ঘোষণা

ধারবাহিক বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ অন্তিম পর্ব

তপন কুমার বসু | শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১ | পড়া হয়েছে 133 বার

ধারবাহিক  বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ  অন্তিম পর্ব
    ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয় মাত্র দুবার। ১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনায় দেখা হওয়ার পর পুনর্বার সাক্ষাৎ হয় ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসে। সেবার ইউরোপ-পরিক্রমায় কবি তাঁর সঙ্গে নিয়েছিলেন নিজের আঁকা অনেক ছবি। ফ্রান্সের যে-সব শিল্পী সেই ছবিগুলি দেখেছিলেন, তাঁরা চাইলেন প্যারিসে কবির একটা চিত্রপ্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হোক। কিন্তু খোঁজ করে বোঝা গেল এত অল্প সময়ের মধ্যে প্যারিসে কোন প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা প্রায় অসম্ভব। একটা উপযুক্ত ঘর পেতেই বছর খানেক লেগে যায়। নিরুপায় কবি স্মরণ করলেন ভিক্টোরিয়াকে। বুয়েন্স এয়ার্স-এ তাঁকে তার করে দেওয়া হল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চলে এলেন এবং অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে সব ব্যবস্থা করে দিলেন। এ সম্বন্ধে কবি প্রতিমা দেবীকে লিখছেন —-
 ” ভিক্টোরিয়া যদি না থাকত তাহলে ছবির ভালই হোক্ মন্দই হোক্ কারো চোখে পড়ত না। একদিন রথী ভেবেছিল ঘর পেলেই ছবির প্রদর্শনী আপনি ঘটে — অত্যন্ত ভুল। এর এত কাঠখড় আছে যে সে আমাদের পক্ষে অসাধ্য, আন্দ্রের পক্ষেও। খরচ কম হয়নি – তিন চারশো পাউণ্ড হবে। ভিক্টোরিয়া অবাধে টাকা ছড়াচ্ছে। এখানকার সমস্ত বড়ো বড়ো গুণীজ্ঞানীদের ও জানে – ডাক দিলেই তারা আসে।”
   চিত্রপ্রদর্শনী হয় ২রা মে। রথীন্দ্রনাথ এই যাত্রায় কবির সঙ্গে ছিলেন। প্যারিসে ভিক্টোরিয়াকে দেখে তাঁর কী মনে হয়েছিল সে কথা তাঁর গ্ৰন্থে লিপিবদ্ধ করে তিনি লিখেছেন —
” Her dignified bearing and charm of manners made her a very attractive personality. Wherever she came she would go straight to Father, in utter disregard of all formalities and completely oblivious of the presence of others. Her devotion to father was extraordinary. She had the deepest regard and affection for him and she was willing to go to any length to satisfy his slightest fancy.”
   কবির সঙ্গে ভিক্টোরিয়ার অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠতার কথা এর চেয়ে সুন্দর ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য।
  রবীন্দ্রনাথ বারবার ভিক্টোরিয়াকে শান্তিনিকেতনে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যদিও আর্জেন্টিনা ও প্যারিস ছাড়া আর কোথাও দেখা হয়নি দুজনের। দেখা না হলেও প্রায় নিয়মিতই একজন আরেকজনকে চিঠি লিখতেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর একেবারে শেষ চিঠিতে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে লিখেছিলেন —
” এতদিন পরে তোমার আমাকে মনে পড়ল – কী যে ভালো লাগছে। পৃথিবীর সব রঙ ফিকে হয়ে আসছে যখন, বিমর্ষ মন কেবল তাদের নৈকট্যই কামনা করে যাদের স্মৃতি সুখময় দিনগুলোর সাথেই জড়িয়ে আছে। যতো দিন যায়, সেই স্মৃতিগুলো যেন গাঢ়  হতে থাকে।”
   এভাবেই তিনি ভিক্টোরিয়াকে তার সে সময়ের অনুভূতির কথা জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, সে সময়েও তাঁর পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করেছেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। খোঁজখবর নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের।
    প্রতিমা দেবী কবিজীবনের শেষের দিনগুলির বর্ণনায় লিখছেন –” বাবামশায় দক্ষিণ আমেরিকার গল্প প্রায়ই করতেন, ভিক্টোরিয়া যে আরাম চেয়ারখানি কবির জন্য ক্যাবিনে তুলে দিয়েছিলেন, সেবার নানা দেশ ঘুরে অবশেষে তা ‘উত্তরায়ণে’ পৌঁছেছিল।”  প্রতিমা দেবী লিখেছেন–
“অনেকদিন আর তিনি ওই চৌকি ব্যবহার করেননি, আমাদের কাছেই পড়েছিল। আজ আবার ব্যামোর মধ্যে দেখলুম ওই চৌকিখানিতে বসা তিনি পছন্দ করছেন, সমস্ত দিনই প্রায় ঘুম বা বিশ্রামান্তে ওই আসনের উপর বসে থাকতেন।”
   আসনদাত্রীর উদ্দেশ্যে কবির শেষ উপলব্ধির সাক্ষী হিসাবে “শেষ লেখা”র পঞ্চম কবিতাটি স্মরণীয়। মৃত্যুর চারমাস আগে কবিতাটি তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ পৌঁছে দিয়েছিলেন গন্তব্যে। কবি লিখছেন —
                 আরো একবার যদি পারি
                 খুঁজে নেব সে আসনখানি
                 যার কোলে রয়েছে বিছানো
                 বিদেশের আদরের বাণী।
                 অতীতের পালানো স্বপন
                 আবার করিবে সেথা ভীড়
                 অস্ফুট গুঞ্জন স্বরে
                 আরবার রচি দিবে নীড়।
                   *        *        *        *
                  বিদেশের ভালবাসা দিয়ে
                  যে প্রেয়সী পেতেছে আসন
                  চিরদিন রাখিবে বাঁধিয়া
                  কানে কানে তাহারি ভাষণ।
                  ভাষা যার জানা ছিল নাকো,
                  আঁখি যার কয়েছিল কথা,
                  জাগায়ে রাখিবে চিরদিন
                  সকরুণ তাহারি বারতা।
    এ কবিতার ভাষা আলোর মতই স্বচ্ছ।
                                                         (শেষ)
তথ্যসূত্র : জগদীশ ভট্টাচার্য (কবিমানসী-১ম)
               Ishtiyak Mahmud – রবীন্দ্রনাথ
               ঠাকুর-ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো – এক
               রহস্যময় প্রেমের গল্প
               অভিজিৎ রায় – ওকাম্পো আর
               রবীন্দ্রনাথ – কিছু অশ্রুত গুঞ্জন
Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:৪২ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জুতার দাম ১০ লাখ ডলার!

০৯ ডিসেম্বর ২০২০