ঘোষণা

ধারাবাহিক পর্ব-৪ বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ

তপন কুমার বসু | বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 69 বার

ধারাবাহিক পর্ব-৪ বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ

 

 

এর তিনদিন পরে অর্থাৎ ১৫ ই নভেম্বর কবি লিখলেন ‘অতিথি’ কবিতাটি। ১৬ ই নভেম্বর ‘অন্তর্হিতা’, ১৭ তারিখে ‘আশঙ্কা’, ২১ তারিখে ‘শেষ বসন্ত’।
‘অতিথি’ কবিতায় কবি তাঁর কৃতজ্ঞতার অনুরাগ প্রকাশ করে বলছেন — প্রবাসের দিন মোর পরিপূর্ণ করে দিলে, নারী,
মাধুর্য সুধায় ; কত সহজে করিলে আপনারি
দূরদেশী পথিকেরে।
জানি না তো ভাষা তব,হে নারী,শুনেছি তব গীতি
“প্রেমের অতিথি কবি, চিরদিন আমারি অতিথি”।

‘অন্তর্হিতা’ ও ‘আশঙ্কা’ কবিতায় এই মেঘ ও রৌদ্রের লীলা পরিদৃশ্যমান। প্রথম কবিতায় কবি বলছেন, আঁধার রাতের প্রদীপ যখন নিয়েছিল, দুয়ার ছিল বন্ধ, ঘরে কেউ সাথী ছিল না; তখন তাঁর হঠাৎ মনে হল অন্ধকারে বাহির দ্বারে তিনি যেন কার পায়ের ধ্বনি শুনতে পেলেন। বারেক ইচ্ছে হল দুয়ার খুলে দিতে। কিন্তু ক্ষণেক পরে ঘুমের ঘোরে সে কথা তিনি ভুলে গেলেন। এই স্বপ্নকামনা বাস্তবে সত্য হয়ে উঠুক- এই প্রত্যাশাকে কাব্যছন্দে গ্ৰথিত করে কবি বলেছেন—-
আজ হতে মোর দুয়ার
রাখব খুলে রাতে
প্রদীপখানি রইবে জ্বালা
বাহির জানালাতে।
আজ হতে কার পরশ লাগি
পথ তাকিয়ে রইব জাগি ;
আর কোনদিন আসবে নাকি
আমার পরাণ ছেয়ে
যুথীর মালার গন্ধখানি
রাতের বাতাস বেয়ে ?
স্বপ্নকামনার এই উজ্জ্বল আলো পরের দিনই ‘আশঙ্কা’-র মেঘে ঢাকা পড়ল। আশঙ্কিত চিত্তে কবি বলছেন—-
পাছে আমার আপন ব্যথা মিটাইতে
ব্যথা জাগাই তোমার চিতে,
পাছে আমার আপন বোঝা লাঘব তরে
চাপাই বোঝা তোমার ‘পরে,
পাছে আমার একলা প্রাণের ক্ষুব্ধ ডাকে
রাত্রে তোমায় জাগিয়ে রাখে,
সেই ভয়েতেই মনের কথা কইনে খুলে;
ভুলতে যদি পার তবে
সেই ভালো গো যেয়ো ভুলে।
প্রথম কবিতায় যে অনুভূতির প্রকাশ তাকে বলা যেতে পারে মানবিক দুর্বলতা আর দ্বিতীয় কবিতায় যে উপলব্ধি তার কবির ভাষায় ‘ত্যাগের সাধন’। ‘পশ্চিম যাত্রীর ডায়ারি’-তে যেন এরই ব্যাখ্যান রূপে কবি বলছেন, ” বাংলা ভাষায় প্রেম অর্থে দুটো শব্দের চলন আছে, ভালোলাগা আর ভালোবাসা। এই দুটো শব্দে আছে প্রেমসমুদ্রের দুই উলটোপারের ঠিকানা। যেখানে ভালোলাগা সেখানে ভালো আমাকে লাগে; যেখানে ভালোবাসা সেখানে ভালো অন্যকে বাসি। আবেগের মুখটা যখন নিজের দিকে তখন ভালোলাগা, যখন অন্যের দিকে তখন ভালোবাসা। ভালোলাগায় ভোগের তৃপ্তি, ভালোবাসায় ত্যাগের সাধন।”
এর আগের দিনের ডায়ারিতে কবি বলছেন, “যাকে আমরা ভালবাসি তারি মধ্যে সত্যকে আমরা নিবিড় করে উপলব্ধি করি। কিন্তু, সেই সত্য-উপলব্ধির লক্ষণ হচ্ছে পাওয়ার সঙ্গে না-পাওয়াকে অনুভব করা।”

রবীন্দ্রনাথের কবিমানসে চিরদিনই অনুরাগের অন্তরে বৈরাগ্য বাসা বেঁধে থাকে। মিলনের মধ্যেই বেজে উঠেছে চিরবিরহের সুর। ‘শেষ বসন্ত’ কবিতার প্রথমেই তাই দেখি কবির আকুল প্রার্থনা-
আজিকার দিন না ফুরাতে
হবে মোর এ আশা পুরাতে-
শুধু এবারের মতো
বসন্তের ফুল যত
যাব মোরা দুজনে কুড়াতে।
তোমার কাননতলে ফাল্গুন আসিবে বারংবার
তাহারি একটি শুধু মাগি আমি দুয়ারে তোমার।

কিন্তু কবিতার অন্তিম স্তবকে বসন্তের ফুল-কুড়ানোর স্বপ্ন ভুলে গিয়ে সব ছেড়ে যাওয়ার জন্যেই নিজেকে প্রস্তুত করে কবি বলছেন—
রাত্রি যবে হবে অন্ধকার
বাতায়নে বসিও তোমার
সব ছেড়ে যাব প্রিয়ে,
সমুখের পথ দিয়ে,
ফিরে দেখা হবে না তো আর।
ফেলে দিয়ো ভোরে-গাঁথা ম্লান মল্লিকার মালাখানি।
সেই হবে স্পর্শ তব, সেই হবে বিদায়ের বাণী।

পয়লা ডিসেম্বর ‘প্রভাতী’ কবিতায় বলছেন —
এল যে আমার মন- বিলাবার বেলা,
খেলিব এবার সব-হারাবার খেলা,
যা কিছু দেবার রাখিব না আর বাকি।
তিনদিন পর ‘মধু’ কবিতায় নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে কবিকণ্ঠে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সুর লেগেছে —
‘মৌমাছির মত আমি চাহি না ভাণ্ডার ভরিবারে
বসন্তেরে ব্যর্থ করিবারে
* * * * * *
পাখির মতন মন শুধু – উড়িবার সুখ চাহে
উধাও উৎসাহে;
এখানে কবির প্রেমচেতনা অনুভূতির এক নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে।

কবি এই বিদেশিনীর মধ্যে অনুরাগের যে আগুন দেখেছিলেন প্রেমের হোমাগ্নিতে তার শিখাগুলিও দিনে দিনে দীপ্ত হয়েই উঠেছিল। রথীন্দ্রনাথ বলেছেন, ভিক্টোরিয়া শেষ পর্যন্ত কবিকে কিছুতেই পেরু যেতে দেন নি। এই নিয়ে পেরু আর আর্জেন্টিনা এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একটা বড় রকমের রাজনৈতিক সংকট পর্যন্ত গড়ে উঠেছিল। দ্বিতীয়বার ডাক্তারি পরীক্ষার পর যখন স্থির হল কবি ইউরোপ হয়েই দেশে ফিরবেন তখন এলমহার্সট প্রত্যাবর্তনের আয়োজনে ব্যস্ত হলেন। কবি বলেছেন, “যদি বা ফেরবার জাহাজ পাওয়া গেল কিন্তু ভিক্টোরিয়া আমাকে কিছুতেই ছাড়তে চায় না। সাহেবের সঙ্গে তার ছিল একটু রেষারেষির সম্পর্ক ; কারণ সাহেব সর্বদা আমার কাছাকাছি থাকতে, সেটা সে সইতে পারত না। অবশেষে সে ভাবলে সাহেব আমাকে নিজের স্বার্থের জন্য এত তাড়াতাড়ি ইংল্যান্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে; গেল সাহেবের উপর খাপ্পা হয়ে।”

প্রত্যাবর্তনের পথে জাহাজ থেকে লেখা এক চিঠিতে কবি ভিক্টোরিয়াকে লিখছেন —
“My true home is there where from my surroundings comes the call to me to bring out the best that I have, for that inevitably leads me to the touch of the Universal. My mind must have a nest to which the voice of the sky that has no other allurements but light and freedom. **** I assure you that through me a claim comes that is not mine. A child’s claim upon its mother has a sublime origin —– it is not claim of an individual, it is that of humanity. Those come on some special errand of God are like that child; if they ever attract love and service it should be for a higher end than merely their own enjoyment.” [সেন্টিনারি ভল্যুম]
(ক্রমশ)

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:০৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত