ঘোষণা

ধারাবাহিক – বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ ।।

তপন কুমার বসু | রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 245 বার

ধারাবাহিক  – বিজয়া ও রবীন্দ্রনাথ ।।

 

কবি জীবনের অপরাহ্ন বেলায় তাঁর দেহ যখন রোগজর্জর, মন ক্লান্ত ও অবসন্ন, তখন সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত পথে তাঁর জীবনে এলেন এক আশ্চর্য রমণী। সেবাকে তিনি সুন্দর করলেন, ক্লান্ত, অবসন্ন কবির জীবনে আনলেন সুধার পাত্র। এই বিশেষ নারীটি হলেন আর্জেন্টিনার বিখ্যাত কবি-লেখিকা ও ললিতকলার উৎসাহদাত্রী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো (Victoria Ocampo)

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো জন্মেছিলেন ৭ই এপ্রিল,১৮৯০ বুয়েনাস এয়ারস্, আর্জেন্টিনা। তাঁর জন্ম তৎকালীন অভিজাত পরিবারে এবং রীতি অনুযায়ী তাঁর শিক্ষালাভ হয়েছিল স্বগৃহে একজন পরিচারিকার কাছে। প্রথমেই তিনি ফরাসী ভাষা শিক্ষা করেছিলেন। কার্যত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর হয়নি। দান্তের ডিভাইন কমেডির ওপর একটি আলোচনামূলক গ্ৰন্থের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে অভিষেক হয়। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘সুর’ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। এ পত্রিকায় ল্যাটিন আমেরিকার সকল প্রধান কবি লেখকদের রচনা প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি ইউনেস্কো প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। ৮৮ বছর বয়সে ২৭শে জানুয়ারি, ১৯৭৯ আর্জেন্টিনায় তাঁর মৃত্যু হয়।
বিশ্বভারতী ও হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট. উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। তিনি ছিলেন ‘আর্জেন্টিনা অ্যাকাডেমি অফ লেটারস’-এর প্রথম মহিলা সদস্য।

১৯২৪ সাল। পেরুর সরকার স্বাধীনতা লাভের শতবার্ষিকী উপলক্ষে বিরাট উৎসবের আয়োজন করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বহু বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিকদের আমন্ত্রণ করেছিলেন পেরু সরকার।
রবীন্দ্রনাথও ছিলেন তাঁদের অন্যতম। ‘আণ্ডেস’ জাহাজ কবিকে নিয়ে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়ানেস এয়ারস-এ পৌঁছল ৭ই নভেম্বর। তিন সপ্তাহ সমুদ্রপাড়ি দিয়ে কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন, সে কথা আমরা ‘পশ্চিম যাত্রীর ডায়ারি’তে জেনেছি। আর্জেন্টিনা পৌঁছে কবি পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে লিখছেন ডাঙ্গায় পৌঁছাবার দিন সাতেক আগে তিনি আবার ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হন, এ যাত্রায় বুঝি তিনি আর দেশে ফিরতে পারবেন না।
আর্জেন্টিনায় এই বৃহত্তম নগরীর অগণিত নর-নারীর কাছ থেকে তিনি পেলেন বিপুল সম্বর্ধনা। নগরীর একটি বিশিষ্ট হোটেল প্লাসাতে সহযাত্রী ও সেক্রেটারি লেনার্ড এলমহার্সট এর সাতে কবির থাকার ব্যবস্থা হল। চিকিৎসা ও সেবা শুশ্রূষার দিক দিয়ে এই মহামান্য অতিথির প্রতি কর্তব্য পালনে আর্জেন্টিনা কোন ত্রুটিই রাখল না। শহরের নামজাদা ডাক্তার তাঁর চিকিৎসা করলেন। কিন্তু তাঁর স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখি গেল না।
এদিকে ভিক্টোরিয়ার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় হয় রবীন্দ্র সাহিত্যের হাত ধরেই।রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হতে থাকে গীতাঞ্জলি। ভিক্টোরিয়ার হাতে এসে পড়ে গীতাঞ্জলির ইংরেজি, স্প্যানিশ ও ফরাসি অনুবাদ। এর মধ্যে আঁদ্রে জিদের ফরাসি ভাষায় করা গীতাঞ্জলির অনুবাদ ছিল তাঁর প্রিয়। রবীন্দ্রনাথের লেখা তাঁকে এতটাই ছুঁয়ে যায় যে তিনি সেসময়ে ‘ রবীন্দ্রনাথ পড়ার আনন্দ ‘ নামে একটা লেখাও লিখে ফেলেন। ভিক্টোরিয়া নয়াদিল্লির ‘ সাহিত্য আ্যকাদেমি ‘ প্রকাশিত রবীন্দ্র শতবার্ষিকী গ্ৰন্থে [Rabindranath Tagore – A Centenary Volume] ‘Tagore on the Banks of the River Plate’ প্রবন্ধে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও অনুরাগরঞ্জিত ভাষায় রবীন্দ্রনাথের দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব দক্ষিণ আমেরিকাবাসীর অনেকের কাছেই একটা বড় ঘটনা। তাঁর কাছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলির অন্যতম।
কাজেই রবীন্দ্রনাথের লেখার ভক্ত ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো কোনোভাবেই এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে চলে আসেন হোটেল প্লাসাতে। কবির অসুস্থতাও যেন তাঁর জীবনে দেবতার বর হয়ে এল। আত্মীয়পরিজনহীন সেই সুদূর প্রবাসে ভিক্টোরিয়া অসুস্থ কবির সেবাশুশ্রূষার সমস্ত দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিলেন। তিনি কবিকে সান ইসিড্রোতে তাঁর সুন্দর বাগানবাড়িতে নিয়ে তুললেন। বাড়িটির নাম ‘মিলারিও’। বাড়িটির উত্তর দিক দিয়ে বয়ে চলছে প্লাতা নদী।
ভিক্টোরিয়া ছিলেন গান্ধীভক্ত। গান্ধীজি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “the Indian I worship – for whom I find no adequate qualifications.” সান ইসিড্রোতে ১৯২৪ এর বসন্ত ছিল বড় সুন্দর। অজস্র গোলাপ ফুটেছিল। নিজের ঘরে বসে গোলাপের গন্ধে আমোদিত প্রতিটি সকাল তাঁর কেটেছে ভারতীয় কবির প্রতীক্ষায় — “reading Tagore, thinking of Tagore, writing to Tagore, waiting for Tagore.”
ভিক্টোরিয়ার জীবনে ‘গীতাঞ্জলি’ এসেছিল দেবতার আশীর্বাদের মতো। তিনি তখন একটি মানস-সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছিলেন – (স্বামী Bernardo Dr Estrada+এর সাথে সম্পর্ক ভাঙ্গনের পথে, এর মধ্যে স্বামীর এক কাজিন জুলিয়ান মার্টিনেজের সঙ্গে গড়ে উঠেছে ‘সমাজ অস্বীকৃত’ এক ধরনের সম্পর্ক।) গীতাঞ্জলির মধ্যে তিনি পেয়েছিলেন পথনির্দেশ। তাই কবিগুরু ছিলেন তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয়। তাঁরই ইঙ্গিত দিয়ে তিনি লিখেছেন, “Now as in roseloaded spring of 1924, he is as near to me as my life, because he helped me to pass ‘from the unreal to the real.”
গান্ধীজি ও কবিগুরুর প্রতি তাঁর সুগভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করে প্রবন্ধ শেষে তিনি লিখেছেন, “the debt that I, a Westerner and South American, owe to men like Gandhi and Gurudev is like the restitution of a treasure I had inherited without being aware of it.”

(ক্রমশ)
তপন কুমার বসু
সালকিয়া, হাওড়া
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৯:২৬ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জুতার দাম ১০ লাখ ডলার!

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

ad