ঘোষণা

ধারাবাহিক বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ পর্ব-৩

তপন কুমার বসু | সোমবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 176 বার

ধারাবাহিক বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ পর্ব-৩

 

 

অসাধারণ এই কবি ও লেখিকা রবীন্দ্রনাথকে সেবায় ভরিয়ে তুললেন। দুজনের মনের মধ্যেই অনুরাগের সৃষ্টি হল প্রথম দর্শনেই। উভয়েই অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁদের মধ্যে একজন কাইজারলিংয়ের ভাষায়-এমন এক পুরুষ যাঁর সমকক্ষ বহু বহু শতাব্দী ধরে পৃথিবীর কোথাও পরিদৃষ্ট হয় নি ( There has been no one like him anywhere on our globe for many centuries )
ভিক্টোরিয়া রবীন্দ্রনাথকে কি চোখে দেখেছিলেন তার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর নিজের প্রবন্ধে। প্রথম দর্শনে তাঁর মনের প্রতিক্রিয়া তিনি এইভাবে বর্ণনা করেছেন– “On his light-brown face there was not a single wrinkle in spite of his 64 years (my father’s age) ….. The eyes, black, with often lowered, perfect lids, still retained there youth and fire …. I felt frozen by the sudden and real presence of this distant man with whom my dreams had made me so familiar and who had been so close to my heart when all I had known of him were his poems.”
কবির সেবায় আত্মনিয়োগ করে তাঁর মনোভাব কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল তারা আভাস দিয়ে তিনি লিখেছেন —– “Thus I came, little to know Tagore and his moods, Little by little he partially tamed the young animal, by turns wild and docile, who did not sleep, dog like, on the floor outside his door, simple because it was not done.” এই শেষ বাক্যটির ব্যঞ্জনা অপরিসীম। ভিক্টোরিয়ার মতো অসামান্য রমণীই এভাবে আত্মবিশ্লেষণ করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের প্রতি এই আসক্তির সঙ্গে মিশেছিল অসুস্থ পুরুষের প্রতি সেবাময়ী নারীরা হৃদয়মথিত করুণা। তিনি বলেছেন, “And I discovered in myself a strong material sense of duty towards this man, my father’s contemporary, whom I could not help myself treating at times like a child.

কবি ভিক্টোরিয়ার নামকরণ করেছিলেন ‘বিজয়া’। পূরবী গ্ৰন্থখানি তিনি বিজয়াকে উৎসর্গ করেছেন। লিখেছেন ‘বিজয়ার করকমলে’। পূরবীর ১০ ই নভেম্বর থেকে ২৯ শে ডিসেম্বর, ১৯২৪ পর্যন্ত যে কবিতাগুলি লেখা হয়েছে তার বেশিরভাগ কবিতাতেই ‘বিজয়া’র উপস্থিতি অনুভব করা যায়।
কবি যে বইটি তাঁকে উৎসর্গ করেছেন তা তিনি চিঠি লিখে জানিয়েও ছিলেন। আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “বইখানা তোমায় উৎসর্গ করা, যদিও এর ভিতরে কী রয়েছে তা তুমি জানতে পারবে না।”
মনে রাখতে হবে, সান ইসিড্রোর বাগানবাড়ি ‘মিরালরিও’তে কবি যখন পৌঁছলেন তখন তাঁর শরীর খুব অসুস্থ, অবসাদগ্ৰস্ত ও ক্লান্ত মন। সঙ্গে আছেন এলমহার্সট আর ভিক্টোরিয়া। এখানে এসে, সান ইসিড্রোর এই সুন্দর পরিবেশ তাঁর ভাল লাগল। কবি লিখছেন —–
স্বর্ণসুধা-ঢালা এই প্রভাতের বুকে
যাপিলাম সুখে,
পরিপূর্ণ অবকাশ করিলাম পান।
মুদিল অলস পাখা মুগ্ধ মোর গান।
যেন আমি নিস্তব্ধ মৌমাছি
আকাশ-পদ্মের মাঝে একান্ত একেলা বসে আছি।
(প্রভাত, ১১ই নভেম্বর)

‘মিরালরিও’তে সেবার মধ্য দিয়ে কবি তাঁর প্রতি মুহুর্তের সঙ্গ পাচ্ছেন অথচ ভাবের আদান-প্রদানে ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকাশের অন্তরায়। আবার ভিক্টোরিয়াও অনুরাগের ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন তিনি ইংরেজি জানেন না বলেই এই নীরবতা। কিন্তু ভাষার অভাব নয়, অনুরাগের গভীরতাই এই নীরবতার কারণ। ভিক্টোরিয়া লিখছেন — “When we were alone together, shyness deprived me of all means of expression, Tagore thought I did not easily find words in English, But it was not the language that stopped me; it was Tagore himself.”

প্লাতা নদীর ধারে সেই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ যেদিন পৌঁছন, সেদিনই তিনি অপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা ‘বিদেশী ফুল’ কবিতাটিতে লেখেন। কবি বলেছেন —
হে বিদেশী ফুল, আমি কানে কানে শুধানু আবার
” ভাষা কি তোমার ?”
হাসিয়া দুলালে শুধু মাথা,
চারিদিকে মর্মরিল পাতা।
আমি কহিলাম, ‘জানি, জানি,’
সৌরভের বাণী
নীরবে জানায় তব আশা। নিঃশ্বাসে ভরেছে মোর সেই তব নিঃশ্বাসের ভাষা।”
ভাষা যেখানে ব্যর্থ, অন্তরের যোগাযোগ সেখানে গভীর। কবি তাই বলছেন —-
‘বোঝ নি কি তোমার পরশে
হৃদয় ভরেছে মোর রসে ।
কেই বা আমারে চেনে এর চেয়ে বেশি,
হে ফুল বিদেশী ।’
‌ (ক্রমশ

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৩:৩৩ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জুতার দাম ১০ লাখ ডলার!

০৯ ডিসেম্বর ২০২০