ঘোষণা

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী – প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তির দোলাচলে

সাইফুর রহমান কায়েস | শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 540 বার

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী – প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তির দোলাচলে

আজ আমরা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে পদার্পণ করলাম। একটা দেশ তার অভ্যূদয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে পা রাখার সাথে সাথে অনেকগুলি প্রশ্ন এসে যায়। আমরা জাতি হিসাবে মননের দিক থেকে কতোটুকু স্বাধীন হতে পেরেছি? পরিকাঠামো ও উপরি কাঠামোগত ভাবে কতোটুকু দৃঢ়তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছি? ত্রিশ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা বোনের হৃত সম্ভ্রমের মধ্য দিয়ে অর্জিত দেশের শির কতোটুকু উন্নত হলো? তাদের আত্মত্যাগকে আমরা কতোটুকু মূল্যায়ন করতে পেরেছি? একাত্তরে ঘটে যাওয়া হতাকাণ্ডগুলিকে নিঃসন্দেহে গণহত্যা বলা যায়। কিন্তু এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো সুদূর পরাহত। আমাদের মেধাশূন্য কূটনৈতিক তৎপরতা এর জন্য দায়ী। জাতিসংঘের মানবসম্পদ প্রতিবেদন অফিসের সদ্য সাবেক পরিচালক ডক্টর সেলিম জাহান স্যার একাত্তরে ঘটে যাওয়া নৃশংসতাকে গণহত্যা বলে দাবী করেছেন। তার এই দাবীর সাথে সকলেই সহমত পোষণ করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সংঘটিত গণহত্যা নিয়ে লেখালেখি করতে গিয়ে মাঠ গবেষণার সময় বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে সময় শুধু যে মানুষ হত্যা হয়েছে তাই নয়। নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছে,শিশুদের পদতলে পিষ্ট করে মারা হয়েছে। অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, ধর্মান্তরিত করাসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যে সেসময়ে পাকিস্তান আর্মি আর তাদের দোসর রাজাকার আলবদর বাহিনী করে নি। যেগুলো শুনলে আজো চোখ ভেসে যায় জলে, হৃদয় তনু শিউরে উঠে।
আমরা এখনো বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার করতে পারি নি। স্বাধীনতার মূলমন্ত্র গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার থেকে দূরে সরে গিয়ে একটি অযাচিত, অপ্রত্যাশিত সংবিধান নিয়ে চলছি। আমরা সংবিধানবিরোধী কাজে জড়িয়ে গেছি। সংবিধানকে বাহাত্তরের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে পারি নি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই দেশে মৌলবাদের আষ্ফালন দেখলে মনে হয় তারা এদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে চায়। শুধু যদি মুসলমানদের দেশ বলে বলে গলা ফাটায় তাহলে বুঝতে হবে তারা এইদেশে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। তাদের অস্বীকার করা মানে দেশের সংবিধানকে অস্বীকার করা। যেটি রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।
দেশ অনেকদিক দিয়ে এগিয়ে গেলেও মানবিকতার দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়েছে। তাই তো ধর্ষণ এখন শুধু সামাজিকই নয়, একটি রাষ্ট্রিয় ব্যাধি।
দেশের কথা চিন্তা করলে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে কবর দিতে হবে। মৌলবাদ একটা বড় রাষ্ট্রীয় ব্যাধির নাম। সাম্প্রতিক সময়ে মৌলবাদের উত্থান দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্যতম বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা দেশের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে এদেশে বিজাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে চায়। শান্তির ধর্ম ইসলামের দোহাই দেশে রক্তের হোলিখেলা চালাতে চায়। দেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক উষ্কানি পছন্দ করেন না। অথচ তাদের উপর এটি চাপিয়ে দেয়ার পায়তারা চলছে। যেকোনো মূল্যে একে প্রতিহত করাই হবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অঙ্গীকার। দেশে ঘটে যাওয়া বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে দেশকে মেধাশূণ্য করা হয়েছে যা আমরা কোনোদিনই পূরণ করতে পারবো না। এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। দেশকে পাঁচশত বছর পিছনে ফেলে দেয়া হয়েছে৷ এই ঘাটতি হয়তো আমরা কোনোদিনই পূরণ করতে না। প্রতিভাবান মানুষদেরকে কাজে লাগাতে হবে। যারা একসময় উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ গিয়ে আর ফেরৎ না এসে পেশাজীবি হিসাবে সেদেশেই থেকে গিয়ে বাংলাদেশকে তুলে ধরছেন তাদেরকে পরামর্শক হিসেবে দেশের কাজে লাগানো হোক।
গ্রে পিপলসের সংখ্যা আমাদের দেশে কম৷ তাদের মেধাকে কাজে লাগানো হোক। কর্মক্ষম যুবকের সংখ্যা আমাদের দেশে শতকরা ষাটভাগের বেশি। এদেরকে কাজে লাগানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি এবং কর্মপরিকল্পনা প্রণীত হোক।
এইদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন হয়েছে। তার জীবনের দামে এই বাংলা পেয়েছি আমরা। জাতীয় বীরদের অবদানের যথাযোগ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেয়া হোক। ম্যানিলার লুনিতা পার্ক বা হোসে রিসাল পার্কের আদলে আমাদের দেশেও হিরোস পার্ক করা হোক। যেখানে জাতীয় বীরদের আবক্ষলম্বিত ভাষ্কর্য থাকবে। ভাষ্কর্যের গায়ে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও বীরগাথাও লেখা থাকবে। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের বাঙালি নেতা বিপিন পালসহ অন্যান্য নেতাদেরও ভাষ্কর্য এই পার্কে ঠাই পেতে পারে।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সফল হোক। সার্থক হোক। মেহনতী মানুষ যেনো পিয়াজলংকা কাণ্ডে নাকাল না হয়, মজুদ্দারদের কবল থেকে মুক্তি পায়, সমাজে ন্যায্যতা এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। সরকার আরো ক্যাপেবল এবং কম্পিট্যান্ট হোক।
বাসে আগুন দিয়ে যেন আর কেউ বহ্নুৎসব পালন না করতে পারে সেদিকে বর্তমান সরকার আরো নজরদারী বাড়াবে যেটি অযাচিত, অপ্রত্যাশিত নয় কোনোভাবেই।
কর্মুমুখি শিক্ষার প্রসারে সরকারকে মনোযোগ আরো বাড়াতে হবে।
দেশের আবাদী জমির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিজমির মাটি দিয়ে ইট বানানো বন্ধ করতে হবে। কৃষিজমির টপসয়েল দিয়ে ইট বানানোর ফলে দেশের খাদ্যোৎপাদন ব্যাহত হবে। উৎপাদন হ্রাস পেলে মঙ্গা দেখা দিতে পারে। স্থায়ীভাবে এজন্য সরকারী প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।
পরিবেশ এবং প্রতিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমাদের সকল অর্জন বিসর্জনের পাল্লায় উঠবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের প্রাক্কালে আমি এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি। জয়বাংলা।
আমি আবারো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবী করছি। সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করুক। মৌলবাদ নিপাত যাক। মানবতা মুক্তি পাক। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এইদেশে রোজায় পূজায় মিল হোক। আল্লাহ ভগবান ঈশ্বরে মিল হোক। মন্দিরে ঢাক বাজুক। মসজিদে আযান পড়ুক। গীর্জাগুলি হালেলুইয়া ধ্বনিতে মুখরিত হোক। বুদ্ধের বাণী ছড়িয়ে পড়ুক সারাদেশে। সিব্বে সিত্তা ভবে।
এই দেশ কুলিদের,কুলীনদের, মুটেদের, মজুরের, আশরাফ আত্রাফ সকলের। সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের অমিতাভ তেজে উঝীবিত হোক পুরো বাঙালি জাতি। রক্তের দামে কিনেছি বাংলা, এদেশ কারো দানে পাওয়া নয়। বাংলাদেশ আমার সূর্য। বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। এই দেশ, এই মাটি পবিত্র। তাই তো সকল দেশের সেরা এই দেশ।
একটি স্থিতিশীল সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বাহ্যিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিকতার উন্নয়ন।
বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে সরকারকে মনোনিবেশ এবং অভিনিবেশ করতে হবে।
পঞ্চাশবছর ধরে ক্রমাগতভাবে বেড়ে যাওয়া নারী বিদ্বেষ এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে রুখে দাঁড়ানো সময়ের দাবী৷ প্রযুক্তির প্রসারের ফলে এটি আরো বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতার নীতির বাস্তবায়ন চাই। আরো কঠোর সেন্সরশীপের আওতায় আনতে হবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটে যাওয়ায় দেশটি উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে। তাই যাতে ডিরেইল্ড বা বেপথু না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। উন্নয়নের পাশাপাশি যমজ ভাইয়ের মতো হাত ধরে দুর্নীতিও অব্যাহত রয়েছে। বড় প্রকল্প মানেই বড় ধরনের দুর্নীতি। তাই কলসিতে পানি ভরার আগে ছিদ্র বন্ধ করতে হবে। না হলে সুবর্ণজয়ন্তী পালনের কোনো সার্থকতা নাই। বিভিন্ন প্রকল বাস্তবায়নের নামে সরকারী কর্মকর্তাদের অযাচিতভাবে বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করতে হবে। অহেতুক যেকারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গিয়ে গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে যাতে দেখা না দেয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অযাচিত করের বোঝা চাপানো যাবে না।
আরেকটি প্রত্যাশার কথা বলে শেষ করে দেবো। দেশের প্রতিটি সরকারী হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যাকেন্দ্রের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি ইউনিট স্থাপন করতে হবে। বেশি সংখ্যায় মনোবিদ, ফিজিওথেরাপিস্ট গড়ে তুলে তাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। তবেই একটি সুস্থ জাতি গড়ে উঠবে। মনে রাখুন, সুস্থ জাতি, সুস্থ দেশ।

সাইফুর রহমান কায়েস
প্রধান সম্পাদক
শব্দকথা টোয়েন্টিফোর ডটকম

 

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৯:৩১ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত