ঘোষণা

মারুফ কামাল খান : প্রসঙ্গ, চীন-ভারত সম্পর্ক

মারুফ কামাল খান | শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 138 বার

মারুফ কামাল খান : প্রসঙ্গ, চীন-ভারত সম্পর্ক

মারুফ কামাল খান: আহমেদাবাদসহ ইন্ডিয়ার গুজরাট রাজ্য জুড়ে ‘দাঙ্গা’ শব্দের আড়ালে বৃদ্ধ-শিশু-নারী সমেত মুসলমানদের পৈশাচিক কায়দায় খুন করা, পুড়িয়ে মারা, তাদের ওপর গণহত্যা চালানো, মুসলমান মহিলাদের ধর্ষণ, তাদের সম্পত্তি লুটে নেয়া, পুড়িয়ে দেয়া, ধ্বংস করা, তাদেরকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ সহ এমন কোনো বর্বরতা নেই, যা চালানো হয়নি। তখন সেখানে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র দামোদর মোদি। সেই সব সাম্প্রদায়িক পৈশাচিকতা মোদির নির্দেশনা ও মদদেই ঘটে বলে সুস্পষ্ট অভিযোগ ওঠে। দেশে-বিদেশে মোদি ‘গুজরাটের কসাই’ হিসেবে কুখ্যাত হন। সারা দুনিয়ার মানবাধিকার সংস্থাগুলো মোদির ক্রিমিন্যাল প্রোফাইল তুলে ধরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কালো তালিকাভূক্ত করে নরেন্দ্র মোদিকে।
মোদির সেই ঘোর দুর্দিনে তার একমাত্র আন্তর্জাতিক মিত্র হিসেবে এগিয়ে আসে চীন। মোদির দিকে তারা অর্থায়ন, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সব রকমের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। কেবল গুজরাটেই চীনা বিনিয়োগের পরিমান দাঁড়ায় ১৭ হাজার কোটি রুপির বেশি। ইন্ডিয়ার এই রাজ্যটির অবকাঠামো উন্নয়নে চীনা হাত ছিল অবারিত ও উদার। মোদির সুপারিশে তার অর্থনৈতিক ছত্রধর আদানি শিল্পগোষ্ঠী চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বন্দর নির্মাণ ও অতিকায় সব পাওয়ার স্টেশন স্থাপন করে। চীনের সহায়তায় মোদি তার উন্নয়নের ‘গুজরাট মডেল’ সফল করেন।

সে সময় ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারে ছিল ন্যাশনাল কংগ্রেস-এর নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ এলায়েন্স বা ইউপিএ জোট। তাদের বাধা উপেক্ষা করে মোদি হংকং হয়ে চীন সফরে চলে যান। সেখানে তাকে ইন্ডিয়ার প্রাইম মিনিস্টারের মতন গুরুত্ব ও প্রটোকল দেয়া হয়। মোদির ওই সফরকালে দু’পক্ষের মধ্যে অনেকগুলো চুক্তিও সই হয়।

সেই যামানায় মোদি ইন্ডিয়ার কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত ইউপিএ সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, তারা চীনের মতন একটা প্রতিবেশী বন্ধুদেশকে সঠিক হাতে নাড়াচাড়া করতে পারছে না।

নোয়াখালীতে চালকের গলা কেটে অটো ‘ছিনতাই চেষ্টা’ ≣ [১] রেড জোনে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে আসতে হবে না : জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ≣ প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের সেমিফাইনালে উঠলেন জেভেরেভ
গুজরাট মডেলই মোদির জন্য হয়ে দাঁড়ায় সাফল্যের চাবিকাঠি। ওই সাফল্যের জেরেই গুজরাটের বাইরেও মোদির জনপ্রিয়তা ও সুনাম বাড়তে থাকে।

ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসে রাজীব-সোনিয়া দম্পতির পুত্র রাহুল তখন সামনে উঠে এসেছেন। কিন্তু তার গ্রহনযোগ্যতা খুবই কম। ইন্ডিয়ার রক্ষণশীল সোসাইটি, বিজনেস ক্লাস এবং নেপথ্যের কিংমেকার-পাওয়ার ব্রোকারদের কাছে রাহুল গান্ধির ইমেজ এক ধরনের ‘ফ্লামবয়ান্ট’ কিংবা ‘শো বয়’-এর চেয়ে বেশি কিছু দাঁড়ায়নি। তার প্রভাবে তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে ইউপিএ কেবিনেটে সর্বশেষ যে রিশাফল করা হয় সেটিকেও ইন্ডিয়ান মিডিয়ায় ‘রাহুল ব্রিগেড’ বলে সমালোচনা করা হয়। অভিযোগ উঠে, রাহুল তার দুর্নীতিগ্রস্ত তরুণ বন্ধুদের নিয়ে একটা সিন্ডিকেট গড়েছেন এবং বনেদি সিনিয়র নেতাদের কোনো গুরুত্বই নেই তার কাছে। এই মর্মেও সমালোচনা শুরু হয় যে, অসুস্থ সোনিয়া গান্ধী তার অযোগ্য ছেলেকে নেতৃত্বে বসানোর জন্য সবকিছু করছেন এবং এ লক্ষ্যে ক্লিন ইমেজের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকেও তিনি ‘স্টুজ’ কিংবা ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছেন।

এই রকমের এক পরিস্থিতিতে ইন্ডিয়ার ডিপ স্টেট কেন্দ্রে ক্ষমতায় বসাবার জন্য ন্যাশনাল কংগ্রেসের বিকল্প পার্টি ও বিকল্প নেতৃত্বের খোঁজে নামে। তারা বিজেপি এবং মোদিকে বাছাই করে। এরপর মোদিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দ্রুত তার উত্থান ঘটে ইন্ডিয়ার জাতীয় রাজনীতিতে। এখন মোদি দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়ে সে দেশের দাপুটে প্রধানমন্ত্রী।
জওহর লাল নেহেরুর আমলে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ইন্ডিয়া সফরে এলে ধ্বনি দেয়া হয়েছিল : ‘হিন্দি-চীনি ভাই ভাই।’ সেই স্লোগানের আওয়াজ মিলিয়ে যাবার আগেই চীনের সঙ্গে ইন্ডিয়ার যুদ্ধ বেধে গিয়েছিল। সে যুদ্ধে ইন্ডিয়াকে বেশ নাকানিচুবানি খেতে হয়েছিল।

এবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ইন্ডিয়া সফরে এলে মোদির ভক্ত-অনুরক্তরা ‘গুজরাটি-চীনি ভাই ভাই’ বলে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিল। সেই ভাই ভাই আওয়াজ একটু বিকৃত হয়ে খুব দ্রুতই ‘বাই বাই’ হয়ে উঠেছে।

চীন ও ইন্ডিয়া এই দুই দেশের মধ্যকার সীমানা দ্বন্দ্ব বহুকালের। এ নিয়েই উভয় পক্ষ সংঘাত এড়িয়ে শান্তির মধ্যেই দীর্ঘকাল জারি রেখেছে পারষ্পরিক লেনদেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি ইন্ডিয়ার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর সে-দেশের স্থায়ী সরকারের চাপে চীনের এক বেল্ট, এক সড়ক উদ্যোগ ‘ওবর’ প্রকল্পের বিরোধিতা করতে বাধ্য হন। সে-থেকেই দুই তরফের মধুর সম্পর্কে চিড় ধরা শুরু হয়।

চায়না-ইন্ডিয়া দ্বন্দ্বের ব্যাপারটা টের পেয়েই যুক্তরাষ্ট্র কালোতালিকা থেকে নাম মুছে দিয়ে মোদিকে দ্রুত বুকে জড়িয়ে নেয়। ট্রাম্প-মোদির মিতালির স্মারক হিসেবে দুই দেশের মাটিতেই প্রদর্শনীমূলক পাব্লিক ফাংশানের আয়োজন হয়। এরই মধ্যে চীন-ইন্ডিয়া বর্ডারের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে বরফের বিশাল বিশাল সব চাঙড়ের মধ্যে চরম শীতার্ত আবহাওয়ায় চীনা গণমুক্তি বাহিনী বা লালফৌজের সেনারা পিটিয়ে কিছু ইন্ডিয়ান সৈন্য ও অফিসার মেরে ফেলে এবং কিছু সৈন্যকে ধরেও নিয়ে যায়। কোভিড-১৯ অতিমারিতে সারাবিশ্বের বিপন্নতার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটে। এর জের ধরে ইন্ডিয়ায় এখন চীনাপণ্য বর্জনের ডাক দিয়ে বিক্ষোভ চলছে। আর বন্ধু আমেরিকা অভয় ও সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে ইন্ডিয়াকে। তবে আমেরিকার আশ্বাসে পুরোপুরি বিশ্বাস রাখতে না-পেরে পুরনো মিত্র রাশিয়ার সহানুভূতির আশায় ছুটেছে ইন্ডিয়ার কূটনীতি।

পরদেশনীতি ও কূটনীতিতে এই ভাবেই বন্ধু ও শত্রুর পরিচয় ও অবস্থান ছায়াছবির দৃশ্যের মতনই দ্রুত পাল্টে যায়। চাঞ্চল্যকর সেই পরিবর্তনশীলতার ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখাটা এখনকার সময়েরও দাবি।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বোধের বিদ্রূপ

১১ সেপ্টেম্বর ২০২০