ঘোষণা

পিতা পুত্রের একই গতিপথ

অনলাইন ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০ | পড়া হয়েছে 67 বার

পিতা পুত্রের একই গতিপথ

 

আওয়ামী লীগ নেতা হাজী মো. সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমকে গত সোমবার গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার বিলাসবহুল জীবনযাপনের নানা তথ্য খুঁজে পায়। তার ছিল ১২ জন দেহরক্ষী এবং সার্বক্ষণিক সঙ্গী থাকতো প্রায় ৩০-৪০ জন যুবক।

২০১৮ সালে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিম অসুস্থ হয়ে পড়লে তার সিংহাসনে আসীন হন তার ছেলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইরফান।

ইরফান সেলিম এবং তার এক দেহরক্ষী জাহিদুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইরফানের বিলাসবহুল জীবনযাপন সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ করেন তারা।

ইরফানের বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে তারা এমন একটি ব্যক্তিগত নজরদারি নেটওয়ার্ক পেয়েছেন যেখানে রয়েছে ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরা এবং চোরাচালানের মাধ্যমে আনা ওয়াকি-টকি। এসব ব্যবহার করে ইরফান তার ব্যবসার সাম্রাজ্য পর্যবেক্ষণ করতেন।

ইরফানের ১২ জন দেহরক্ষীর পাশাপাশি রয়েছে তাদের পরিবারের কাজে নিয়োজিত ৩০-৪০ জনের একটি গ্রুপ, যারা সব সময় তার সঙ্গে থাকতেন।

শুধুমাত্র গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা এবং তার চোখে ‘দেখতে স্মার্ট’দের দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ দিতেন ইরফান।

তার ল্যান্ড রোভার নিয়ে কোথাও যাওয়ার সময় সাধারণত তিন থেকে চার জন দেহরক্ষী সঙ্গে নিয়ে যেতেন এবং ধারণা করা হচ্ছে তারা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতেন। দেহরক্ষীরা একটি বিশেষ ব্রিফকেস এবং হাতকড়া সঙ্গে রাখতেন।

পিতার সহযোগিতায় বেড়ে ওঠা:

সূত্র জানায়, হাজী সেলিমের ভাগ্নে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হাজী মোহাম্মদ হাসান পিলু ডিএনসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন। সম্প্রতি তিনি হাজী সেলিমের কিছু সিদ্ধান্ত মানতে চাইছিলেন না। এরপরে হাজী সেলিম তার ছোট ছেলে ইরফানকে সর্বশেষ কাউন্সিলর নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পিলুর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করান।

এই বিষয়ে পিলুর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানিয়েছে, ইরফান তার ব্যবসায়ের কার্যক্রম এবং সাম্রাজ্যের ওপর নজরদারি করতে একটি ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কিং সিস্টেম এবং সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছেন।

কয়েক বছর আগে তিনি বিদেশ থেকে ওয়াকি-টকি হ্যান্ডসেট পাচার করে এনে চকবাজারের ১৬ তলা ভবন মদিনা আশিক টাওয়ারের ছাদে একটি টাওয়ার স্থাপন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই ওয়াকি-টকি ব্যবহার করে তিনি ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যোগাযোগ করতে পারতেন। এর ফ্রিকোয়েন্সি ভিন্ন হওয়ায় কেউ এগুলো সম্পর্কে জানতে পারেনি।

গত সোমবার ইরফানকে গ্রেপ্তারের অভিযানে উপস্থিত এক র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, তারা প্রায় ৩৮টি ওয়াকি-টকি হ্যান্ডসেট উদ্ধার করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে এগুলো তার সহযোগীরা ব্যবহার করত।

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ইরফানের বাকি দেহরক্ষীদের এখনও কোনও সন্ধান পাইনি।’

আশিক টাওয়ারের ছাদে ইরফানের একটি টর্চার সেল ছিল। কেউ তার নির্দেশ না মানলে সেখানে নিয়ে নির্যাতন করা হতো।

পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী জাহিদ হোসেন জানান, চকবাজারের বশির মার্কেটে তার সাতটি দোকান ছিল।

তিনি অভিযোগ করেন, ‘ঈদের ঠিক একদিন আগে ইরফানের লোকজন আমাকে ছাদে ডেকে টাওয়ারের একটি ঘরে ঢুকিয়ে জোর করে সই নিয়ে আমার প্রায় দুই কোটি টাকা দামের দোকান নিয়ে নিয়েছে।’

স্থানীয়রা জানান, ইরফান ছাদে আতশবাজি ফাটাতেন। তারা অভিযোগ করেন, ওই অঞ্চলে কোনও পরিত্যক্ত ভবন দেখলেই তা দখল করে নিতেন ইরফান।

তদন্তকারীরা দাবি করেছেন, ইরফানের বাসভবনে অভিযান চালিয়ে সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেকের নামের একটি তালিকা পাওয়া যায়। তালিকায় তাদের নাম রয়েছে যারা জমি ও সম্পত্তি দখল করতে ইরফানকে সহায়তা করতেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘অবৈধ কাজে সহযোগিতার বিনিময়ে ইরফান তাদের উপহার পাঠাতেন। আমরা এ বিষয়ে তদন্ত করছি।’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও মাদকদ্রব্য রাখার অভিযোগে ইরফান ও তার দেহরক্ষী জাহিদুলের বিরুদ্ধে চকবাজার থানায় দুটি মামলা করা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য রাখার দায়ে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ইতোমধ্যে ইরফানকে এক বছরের কারাদণ্ড এবং অবৈধভাবে ওয়াকি-টকি ব্যবহারের দায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। জাহিদুলকে অবৈধভাবে ওয়াকি-টকি ব্যবহারের জন্য ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইরফান ও জাহিদুলকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে হস্তান্তর করা হয়েছে।

রমনা বিভাগের উপকমিশনার এইচ এম আজিমুল হক জানান, নৌবাহিনীর কর্মকর্তার ওপর হামলার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ইরফানের ব্যক্তিগত সহকারী এবি সিদ্দিক দিপুকে তার টাঙ্গাইলের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।

দিপুকে সাত দিনের রিমান্ডে চেয়ে ঢাকার একটি আদালতে হাজির করা হয়েছিল। পরবর্তীতে দিপুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

বাংলাদেশ নেভির লেফটেনেন্ট ওয়াসিফ আহমেদ রাজধানীতে ইরফান ও আরও চার জনের বিরুদ্ধে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে মামলা করেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি) ইরফানকে তার কাউন্সিলর পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। এলজিডির উপসচিব এএনএম ফয়েজুল হকের সই করা আদেশে বলা হয়েছে যেহেতু ইরফানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে এবং তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাই তাকে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ অনুযায়ী বরখাস্ত করা হয়েছে।

এর আগে, এলজিডিকে এক চিঠি দিয়ে ইরফানের কারাদণ্ডের বিষয়ে জানায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত