ঘোষণা

ধারাবাহিক পর্ব ২- ‌বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ

তপন কুমার বসু | শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 444 বার

ধারাবাহিক পর্ব ২- ‌বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ

 

স্বভাবতই ভিক্টোরিয়ার জীবনে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব একটা সুন্দর স্বপ্নের বাস্তবীভবনের মতোই পরম রোমাঞ্চকর। মিলারিও বাগানবাড়িতে সবসময়ে কবির সঙ্গে থেকে তিনি তাঁর নারী হৃদয়ের লাবণ্য এবং সুমধুর সেবার মাধুর্য দিয়ে ভরে তুললেন অসুস্থ কবির নিঃসঙ্গ প্রবাসের দিনগুলিকে। প্রতিমা দেবীকে কবি লিখছেন —-
“এখানকার একজন মহিলা আমাকে ঘরের লোকের মত যত্ম করছেন। তিনি আমার সঙ্গে (পেরুতে) যেতে রাজি হয়েছেন। তিনি তাঁর একটা বাগানবাড়ি আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি এখানকার খুব একজন বিখ্যাত লেখিকা – অনেকদিন থেকে আমার লেখা পড়ে আমাকে বিশেষ ভক্তি করেন।”
রবীন্দ্রনাথের তরুণ যৌবনে তাঁর জীবনে আনা তরখড়ের আবির্ভাব সম্বন্ধে বলা যায়, ” যাঁরা জীবনে অসামান্যের স্বাক্ষর নিয়ে এসেছেন, ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’ বিধাতা যাঁদের দিয়েছেন, তাঁদের জীবনে এমন সব ঘটনা ঘটে যা সাধারণের কল্পনার বাইরে। রবীন্দ্র-জীবনে আনা-পর্ব এমনি একটি কল্পনাতীত কাহিনী। বিকশিতযৌবনা সুন্দরী বিদেশিনীর গৃহবিদ্যার্থী-রূপে সাড়ে-সতেরো বছরের এক অসামান্য কবি-কিশোরের উপস্থাপনা মহাকবির কল্পনাতেই সম্ভব। বিশ্বকবির জীবন-মহাকাব্যের স্রষ্টাকেও তাই মহাকবি বলতে হবে।” রবীন্দ্রজীবনের প্রভাতলগ্নে তাঁর মানসলোকে অন্নপূর্ণার আবির্ভাবের মতো তাঁর জীবনের অপরাহ্নবেলায় ভিক্টোরিয়ার আবির্ভাবও একটা অবিস্মরণীয় ঘটনা।
ভিক্টোরিয়া শুধু কবি লেখিকা ও শিল্পরসিকমাত্রই নন, অসামান্য ব্যক্তিত্বসম্পন্না এই মহিয়সী নারীরা মধ্যে নারীত্বের এক দুর্লভ মহিমাও বিকশিত হয়েছে। বিশ্বখ্যাত দার্শনিক-পরিব্রাজক কাউণ্ট কাইজারলিং তাঁর ‘Significant Memories’ গ্ৰন্থে লিখেছেন, বিশ্বপরিক্রমায় বহু মনীষী পুরুষের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে, কিন্তু আধুনিক পৃথিবীতে মহিয়সী নারীরা সাক্ষাৎ তিনি অল্পই পেয়েছেন। তাঁর মতে, পাশ্চাত্য জগতের বর্তমান পরিবেশ নারীত্বের পূর্ণ বিকাশের পক্ষে অনুকূল নয়। কিন্তু স্পেনীয় ও রোমক-ঐতিহ্যের কারণে উত্তর আমেরিকার নতুন জীবন আদর্শের চর্চায়, অনুশীলনে এক নতুন নারীত্বের উদ্ভব হয়েছে। ভিক্টোরিয়ার মধ্যে এই দুর্লভ নারীত্বের মহিমা কাইজারলিং প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি লিখছেন—
“In recent years, however, I have come in contact with one woman whose superlative eminence is beyond question, namely the Argentinian, Victoria Ocampo. A wonderfully beautiful woman of great vitality, acute intelligence, fine aesthetic feeling, enormous power of work and great social position. Her picture has inspired many, very many, ‘Views of American Meditations’.”
সামাজিক জীবনে ভিক্টোরিয়ার প্রভাবের কথা উল্লেখ করে কাইজারলিং বলেছেন যে দক্ষিণ আমেরিকায় পুরুষের চেয়ে নারীর ভূমিকা বা স্থান অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকাতেই তিনি প্রথম দেখলেন মানুষের আত্মিক দিকটাই অধিক প্রাধান্য লাভ করেছে। কাইজারলিং মানুষের যে নতুন সংস্কৃতির সন্ধানে সাধনা করেছেন, তাতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছেন ভিক্টোরিয়ার কাছে। দক্ষিণ আমেরিকায় তাঁর প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন —
“with her striking personality she exercised great influence in the southern world, as very few women in the old world, have been able to do.” (ref.- ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেটের ‘টেগোর মেমোরিয়াল স্পেশাল সাপ্লিমেন্ট’)
প্রতিমা দেবীও ভিক্টোরিয়া প্রসঙ্গে লিখছেন —-
” ভিক্টোরিয়া ইংরেজি খুব ভাঙ্গা ভাঙ্গা বলতেন, ফরাসী ভাষাতেই তাঁর দক্ষতা ছিল বেশি, তাঁকে সুন্দরী বলা চলে না, কিন্তু বুদ্ধির প্রখরতা তাঁর মুখে একটি সৌন্দর্যের দীপ্তি এনে দিত। তাঁর বড়ো বড়ো কালো পল্লব-ঢাকা গাঢ় নীল চোখে একটা স্বপ্নময় আকর্ষণী ক্ষমতা ছিল। তাঁর দীর্ঘ দেহ গৌরবময় আভিজাত্যের পরিচয় দিত। তিনি যখন নতজানু হয়ে বাবামশায়ের পায়ের কাছে বসতেন, মনে হোত ক্রাইস্টের পুরানো কোন ছবির পদতলে তাঁর হিব্রু ভক্ত মহিলার নিবেদন-মূর্তি।”
(ক্রমশ)

 

তপন কুমার বসু

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৯:৪৭ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জুতার দাম ১০ লাখ ডলার!

০৯ ডিসেম্বর ২০২০