ঘোষণা

ভিন্ন ঈদ

বন্যায়, করোনায় যেমন হলো ঈদ

আবদুস শহীদ | শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 114 বার

বন্যায়, করোনায় যেমন হলো ঈদ

করোনাভাইরাস আর উপর্যুপরি বন্যার কারণে এবারের ঈদুল আজহা ভিন্ন মাত্রা ধারণ করেছে। এবারের কোরবানির আয়োজন যেমন ছিল সীমিত, তেমনি সবাই মিলে নামাজ পড়া বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার যে প্রচলিত নিয়ম ছিল, তাতে দেখা গেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। সব মিলিয়ে ভিন্ন এক বাস্তবতায় ঈদ উদ্‌যাপন হয়েছে। করোনাভাইরাস আর বন্যা ঈদের আনন্দের আবহকে ম্লান করে দিয়েছে।

বিশ্বের সব মুসলমান পুরুষের মধ্যে (কোথাও কোথাও নারীদের জন্যও) একটি বড় অংশের ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য ঈদগাহের ব্যবস্থা করা হয়। নামাজ শেষে পরস্পরের সঙ্গে করমর্দন ও কোলাকুলি করাটা রেওয়াজ। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ গ্রামের ঈদগাহ ময়দান বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঈদের নামাজ এবং করোনাভাইরাসের কারণে মসজিদে যারা নামাজ পড়েছেন, তাদের পক্ষেও নিরাপত্তা বিবেচনায় কোলাকুলির মতো রেওয়াজ পালন সম্ভব হয়নি। ঈদুল ফিতরের মতো এবারও সময় ভাগ করে একাধিক জামাতে নামাজ পড়তে হয়েছে। তাই এবারের ঈদের আমেজটা একদম নেই।দীর্ঘদিনের ছকে বাঁধা ঈদ উদ্‌যাপন এবার পাল্টে দিয়েছে করোনাভাইরাস। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যা। এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। এমন ঈদ কখনো দেখেনি বাংলাদেশের মানুষ, বা প্রবাসী বাঙালিরা। করোনাভাইরাস আর বন্যার কারণে পশু কোরবানি অন্যবারের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। করোনাভাইরাস আতঙ্ক ও বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির কারণে ঈদ এবার অনেক মানুষের কাছেই আগের মতো খুশির বার্তা বয়ে আনতে পারেনি।

ঈদ উদ্‌যাপনের চেয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটাই যেন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপরও বিশ্বের রোগ বিশেষজ্ঞদের ধারণা পৃথিবীতে কোনো ভাইরাসই মানুষের সঙ্গে লড়াই করে জিততে পারেনি। সবচেয়ে বড় মহামারি হাম রোগের ভাইরাস; রুবিওলাও মানুষের কাছে পরাজিত হয়েছে। মানুষ জিতেছে। কিন্তু মানবিকতা হার মেনেছে কখনো কখনো। মনোবিজ্ঞানীদের ধারণা করোনাভাইরাস যত দীর্ঘ হবে, ততই সৃষ্টি হতে থাকবে সামাজিক অবক্ষয়। মানবিক মূল্যবোধে আসবে চরম ভাঙন। এর পরিণতি হবে ভাইরাস থেকেও ভয়াবহ। বাড়তে থাকবে স্নায়বিক চাপ। অতীতে দিকে তাকাতে গিয়ে নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসবে এক শ্রেণির সমাজকে। ধর্মীয় মূল্যবোধে আসবে অনীহা। ফলে সমাজে অনাচার ও আধিপত্যবাদের সংস্কৃতির আশঙ্কা দেখা দেবে।

দীর্ঘদিন গৃহবন্দী থেকে মানুষের দাম্পত্য কলহ দেখা দেবে। কারণ হিসেবে বলতে পারি বাঙালি সমাজের শতকরা ৮০ ভাগ পুরুষ কাজের মাধ্যমে কিংবা বিভিন্ন অজুহাতে বাইরে থেকে অভ্যস্ত। নারীরা ঘর-সংসার বা সন্তান লালনপালনে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু বর্তমানে বন্যা ও করোনাভাইরাসের কারণে তাদের একই ছাদের নিচে কাটাতে হচ্ছে দিনের পর দিন। শুরুতে সবাই একসঙ্গে থাকাটা উপভোগ করলেও, পরে দেখা যায় পান থেকে চুন খসলেই ঝগড়া শুরু হয়ে যায়। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারেন না। অনেকে হয়তো পরিস্থিতির পক্ষে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছেন । জানা যায় স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া মেটাতে ব্রিটিশ সরকার ৭৬ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দিয়েছেন। কারণ, করোনায় ব্রিটেনে ঘরবন্দী দম্পতির কলহ দিন দিন বেড়েই চলছে।

এদিকে অভিনব কাহিনিও শোনা যাচ্ছে। এক নারী স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়ে ছুটিতে গেলে এলাকাবাসী স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার আদেশে পানি শুকিয়ে যাওয়া পুকুরের মধ্যখানে তালপাতা নির্মিত কুঁড়েঘরে ওই স্বাস্থ্যকর্মীকে এক সপ্তাহ রেখে দেয়। রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে ওই নারী এক সপ্তাহ পার করেন। এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় দু শ বছর আগের আরেক মহামারি গুটি বসন্তের কথা। তখনকার দিনে বসন্ত রোগীকে নির্জন কক্ষে দিনের পর দিন কোয়ারেন্টিনে রাখা হতো। আজ একবিংশ শতাব্দীতে করোনাভাইরাস আমাদের নিয়ে গেছে সেই যুগে।

দফায় দফায় তিনবার বন্যার কারণে হাওরপারের গ্রামে পবিত্র ঈদুল আজহার তাৎপর্য থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। এলাকার স্বাবলম্বী কৃষকেরাও পশু কোরবানি দিতে পারেননি। নিম্ন মধ্যবিত্ত কৃষকের হাতে টাকা না থাকায় সন্তানদের ঈদের নতুন কাপড় কিনে দেওয়ার সামর্থ্য হারিয়েছেন। মাসব্যাপী বানের পানিতে বন্দী থাকায় আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাঁরা। কাজকর্ম করতে না পারায় ধারদেনা করে পরিবারের খাদ্যের জোগান দিচ্ছেন কেউ কেউ। সব মিলিয়ে এক ভুলে যাওয়ার মতোই ঈদই কাটল বলা যায়।

প্রথম আলো

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত