ঘোষণা

বাটপার

অনলাইন ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 162 বার

বাটপার

বাড়ির নিচে এসে থমকে গেলাম, মনে হলো এতদূর এসে উপরে উঠতে পারব না আর। বুকে চাপ চাপ ব্যথা হবে, তার চেয়ে সিঁড়ির গোড়ায় বসে জিরিয়ে নিই। ধাপে ধাপে যাওয়া পাথরের সিঁড়ির পঁচাত্তরখানা ধাপ। বাপ তার ছয় ভাইকে সাথে নিয়ে বরইটিকি থেকে পাথর কেটে এনে বাবাজিরা বানিয়েছিলেন এই সিঁড়ি। মাঝখানে পাঁচ হাতের একটা ল্যান্ডিং আছে, একটা দুর্বল টাইপের রং জ্বলা ঘোড়া থাকত সেখানে, কাঁঠালগাছে বাঁধা। ঘোড়া আর নেই জানি, কাঁঠালগাছটা আছে কিনা জানি না। কে যেন বিপদে পড়ে তার ঘাটের মড়াকে বিক্রি করে গিয়েছিল বাবাজির কাছে। বছর দিন বালবাচ্চাদের পিঠে নিয়ে ঘুরে ঘুরে আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নিশ্চয়ই অনেক অত্যাচার সহ্য করেছিল ঘোড়াটি। রাতে গরু-মহিষের ঘরে থাকলেও সকাল হলে কাঁঠালগাছে বেঁধে রাখত ময়না, যদি কোনোদিন বাবাজির ইচ্ছা হয় তার পিঠে চড়ে বসবেন এই আশায়।

বুকে সত্যি সত্যি চাপ চাপ ব্যথা হচ্ছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই, খাঁ খাঁ দুপুর। আসমানের দিকে তাকালে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত দেখা যায়, মেঘের দিদার নেই কোথাও… কাউকে দেখা গেলে ধরে ধরে উপরে উঠতে পারতাম। দক্ষিণের পুকুরে রোদ পড়ে বিকেলের দিকে, এখনও ঠান্ডা, হিম আছে পুকুরের পানি; সেই পুকুরের পানি খেতে পারলে দুই লাফে ওঠা যায় বাড়িতে! কত দেশের পানি খেলাম, কত কত নদী আর ঝরনার, এমন হিম আর মিঠা পানি কোথাও পেলাম না যা মুখে দিলে বুকে টের পায়, বুকে গেলে পেট ছটফট করে শীতল হবার জন্য! পাথুরে গ্রামের পুকুর, পুকুরের তলায় নুড়ি পাথরের খনি, এমন স্বচ্ছ পানি যে, এক টুকরো আকাশ যেন খসে পড়েছে এখানে!

ব্যাগে কি পানির বোতল রেখেছিলাম এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে! এয়ারপোর্ট আগে কেমন ছিল মনে আছে, গরিবি এতটা হালত, সাদাসিধে একতলা একটা বিল্ডিং, একেবারে বাড়ি বাড়ি একটা বিষয়, ভাইবোন বিলাত আমেরিকা গেলে, দেশে এলে এয়ারপোর্টে বাস বোঝাই করে যেতাম সবাই! মনে হলো বেশ উন্নতি হয়েছে, বিশাল ভবন উঠেছে, তবে ভিড় আর নেই আগের মতো!

বাড়িতে ওঠার আরও তিনটি পথ আছে, একেকটা পথ একেকটা দরকারের। এই পথটা নতুন মানুষ বা আত্মীয়-মেহমানের জন্য, উত্তরের পথ বাড়িতে রিকশা, বেবিট্যাক্সি তোলার জন্য; উত্তর-পূর্ব কোণের পথে নেমে পুরুষদের জন্য পুকুর। গুষ্টিতে আর পান্‌জেগানা মসজিদে যাবার জন্য আর বাড়িতে গরু-মহিষ ওঠানোর জন্যও, দক্ষিণের পথ নারীদের পুকুরে যাওয়ার জন্য। এর পরেও পুবের কুট দিয়ে জংলা আনারসের বন দিয়েও নামার চোরাই পথ আছে একটা। সেই পথ সাহসী আর বেয়াড়া লোকের যেমন পথ, চোরের পথ তেমনি। পথটা শেষ হয়েছে গোরস্তানের মুখে, তারপর সামান্য বেঁকে ধানের আইল ধরলে দ্রুত গুষ্টিতে যাওয়া যায়। সুতরাং যে পথই ধরি না কেন মন্‌জিল বহুতদূর।

সিঁড়ির ডান দিকে নতুন এক সারি কমলাগাছ দেখতে পাচ্ছি, গাছের পাতায় পাতায় সবুজ সবুজ কমলা, সেই সকাল থেকে রোদ খেতে খেতে পাতাগুলো ঝিম ধরে আছে আর চকচকে হয়ে উঠেছে কমলাগুলো। আগে এখানে তেলগাছ, বরুণ গাছ আর পেয়ারাগাছের জঙ্গল ছিল, শত শত পাখির ডাকে কানে তালা লেগে যেত দুপুরবেলা! ঝগড়াটে এক পাখি টুনটুনি, মাথা গরম পাখি টিয়া, ড্যামকেয়ার পাখি কাঠঠোকরা, ভেতরবুদ্ধির শয়তান কোকিল আর শত শত ধানচড়ুইয়ের হাঁকডাকে দুপুরবেলা দুই দণ্ড চোখ বন্ধ করা যেত না। আজ সেই একই চৈত্রের দুপুর, দূরে কোথাও একলা এক ডাহুকের গুনগুন ছাড়া আর কোনো শব্দ পাচ্ছি না। কমলাগাছের সারি শেষ হলে বুড়ো তেজপাতা গাছটি বেঁচে আছে দেখলাম। তাহলে তার আশপাশে পুরোনো বেল, হরীতকীর গাছটিও আছে, উপরে উঠলে হাজারি কাঁঠাল গাছের পাশে পুরোনো মালদহ আমের গাছগুলোও থাকার কথা, পর পর ছয়টি কমলাগাছের নিচের ঢালে অগুনতি কাঁঠাল আর পেয়ারার বন!

সিঁড়ির বাঁ দিকে তেমন গাছ নেই সেই আগের মতো, হাল্ক্কা-পাতলা মিরতিঙ্গা বাঁশের ঝোপ, লেবুর ঝাড় আর তার ফাঁকফোকরে লম্বা লম্বা ঘাসের ভেতরে বারাণশী আনারস, দাঁড়াশ সাপ, একেবারে মাথায় কাত হয়ে পড়া জাম্বুরা গাছের অদূরে জাড়ালেবুর ঝাড়, এক ঝোপ সোনালি মিরতিঙ্গা আর তার পাশে বাঁশের শলায় কাঁঠালের আঠা লাগিয়ে মাথায় ধান ফড়িং গেঁথে আনারস বনে এক সারি ফাঁদ পেতে বসে আছেন আম্মাজি। ক্ষণে ক্ষণে বনচড়ুই, টুনটুনি আর বুলবুলি পাখি আটকে যাবে, কেউ ধরে এনে কচ করে গলা কেটে টুকরি দিয়ে ঢেকে রাখবে আর দুপুরের আগে আগে ভরে উঠবে টুকরি। পাখি ভুনার একটা গোল আর কালো রঙের কড়াই আছে আম্মাজির, মসলা বেটে দেবে ময়নার বউ, জোহরের নামাজ সেরে, মুখে পান পুরে আম্মাজি এক কড়াই পাখি ভুনা করবেন আস্ত আস্ত, কোনোদিন দুটি আস্ত পাখি পাইজাম চালের ঝরঝরা ভাতের উপরে! খয়েরি রঙের মাখো মাখো মসলায় আস্ত আস্ত পাখি, পুরো শীতকাল শেষ হয়ে চৈত্র মাস পর্যন্ত।

বাড়ি ছেড়ে যাবার সময়ে আম্মাজির চুলে পাক ধরেছিল মনে আছে আমার, আব্বাজির পুরো মাথাই ধবধবা! বড় ভাবির আট-নয় মাসের পেট, নির্ঝরের বয়স পাঁচ আর মেজ ভাবি বিছানা থেকে নামলেই বমি করেন। আমেরিকা থেকে মিলি প্রত্যেক মাসে চিঠি লেখে, তবু আব্বাজি বাজারে গিয়ে মিসকল দিয়ে বসে থাকেন জব্বারের দোকানে। মিলি সাথে সাথে ফোন দিয়ে এক মিনিট কথা বলে আব্বাজির সাথে, বাড়িতে নতুন ফ্যান লাগানো হয়েছে দুটো, টঙ্গিঘরে আর আব্বাজি আম্মাজির ঘরে। দেশের অবস্থাও ভালো না, রেডিও খুললেই খুন-খারাবি জায়েজ করার দালালে ভর্তি রেডিও। বাবাজির মহিষ বেচার দুই হাজার টাকা নিয়ে আমি চলে গেলাম বরমচাল। তারপর কলকাতা, লিভারপুল, প্যারিস, ব্রাজিল, পেরু…

আপনে কে? বাড়িত ঢুকছইন কেনে?

এই তরুণীটা কে! বড় ভাই না মেজ ভাইয়ের নাতনি! না কোন নাতবউ!

তুমি কে গো? কিতা নাম তোমার?

আপনারে কেনে কইতাম? কে আপনে?

তোমার এক দাদা, তোমার দাদার ভাই আফসার আলী…

ও আল্লাগো…

কে যেন ঘরের ভিতর থেকে চিৎকার দিলো, ভয়ার্ত চিৎকার! সামনের তরুণী দ্রুত চলে গেল ঘরের ভেতরে, তারপর দাদি… দাদি… বলে চিৎকার করতে লাগল! আরও আরও কণ্ঠ জড়ো হতে লাগল চারপাশ থেকে! কয়েকজন ঘন ঘন ফোন দিতে লাগল কোথাও। দ্রুত আসতে বলল কাউকে একজন। আমি কি ঘরের ভিতরে ঢুকবো! কার কোনটা ঘর! পুরো ভিটা জুড়ে দোতলা একটি বিল্ডিং, সেই আগের মতো চৌচালা টিনের ঘরটিই দেখবো কীভাবে ভাবতে ভাবতে এলাম এতটা পথ! একটা মরা গাছের ডালে ভর করে বাড়ির উপরে উঠে কোঁকড়া হয়ে গেছি, উঠানের কোলের তরুণ যে লিচুগাছটা রেখে গিয়েছিলাম, সেই বেটা দেখি আমার চেয়েও বুড়ো আর বিশাল হয়েছে, ঝুঁকে ঝুঁকে তার গোড়ায় গিয়ে বসলাম, ঘুমিয়ে কি পড়েছিলাম বুড়ো আফসার মিয়া, ঘুম ভাঙল গাছের সাথে বাঁধা অবস্থায়। পানির কথা কি বলেছিলাম কাউকে? প্রচণ্ড চড়ে বাঁধানো দাঁতের একপাটি খুলে গিয়ে উঠানের মাটিতে পড়ল। আরে এইখানে তো ছোটবেলা দাঁত লুকিয়ে রাখতাম দূর্বাঘাসের নিচে! আরেকটা চড় পড়ল নতুন হাতের, এই দুই তরুণ আমার কোনো ভাইয়ের নাতি! নাকি চাচাতো কোনো ভাইয়ের! ঘরের ভেতর থেকে কে যেন ‘ছোট ভাই… ছোট ভাই’ বলে একবার কাঁদলো, কেউ প্রচণ্ড কড়া ধমক দিলো সেই নারীকে! মানুষের জটলা উঠান ভরে ঘর বারান্দা ভরে গেল আসরের আগে আগে, তবু কেউ চিনতে পারল না আমাকে! সবাই বলে গেল এই নামে একজন সত্যিই ছিল এই বাড়ির ছোট ছেলে, চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগে আসাম যাওয়ার পথে ব্রহ্মপুত্রে নৌকাডুবিতে মারা যায় সে, তার ভাইয়েরা খুঁজতে খুঁজতে সন্ধান পেয়ে কবর থেকে তুলে এনে জানাজা পড়িয়ে মাটি দেন তাদের দাদা-দাদির কবরের পাশে। সেই দুঃখে ছেলেটির বড় দাদা, বড় দাদি মারা যান বছরের ভিতরে; তারপর তার দাদা, মেজ দাদাও মারা যান কয় বছর আগে, মেজ দাদি ছেলেমেয়ের কাছে লন্ডন থাকেন, তার দাদির হুঁশবুদ্ধি আগের মতো কাজ করে না

বড় ভাবি! ও নির্ঝরের মা…

আমি হাতির শক্তি নিয়ে রশি ছিঁড়ে ঘরের ভেতর যেতে চাইলাম, কেউ একজন প্রচণ্ড লাথ্‌থি দেয় বুকে, হার্টের সেলাই কি খুলে গেছে! গভীর ঝিমুনি লাগে চোখে, যেন কাঁঠালের আঠা চোখের পাতায়, গাঢ় ঘুম আসে শরীরে, ঘুমাতে ঘুমাতে শুনি অনেকে একসাথে বাটপার… ধান্ধাবাজ… শয়তান… চিৎকার করছে উঠান জুড়ে। এতসব চিৎকারের ভেতরও ছোট ভাই… ছোট ভাই… আফসার… বলে মিহি সুরে কেউ কাঁদছে কোথাও… া

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ২:২৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

বিটলবণের স্বাদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ফেরা

১৪ মার্চ ২০২০

জোছনায় কালো ছায়া

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০