ঘোষণা

পঁচিশে মার্চ কালরাত্রি এবং কিছু কথা

| শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০ | পড়া হয়েছে 109 বার

পঁচিশে মার্চ কালরাত্রি এবং কিছু কথা

দীনেশ পিটার রেগো,

একাত্তরে দিবাগত পঁচিশে মার্চে মধ্যরাতে সেই কালরাত্রির নিষ্ঠুরতম গণহত্যার রক্তপাতে রাজধানীর রাজপথ প্লাবিত হয়েছিল।সেই সকল শহীদের তাজা রক্তধারা অস্ফুট শব্দে বিলাপ করে কাঁদছিল।সেই রক্তপ্লাবন দেখে এবং রক্তের কান্না বুঝতে পেরে বাংলার অকুতোভয় ছেলেরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।তৎক্ষণাৎ তারা পণ করল যে, দেশমাতাকে শত্রুমুক্ত করতে হবেই হবে।অবিলম্বেই অনির্দিষ্টকালের জন্য সকলস্তরের বিদ্যাপীঠ বন্ধ রেখে সোনার সন্তানরা এই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হল যে, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবনা’ বলেই মুক্তিযুদ্ধে যাবার জন্যে বা ট্রেনিং নেবার উদ্দেশ্যে দলে দলে ভারতে যেতে শুরু করল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে,সন্তান যুদ্ধে যাবার প্রাক্কালে পরোক্ষভাবে অনেক ছেলেরা নিজ নিজ মায়ের সম্মতি পেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার জন্যে।

অনেক বাবাও তাঁর আদরের খোকাকে দেশ বাঁচাতে হবে বাছা,এমনটি বলেই তাঁর সম্মতি দিয়েছেন।বোন নয়নজলে ভেসে ভেসে স্নেহের ভাইয়ের ব্যাগখানা প্রয়োজনীয় জিনিসসমেত সুবিন্যস্তভাবে গুছিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে অনুমতি প্রকাশ করেছে দেশ রক্ষার জন্যে।এছাড়া দীর্ঘদিনের প্রেমিকও তার প্রেমিকার সদয় অনুমতি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নিজেকে নিয়োজিত করেছিল দেশমাতৃকাকে রক্ষা করার জন্যে।তৎকালীন এমন সব ঘটনাবলী নিখাদ সত্য।এতে স্পস্ততই বোধগম্য যে,একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে সকলস্তরের নাগরিকের সহযোগিতা ছিল, যা নিদেনপক্ষেই অনস্বীকার্য।দেশকে শত্রুমুক্ত করব,এই মর্মে বাঙালিজাতি মরিয়া হয়ে উঠেছিল,মরিয়া হয়ে উঠেছিল তদানীন্তন বিজ্ঞ ছাত্রসমাজ।তাদের মধ্যে উত্তাল বিপ্লবী তৎপরতা এবং দেশমাতার প্রতি গভীর প্রেমবোধ, মমত্ববোধ লক্ষ্য করা গিয়েছিল।রাজধানীসহ সারা বাংলাকে ম্যাসাকার করেছিল সেই ভয়ানক কালরাতে পশুবৎ বর্বর হিংস্র পাক-সেনাদল।“কাল” শব্দের অর্থঃ যম,সর্বনাশ,ধবংস বা মৃত্যু।বুলেটের তাণ্ডবে বসতবাটী, দোকানপাট ছারখার,ঝাঁঝরা করে ফেলে ওরা।গণমানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়ে।পাক-নরপশুরা পেয়েছিল তাদের বিশেষ দোসর কথিত রাজাকার,আলশামস,আলবদরের জোরালো পৃষ্ঠপোষকতা।বাসস্থানে অগ্নিসংযোগসহ ওরা একের পর এক চাটুকারিতার সাথে সার্বক্ষণিকভাবে যোগাড় করে দিতে থাকে নরপশুদের দৈহিক কামনা মেটানোর আহার সামগ্রী ‘নারী’।যারা আমাদেরই মা-বোন।যাদের কোন আর্তচিৎকার কারো কানে এসে পৌঁছেনি!বাঁচাও,বাঁচাও,ত্রাহি ত্রাহি আর্তনাদ সেই পাশবিক ঘৃণ্য নিনাদ ভেদ করে কারো কর্ণগোচর হয়নি সেই কালরাতে!!

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হল-অভ্যন্তরে ধর্ষণকৃত নারী শিক্ষার্থীদের করুণ চিৎকারে কেউ এগিয়ে আসতে পারেনি তাদেরকে রক্ষা করার জন্য।কেননা সেক্ষণে বাংলার মানুষ হয়েছিল হতভম্ব,দিশেহারা,ছত্রভঙ্গ এবং তারা হয়েছিল কিংকর্তব্যবিমূঢ়।এর মূখ্য কারণঃ সকলেই নিরীহ, নিরস্ত্র,নিঃশক্তি মানুষ।অতর্কিত হামলাকে স্বভাবত কেউই ঠেকাবার সুযোগ এবং সাহস পায় না।যুদ্ধ শেষে সে সকল ধর্ষিতা নারীগণ কি পেল?? তারা পেল “বীরাঙ্গনা” উপাধি।নিরুপায় হয়ে সে খেতাব বরণ করল তারা।আমাদের সে সকল মা বোনদের সম্ভ্রমহানি, মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত বা শরীক হতে পেরেছে নিশ্চয়ই।তারা তাদের মহা মূল্যবান সম্ভ্রম দায়বদ্ধতার সঙ্গেই দেশমাতার মুক্তির লক্ষ্যে দান করেছে বৈকি!!সেই দান নিদেনপক্ষেই অনস্বীকার্য এবং অপরিহার্য,অম্লান-অমূল্য দান!

সেই কালরাতে জেলে মরেছে নদীতে,শ্রমিক মরেছে পথে,দোকানী মরেছে দোকানে, ঘুমন্ত বাস্তুহারা প্রাণ দিয়েছে রাজপথের ফুটপাতে।সকলেই হয়েছিল নির্মম ব্রাশফায়ারের শিকার।যারা স্বপ্নেও ভাবেনি এভাবে নির্বিচারে অতর্কিত হামলায় তাদের প্রাণ নাশ হবে!চোখ বেঁধে অপহরণ করেছিল ডাক্তার, শিক্ষক এবং অগণিত বুদ্ধিজীবিকে।নির্জন ভয়ানক বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে বেয়নেটের খোঁচায় হত্যা ক’রে নিষ্ঠুর বিদ্রূপের শিকার বানিয়েছিল তাদেরকে!এমনই ছিল শহীদবর্গের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস!পিঁড়ার মত নিষ্ঠুর গণহত্যা চালিয়েছিল নির্দয় ঘাতকগোষ্ঠী সেই ভয়াল কালরাতে!

এতদ নির্মম ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার সন্তানদের মধ্যে জাগ্রত হয়েছিল বাঁধ-ভাঙ্গা মনোচৈতন্য।তাদের জীবনের গতিবেগ হয়ে উঠেছিল উত্তাল জেদ-ভরা চঞ্চলতায়।জয়বাংলা বলেই তারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যা ঐতিহাসিক সত্য।গেরিলাযুদ্ধে বিজয়প্রত্যয় জীবনের মহৎ লক্ষ্যরূপে স্পন্দিত হতে থাকে সকল ট্রেনিংপ্রাপ্ত যোদ্ধা-জীবনের হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে।ছাব্বিশে মার্চ বড়ই অর্থবহ দিন অর্থাৎ এই দিনটি নির্ধারিত হয় বাঙালি জাতির স্বাধীনতাদিবসরূপে।ছাব্বিশে মার্চ বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবস।

একাত্তরের মার্চ মাসের সাত তারিখে বাংলার প্রাণপ্রিয়,অবিসংবাদিত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি,জনদরদী মহান নেতা “বঙ্গবন্ধু”শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানের রেসকোর্স মঞ্চে দাঁড়িয়ে বজ্রকন্ঠে দেশবাসীর প্রতি স্বাধীনতার উদাত্ত আহ্বান তথা ঘোষণা দিয়েছিলন। সেই ঘোষণা ছিল “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। সেই মহান ঘোষণা থেকেই সঙ্ঘটিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। টানা নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলেছিল।আজ সেই মহান নেতা, মহান কান্ডারীকে হৃদয়ের শ্রদ্ধার্ঘ্য দিয়ে স্মরণ করছি।তাঁর প্রতি রইল আমাদের অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা।এই যুদ্ধের মাসেই মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আমরা আন্তরিক অভিনন্দনসহ তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি এবং তাঁর সঙ্গে সেই হারিয়ে যাওয়া তাঁর সকল পরিজনদের বিদেহী আত্মার চিরস্বর্গীয় শান্তি কামনা করছি।আজ মহান স্বাধীনতা দিবস।আমাদের বড়ই গর্বের দিন,অতীব আনন্দের দিন।আজ সুখদুঃখ বিজড়িত এই দিনে সেই বীর শহীদদের বিদেহী আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছি।আজ এই মহান-দিনে সেই কালজয়ী গানের প্রারম্ভিক অংশটুকু এখানে উল্লেখ করতে হয়ঃ

“এক সাগর রক্তের বিনিময়ে —
বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা—
আমরা তোমাদের ভুলবনা,
আমরা তোমাদের ভুলব না।।

বিশ্বের সকল প্রান্তে বসবাসকারী বাংলার সমুদয় অধিবাসীকে মহান স্বাধীনতা দিবসের আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু,জয় মুক্তিযোদ্ধাগণ।বাংলাদেশ চিরজীবি হোক।

————-

দীনেশ পিটার রেগো,

সিলভার স্প্রিং, মেরিল্যান্ড

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:১৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত