ঘোষণা

 বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছ তুমি,নজরুল

শিবব্রত গুহ | শনিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২১ | পড়া হয়েছে 400 বার

 বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছ তুমি,নজরুল

 

 

” বল বীর –
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর
হিমাদ্রির!

বল বীর –
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন ‘ আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির- বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-
রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর –
আমি চির উন্নত শির!”

– উপরোক্ত লাইনগুলি কবি কাজী নজরুল
ইসলামের রচিত বিখ্যাত কবিতা ‘ বিদ্রোহী ‘ – এর।
এই কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য
সম্পদ। এর প্রতিটি লাইন, শব্দ থেকে বেরিয়ে আসে যেন বিদ্রোহের আগুন। কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা সবাই বলি
” বিদ্রোহী কবি “।

নজরুলের কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে,
তাকে এই নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাঁর কবিতার মূল বিষয় হল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের
বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।তাই তো, তাঁর কবিতা
পাঠ করলে মনেপ্রাণে জাগে বিপ্লবের চেতনা।

নজরুল যখন, কোলকাতার ৩/৪ সি, তালতলা লেনের বাড়িতে থাকতেন, তখন, তিনি এই
বিদ্রোহী কবিতাটা রচনা করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে,
তাঁর ঘনিষ্ঠ মুজফফর আহমদ তাঁর ” কাজী নজরুল ইসলাম ঃ স্মৃতিকথা ” বইতে লিখেছেন ঃ
” সে কবিতাটি লিখেছিল রাত্রিতে। রাত্রিতে কোন
সময়ে তা আমি জানি নে। রাত দশটার পরে আমি
ঘুমিয়ে পড়েছিলেম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ
ধুয়ে এসে আমি বসেছি, এমন সময়ে নজরুল
বলল, সে একটি কবিতা লিখেছে। পুরো
কবিতাটি সে তখন আমায় পড়ে শোনাল।
‘ বিদ্রোহী ‘ কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা। ”

নজরুল বিদ্রোহী কবিতাটি লিখেছেন পেন্সিলে।
কারণ, সেসময়, কোন ফাউন্টেন পেন বা ঝরনা
কলম ছিলই না। ১৯২২ সালের, ৬ ই জানুয়ারি,
সাপ্তাহিক ” বিজলী ” – তে তাঁর এই বিদ্রোহী কবিতাটি প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল।

নজরুলের আর একটি অনবদ্য কবিতা হল
ধূমকেতু। এই কবিতায় কবি জয়গান গেয়েছেন
বিপ্লবের। নজরুল বিপ্লবকে ভালোবাসতেন।
তিনি চাইতেন, আমাদের মানবসমাজের বুকে
যে সামাজিক বৈষম্য রয়েছে প্রবলভাবে,
তা চিরকালের মতো দূর হোক। আর তিনি
বিশ্বাস করতেন, যে, এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে
পারে একমাত্র বিপ্লব, সমাজের সর্বস্তরে সর্বাত্মক
বিপ্লব।

তাই তো, ধূমকেতু কবিতায় কবি কাজী নজরুল
ইসলাম বলেছেন,

” আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
সাত সাতশো নরক – জ্বালা জলে মম ললাটে,
মম ধূম – কুন্ডুলি করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘর ঘোলাটে!
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ,
আমি স্রষ্টার বুকে সৃষ্টি – পাপের অনুতাপ – তাপ
– হাহাকার –
আর মর্তে সাহারা- গোবি- ছাপ,
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ!

আমি সর্বনাশের ঝাণ্ডা উড়ায়ে বোঁও বোঁও
ঘুরি শূন্যে,
আমি বিষ – ধূম – বাণ হানি একা ঘিরে ভগবান – অভিমুন্যে।”

কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক। তিনি বিশ্বাস করতেন স্বাধীনতায়।
তিনি চাইতেন, ব্রিটিশ শাসনের পরাধীনতা থেকে
যেন ভারতবাসী চিরকালের মতো মুক্তি পায়।
তাই, তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন দেশের পরাধীনতার বিরুদ্ধে, ব্রিটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে, ভারতীয়দের ওপরে ব্রিটিশদের অকথ্য
অত্যাচারের বিরুদ্ধে। তাঁর কলম গর্জে উঠেছিল
সোচ্চার প্রতিবাদে।

তিনি বারবার ব্রিটিশদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে
তাঁর বিদ্রোহ চালিয়ে গিয়েছেন। তিনি কখনো
কোন পরিস্থিতিতে পাননি ভয়। তিনি সর্বদা করেছিলেন ভয়কে জয়। তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য করেছিলেন কারাবরণ। তাঁর লেখা দেশাত্মবোধক কবিতা ও গান প্রেরণা যোগাত ওইসময় আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের।

তাঁর লেখা একটি কবিতার নাম হল কান্ডারী হুশিয়ার। এই কবিতাটি দেশাত্মবোধক চেতনায়
সমৃদ্ধ। এই কবিতায় কবি নজরুল বলছেন,

দুর্গম গিরি কান্তার- মরু- দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার!
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভূলিতেছে মাঝি
পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার
হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে
ভবিষ্যত।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী
পার!! ”

একটা দেশ ও সমাজের ভিত হল সেই দেশ ও
সমাজের ছাত্রসমাজ। এই ছাত্রসমাজ যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে তার
খারাপ প্রভাব পড়তে বাধ্য দেশ ও সমাজের
ওপরে। তাই দেশ ও সমাজের উন্নতিতে,
ছাত্রসমাজের গুরুত্ব অপরিসীম। এই ছাত্রসমাজের জয়গান কবি কাজী নজরুল
ইসলাম গেয়েছেন তাঁর ” ছাত্রদলের গান ”
কবিতায়।

” আমরা শক্তি আমরা বল
আমরা ছাত্রদল।
মোদের পায়ের তলায় মুর্সে তুফান
উর্ধ্বে বিমান ঝড় – বাদল।
আমরা ছাত্রদল।।

মোদের আঁধার রাতে বাধার পথে
যাত্রা নাঙ্গা পায়,
আমরা শক্ত মাটি রক্তে রাঙাই
বিষম চলার ঘায়!
যুগে – যুগে রক্তে মোদের
সিক্ত হ’ল পৃথ্বীতল!
আমরা ছাত্রদল।। ”

কবি নজরুল ছাত্রদলের গুরুত্ব ভালো ভাবেই
উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তখন ভারতবর্ষ ছিল পরাধীন। লালমুখো সাহেবদের অত্যাচারে,
সারা ভারত জুড়ে উঠেছে ত্রাহি ত্রাহি রব। ভারতবাসী মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারছে
পরাধীনতার জ্বালা। ভারতবাসীরা চায়
পেতে স্বাধীনতা। ব্রিটিশরা আবার কড়া হাতে
দমন করে চলেছে ভারতীয়দের স্বাধীনতা সংগ্রাম।

এই সময় নিষিদ্ধ হয়েছিল বিভিন্ন ভারতীয় কবি
– লেখকের বই, প্রবন্ধ – নিবন্ধ। অনেকের মতো
দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল
নজরুলের বই। তাঁর খবর জোগাড় করার জন্য
তাঁর পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার।

১৯২২ সাল থেকে ১৯৩১ সাল অবধি নজরুলের ৫টি
বই করা হয়েছিল বাজেয়াপ্ত। তাঁর প্রথম যে বইটি
অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকদের রোষানলে পড়েছিল,
তার নাম হল ” যুগবাণী “। ১৯২২ সালে ব্রিটিশ ফৌজদারী বিধির ৯৯এ ধারা অনুসরণ করে,
এই বইটিকে বাজেয়াপ্ত করা হয়। তখনকার
ব্রিটিশ শাসকেরা, এই বইটাকে ” একটি ভয়ংকর
বই ” বলে চিহ্নিত করে।

এরপরে, ১৯২৪ সালের ২২শে অক্টোবর, নজরুলের কবিতার বই ” বিষের বাঁশি “নিষিদ্ধ
হয়েছিল। তারপরে, ১৯২৪ সালেই, ১১ ই নভেম্বর,
নজরুলের আরো একটি কবিতার বই ” ভাঙার
গান ” বাজেয়াপ্ত হয়।

এরপর, নজরুলের, আর একটি কাব্যগ্রন্থ
” প্রলয় শিখা ” বাজেয়াপ্ত করা হয় ১৯৩১ সালে।
এই সময় কবির হৃদয় বেদনায় ছিল ভরা,
তাঁর প্রিয় ছেলে বুলবুলের মৃত্যুতে। তাঁর দুচোখ
অশ্রুতে সিক্ত হলেও, তাঁর কলম থেকে বেরিয়েছিল একের পর এক আগুনের ফুলকি,
প্রলয় শিখাতে।

তারপরে, নজরুলের একটি ব্যঙ্গ বিদ্রুপের কবিতার বই ” চন্দ্রবিন্দু ” নিষিদ্ধ হয়েছিল
১৯৩১ সালের ১৪ ই অক্টোবর। কিন্তু, এতকিছু করেও দমানো যায়নি নজরুলকে। কারণ, তিনি
যে বিদ্রোহী কবি। বিদ্রোহ তাঁর রক্তে, বিদ্রোহ তাঁর
কলমে, বিদ্রোহ তাঁর শিরায় – উপশিরায়।

বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছ তুমি,
নজরুল,
মানুষের অন্তরে,
মানুষের অন্তরে,
মানুষেরই অন্তরে।

( তথ্য সংগৃহীত )

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৫:২৪ অপরাহ্ণ | শনিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জুতার দাম ১০ লাখ ডলার!

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

ad