ঘোষণা

ফ্রান্সের পণ্য বয়কট ও বাংলাদেশ সমাচার

সাইফ নাসির | বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০ | পড়া হয়েছে 69 বার

ফ্রান্সের পণ্য বয়কট ও বাংলাদেশ সমাচার

সম্প্রতি মহানবীকে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করায় ফ্রান্সের পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে মুসলিম বিশ্ব।মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের মানুষও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ ইতিমধ্যে ফ্রান্সের পণ্য তাদের সুপার শপগুলো থেকে সরিয়ে নিয়েছে।

বাংলাদেশেও ইসলামী কিছু দল ও গোষ্ঠি এবং স্যোশাল মিডিয়ায় সাধারন অনেক মানুষও ফ্রান্সের পণ্য বর্জনের পক্ষে কথা বলছেন।

কিন্তু এই দাবী ও প্রচারণার ফলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প এবং ফ্রান্সে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিরা হুমকির মুখে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন দেশের অনেক ব্যবসায়ী এবং অনেক ফ্রান্স প্রবাসী। যা নিয়ে ভাববার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন , আমাদের দেশ যদি ফ্রান্সের পণ্য বর্জন করে তবে ফ্রান্সের কোন ক্ষতি বা আমাদের কোন লাভ আছে কিনা।

উত্তরটি হচ্ছে বাংলাদেশে ফ্রান্সের পণ্য বর্জন হলে তাদের তেমন কিছু আসবে যাবে না। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় যদি ফ্রান্স বাংলাদেশের পণ্য বর্জন করে তবে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে বড় ধরণের বিপর্যয় নেমে আসবে।

১৯৭৭ সালে ফ্রান্সে ১০ হাজার পিস শার্ট রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিলো। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশের মোট তৈরী পোশাকের প্রায় অর্ধেক (৫১ শতাংশ) আমদানি করে ইউরোপের দেশগুলো। আর ইউরোপের সবচেয়ে বড় তিন ক্রেতা দেশ হচ্ছে যথাক্রমে জার্মানী, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এছাড়া বুলগেরিয়া, ডেনমার্ক ও পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশ ফ্রান্সের মাধ্যমেই বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি শুরু করেছিলো। তবে বর্তমানে তারা জার্মানিকে ভায়া হিসেবে বেছে নিয়েছে। এখানেও প্রতিবছর বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমান ৮ ভাগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ফ্রান্সে বাংলাদেশের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। টাকায় এর পরিমান প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু করোনার কারণে এ বছর রপ্তানী ঠেকে ১.৭ বিলিয়ন ডলারের। তবুও ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাকের তৃতীয় আমদানীকারক দেশ হচ্ছে ফ্রান্স। এছাড়া হিমায়িত খাদ্য, পাটজাত পণ্য, বাইসাইকেল, চিংড়ি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সবজি ও গ্রোসারি আইটেম রপ্তানি করে বাংলাদেশ। সেখান থেকেও যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ফ্রান্সের পণ্য বলতে মূলত রাসায়নিক, সুগন্ধি, প্রসাধনসামগ্রী, ফার্মাসিটিক্যালস ও কৃষিভিত্তিক পণ্য আমদানি হয়। যার আমদানী মূল্য তৈরী পোশাক রপ্তানী আয়ের তুলনায় যৎসামান্য। তাই এই মুহুর্তে ফ্রান্সের পণ্য বর্জন করলে ফ্রান্সের চেয়ে বাংলাদেশেরই ক্ষতি বেশি।

মধ্যপ্রাচ্যের যে দেশগুলো ফ্রান্সের পণ্য বর্জন করেছে তারা কোন শিল্পে এককভাবে ফ্রান্সের ওপর নির্ভরশীল নয়। এছাড়া এই বর্জনের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক খেলাও রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশে এক শ্রেনীর আন্দোলনকারী ফ্রান্সের পণ্য বয়কটের পাশপাপাশি ফ্রান্সের দূতাবাস ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও পালন করেছেন। বিষয়টি ফ্রান্সে অবস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্যও বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যে কোন কর্মসূচি দেয়ার আগে তার প্রতিফল সম্পর্কে ধারণা থাকা ও দ্বায়ীত্বশীল আচরণ করা বাঞ্চনীয়।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরিণ বিনিয়োগ ও জাতীয় উন্নয়নের দেশটির যথেষ্ট অংশগ্রহণ রয়েছে। চট্টগ্রামের তেল শোধনাগার ও ইস্টার্ন রিফাইনারির পর নতুন রিফাইনারি বানানোর জন্য ফ্রান্সকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে ফ্রান্স। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রজেকটাইল ও দেশের মোবাইল প্রযুক্তিতে সহায়তাকারী দেশ ফ্রান্স।

এলপিজি গ্যাস, ওষুধ ও প্রযুক্তিখাতে ফ্রান্সের অন্তত ১০ টি প্রতিষ্ঠান বৃহৎ বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পেই তাদের ২৫৩ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে হাজার হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী।

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর অন্যান্য দেশ যখন বাংলাদেশ থেকে সরে আসার কথা তুলেছিল তখন একমাত্র ফ্রান্সই দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছিলো।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত