ঘোষণা

ফেরা

| শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২০ | পড়া হয়েছে 98 বার

ফেরা

 

তেরেজা সোমা ডি কস্তা

দেশভাগের আগে থেকেই মধু ব্যাপারী আর জকু মাষ্টার কাজ করতেন করাচীতে। ছোট বেলার দুই বন্ধু জাহাজে করে একসাথে করাচীতে যেতেন একসাথে আসতেন। দুজনেই নাকী করাচীর কোন হোটেলে বাবুচি©র কাজ করতেন। দুজনের বন্ধুত্ব পরম্পরাগতভাবে তাদের ছেলেমেয়েদের উপরও বতা©ল। একই গ্রামে বাড়ি হওয়ায় এদের ছেলেমেয়েদের একে অপরের বাড়িতে যাতায়াতে কে যে কার সন্তান তা যেন বুঝাই দায়। তবে এ রসায়নে প্রবল বাuধা বিপত্তি ঘটলো ১৯৬৭ সনে জকু মাষ্টার তার দুই ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে দিল্লিতে পাড়ি জমালে পর। সেখানেই নিজে ও ছেলেরা বিস্তর পরিশ্রম করে বাড়ি করলেন, ছেলেমেয়েদের বিয়েসাদি করালেন। আর দেশের সম্পত্তি তিনি মুখে মুখে দিয়ে গেলেন বন্ধু মধু ব্যাপারীকে। এদিকে মধু ব্যাপারীরও তিন ছেলে দুই মেয়ে। তিনি বন্ধুর দেয়া সম্পত্তি ভোগ করে তা আবার নিজের ছেলেদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন।
সে অনেক বছর আগের কথা। এখন আর জকু মাষ্টারও নেই মধু ব্যাপারীও নেই। তাদের ছেলেমেয়েরা বিয়েসাদি করে যার যার মতো সংসার সংন্তান নিয়ে ব্যস্ত।
মধু ব্যাপারীর ছেলে টমাস গমেজের একমাত্র মেয়ে চন্দ্রা। টমাসের আরো দুই ছেলে আছে। চন্দ্রা সবে এইসএসসি পরীক্ষা লিখে কলেজের পাশেই এক সেন্টারে ইংলিশ কোসে© ভতি© হয়েছে। সেদিন ইংলিশ কোস© করে একাই বাড়ি ফিরছিল। বাস থেকে নামতেই রাস্তায় দেখা হলো অপরিচিত দুজন ভদ্রলোকের সাথে। একজনের বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি হবে আরেকজনের বয়স ত্রিশও হতে পারে আবার চল্লিশও হতে পারে। চোখে স্নাসগ্লাস। বয়স্ক লোকটি চন্দ্রাকে ডেকে বললেন, Òএই যে মামনি তোমার নাম কি?Ó
Òআমার নাম চন্দ্রাÓ
Òশ্যামপুর গ্রামটা কোন দিকে বলতে পারো?Ó
Òহ্যাu আমি সেখানেই যাচ্ছি । আমার সাথে যেতে পারেন। আপনারা কি এখানে প্রথম এলেন?Ó
Òহ্যাu । প্রথমই বলতে পারো। তোমার বাড়ি শ্যামপুরে?Ó
Òহ্যাu।Ó
Òকোন বাড়ি? তোমার বাবার নাম কি?Ó
Òনাম বললে আমার বাবাকে আপনি চিনবেন?Ó
তিনজনেই হাuটতে লাগলো। বয়স্ক লোকটি মেয়েটির কথায় খুব আগ্রহ পেলেন। তবে চোখে স্লানগ্লাস পরা লোকটি কিছুই বলছেন না। বারে বারে রুমাল দিয়ে কপাল মুছছেন।
মেয়েটি বললো, Òব্যাপারী বাড়ি। আমার বাবার নাম টমাস গমেজ।Ó
Òটমাসের মেয়ে তুমি?Ó
Òআপনি আমার বাবাকে চেনেন?Ó
Òচিনি না মানে। ছোটবেলায় তোমার জ্যাঠাদের সাথে সারাটা দিন কাটিয়েছি। তোমার বড় জ্যাষ্ঠা অনিল আমার বাল্যবন্ধু। তোমার বাবা তো তখন একেবারে পিচ্চি। ওকে খেলা নিতে চাইতাম না বলে কেuদেকেটে সেকি কান্ড।Ó
Òসত্যি! আপনার নাম কি?Ó
Òআমার নাম রমেশ মাষ্টার। আমরা দিল্লি থেকে এসেছিÓ
Òদিল্লি থেকে!Ó
Òহ্যাu ও আমার ছেলে। বাংলা বলতে পারে না।Ó
Òতাই বুঝি!Ó
Òগ্রামের কত পরিবত©ন হয়েছে। সেই পuয়তাল্লিশ বছর আগে কেমন ছিল আর এখন কত উন্নত হয়েছে।Ó
কথা বলতে বলতে ওরা বাড়ির কাছে চলে এলো।
চন্দ্রা বললো, Òআপনারা কোন বাড়িতে যাবেন?Ó
Òআমাদের তো বাড়িঘর আর কিছু নেই। তোমার সাথে না হয় তোমাদের বাড়িতেই যাই।Ó
Òআমাদের বাড়ি?Ó
Òনা থাক, তোমার জ্যাঠার বাড়ি নিয়ে চলো।Ó
চন্দ্রা অতিথিদের জ্যাঠার বাড়ি পৌuছে দিয়ে বললো, Òআমাদের বাড়ি পাশেই। আসবেন কিন্তু।Ó
টমাসের শরীরটা ভাল না। কয়েক মাস যাবৎ বিছানায়। চাকরীবাকরিও নেই। মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। দুই ছেলে এখনও স্কুলে যায়। ছেলেরা কবে সংসারের হাল ধরে কে জানে। নানান চিন্তায় টমাস আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মেয়ের কাছে রমেশের আগমনের কথা শুনে টমাসের বুকের ভেতরটা এক অজানা শংকায় কেuপে উঠে।
এদিকে অনিল ছেলেবেলার বন্ধুকে প্রথম দেখায় চিনতে না পারলেও একে একে সব স্মৃতি মনে পড়ে যায়। রমেশ আর অনিল দুই বন্ধু মিলে খুব আড্ডা দেয়।
রমেশের ছেলের নাম রোহিত। বাংলা কিছুই বুঝে না। রমেশের স্ত্রী দিল্লির মেয়ে। হিন্দিতে কথা বলে। তাই রোহিতের বাংলা শেখা হয় নি। বাংলাদেশে এসে কারো সাথেই রোহিতের কথা হয় না হাসি বিনিময় ছাড়া। তবে চন্দ্রা অধে©ক ইংরেজিতে অধে©ক ভুলভাল হিন্দিতে রোহিতের সাথে কথা বলে। চন্দ্রা রোহিতকে পুরো গ্রাম ঘুরে দেখালো। তাদের কলেজে নিয়ে গেল। চন্দ্রার এই স্বতস্ফুত©তা, উচ্ছলতা রোহিতের খুব ভাল লাগে। এক সময় রোহিতের সাথে চন্দ্রার খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
দিন সাতেক সব কিছুই ভাল কাটছিল। সমস্যার সৃষ্টি হলো যখন রমেশের বাংলাদেশের আগমনের হেতু জানা গেল। রমেশ দেশে এসেছেন বাপের সম্পত্তি উদ্ধারের উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশ সরকার নাকী Ôঅপি©ত সম্পত্তি প্রত্যাবত©ন আইন জারিÕ করেছেন। সেই সূত্র ধরেই পuয়তাল্লিশ বছর পরে রমেশের স্বদেশের মাটির কথা মনে পড়েছে।
যে কারণে রমেশের আগমনের বাতা© শুনে টমাসের বুকটা কেuপে উঠেছিল সেই আতঙ্কটাই সত্যি হলো। মধু ব্যাপারীর পাuচ ছেলেমেয়ে আলোচনায় বসেন। অভাগা যেদিকে যায় নদীও নাকি সেদিকে শুকিয়ে যায়। তাই দেখা গেল জকু মাষ্টারের সম্পত্তির উপরেই টমাসের ঘর। ভাগে যে জেমি পেয়েছে তাও জকু মাষ্টারের সম্পত্তি। ভাইয়েরা কেউই এই ব্যাপারে কিছু করতে পারবেন না জানিয়ে দিলেন। তাই যদি কিছু ছাড়তেই হয় তবে ছাড়তে হবে টমাসকে তার পুরোটাই। অন্যান্য ভাইদের কাছ থেকে ছাড় যাবে অল্পবিস্তর। মরার উপর খাড়ার ঘা যাকে বলে। টমাস চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলেন। কি করে তিনি রমেশের F…ণ শোধ করবেন!
চন্দ্রা রোহিতকে বললো, Òআপনার বাবা কেন এখানে এসেছেন আপনি জানেন?Ó
Òআসার আগে জানতাম না এখন জেনেছিÓ
Òআপনি তো আমাদের অবস্থা দেখছেনই। সম্পত্তি দিতে না পারলে আপনার বাবা আমার বাবার কাছে পনের লাখ টাকা দাবী করেছেন। সেটা জানেন? Ó
Òশুনেছি।Ó
Òআপনাদের সম্পত্তি কিংবা টাকা দেওয়ার মতো অবস্থা আমাদের যে নেই সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন?Ó
Òহ্যাu সেটাও আমি বুঝতে পারছি।Ó
Òআমার বাবা অসুস্থ। আমাদের সংসার কোন রকমে চলছে। আপনাদের এই দাবী যে আমাদের জন্য কতটা হতাশার। আপনাকে আমি বোঝাতে পারবো না। Ó
Òচন্দ্রা বিশ্বাস করো আমি এসেছি শুধু একবার আমার দাদার দেশ-বাড়ি নিজের চোখে দেখতে। এই সম্পত্তির উপর আমার কোন লোভ নেই। আমি বাবার সাথে একমত নই।Ó
Òআপনি কি পারেন না আপনার বাবাকে বোঝাতে? আপনার বাবার এই দাবীতে আমাদের যে ঘর ছাড়া হতে হবে, আমার ভাইদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে। আর আমার বাবা সেই শোকে মরে যাবেনÓ বলেই চন্দ্রা কান্না করতে করতে চলে গেল।
রোহিতের মনটা বিষন্নতায় ভরে গেল। এতদিন যে উচ্ছল-চঞ্চল চন্দ্রাকে সে দেখেছে আজ সেই চন্দ্রা যেন সম্পূণ© উল্টো। এই চন্দ্রা যেন এক কত©ব্যপরায়ন মেয়ে, দায়িত্বশীল বোন।

পরের দিন রমেশ মাষ্টার বন্ধু অনিলকে প্রস্তাব দিলেন তিনি চন্দ্রাকে তার ছেলের জন্য পছন্দ করেছেন। এ প্রস্তাবে যদি টমাস রাজী থাকেন তো তিনি সম্পত্তি আর দাবী করবেন না। প্রস্তাবে অনিলসহ তার আরো তিনভাইবোন যারপর নাই খুশি হলেও টমাস গমেজ খুশি হলেন না। একে তো ছেলের বয়স বেশী প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি তার উপর ছেলে বাংলা বলতে পারে না। তার এইটুকু মেয়েকে বিয়ে করে কোথায় কোন প্রান্তে নিয়ে যাবে। সে আর কোনদিন দেখতে পাবে কি না কে জানে। তিনি রাজি নন। অনিল ব্যাপারী চন্দ্রাকে ডেকে প্রস্তাবের কথা জানালেন। চন্দ্রার বাবা ছাড়া চন্দ্রার অন্যান্য জ্যাঠাপিসিরা এই প্রস্তাবে রাজি সে কথা জানাতেও ভুললেন না। চন্দ্রা অবাক হলো জ্যাঠার কথা শুনে।
বললো, Òজ্যাঠা আজ যদি আপনাকে সম্পত্তি ছাড়তে হতো বা সম্পত্তির বিনিময়ে আপনার মেয়েকে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হতো আপনি কি রাজি হতেন?Ó
Òচন্দ্রা সমস্যাটা যদি আমাদের হতো তবে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হতো। এখন যেহেতু সমস্যাটা তোদের তাই তোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তোর বাবার বাuচা-মরা, ভাইদের লেখাপড়া সব তোর উপর নিভ©র করছে। তুই যদি এভাবে বেuকে বসে থাকিস তখন তোদের তো রাস্তায় গিয়ে দাuড়াতে হবে। তোরা যে বিপদে পড়েছিস এর চেয়ে ভাল সমাধান কি আর হয়।Ó
চন্দ্রা রাগে, দুtখে-কষ্টে, অপমানে শেষে রাজি হয়ে গেল। কথা হলো ডিসেম্বরে আবার তারা আসবে এবং বিয়ে করে চন্দ্রাকে নিয়ে যাবে। সে বছরই ডিসেম্বর মাসে রমেশ মাষ্টার দেশে এসে রোহিতের সঙ্গে চন্দ্রার বিয়ে দিয়ে চন্দ্রাকে দিল্লি নিয়ে গেলেন।
চন্দ্রার স্বামী রোহিত এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। চন্দ্রার প্রতি তিনি যথেষ্ট কেয়ারিং তবে তিনি তার ভালবাসার কথা মুখফুটে বলতে পারেন না। চন্দ্রা খেল কি-না, চন্দ্রার কখন কি লাগবে সব দিকেই তার খেয়াল। তবে কারণে-অকারণে খুনশুটি করা, অভিমান করা, যখন তখন চন্দ্রাকে নিয়ে ঘুরতে বের হওয়া এসবে তার কোন আগ্রহ নেই। চন্দ্রাকে নিয়ে তিনি শপিংয়ে যান না। চন্দ্রার হাতে টাকা দিয়ে বলবেন দিদির সাথে শপিংয়ে যেও। সময় পেলে তিনি বইয়ে মুখ গুজে পড়ে থাকেন। চন্দ্রার জন্যও ইংলিশ আর হিন্দি বই কিনে আনেন। চন্দ্রার জন্য তিনি হিন্দি শিক্ষিকা রেখে দিয়েছেন। চন্দ্রা ঘরে হিন্দি শিখে।
চন্দ্রা আবার পুরোই তার উল্টো প্রকৃতির। হাসি-খুশি-প্রানবন্ত। তবে রোহিতের কাছে এসে চন্দ্রা তার আগের সেই পুরোনো জীবন সম্পূণ© ত্যাগ করে রোহিতের মতোই যেন সাদাসিধে হয়ে যাচ্ছে। এখন আর চন্দ্রা হিন্দি মুভি দেখে না, কবিতা আবৃত্তি করে না, যখন তখন গলা ছেড়ে গান গায় না। রোহিতকে ঠিক ভালবাসতে না পারলেও চন্দ্রাকে চন্দ্রার পরিবারকে বিশাল এক বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে বিধায় রোহিতের প্রতি চন্দ্রার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। রোহিতকে চন্দ্রা শ্রদ্ধা করে। বিয়ের পরের বছরই চন্দ্রার কোল জুড়ে ফুটফুটে এক ছেলের জন্ম হলো। চন্দ্রার জীবনটা যেন আবার কলোরবে ভরে উঠলো।
চন্দ্রার ছেলে এবার দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভতি© হয়েছে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে বলে রোহিত আর চন্দ্রা ছেলের সাথে বেশীরভাগ সময় ইংরেজীতে কথা বলে। চন্দ্রার ইচ্ছে করে ছেলেকে একটু বাংলা শেখাতে। কিন্তু ছেলেটা ইংলিশ বলার পর যেটুকু সময় পায় বাংলার চেয়ে হিন্দিতে কথা বলতেই যেন স্বাচ্ছন্দবোধ করে। তবে চন্দ্রা সময় পেলেই ছেলের সাথে একটু আধটু বাংলায় কথা বলে।
এতদিন চন্দ্রা ছেলেকে নিয়ে সারাটা দিন ব্যাস্ত থেকেছে। কিন্তু ছেলেকে স্কুলে ভতি© করানোর পর থেকেই চন্দ্রার সারাটা দিন একা একা কাটে। বিশেষ করে সকাল সাতটা থেকে সেই দুপুর বারোটা পয©ন্ত চন্দ্রা সম্পূণ© একা। এসময় চন্দ্রা একটা ফেসবুক একাউন্ট খুললো। ফিরে পেল অনেক পুরোনো বন্ধুকে। অনেকে বাংলাদেশে থাকে অনেকে আবার ইউরোপ-আমেরিকাতে। ছেলেকে স্কুলে দিয়ে এসে চন্দ্রা এখন তার স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাটিং করে, কথা বলে এভাবে বেশ চলছিল।
একদিন হঠাৎ চন্দ্রা অজু©ন নামে একটা আইডি থেকে রিকোয়েষ্ট পেল। চন্দ্রার খুব বেশী বন্ধু নেই। অজানা এই আইডি থেকে রিকোয়েষ্ট পেয়ে চন্দ্রা এমনেই রেখে দিল। বেশ কিছুদিন পর চন্দ্রার কোন বন্ধু লাইনে নেই বলে চন্দ্রা অজু©নের আইডিটি ঘুরে দেখলো।
ছেলেটি কবিতা লিখে। পুরো ওয়াল জুড়ে কবিতা। প্রেমের কবিতা, দেশের কবিতা, গ্রামের কবিতা- চন্দ্রার মনে হয় এসব কবিতা যেন তার ফেলে আসা বাংলাদেশের কবিতা, তার গ্রামের কবিতা। কয়েকটি কবিতা চন্দ্রার খুব ভাল লাগে। চন্দ্রা কবিতাগুলো পড়তে থাকে মনে মনে। বেশ কয়েকদিন পর চন্দ্রা আবার অজু©নের আইডিতে ঢুকে দেখে নতুন বেশ কতগুলো কবিতা আপলোড করা হয়েছে। এবার চন্দ্রা কবিতাগুলো সেভ করে রাখে। যখনই একা থাকে গলা ছেড়ে আবৃত্তি করে। একসময় চন্দ্রার মনে হলো অজু©নকে সে তার ফ্রেন্ডলিষ্টে যুক্ত করবে। চন্দ্রা অজু©নকে বন্ধু করে নেয়। সাথে সাথেই অজু©নের ম্যাসেজ এলো –
Òকেমন আছেন?Ó
চন্দ্রা কোন উত্তর দিলো না। তারপরদিন ভোরে আবার ম্যাসেজ Òশুভ সকালÓ। এবারও চন্দ্রা কোন উত্তর দিলো না। কিন্তু চন্দ্রা অজু©নের প্রত্যেকটি কবিতা ঠিকই দেখে ঠিকই একা একা আবৃত্তি করে।
Òআমাকে আপনি বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। উত্তর দিচ্ছেন না যে। কেমন বন্ধু আমরা বলুন তো?Ó
চন্দ্রা Òশুভ সকালÓ লিখেই ইন্টারনেট অফ করে রাখলো।
পরেরদিন আবার Òশুভ সকালÓ ম্যাসেজ এলো।
এবার চন্দ্রা উত্তর দেয়।
এভাবেই অজু©নের সাথে চন্দ্রার বন্ধুত্ব শুরু হলো। বন্ধুত্ব গভীর হলে অজু©ন জানতে চাইলো কেন চন্দ্রা ভিনদেশী ছেলেকে বিয়ে করেছে? চন্দ্রা সবাইকে বলতো রোহিতকে সে ভালবেসে বিয়ে করেছে। কিন্তু এই প্রথম কাছের বন্ধু অজু©নকে রোহিতের সঙ্গে তার বিয়ের আসল ঘটনাটা বললো।
রোহিত বললো, Òচন্দ্রা তুমি তো দেবীÓ
Òমানে?Ó
Òদেবী না হলে কেউ এত বড় ত্যাগস্বীকার করতে পারে? জানো আমার ইচ্ছে করছে তোমার পা ছুuয়ে প্রনাম করি।Ó
Òকি বলছো এসব?Ó
Òসত্যি চন্দ্রা। তোমার মা রত্নাগভা। তোমার মতো একজন দেবীকে তিনি গভে© ধরেছেন। তার প্রতিও আমি প্রনাম জানাচ্ছি চন্দ্রাÓ
এরপর একদিন অজু©নের ম্যাসেজ আসে Ôচন্দ্রা আমি তোমাকে ভালবাসিÕ। নিজের ভাষায় ÔভালবাসিÕ কথাটা কোনদিন শুনেনি চন্দ্রা। অজু©নের লেখা ÔভালবাসিÕ শব্দটার প্রতি চন্দ্রা প্রচন্ড রকম দূব©ল হয়ে পড়লো। Òআমি তোমাকে জীবনের চেয়েও ভালবাসি চন্দ্রাÓ বাক্যটা যে এত মধুরময়, এতে যে এত মাদকাতা লুকিয়ে আছে তা আগে চন্দ্রার জানা ছিল না। চন্দ্রা অজু©নের চেয়ে অজু©নের লেখা ম্যাসেজগুলোর প্রতি প্রেমে পড়ে গেল। Òতোমাকে আমি ভালবাসবো জন্ম-জন্মান্তরÓ একরকম করে যে আর কেউ কখনও তাকে বলে নি। চন্দ্রা প্রতিদিন অপেক্ষা করে অজু©নের ম্যাসেজের। সেও ছোট্ট করে উত্তর দেয়। এভাবেই শুরু –
চন্দ্রার স্বামী সকালে সাড়ে ছয়টায় অফিসে চলে যায়। চন্দ্রা তার ছেলেকে স্কুলে দিয়ে ঠিক সাতটায় বাসায় ফেরে। ইন্টারনেট অন করেই দেখে অজু©নের ম্যাসেজ Ôশুভ সকালÕ। অজু©ন অনলাইনেই থাকে। অপেক্ষা করে কখন চন্দ্রা আসবে লাইনে। এরপর দুজনের সুন্দর কিছু মূহুত©-
কিছুদিন শুধুই ম্যাসেজ বিনিময়। এরপর অডিও কল, ভিডিও কল। চন্দ্রার কন্ঠ প্রথম শুনে অজু©ন যেন মাতাল হয়ে গিয়েছিল। এর আগে নাকি অজু©ন এত মধুর কন্ঠ শুনেনি। অজু©নের মুখে নিজের প্রশংসা শুনে চন্দ্রা পুলকিত হয়েছিল। চন্দ্রার মধুর কন্ঠ না শুনলে যেন অজু©নের দিন শুরু হতে চায় না। চন্দ্রা ছবি না পাঠালে অজু©ন অভিমান করে সে ঘুম থেকেই উঠবে না। দুÕজনের মধ্যে কত না খুনসুটি, কতনা মধুময়তা।
চন্দ্রা নিজের স্বামী-সন্তান-সংসার ভুলে অজু©নকে পাগলের মতো ভালবাসে ফেলে। অজু©ন চন্দ্রাকে নিয়ে নতুন করে সুখের সংসার সাজনোর প্রস্তাব দেয়। অজু©ন চন্দ্রার জন্য সব ছাড়তে রাজি বাবা-মা, সমাজ, ধম© সব। সে শুধু চন্দ্রাকে চায়, চন্দ্রার ভালবাসা চায়। চন্দ্রাকে পেলেই তার জীবন স্বাথ©ক। কিন্তু চন্দ্রা রাজি হয় না। কারণ চন্দ্রা তার স্বামীর কাছে F…ণি। চন্দ্রা সামাজিক, পারিবারিক, ধমী©য় ও নৈতিক মূল্যবোধের কাছে দায়বদ্ধ। সে পারবে না সব ছেড়ে অজু©নের সাথে আবার নতুন করে শুরু করতে।
অজু©ন বলে, Òচন্দ্রা থাক তোমাকে আমার জন্য কিছু ছাড়তে হবে না। তুমি শুধু আমাকে এভাবে ভালোবেসো তাতেই হবে।Ó
একদিন বিকেলে চন্দ্রার ছেলে ঘুমে, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি, অজু©ন চন্দ্রাকে ফোন করে। সেদিন ভিডিও কলে শুধুমাত্র চন্দ্রার মুখ দেখেই অজু©নের সাধ মিটে না। অজু©ন আরো কিছু দেখতে চায়, চন্দ্রার দেহের ভাuজ। এমন প্রস্তাব শুনে চন্দ্রা অজু©নের উপর রাগ করে ফোন কেটে দেয়। চন্দ্রা রাগে, লজ্জায়, অপমানে কান্না করতে থাকে। এরপর থেকে অজু©ন আর চন্দ্রার সাথে কোন যোগাযোগ করে না।
এভাবেই চললো প্রায় তিনদিন। এদিকে অজু©নের বিরহে চন্দ্রা অসহায় হয়ে পড়ে। সে অজু©নের সাথে একটু কথা বলার জন্য পাগল হয়ে উঠে। কিন্তু অজু©ন চন্দ্রার কোন খোuজখবর নেয় না। শেষে আর থাকতে না পেরে চন্দ্রাই অজু©নের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অজু©ন বুঝতে পারে আর যাই হোক চন্দ্রার সাথে সম্পক© করে সে তার স্বাথ© উদ্ধার করতে পারবে না। তাই চন্দ্রা যোগাযোগ করলেও অজুন© আর সেই আগের অজু©ন থাকে না।
এখন চন্দ্রা দশটা ম্যাসেজ লিখলে অজু©ন একটার উত্তর লিখে হ্যাu অথবা না। কিংবা শুধুমাত্র লাইক বাটনটা টিপে রাখে। এখন অজু©ন আর চন্দ্রার ছবি চায় না। চন্দ্রাকে ফোন করে না। চন্দ্রার ভালবাসাকে অজু©নের ন্যাকামী মনে হয়। চন্দ্রা বুঝতে পারে অজু©নের পরিবত©ন। চন্দ্রা অজুনকে অনুযোগ করে ম্যাসেজ লিখলো, Òকেন আমায় অবহেলা করছো?Ó
অজু©নের উত্তর আসে, Òতোমাকে আমি অবহেলা করি- এই মিথ্যে কথা শুনতে আমার ভাল লাগে না। তোমার যদি মনে হয় আমি সত্যি তোমাকে অবহেলা করছি তবে প্লিজ আমার সাথে আর যোগাযোগ করো না।Ó
Òঅজু©ন আমি তোমাকে ভালবাসি তাই তুমি যোগাযোগ না করলে ভয় হয় এই বুঝি আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলবো। এবার তুমি বলো আমি কি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবো?Ó
Òনা করো না প্লিজ। দরকার হলে আমিই করবোÓ
অজু©নের এমন উত্তরে চন্দ্রার সাজানো পৃথিবীটা যেন এক নিমিষেই দুমরে মুচরে ভেঙ্গে যায়। চন্দ্রার বুকের পাজরগুলো একটা একটা করে ভেঙ্গে যেতে থাকে। চোখের জল চন্দ্রার নিত্য সঙ্গি হয়ে উঠে।
চন্দ্রা দেখে অজুন© অনলাইনেই থাকে কিন্তু চন্দ্রাকে কোন ম্যাসেজ দেয় না। চন্দ্রার খুব ইচ্ছে করে অজু©নের সাথে একটু কথা বলতে, অজু©নের একটা ম্যাসেজ পেতে কিন্তু অজু©ন যে তাকে যোগাযোগ বারণ করেছে।
পরের দিন চন্দ্রা লিখলো, Òঅজু©ন তোমার সঙ্গে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে।Ó
অজু©ন ফোন দিল।
Òকেমন আছো অজু©ন?Ó
Òভাল না জ্বর আসছে।Ó
Òডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে?Ó
হঠাৎ রেগে গিয়ে অজু©ন বলে, Òডাক্তারের কাছে যাব কেন? আমি কি রোগি? জ্বর মানুষের হয় না? জ্বরের জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হয় যত্তসব। ফোন করতে বলছো কেন?Ó
অজু©নের কথা শুনে চন্দ্রার চোখ দিয়ে দরদর করে জল ঝরতে থাকে।
Òকথা বলো না কেন?Ó
চন্দ্রা কিছু একটা বলতে চায় কিন্তু চন্দ্রার গলা দিয়ে কোন স্বর বের হয় না। কেমন যেন একটা কষ্টের দলা গলায় আটকে থাকে। চন্দ্রা দলাটাকে নীচে নামানোর জন্য ঢোক গিলে কিন্তু নামে না।
Òকথা বলবে না তো ফোন করতে বলেছো কেনÓ বলেই অজু©ন ফোনটা কেটে দেয়।
চন্দ্রার সাজানো পুরো পৃথিবীটা যেন এক নিমিষেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। অজু©ন যে তার ব্যবহারে চন্দ্রাকে সব বুঝিয়েই দিয়েছে। অজু©ন হারিয়ে যায় চন্দ্রার পৃথিবী থেকে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলেও চন্দ্রা অজু©নকে ভুলতে পারলো না। প্রতিদিন প্রতিক্ষণে সে মনে মনে অজু©নকে খুuজে বেড়ায়। অপেক্ষায় থেকে থেকে চন্দ্রা নিজেকে শক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। অভিমানে একদিন সে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় ফলে সব স্যোস্যাল মিডিয়া থেকে দূরে চলে যায় চন্দ্রা। স্বামী, সন্তান আর সংসারের প্রতি মনোযোগী হতে চেষ্টা করে। এত কিছুর পরেও অজু©নই গোপনে তার সাধনার পুরুষ থেকে যায়। মনে মনে সে অজু©নকেই পূজা করতে থাকে। এক সময় ধীরে ধীরে চন্দ্রা বিষ্ণন্নতায় ডুবে যেতে থাকে। এখন চন্দ্রার বাগানে আর ফুল ফুটে না। অযত্নে অবহেলায় ফুলের গাছগুলো শুকিয়ে মরে গেছে। গাছের ফলগুলো পেকে মাটিতে পড়ে যায় কেউ তার খবর রাখে না। চন্দ্রার ছেলের পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ থেকে খারাপ হয়। ঘটে যায় চন্দ্রার জীবনে আরো অনেক ঘটনা।
প্রায় বছর খানেক পরের কথা। চন্দ্রার ফোনের ইন্টারনেট এতদিন বন্ধ ছিল। গত পরশু থেকে ওয়াইফাই লাইন পেয়ে ম্যাসেঞ্জারে চন্দ্রাকে এ্যাকটিভ দেখা গেল। সকালে এক অচেনা নম্বর থেকে ম্যাসেঞ্জারে ফোন আসে। চন্দ্রার ছেলে জয় ফোন রিসিভ করলো।
Òহ্যালো, কে বলছেন?Ó
Òআমি কি চন্দ্রার সাথে কথা বলতে পারি?Ó
Òমা তো বাসায় নেই।Ó
Òজয় কেমন আছো? তুমি আজ স্কুলে যাও নি?Ó
Òআমরা তো এখন বাংলাদেশে নানার বাড়ি বেড়াতে এসেছি Ó
Òতোমার মা কোথায়?Ó
Òজয় কাuদতে লাগলোÓ
Òকাuদছো কেন জয়?Ó
Òমাকে কাল হাসপাতালে রেখে এসেছি।Ó
Òকেন কি হয়েছে তোমার মায়ের?Ó
Òসবাই বলছে আমার মা নাকি পাগল হয়ে গেছেÓ
Òকোন হাসপাতালে আছে তোমার মা?Ó
Ò জায়গাটার নাম পাবনাÓ
Òপাবনা?Ó
Òহ্যাu পাবনার হেমায়েতপুরÓ
Òতোমার বাবা কোথায়?Ó
Òআমরা তো মাকে হাসপাতালে রেখে আগামীকাল ইন্ডিয়া চলে যাব। তাই আজ বাবা গেছে আবার মাকে দেখতেÓ
Òকেuদোনা জয়। তুমি চিন্তা করো না। তোমার মা ভাল হয়ে আবার তোমাদের কাছে ফিরে যাবে।Ó
Òসত্যি বলছেন আঙ্কেল?Ó
Òহ্যাu সত্যি। মানুষের অসুখ হয় না? ডাক্তার দেখালে ওষুধ খেলে ভাল হয়ে যাবে।Ó
Òকিন্তু সবাই যে বলছে আমার মা পাগল। সত্যি কি আমার মা পাগল আঙ্কেল?Ó
অজু©ন চুপ করে রইলো। এই প্রথম হয় তো চন্দ্রার জন্য অজু©নের চোখদুটো ভিজে উঠেছিল।
চন্দ্রা শুধু বাংলায়ই বিরবির করে কথা বলছে। তাই ইন্ডিয়ার ডাক্তাররা বাংলায় কথা বলতে পারবে এমন পরিবেশে রেখে চিকিৎসা করার পরামশ© দিয়েছেন।পরের দিন অজু©ন গেল হেমায়েতপুরে। অনেক খোuজ-খবর নিয়ে চন্দ্রাকে খুuজে বের করলো। এক বছর আগে ভিডিও কলে দেখা সেই চন্দ্রা আর আজকের চন্দ্রার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান।
অজু©ন বললো, Òকেমন আছো চন্দ্রা?Ó
চন্দ্রা অনেকক্ষণ অজু©নের দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেল। হয় তো অজু©নকে চিনতে পারে নি চন্দ্রা।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১২:৫৫ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

বিটলবণের স্বাদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

জোছনায় কালো ছায়া

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০