ঘোষণা

ধারাবাহিক-  বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ পর্ব – ৫

তপন কুমার বসু | রবিবার, ০৩ জানুয়ারি ২০২১ | পড়া হয়েছে 77 বার

ধারাবাহিক-  বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ  পর্ব –   ৫
           ‌
পূরবী কাব্যগ্রন্থ তাঁকে উৎসর্গ করে কবি যে চিঠি  লিখে জানিয়েছিলেন (পূর্বে উল্লেখিত) তার প্রেক্ষিতে ১৯২৫ সালের ২৮ শেষ ডিসেম্বর ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো চিঠিতে লিখেছিলেন —-
“বইটাতে কি আছে তা জানার জন্য আমি পাগল হয়ে আছি।” প্রেমের প্রকাশে ভিক্টোরিয়াই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পুরো একটা বই-ই লিখে ফেললেন। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বই ‘Tagore en last barrancas de San Isidro.’, বাংলায় বলা যায় ‘সান ইসিড্রোর উপত্যকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’
    ৩০ টি কবিতা রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়ার কাছে থাকাকালীন। এ সমস্ত কবিতায় প্রেমময় অভিব্যক্তি এতই বেশি ছিল যে রবীন্দ্রনাথ নিজের কবিতাগুলো দেশে (তাঁর পুত্র ও পুত্রবধূর কাছে) পাঠানো উচিৎ হবে কিনা ভেবে এলমহার্সটকে বললেন, ‘বেশি কিছু তো বলা যাবে না। ওরা খুব বিচলিত হয়ে পড়বে। আমার এইসব কবিতার কোন মানে করতে পারবে না ওরা। ওদেরকে পাঠিয়ে দাও চিঠিগুলো আর খবরের কাগজের কাটিংগুলো। কিন্তু কবিতাগুলো পাঠিয়ো না।
      রবীন্দ্রনাথের প্রথমে সাতদিন থাকার কথা ছিল আর্জেন্টিনায়। তারপর সেটা বাড়তে বাড়তে এসে দাঁড়ায় বাহান্ন দিনে। রবীন্দ্রনাথের আর্জেন্টিনা ভ্রমণ যাতে উপভোগ্য হয়ে উঠে, তারজন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করেছিলেন তিনি। একটি সাজানো ঘর, সুদৃশ্য অলিন্দ, কবিতা লেখার উপযোগী নিভৃত পরিবেশের বন্দোবস্ত করা থেকে শুরু করে যখন দরকার সঙ্গ দেওয়া, দর্শনার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা, সাহিত্যিকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, রবীন্দ্রনাথের পছন্দের জায়গায় নিয়ে যাওয়া সবই করেছিলেন ওকাম্পো। শোনা যায় রবীন্দ্রনাথের ভরণপোষণের এই খরচ মেটানোর জন্য ওকাম্পোকে খুব দামী একটা হীরের টায়রা খুব নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে হয়েছিল। গয়না বিক্রির টাকা থেকে দশ হাজার পেসো আগাম ভাড়া দিয়ে এসেছিলেন মিরালরিওর বাড়ির মালিককে। এ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেজন্য ফানি বলে এক পরিচারিকাকে রেখে ছিলেন চব্বিশ ঘন্টা তদারকিতে।
    সান ইসিড্রোর সেই বাড়ি ‘মিরালরিও’র বারান্দায় বসে বসে রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া একসাথে নদী দেখতেন। কখনো বা বাড়িসংলগ্ন চিপা গাছের নীচে বসে অবিশ্রান্ত আড্ডা দিতেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন বিজয়াকে, বিজয়াও শোনাতেন শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা। সে সময়টাকে রবীন্দ্রনাথ উপভোগ করেছেন প্রাণভরে। সুদূর সান ইসিড্রোর সেই বাড়ির স্মৃতি রোমন্থন করেছেন শান্তিনিকেতনে বসেও।
     প্লাতা নদীর তীরে সান ইসিড্রোর সেই অজস্র গোলাপ ফোটানো বসন্তের দিনগুলি থেকে বিদায় নিয়ে আসতে কবির মন কিছুতেই চায় নি। শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে ১৯২৫ এর আগস্ট মাসে লেখা এক চিঠিতে তিনি ভিক্টোরিয়াকে লিখছেন —-“You express regret in your letter that I could not continue to stay at that beautiful house near the river till the end of the summer. You do not know how often I wish I could do so. It was some lure of duty which drove me from the sweet corner with its inspiration for seemingly futile idling ; but to-day I discover that my basket, while I  was there, was being daily filled with shy- flowers of poems that thrive under the shade of lazy hours. I can assure you, most of them till remain fresh long often the time when the laboriously buii towers of my beneficent deeds will crumbo into oblivion.” (সেণ্টিনারি ভল্যুম, পর। ৩১)
  রবীন্দ্র জীবনে ওকাম্পোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব হল রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সে ‘চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ’ হয়ে ওঠা। রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর ছবির আঁকার শখকে ‘শেষ বয়সের প্রিয়া’ বলে উল্লেখ করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এর শুরুটা গড়ে উঠেছিল ওকাম্পোর বাড়িতেই ‘পূরবী কাব্য গ্ৰন্থ’ তৈরির সময়। ওকাম্পো লিখছেন —-
  “ওর একটি ছোট খাতা টেবিলে পড়ে থাকতো ; ওরা মধ্যে কবিতা লিখতেন বাংলায়। বাংলা বলেই যখন – তখন খাতাটা খুলে দেখার আমার পক্ষে তেমন দোষের কিছু ছিল না। এই খাতা আমাকে বিস্মিত করল, মুগ্ধ করল। লেখার নানা কাটাকুটিতে একত্রে জুড়ে দিয়ে তার ওপর কলমের আঁচড় কাটতে যেন মজা পেতেন কবি। এই আঁকিবুঁকি থেকে বেরিয়ে আসতো নানা রকমের মুখ, প্রাগৈতিহাসিক দানব, সরীসৃপ অথবা নানা আবোলতাবোল। সমস্ত ভুল, সমস্ত বাতিল করা লাইন কবিতা থেকে বহিস্কৃত সব শব্দ এমনি করে পুনর্জীবিত হতো এক ভিন্ন রূপের জগতে, আমাদের দিকে তাকিয়ে যেন স্নিগ্ধ কৌতুকে হাসত তারা,……………….এই ছোট খাতাটাই হলো শিল্পী রবীন্দ্রনাথের সূচনাপর্ব।”
     ওকাম্পোর বাড়িতে বসে কবিতা লিখতে গিয়ে কবি যে সমস্ত কাটাকুটি করতেন, তা দেখে মাঝে মাঝে ওকাম্পো ঠাট্টা করে বলে বসতেন— ‘সাবধান, তোমার কবিতায় যত ভুলভ্রান্তি থাকবে, তুমি তো তত বেশিই ছবি এঁকে মজা পাবে। শেষে দেখবে যে, নিজে ইচ্ছে করেই বাজে কবিতা লিখছো।’
    ওকাম্পো আরো লিখছেন —-
“……… তাঁর এই আঁকিবুঁকিতে তো আমি মেতে গেলাম। ব্যাপারটায় ওঁকে উস্কে দিলাম। সান ইসিদ্রোর ছ বছর পর প্যারিসে যখন আবার দেখা হলো কবির সাথে, ঐ খেলা তখন দাঁড়িয়ে গেছে ছবিতে।”
                                                       (ক্রমশ)
তথ্যসূত্র : জগদীশ ভট্টাচার্য (কবিমানসী-১ম)
               Ishtiyak Mahmud – রবীন্দ্রনাথ
               ঠাকুর-ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো – এক
               রহস্যময় প্রেমের গল্প
               অভিজিৎ রায় – ওকাম্পো আর
রবীন্দ্রনাথ – কিছু অশ্রুত গুঞ্জন

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১:০৯ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৩ জানুয়ারি ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত