ঘোষণা

চীন থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে জাপান

জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে ঢাকার যত উদ্যোগ

হিমালয় আহমেদ | মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 77 বার

জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে ঢাকার যত উদ্যোগ

বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতির প্রতিবেশী চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান। জাপানের বিনিয়োগকারীরা চীন ছেড়ে অন্য দেশে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছে।

জাপানের যে কোম্পানিগুলো বর্তমানে বাংলাদেশে কাজ করছে তাদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। যাতে জাপানের নতুন বিনিয়োগকারীরা অন্যান্য এশীয় প্রতিবেশীদের তুলনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে অগ্রাধিকার দেয়।

রফতানিতে নগদ সহায়তা, মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোসহ দ্রুত শুল্ক ছাড়ের বিষয় মাথায় রেখে জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে কাজ করছে সরকার।

স্থানীয় ও বিদেশী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো রফতানির ক্ষেত্রে কিছু “বৈষম্য” চিহ্নিত করেছে জাপানি বিনিয়োগকারীরা। তাদের পর্যালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে তার সমাধানের নির্দেশনা দেয়া হয়।

তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশে সম্পূর্ণ বিদেশী মালিকানাধীন ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো রফতানির বিপরীতে সরকারের কাছ থেকে কোনো নগদ প্রণোদনা পায় না। রফতানিমুখী বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একই প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে জাপানি বিনিয়োগকারীরা।

জাপানি বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবের সাথে একমত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) পরের অর্থ বছর থেকে স্থানীয় কোম্পানিগুলো যেভাবে প্রণোদনা সহায়তা পায় বিদেশিগুলোকে একই হারে প্রণোদনা দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে।

চীন ত্যাগ’ করে ভারত ও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে জাপান:

চীন ছেড়ে যাওয়া জাপানি বিনিয়োগকারীদের ভারতে বিনিয়োগ করতে চেষ্টা চালাচ্ছে ভারতের সরকারও। ভারতে প্রভাবশালী গণ মাধ্যম দ্য হিন্দুর গত সপ্তাহের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানি বিনিয়োগকারীদের আইনগত, শুল্ক ছাড়পত্র, রফতানি পদ্ধতি ও গুণগত মান নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে তা সমাধান করার আশ্বাস দিয়েছেন ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল।

ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে বর্তমানে মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন ফি যে পরিমাণে রয়েছে বিদ্যমান রেজিস্ট্রেশন ফি আরো ২২% থেকে ১০% কম করার প্রস্তাব করেছেন জাপানি বিনিয়োগকারীরা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অর্থ বিভাগের সাথে আলোচনা শেষে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি ১০ % এর নিচে নামিয়ে আনার জন্য সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

করোনা মহামারী ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পরে জাপানি কোম্পানিগুলো চীন থেকে অন্য দেশে সরে যাওয়ার ঘোষণাকে কাজে লাগাতে বিশ্ব ব্যাংকের ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস সূচক বাড়ানোর পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

নীতি নির্ধারকরা বলছেন, বাংলাদেশ জাপানি বিনিয়োগকারীদের ভেড়াতে তৎপর হতে হবে। নতুন জাপানি বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ব্যবসায়িক পরামর্শ নেবেন।

১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাসের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ-জাপান পাবলিক প্রাইভেট জয়েন্ট ইকোনমিক ডায়লগের (পিপিইডি) বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) সহ পররাষ্ট্র সচিব, অর্থ সচিব, রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে বিডার কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান মোঃ সিরাজুল ইসলাম বলেন, জাপানি কোম্পানিগুলো তাদের বিনিয়োগ চীন থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে আকর্ষণীয় করে তুলতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের উত্থাপিত বিষয়গুলোর সমাধানের জন্য বিভিন্ন সরকারী সংস্থার সাথে কাজ করছে বিডা।

তিনি বলেন, বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের খুশি করতে ও নতুন বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করার জন্য বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জাপানি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টাস্কফোর্সের সদস্য ও এফবিসিসিআই এর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ১০০% বিদেশী মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো বেতন প্রদানের জন্য করোনাকালের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে কোনও আর্থিক সুবিধা পায়নি। যদি এ জাতীয় বৈষম্য দূর না করা হয় তবে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবে না।

তিনি আরো বলেন, চীন থেকে দূরে সরে যাওয়া জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে নতুন করে বিনিয়োগের জন্য জরুরী ভিত্তিতে আগে থেকে যারা বাংলাদেশে ব্যবসা করছে তাদের সমস্যা সমাধান করতে হবে। কারণ, বিদ্যমান কোম্পানিগুলো নতুন জাপানি বিনিয়োগ আনতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করবে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৩০০ জাপানি কোম্পানির বাংলাদেশে ব্যবসা করছিল, যেখানে তাদের বিনিয়োগ ছিল ৩৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এক দশক আগেও দেশে মাত্র ৮২ টি জাপানি কোম্পানি ছিল।

জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অধিক সম্ভাবনা ও লাভের কারণে আগামী দুই বছরে জাপানি কোম্পানিগুলো এশিয়া ও ওশেনিয়ায় তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাইছে সেখানে বাংলাদেশ শীর্ষ স্থান হবে।

বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রায় ৭০.৩% সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে আর ২৩.৪% কোম্পানি একই অবস্থায় থাকবে ও মাত্র ১.৬ % কোম্পানি ব্যবসায়িক ক্রিয়াকলাপ কমানোর বিবেচনা করছে বলে জেট্রোর সসীক্ষায় বলা হয়েছে।

বর্তমানে প্রায় ৮৭ টি জাপানী কোম্পানি তাদের ব্যবসা বাণিজ্য চীন থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত করার বিষয়ে বিবেচনা করছে। জাপান সরকার এ গুলোকে বাংলাদেশ বা ভারতে স্থানান্তরিত হলে তাদেরকে ২২.১০ কোটি ডলার ভর্তুকি দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।

আড়াইহাজারে জাপানি বিনিয়োগ হবে এশিয়ার বৃহত্তম:

বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় জাপানি বিনিয়োগে এককভাবে এক হাজার একর অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড) তৈরি করা হচ্ছে। সরকার-সরকার উদ্যোগে এটি বাংলাদেশের প্রথম অর্থনৈতিক অঞ্চল।

বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। এরপর পাঁচ বছর চলমান জাপানি বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

গত ৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রী বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকির সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় এসব কথা বলেন।

টিপু মুনশি বলেন, জাপানের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। জাপান বাংলাদেশের উন্নয়নের বড় অংশীদার। জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির প্রচুর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। তৈরী পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে আরও বাণিজ্য সুবিধা প্রদান করলে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে।

জাপানি রাষ্ট্রদূত বলেছেন, এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পরও জাপান বাংলাদেশকে দেয়া বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখার চিন্তা করছে। এজন্য এফটিএ অথবা পিটিএ করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় দেশে ১০০টি স্পেশাল ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা হচ্ছে। এগুলোতে জাপান বিনিয়োগ করলে লাভবান হবে। এখানে বিনিয়োগে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ জাপানের তৈরী গাড়ির বড় বাজার। বাংলাদেশে জাপান গাড়ি তৈরীর কারখানা স্থাপন করলে তা লাভজনক হবে।

জাপানের রাষ্ট্রদূত বাণিজ্যমন্ত্রীকে জানান, জাপান বাংলাদেশে অটোমোবাইল কারখানা স্থাপনের চিন্তা করছে। বাংলাদেশের আড়াইহাজার স্পেশাল ইকোনমিক জোনে জাপান বড় ধরনের বিনিয়োগ করবে, এ বিনিয়োগ হবে এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম। জাপান বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাপানের ব্যবসায়ীগণ বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে আগ্রহী। উভয় দেশের বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা যেতে পারে। জাপানে দক্ষ শ্রমিকের প্রচুর চাহিদা আছে। বাংলাদেশ এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারে।

বাংলাদেশ ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে জাপানে ১৩৬৫.৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ১২০০.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে।

একই ভাবে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে জাপান থেকে ১৮৫২.৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৯-২০ অর্থ বছরের জুলাই-মে সময়ে ১২৯৪.৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বিশ্বে যেকোনো দেশের উন্নয়নে অর্থনৈতিক কূটনীতি বিশেষ ভূমিকা রাখে। চীন থেকে কারখানা সরিয়ে ভারত বা বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করলে দেশের শিল্পোদ্যোক্তাদের ভর্তুকি দেওয়ার যে ঘোষণা জাপান সরকার দিয়েছে, তা কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে তৎপরতা বাড়াতে হবে।

জাপানি বিনিয়োগ আনা গেলে দেশের অর্থনীতির চাকা যেমন গতিশীল হবে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:০০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত