ঘোষণা

চন্দ্রাবলী

হরিদাস পাল | সোমবার, ১৬ নভেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 174 বার

চন্দ্রাবলী

দিনে কমই থাকে। রাত হলেই গলা পর্যন্ত, তখনই যতসব অশান্তি।
” বাবা- মার চরিত্র – শিক্ষা -দীক্ষাতেই লেখা থাকে ছেলে -মেয়েদের ভবিষ্যৎ । বাবা যদি একটা মদারু জুয়ারু হয়,তবে তার থেকে কী বা আশা করা যায়? মেয়েটা বড় হচ্ছে, সবই দেখছে।পাঁচ -ছয় বছরের ওই ছোট্ট মেয়ে নীলা ভালো মন্দের কতটুকুই বা বোঝে? যখন বুঝবে, তখন? সুস্থ স্বাভাবিকে বড় হতে পারবে? বাজে নেশা ঘরে বাস করলে শিক্ষায়
নেমে আসে অন্ধকারের ছায়া।বই পাতার শিক্ষা নয় অল্পস্বল্প খাতাতেই রাখলাম,কিন্তু বিয়ে?মেয়েটাকে বিয়ে দিতেও অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। সুস্থ পরিবেশ সবসময় সুস্থই খোঁজে। কিন্তু এখানে? কোন ভদ্র লোক কি চাইবেন এমন একটা অসুস্থ পরিবারের সঙ্গে আত্নীয়তা করতে?সংসারটা একেবারে শেষ করে ছাড়ল! ওসব গু মুত না খেলে কি চলে না? ” রাগে গজ্ গজ্ করতে লাগল চন্দ্রাবলী।
দিবা বড় বড় চোখ করে চটে গেল, ” কী, তোমার সাহস তো কম না! আমি গু মুত খাই? অমৃতকে ওসব নোংরার সঙ্গে তুলনা করছ? দ্যাখো, মাপ রেখে কথা বল, নইলে কিন্তু …!”
” নইলে কী? মারবে? গায়ে হাত দিয়েই দ্যাখো না! আমার চন্ডীমূর্তি তো দেখনি, দেখিয়ে ছাড়ব, ” গলায় ঝাঁঝ নিয়ে বক্ বক্ করতে করতে মেয়ের কাছে চলে গেলো চন্দ্রা।
এভাবেই চলছিল তাদের প্রতিদিনের সংসার। একদিন দিনে সেই অশান্তি চরম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকল।কেউ কমে ছাড়ে না। চন্দ্রা জেদ ধরেছে, ” আর সহ্য হয় না! আজ এর একটা হেস্তন্যস্ত করেই ছাড়ব! হয় তুমি বাড়ি থাকবে, নয় আমি।এমন স্বামীর কপালে ঝ্যাঁটা। ”
নরমে নরম, কঠিনে কঠিন –একদম ঠিক। বউ -এর ওমন গরম ভাব দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল দিবা।

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছে।
রাত প্রায় বারোটা। দিবা বাড়ি ফিরে নি। সারাদিনে চন্দ্রাবলী একটা দানা পর্যন্ত দাঁতে কাটে নি। রাতে শুধু এক গ্লাস জল খেয়ে মেয়েকে নিয়ে বিছানায়। ঘুম আসছে না। সমস্ত চিন্তা – ভাবনা মাথায় যেন তার পেরেকের মতো বিঁধছে।মেয়েদের এমন বিয়ের চেয়ে চিরকুমারী হয়ে থাকাই শতগুণে ভালো। চোখে একটু তন্দ্রা আসতেই মাতলামি গলা দিবার, ” চন্দ্রা, দরজা খোল….।কী, কথা কানে ঢুকছে? ….কী হল, খুলছ না যে? ”
দরজায় দুটো লাথির শব্দ শুনতেই, আস্তে করে খুলেই আবার বিছানায় চন্দ্রা।
” খেতে দাও। তুমি খেয়েছ? ” দিবা কেটে কেটে বলল।
চন্দ্রা কোন সাড়া দিল না।
” কী, উঠবে না? সোজা কথা কানে ঢোকে না বুঝি? এবার কিন্তু কঠিন হব, তখন বুঝবে এ কঠিনের ধার কত ! ”
চন্দ্রা বালিশে মাথা রেখেই শোনায় মুখ ঝ্যাংটা , ” জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে ফেলল। এখন হাতে দড়ি ছাড়া উপায় নেই। কবেই নিতাম! মেয়েটির কথা ভেবেই দমে যাই।উঠতে পারব না। নিজে নিয়ে খাও। ”
” কী-ই, নিয়ে খেতে হবে?দেবে না তবে? ”
” বলছি তো পারব না। এক কথা বারবার ভাল লাগে না! ইচ্ছে হলে খা, নইলে যেখানে বসে বসে গিলছিলি, সেখানে গিয়ে আরও গিলতে থাক্। ”
এবার দিবা তার সেই ভয়ংকর কঠিন রূপ দেখাল, “কী মাগি, আমার সঙ্গে এই ভাষায় কথা? স্বামীকে তোর স্বামী বলেই মনে হয় না, না? খেতে দিবি না? ভাবছিসটা কী ?বেশি গরম দেখাচ্ছিস, না? তবে দ্যাখ তোর গরম কোথায় থাকে! “— বলেই সজোরে পিঠে মুষ্ঠিঘাত করে
ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। চন্দ্রা মেঝেতে পড়ে কাতরাতে লাগল।
ওই ছোট্ট মেয়ে নীলার কচি কচি কথায়
কান্না জড়ানো কাতর চিৎকার, ” কাকু, তোমারা আসো গো, মা যেন কেমন করছে । মরে যাবে ! ”
অত গভির রাতে ওটুকুন মেয়ের আর্তনাদে আশপাশেরা দৌড়ে এসে দেখে চন্দ্রা কথা বলছে না,শুধু গোঙ্গানির শব্দ।
দেরি না করে ক্লাবের ছেলেরা হাসপাতালে নিয়ে গেল। পরের দিন সুস্থ হয়ে বাড়ি এসে শোনে দিবা আর ফিরে নি। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে থানায় একটা মিসিং ডায়েরি করে আসে চন্দ্রা।থানার তৎপরতায় দিবার খোঁজ মিলল একটা কাঁঠাল গাছে ঝুলন্ত অবস্থায়।

ইচ্ছে করলে পঁচিশ ছাব্বিশের চন্দ্রা শুধু নিজের কথা ভেবে আবার কপাল সিঁদুরে রাঙিয়ে নিতে পারত। কিন্তু না, কারওর কথা শোনেনি।স্বামী- সুখ -এর প্রতি ওর ঘেন্না ধরে গেছে। নতুন স্বামীর ঘর, সে ভাবনা মন থেকে একদম মুছে মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিয়েই ভাবতে থাকল। মেয়েকে নিয়েই স্বপ্ন দেখা শুরু করল।
শিক্ষা -দীক্ষায় যাতে ও সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, সেই তার একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু সেজন্য তো চাই টাকা।জমানো টাকা বলতে কিছুই নেই। মদারু জুয়ারুরা ভবিষ্যতের কথা কি আদৌ ভাবে?

চলল চন্দ্রার জীবন সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায়।নিজেদের কোনোভাবে চলার উপায় আপাতত বেছে নিল। অল্প সোনা ছিল, ওই বাপের বাড়ি থেকে দেওয়া। দিবার মারধর খেয়েও ওটুকু হাত ছাড়া করে নি। সোনাটুকু বিক্রি করে শুরু করল শাড়ির ব্যবসা।মেয়েকে পাশের একটা প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করে দিল। ওকে স্কুলে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে শাড়ি নিয়ে। প্রথম প্রথম বেশি দূর যেতে পারত না, স্কুল ছুটি হলেই যে মেয়েকে নিয়ে আসতে হত।এই অল্প সময়ে দিনে দু ‘চারখানার বেশি বিক্রি ছিল না। স্বল্প আয়েই চলে যেত কোনমতে ।

মেয়েটি যখন একটু বড় হল,বুঝতে শিখল তখন দূরেই চলে যেত ; পায়ে হেঁটেই মাইলের পর মাইল। ফিরতে ফিরতে বিকেল সন্ধ্যা। ফাঁকা বাড়িতে কাজের মাসিই ছিল মেয়ের সঙ্গী সাথী।

দিন দিন শাড়ি বিক্রি বেড়েই চলল।ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স এখন ভালোই। ইচ্ছে করলে সুন্দর একখানা বাড়িও তৈরী করতে পারে যখন তখন। চন্দ্রা সে কথা এখনই ভাবছে না, ভাবছে তার মেয়ে আগে। মেয়েটিও যে রূপে গুণে লক্ষ্ণী সরস্বতী।চোখ ধাঁধাঁনো সুন্দর। ক্লাসে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় কখনো হয় না। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে গেলে ভাল টাকার প্রয়োজন হবেই। সে ভেবেই জমানো টাকায় হাত দিচ্ছে না। সরল সাধারণ দিনযাপনেই চলল। কিন্তু ইদানীং ওকে আরেক চিন্তা খুব ভাবাচ্ছে। মাসির ভাবগতিক মোটেই ভালো ঠেকছে না। ওকে আগের মতো ভরসা করতে পারছে না। দু -তিন দিন চোখে পড়েছে গেটের সামনে একটা ছেলের সঙ্গে কথা বলতে। মেয়েকে এভাবে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। একটা অঘটন ঘটে গেলে, তখন? স্থির করল বাড়ির সামনেই একটা দোকান খুলবে , শাড়ির দোকান। খুলেও ফেলল। পুরনো মাসিকে ছাড়িয়ে নতুন মাসি ঠিক করল।

এখন চন্দ্রার সেই আগের মতো আয় নেই। মাস শেষে তেরো -চোদ্দ -পনেরো হাজারের মধ্যেই ঘোরাফেরা। এদিকে মেয়ে নীলাও মেডিক্যাল জয়েন্ট এন্ট্রান্সে ভালো রেঙ্ক করেছে। চন্দ্রাবলী সত্যি যেন চন্দ্রাবলীই হয়ে উঠল। দেওয়ালে ঝুলানো রাধাকৃষ্ণের ফটোর দিকে তাকিয়ে কী ভেবে যেন অপরাজেয় চন্দ্রা বলে উঠল, ” ভাগ্যিস টাকাগুলো ঘরের পিছনে শেষ করিনি! করলে কী – ই না অসুবিধায় পড়তাম। ”

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৫:১৩ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৬ নভেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

বিটলবণের স্বাদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ফেরা

১৪ মার্চ ২০২০

জোছনায় কালো ছায়া

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০