ঘোষণা

পদ্মাসেতু, শেখ হাসিনা এবং আমাদের জনজীবন

সাইফুর রহমান কায়েস | সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 365 বার

পদ্মাসেতু, শেখ হাসিনা এবং আমাদের জনজীবন

যৌবনের শুরুতে আমি ঝাপিয়ে পড়েছিলাম জীবন ও জীবিকাণ্বেষণে। জীবিকার ভেতরে তখন জীবনকে খুঁজে নিতে চেয়েছি। এখন তার বিপরীতমুখি স্রোতে মজে গিয়ে জীবনের ভেতরেই জীবিকাকে অন্বেষণ করে ফিরি। ফলে জীবন হয়ে উঠেছে আরো তাৎপর্যপূর্ণ, উপভোগের এবং সুনিশ্চিতভাবে উদযাপনের। এখন আমি যে জীবনটি উদযাপন করি সেটি আমার আরাধ্যমান।
এই জীবনকে উদযাপন করতে গিয়ে আমি বহুনদী,সমুদ্র, মহাসমুদ্র,হাওর বাওড়,বিল, জলাশয়,খাল, জনপদ পাড়ি দিয়েছি। বহু মানুষের সংস্রব লাভের সুযোগ হয়েছে। যে সুযোগসমূহ সম্ভাবনায় রূপান্তরিত হয়েছে।
জীবনকে ছেনে দেখার হাতছানি আমি সবসময়ই অনুভব করি। আমি তাই পাড়ি দিয়েছি প্রমত্তা পদ্মা। আজ থেকে দুই যুগ আগে। সন্দ্বীপ থেকে গোকর্ণঘাট, বাল্লা থেকে জাফলং, বাংলাবান্ধা থেকে জকিগঞ্জ, শিলিগুড়ি থেকে কাঠমন্ডু, পারু। আশুলিয়া থেকে ম্যানিলা, মোল্লাগুল থেকে লাগোস, ইটনা থেকে আক্রা, আক্রা থেকে ইস্তাম্বুল, ঢাকা থেকে ব্যাংকক, দুবাই, সিঙ্গাপুর এবং কোদালীর হাওর থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর, হাইলহাওর থেকে হাকালুকি, আজুমাসা উইলি ফলস থেকে হামহাম, লাওয়াছড়া থেকে নীলাচল, এঞ্জুলেজু ভাসমান গ্রাম আর জলারবন থেকে রাতারগুল, এবুরি বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, সুন্দরবন থেকে রেমা কালেঙ্গা, কেপকোষ্ট ক্যাসল থেকে ঘানা ন্যাশনাল থিয়েটার,খোয়াই থেকে তিস্তা, পদ্মা থেকে বলেশ্বরী – কোথায় আমি পদচ্ছাপ অংকন করি নি। বহু ঘাট ও ঘটির জল পান করে আমি পুষ্ট হবার চেষ্টা করেছি। ঋদ্ধ হবার চেষ্টা করে গেছি প্রাণান্তকরভাবে। ফলের ভারে নত হয়ে যাওয়া বৃক্ষের কাছে নমিত হতে শিখেছি, এখনো শিখে চলেছি। নিষ্ফলা বিষবৃক্ষের আষ্ফালনও যে দেখি নি তা কিন্তু নয়। এদের সাময়িক উপদ্রবে উপদ্রুত হয়েছি বহুবার কিন্তু দমে যাই নি, আমলে নিই নি। সুখের গভীরে অসুখ নিয়েও বেচে ছিলাম এই পৃথিবীতে। ভাটির গাঙে নাও ভাসিয়েছি বলে সব টাঙ্গুয়ার ঘন নীল জলে ভাসিয়ে দিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছি। দৌড় সালাহদীনের খাতায় নাম লিখাইনি। অত্যন্ত ধীর পদক্ষেপে, শান্ত মনে এগিয়ে যেতে চেয়েছি। কারো দ্বারা যদি একবছরে সুপারসিডেড হই তাকে আমি কখনো সুপারসিড করার চিন্তা করি না। নিজের ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা তার সামনে দশ বছরে তুলে ধরার মনোবাঞ্চা পোষণ করি।
জীবনে যে বাধা ও বাধ আসে নি তা কিন্তু নয়। কিন্তু আমি খুব সন্তর্পণে মোকাবেলা করতে চেয়েছি।
আমি এক নির্বিষ জীবন যাপন করতে চেয়েছি।
পথ চলতে গিয়ে পথ ভুল করেছি, আবার পথ চিনে নিতে চেয়েছি। কিন্তু খেই হারাই নি। কাজের অবসরে খৈ ভাজি নি, বই পড়ার চেষ্টা করেছি। অবসরকে শুধু যাপনের বিবেচনায় রাখি নি, উদযাপনের কাতারে নিয়ে যেতে চেয়েছি।
পদ্মা সেতু যখন হতে দেখছি তখন মনে একই ধ্বনি বাজছে। এক সময় সেতু না থাকার কষ্ট মনকে দ্রবীভূত করতো। আজ যখন পদ্মা সেতু হয়েই গেছে তখন নিজেকে আর স্বপ্নচারী নয়, স্বপ্নসঞ্চারী এবং স্বপ্নাচারী বলেই মনে হয়। আর তা মনে হয় বলেই খুশিতে ভাসছি। যুগপরাম্পরায় মানুষের কষ্টকে ঘুচিয়ে দেবার মতো নেতৃত্ব আমরা পেয়েছি। মৃত্যুর হাত থেকে বারবার দৈবক্রমে বেচে যাওয়া মানুষটির সক্ষমতা আর দেশপ্রেম আমাকে বিমোহিত করে, আন্দোলিত করে। আমরা গর্ব করে বলি শেখের বেটি হাসিনা। অথচ ছোটবেলায় তার নামে জনপদে দেশবিক্রির অপবাদ দেয়া হয়েছিলো বলে শুনেছি, হাসিনা গো হাসিনা/ তোর কথায় নাচি না/ তোর কথায় নাইচ্যা/ দেশ দিলাম বেইচ্যা। কি সাংঘাতিকভাবে তখনকার সময়ে আমাদের মনোজগৎকে বিষিয়ে তোলা হয়েছিলো। জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে জনবিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা হয়েছিলো। জীবন নিয়ে তিনিও শংকার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছেন। একদেশ থেকে আরেক দেশে ফেরার হয়েছেন স্বজন হারানোর জগদ্দল পাথর বুকে চেপে। কারবালার চেয়েও বড় কারবালা সৃষ্টির খলনায়কেরা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন একসময় ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ বা দায়মুক্তি আইনের সুবিধা নিয়ে। আমরা কতো বর্বর এবং জাতি হিসাবে কতোটা আত্মঘাতী এবং পাষণ্ড হলে পরে জাতির জনকের হত্যার বিচারকে বিচারহীনতার দিকে ঠেলে দিতে পেরেছি। এর জন্য জাতিকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। হাসিনা আমাদের সে কালিমা থেকে মুক্ত করেছেন নির্দায় আইন বাতিলের মাধ্যমে। এই আইনটি এলব্যাট্রসের মতো আমাদের গলায় ঝুলেছিলো। তার যোগ্য নেতৃত্বের জন্যই বিশ্ব দরবারে আমরা শিরোন্নত অবস্থান ঘোষণা করছি। হত্যা করলে বিচারের মুখোমুখি দাড়াতে হবে না এমন সংস্কৃতি থেকে জাতিকে বেরিয়ে আসার পেছনে তেলসলতে ও পিদিমের যোগানদার শেখ হাসিনা। সাহসী, স্বাধীনচেতা মনোভাব আমরা দেখি তার মাঝে। একটি আত্মনির্ভরশীল উন্নয়নের মডেল হিসাবে দেশকে সম্মানের আসনে বসানোর সুযোগ্য দাবীদার এবং গণমানুষের নেতা হিসাবে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। সকল স্তরের ব্যর্থতার মাঝে তার সাফল্য ঈর্ষণীয়। তিনি হয়ে উঠেছেন জনগণের আস্থার প্রতীক। যোগাযোগের ক্ষেত্রে উন্নয়নের ফলে দেশের মানুষের মবিলিটিই যে শুধু বাড়বে তাই নয়, মানুষের অন্তর্চক্ষুটিও খুলে যাবে। মানুষে মানুষে যোগাযোগ বেড়ে যাবে। ফলে জ্ঞানভিত্তিক একটা সমাজ বিনির্মাণের দিকে দেশ এগিয়ে যাবে। মানবিক মুক্তি ও অত্যাবশ্যকীয়ভাবে উন্নয়ন ঘটতেই থাকবে। সেবা, পরিষেবার মানোন্নয়ন ঘটবে। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন সেটিই মনে করিয়ে দেয়। পদ্মা সেতু মানুষকে আইনের কাছে যাবার সুযোগকে প্রসারিত করবে, অধিকারকে নিজের মতো করে পাবার সুযোগকে ত্বরাণ্বিত করবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ঘুচিয়ে দেবে। শুধু মানুষকে তার জীবিকা নিয়েই নয়, জীবনকে নিয়েও ঘনিষ্ঠভাবে ভাবতে শেখাবে।
দেশে এখন আসলেই একশ ইদুরের শাসনের চেয়ে একটি সিংহের শাসন জরুরী। আমরা শেখ হাসিনার সেই সিংহ নেতৃত্বেরই প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি।
বিদেশীরা বন্ধু নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রভুর মতো আচরণ করেন। পদ্মাসেতুর ক্ষেত্রে তাদের প্রভুত্ববাদী আচরণ শেখ হাসিনার দৃঢ়তার কাছে ধুপে টিকে নি। তারা সাহায্য দেবার নাম করে দুর্নীতির অপবাদ দিয়ে আমাদের স্বপ্নভঙ্গ করতে চেয়েছিলো। কিন্তু পারে নি। পদ্মা সেতু তাই তাদের কাছেও একটি বিষ্ময়ের বিষ্ময়। জয়বাংলা। বিজয়ের মাসে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে দাঁড়িয়ে আমি শেখ হাসিনা সুযোগ্য নেতৃত্বের স্থায়িত্ব কামনা করছি। কেনোনা, আমরা যারা শুধু জীবিকা নয়, জীবনকেও ছেনে দেখতে চাই। বঙ্গবন্ধুর নামে শুধু ভাষ্কর্য স্থাপন করলেই শ্রদ্ধা প্রদর্শন বুঝায় না। তাকে আমরা যেনো বাজারে বিকাতে না যাই সেটিও লক্ষ্য রাখতে হবে। সারাদেশে অধিকহারে ডিজিটাল ইশকুল গড়ার মাধ্যমে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। বইপড়ার সংস্কৃতির বিকাশের জন্য প্রতিটি গ্রামে পাঠাগার স্থাপন করতে হবে। দেশের সংস্কৃতিকে গণমানুষের কাছে পৌছে দিতে হবে। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল যাতে বিকশিত হতে পারে সেলক্ষ্যে মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেতুবন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করতে হবে। দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে হবে। মানুষের মনোজাগতিক পরিবর্তনকে মৌলবাদ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে৷ সমকাম ও সমকামীতার সুতিকাগার মাদ্রাসাগুলোকে নিবিড় মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। বাদরকে লাই দিলে কি হয় সেটি শেখ হাসিনাকে এবং দেশপ্রেমিক মানবহিতৈষী জনগণকে ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের সকল অর্জনকে মৌলবাদের কাছে বিসর্জন দেয়া যাবে না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজো বিক্রি হয় নি। বরং সমুদ্রবিজয়ের মাধ্যমে আরেকটি বাংলাদশ আমরা পেয়েছি।

সাইফুর রহমান কায়েস
প্রধান সম্পাদক
শব্দকথা টোয়েন্টিফোর ডটকম

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১:৪৭ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত