ঘোষণা

শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন,বউয়ের অভিশাপ এবং সমীর হোসেনের পুঁজিবাদী বিশ্বদর্শন

সাইফুর রহমান কায়েস | সোমবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 448 বার

শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন,বউয়ের অভিশাপ এবং সমীর হোসেনের পুঁজিবাদী বিশ্বদর্শন

 

ফেসবুকে অরিজিনাল শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনে বিরক্তি প্রকাশ করছি। বলি ও ভাইয়েরা আমি ন্যাড়া সন্ন্যাসী। বেলতলাতে যেতেই আমার যতো ভয়। আবার শ্যাম্পু কিনে মাথায় দিমু! মুই কি পাগল হনু রে??? হইরর তেল কেনার মুরোদ নাই বইল্যা মাথা ন্যাড়া কইরা রাখি। এমনিতেই বউয়ের সন্দেহের বাতিক। বলে, আমি নাকি আবার প্রেমে পড়েছি। তাই একটু বেশি হাইজ্যা পাইড়া থাকি। আমারে নাকি হে খুব তাড়াতাড়ি হারাইয়া লাইবো। এই চিন্তাত পইড়া তো বউয়ের ঘুম নাই। আইবার সময় কইলাম বউরে এক কাপ চা অইব নি? রাগে ফুইল্যা ফাইপ্যা তো হের মাথায় গেষ্ট্রিক উইঠ্যা রইছে। ফানক হাপের লাখান গজগজ করতে করতে কইলো, পারমু না। তূমি যাদের পিরিতে মইজ্যা রইছো কিংবা যারা তোমার পিরিতে মইজ্যা রইছে হেরারে কউ তোমারে মজা কইরা চা বানাইয়া দিবো নে।
হায়রে! কপাল আমার। আমার লগে চাকরী করতো এক বাউনের পোলা। হে কইতো স্যার, স্ত্রী,পুত্র,জল এই অইলো কর্মফল। এখন দেখছি এর সাথে চাও যোগ করণ লাগবো। বউ ভাগ্য ভালা অইলে কপালে চা জুটবো। না অইলে আমার মতো হুড়ুইনের বাড়ি। বউয়ের ঝামটা দেওয়া মুখ এই শরৎকালে দেখতে ভালা লাগে না। বউয়েরে কই মাঝে মাঝে বউ যতো পারিস আমাকে গাইল বকা দে, আমি অখুশি না। কিন্তু গাইলটা দিবার সময় তুই পদ্মফুল ফোটাইন্যা তোর বিখ্যাত হাসিটা দিস। বউ উত্তরে বলে,তুমি নিপাত যাও। তুমি আর আমার ধারো আইওনা। শুনে তো আমার সর্বনাশের মাথায় বাড়ি। ও বউ তুই ইতা কিতা মাতোস রে। আমি একটু পরে ক্ষেতে হাল বাইমু,আর তুই কই দূরে চইল্যা যাইতে। তুরে ডাচবাংলার বুথে টাকা দিলেই কি সব শেষ।
আমি আধা পাগলাটে, উড়াধুরা গোছের সমীর হোসেন। জেদি,একগুঁয়ে স্বভাবের মানুষ। আমি সমীর ক্ষেইপ্পা গেলে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ি দেশ দেশান্তরে। আর ফিরবার নাম নাই। হেশে বউ তো আমার কাইন্দা কাইট্যা হের নেতাগোছের বাপের কাছে নালিশ করে। আমার কাকার কাছে,বড় ভাইদের কাছে,এমনকি ট্রাম্প কাকুর বড়কর্তা ছোটভাইয়ের কাছেও নালিশ করে। ট্রাম্প কাকুর লোক বলে কথা। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাইয়া তো তেলেবেগুনে জ্বইল্যা উঠে। বলে তুমি যে দেশ বিদেশ ঘুরো ট্যাকা কই পাও? একলা গেলায় কেরে? বউ পোলাফুড়ি লইয়া গেলায় না কেরে? আমি বুঝি বউয়ের সন্দেহের বাতিক আমার হুরু ভাইয়ের উপরও আছড়াইয়া পড়ছে।
আমি সমীর হোসেন এইবার খুব বিপাকে এবং এম্বারাসিং সিচুয়েশনে পইড়া যাই। খুব বিব্রতবোধ করতে থাকি হুরুভাইয়ের কাছে। মোবাইলে তার রাশভারী গলা আমি বুঝতে পেরে আমতাআমতা করে বলি ট্যাকা তো প্রভিডেন্ট ফাণ্ডে থাইক্যা তুলছি। আর হকলতারে লইয়া আইবার মতো ট্যাকা তো আমার কাছে নাই। হুরুভাইরে আর কিতা কইতাম। হের কথা খালি কান পাইত্যা হুনি আর হু হু করি। মনে লয় বিষ খাইয়া বিষ অজম করতাছি। জাহিদের মধু হই হই গানটি সবে মাত্র চাউর অইছ। তাই মনে মনে বউয়েরে জাহিদের গান গাইয়া অভিসম্পাত করতে থাকেন আধা পাগলাটে সমীর হোসেন। নিজের নামের পাশে এবার অভিমানী বিশেষণখানি যুক্ত কইরা লইলো। আত্মবৈদগ্ধতার আঙরাতে এবার জ্বলছে সমীর হোসেন।
কাঠমান্ডুতে তাই বহুজনে প্রশ্ন করে আপনি একা ঘুরতে এসেছেন কেনো? একা ঘুরতে ভালো লাগে?
হালারা কয় কি? থামেল বাজারে সন্ধ্যার সময় মাগির দালালেরা অনবরত খদ্দেরদের উদ্দেশ্যে ডাকতে থাকে, লেটস গো স্যার। থার্টিন, সিক্সটিন,ভার্জিন – এনি কাইন্ড অফ চিক্স ইফ ইয়্যু ওয়ান্ট, আই হ্যাভ। স্যার,স্যার ভেরি চিফ। অনলি ওয়ান থাউসেন্ড এন আই সি। শব্দটি সেদিন দুপুরে একটা কাপড়ের দোকানে প্রদীপকে সাথে নিয়ে যখন নেপালি টুপি কিনতে গিয়ে প্রথম শুনলো। তার আগে প্রদীপ বলেছিলো,হোয়েন ইউ ভারগেইন ফর প্রাইস প্লিজ মেইক সিউর দ্যাট ইন হোয়াট টাইপ অফ কারেন্সি দে আর আস্কিং ফর। আই সি মানে ভারতীয় আর এন আই সি মানে নেপালীয় মুদ্রাকে বুঝাচ্ছে।
নেপাল বোর্ডার ক্রস করার আগে রাণীগঞ্জ আইসিপিতে মানিকগঞ্জের এক বড়মিয়ার সাথে তার পরিচয় হয়েছিলো। তার নাম শুভ। ইমিগ্রেশন অফিসার দিলীপ বাবু তো ট্যাকা ছাড়া নড়ে না। সমীর হোসেন গুণে গুণে চার হাজার আইসি দিয়ে তবে এক্সিট সীল যোগাড় করেছে। তবে লাভের উপর লাভ এটাই অইছে যে, ঘর থাইক্যা বাইর অওনের সময় বউয়ের যে ঝামটা আর রাগী চেহারা দেখছিলো নেপালীয় ইমিগ্রেশন অফিসার আর শুভ ‘র গুয়ামুড়ি হাসি আর গুয়া মারবার মিহি কৌশল উপহার পাইয়া বেমালুম ভুইল্যা গেছে।
ইমিগ্রেশন পার অইয়া সমীর পাঞ্জাব ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভারসিটির ছাত্র প্রদীপের সাথে কাঠমান্ডুর বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে পরিচয় হয়েছে। এরপর সারা রাস্তায় সে তার ছায়াশরীর হয়ে থেকেছে। গাড়ি দুঘণ্টা চলে আর থামে। সমীরের জলবিয়োগের চাপ সহ্য হয় না। রাস্তার পাশের খাবার দোকানদার গলা ছেড়ে ডাকছে আর বলছে খানা রুটি খা লে লো। অন্যরা যেখানে খাবার আর জলযোগে ব্যস্ততা দেখাচ্ছে, সমীরের যেখানে জলবিয়োগের তর সামলাতে ক্লীনরুম বা সিআরের সন্ধানে ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। উফ! কি প্রশান্তি তার জলবিয়োগযজ্ঞে। মনে হচ্ছে সে যজ্ঞেশ্বর। খুব দ্রুতই সম্পাদন করে রাতের খাবার খাসির মাংসের সুরার সাথে বেশ কয়েক টুকরো মাংস পাতে পরায় বউয়ের বিদ্রোহী মুখখানি মনে পড়ে গেলো। খাবার শেষে ঘন টকদই খেলো বেল্টখুলে। আবার জলবিয়োগের চাপে পড়লো সে। সেরে এসে বাসে উঠে কি ঘুম। এক ঘুমে প্রায় সকাল।
ভোরের আলোতে এক চিলতে রোদের ছ্বটায় তার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। গাড়িতে তখন ভিক্ষা কেমনে চাইয়ের দল উঠলো গানবাজনা নিয়ে। মিষ্টি সুরের আওয়াজে সমীর মিইয়ে যাচ্ছিলো— যাদু বাস্তবতার জগতে। অনেক পুরনো দিনের যন্ত্রানুসঙ্গ দেখে নেপাল প্রসঙ্গে তার ধারণা পাল্টাইয়া গেলো। হনুমান আকৃতির একটি যন্ত্র অনেকটা আমাদের দুতারার মতো। গায়েনদের মাথায় নেপালীয় টুপি দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, ঐতিহ্যের প্রতি তাদের মমতা কতো গভীরে। গান শুনতে শুনতে এক সময় গাড়ি কুটিলেশ্বরে প্রবেশ করলো। এসি বাসে বসে উষ্ণতা গায়ে লাগে নি সমীরের। কিন্তু বাস থেকে নামতেই ৩৫ ডিগ্রি তাপমাত্রাকে তার কাছে মনে হলো দোজখের আগুনের থাইক্যাও বেশী। আচে মগজ বাইর অইবার মতো অবস্থা তার। বেগতিক দেখে থামেল বাজারের একটি চাইনিজ হোটেলে রুম ভাড়া করে দিলো প্রদীপ। সেখানে গিয়ে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আবার বেড়িয়ে পড়লো বুদ্ধমন্দিরের সন্ধানে। মন্দিরের পাশে একটি নিরামিষাশীদের জন্য পরিচালিত হোটেল দেখে খেতে গিয়ে দেখলো খাবারের আখাড়ি দাম। যা মেটানো বেশ বিলাসিতার স্তরে পড়ে।
বুদ্ধমন্দির দেখতে টিকিট কাটলো সমীর। সাথে প্রদীপ। ঘুরে ঘুরে অনেক স্থাপনা দেখলো আর ছবি তুললো। দেখা শেষে একটু দূরের একটি রেষ্টুরেন্টে গেলো খাবারের খোঁজে। সেখানে গিয়ে নুডলস,মমো চিকেন আর নেপালি সালাদের জন্য অর্ডার দিলো। গুটি কয়েক শশা আর গাজরের ছিলা টুকরো প্লেটে সাজিয়ে দিয়ে বলছে এটাই নেপালি সালাদ। আর মমো আমাদের বাড়ির আধাকাচা ছই পিঠার লাখান। হালারা পকেট কাটার ধান্ধামান্ধা তো ভালোই জানে। এই যদি হয় হোটেলে তাইলে সন্ধ্যার পরে বার হাউসগুলোতে কি হয় চিন্তা করে বউয়ের দেয়া অভিসম্পাতের কথা মনে পড়ে গেলো সমীর হোসেনের।
বিকেলে আবার হোটেল রুমে ফিরে এসে ক্লান্ত গতর বিছানায় এলিয়ে দিয়ে ভাবছে আহা মধু,মধু। সন্ধ্যায় বারে যাওয়া যাবে। সঙ্গীতের মূর্ছনায় কিছুসময় ডুবে থাকলে বউয়ের সেই রাগী আর বেহাগ চেহারাখানি ভুলে যাবে। সন্ধ্যার একটু আগে বেয়ারা এসে মেনু জানিয়ে খাবার ডাক দিয়ে গেলো।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই পোষাকে অনাবৃত অর্ধেক শরীর জুড়ে ফসফরাস দ্যুতিজীব রিসেপশনের ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছে। চক্ষু তো চড়কগাছ। নিজেকে সামলাতে তার অনেক কষ্ট হচ্ছিলো। শেষে ডাইনিং টেবিলের দিকে পা বাড়ালো। সেখানে পাশের টেবিলে বসা এক তণ্বীকে ঘিরে আছে দুজন যুবক। অনেকটা এক ফুল দুই মালির মতো। যুবকদের বেলায় বেবি নাজনীনের হে যুবক গানটি খুবই প্রাসঙ্গিকভাবেই প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সমীর তুমি জানো না, এসব তোমার জন্য নয়। আবার আরেকটা ঈমানের পরীক্ষায় পড়ে গেলো। লিবিডোকে অবদমিত করে রাখলো। অথবা চেপে গেলো। তবে তেতুল হুজুরের কথা তার ঠিকই মনে পড়েছে। তাহেরির ঢেলে দিই তখন অতো জনপ্রিয়তা পায় নি। তবুও তার মনে ঢেলে দেবার বাসনার তীব্রতা সামলাতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
বেয়ারা এসে মেনু ধরিয়ে দিয়ে গেলো। প্রদীপই তার পছন্দে চিকেন স্যুপ আর সাদা ভাত সাথে নুডলস আনতে বললো। সবুজ চায়ের পানীয় মাগনা পেয়ে সে পানির বদলে চা- ই পান করতে লাগলো। বেশ তৃপ্তি ভরে খেয়ে নেপালীয় এক হাজার রুপি বিল দিয়ে বেড়িয়ে পড়লো।
থামেল বাজারের বারগুলো তখন একটু একটু করে জমে উঠছে। মওকা বুঝে প্রদীপকে সাথে নিয়ে হিরা চাই না,চুনি চাই না, চাই যে তোমার সম্পর্ক আর চাই না কোনো সম্পত্তি – নেপালি এক্সেন্টে গানগুলি যখন সমীর শুনছিলো তখন সে আরো বেশি আপ্লুত হচ্ছিলো। লম্বা গাউন পরে সুশ্রী গড়নের মেয়েদের নাচের মুদ্রায় যেন স্বর্গপুরীর আহ্বান ছিলো। একটু একটু করে বরফকুচি চুবিয়ে কোমল পানিয়ের সাথে নৃত্যদৃশ্য উপভোগ তার মন্দ লাগে নি। কিন্ত মন্দ লেগেছে বিল দেবার সময়। সবগুলি মেয়ে নাচের পরে এসে তাকে ঘিরে বসেছে আর ইচ্ছেমতো খেয়ে গেছে মদ আর চিকেন গ্রিল,নুডলস। এদের সাথে বারের মালিকও যুক্ত হয়েছে। গুণে গুণে সাড়ে পাচ হাজার ভারতীয় রুপি দিতে গিয়ে মূর্ছা যাবার যোগাড় হয়েছিলো সমীরের। বউয়ের আভিশাপ মনে হয় লেগেছে। বিড় বিড় করে সমীর আওড়াতে থাকে স্ত্রী,পুত্র, চা আর জল এই মিলে আমার কর্মফল। সমীর টলছে একটু নৃত্যেশ্বরীদের নৃত্যের তালে। তাকে ছুঁইতে দিচ্ছে তাদের পেলব বাহু, তারাও তার গ্রীবাদেশ চুম্বনে চুম্বনে ভরে দিচ্ছে। ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। যেখানে বউয়ের হাতের আঙ্গুলগুলো সঞ্চালিত হবার কথা ছিলো।
ললনারা তার দেহণ্বিষ্ট হচ্ছিলো আর তার শরীরে ডেঙ্গুজ্বর শিহরণ তুলছিলো,শরীরের নয় ওয়ালেটের প্লাটিলেট তখন বেশ নিচে নেমে গিয়েছিলো।বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের জন্য ঘোষিত শোককাতরতা নেপালকে তখনো ঘিরে রেখেছিলো বলে সমীরেরও ধাতস্থ হতে অনেক সময় লেগেছিলো বউয়ের আভিসম্পাত কাটিয়ে উঠতে। টিভিতে শ্যাম্পুর কুইক এফেক্টিভিটি নিয়ে বিজ্ঞাপনটি তখনো দেখানো হচ্ছিলো আর মডেলরা আমাদের পুঁজিবাদী কর্পোরেটদের মনোরঞ্জনে একটু একটু করে অনাবৃত হচ্ছিলো। সাথে ফেসবুকীয় প্রচারণাও পিছিয়ে নেই।

সাইফুর রহমান কায়েস
প্রধান সম্পাদক
শব্দকথা টোয়েন্টিফোর ডটকম

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:২৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীরব-নিথর অবয়ব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০