এখন অন্য প্রেমিকের সঙ্গে দিব্যি সংসার করে চলেছে, এ আমার চোখে দেখা। বরং আপাতত দু ‘জনে ভাল বন্ধু হয়ে থাকি না কেন ? এতে অনেক সুখ, আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ”
“বুঝলাম, আমার ভিতরের কথা বললাম। এখন ভাব্ কী করবি । ”

এভাবেই চলল ওদের আধা আধা প্রেমে এম্. এড্ -এর পড়াশোনা। পাশ কারার পর ওরা আর বসে থাকল না। কাকতালীয়ভাবে দু ‘ জন একই সঙ্গে একই বেসরকারি বি.এড্ কলেজে পড়াতে শুরু করল।

দুটো বসন্ত গড়িয়ে যেতে না যেতেই সুলেখা একটা সরকারি বি এড্ কলেজে এসিস্ট্যান্ট প্রোফেসার হিসেবে জয়েন করল। নিজের বাড়ি থেকে সত্তুর – আশি কিলোমিটার দূরে। যাবার সময় শুভদীপকে বলে গেল,” ভাবিস না, আবার এ্যাড দিয়েছে।এবার তোরও হয়ে যেতে পারে।”

সুলেখা ছাড়া শুভদীপ যেন বড্ড একা হয়ে পড়ল। ক্লাস ঘরে ঢুকলেই ভিতরটা যেন কেমন হয়ে ওঠে ওর!মনে কী সব উল্টো পাল্টা ভাবনার দানা বাঁধতে শুরু করল।প্রথম দু -তিন মাস ফোনে বেশ ঘন ঘনই আলাপ হত, তারপর হালকা, সপ্তাহে দু -একদিন, তবুও যেন আকর্ষণবিহীন।
মাকে বলল, ” মা, সুলেখা আগের কথা সব ভুলে যাবে না তো? ”
মা সহজ সরল ভাষায় বললেন,” প্রকৃত প্রেম ভালবাসা কখনও দিক পরিবর্তন করে না, মরেও না রে।ও যদি তোকে সত্যি ভালবাসে, দেখবি তোর কাছেই ফিরে আসবে।যদি না আসে ভাববি ও শুধু ওর জন্যই, কারওর কখনোই নয়।”

 

হরিদাস পাল
কোচবিহার

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:১৪ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীরব-নিথর অবয়ব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০