ঘোষণা

হাতছাড়া সাম্রাজ্য

| শুক্রবার, ১২ জুন ২০২০ | পড়া হয়েছে 92 বার

হাতছাড়া সাম্রাজ্য

আফসানা বেগম : আজ মঈন বাড়ি ফিরবে। ফোন করে জানাল, ব্লাড প্রেশার হাই; কিছুটা জ্বরজ্বরও। ফ্যাক্টরির কোয়ারেন্টিন থেকে প্রায় তিন সপ্তাহ পরে ফিরছে। রিনির নিজের শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না, মঈন আসবে শুনে অস্বস্তিতে পড়ল। তবে তাকে এতদিন পরে বাড়িতে ফিরতে নিষেধ করতে পারল না।

বাড়ির জায়গাটায় যে লকডাউন হয়ে যাবে, রিনি ভাবতে পারেনি। মোহাম্মদপুরের এদিককার জেনেভা ক্যাম্পের গলিগুলো ঘিঞ্জি। লম্বা দুটো গলিতে বাজার- দুদিকে সারি বাঁধা ঘুপচি ঘুপচি দোকান, মাছের বা সবজির উপরে সমানে পানি ছিটানো হচ্ছে, পাশ দিয়ে গেলে গায়ে পানি ছিটে এসে পড়ছে, মালামাল দিতে এলে ছোট পিকআপ ভ্যান পুরো রাস্তা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে- ওরকম সময়ে কখনো রিনিদেরকে আধাঘণ্টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আধা বাংলা আর আধা উর্দু-হিন্দিতে খিস্তি কি ওখানে থামা সম্ভব? কিন্তু থামল। দিনরাত হইহল্লা তোলা বাজারটা সপ্তাহ খানেকে খাঁখাঁ করতে লাগল। রিনি জানালা দিয়ে দেখতে পেল। ওই বাজারের গলির শেষ মাথায় পাঁচিলঘেরা কয়েকটা পাঁচতলা বাড়ি। সবকিছু সুনসান হয়ে এলে তারই একটা বাড়ির পাঁচ তলার একটা ঘরে রিনি জন্মের তরে আটকা পড়ল।

একটা ঘরেই যে আটকা পড়ল, ঠিক তা নয়; পুরো বাড়িটাই তার দখলে। কিন্তু একা মানুষ তাই শোবার ঘর থেকে বোরোতে রাজ্যের আলসেমি। অবশ্য অলসতাটা শারীরিক নাকি মানসিক, রিনির জানা নেই। লকডাউন শুরুর এক সপ্তাহ আগে মঈন চলে গেল ফ্যাক্টরিতে। সংক্রমণের ভয় আছে কিন্তু ফার্মাসিউটিক্যাল ফ্যাক্টরি চালু থাকতে হবে, ওষুধ যে বানাতেই হবে। ফার্মাসিস্টদের আসা-যাওয়া ঝুঁকি বলে মঈনকে ফ্যাক্টরির ভিতরে কোয়ার্টারে উঠতে হলো।

আর অন্য আরেকটা শোবার ঘর বহুদিন ধরে খালি। ঘরটার দিকে তাকালেই তার চোখে পানি আসে। ছেলেটা কানাডায় পড়তে গেছে গত বছর। মার্চে দেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু মার্চ আসতেই ফ্লাইট বন্ধ হয়ে বিতিকিচ্ছি অবস্থা হলো। ছেলে অবশ্য শেষ ফ্লাইটেই আসতে চেয়েছিল। কিন্তু মঈন রাজি হলো না। বলল, ‘দেখ, আমি ওষুধ বানাই, হাসপাতালের ব্যাপারস্যাপার আমার ঢের জানা আছে। ওখানেও এত মানুষ মরতেছে সেইটা ঠিক, কিন্তু এখানে আসলে মরা ছাড়া উপায় নাই।’

ছেলে চলে যাবার পর থেকে বাড়ি শূন্য হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রিনি আর মঈন যা ভেবেছিল সে রকম কিছু হয়নি। সে থাকতে তাদের দু’জনের মাঝখানে মাধ্যমের মতো কাজ করত। তর্কাতর্কি-রাগারাগি হলে যখন দু’জনের মধ্যে কথা বন্ধ হয়ে যেত, ছেলেটা একজনের কথা আরেকজনকে গিয়ে বলত। রিনি হয়তো বলত, ‘উপল, তোর বাবাকে ভাত খেতে ডাক।’ উপল ডেকে দিত। মঈন এসে ভাত খেতে বসে হয়তো বলত, ‘উপল, তোমার মাকে বলো আজকে ডালে লবণ দিতে ভুলে গেছে।’ একই টেবিলে বসা উপল বলত, ‘মা, আজকে ডালে লবণ দেয়া হয় নাই। আমি না, বাবা বলছে।’ রিনি তখন মুখ ঝামটা দিয়ে লবণদানিটা এগিয়ে দিয়ে বলত, ‘তোর বাবাকে বল, একদিন কাঁচা লবণ ছিটিয়ে খেলে প্রেশার এমন কিছু বাড়বে না।’ উপল বাবার দিকে লবণদানি এগিয়ে দিয়ে চোখের ইশারায় সেটাই বলত। এভাবে চলতে চলতে এক সকালে দেখা যেত রিনি আর মঈনের মাঝখানে মাধ্যমের দরকার পড়ছে না। দু’জনেই ফুরফুরে মেজাজে কথাবার্তা চালাচ্ছে। উপল যখন আরো ছোট তখন ভাবত, কাল রাত অব্দি তাকেই যোগাযোগ করিয়ে দিতে হয়েছে, তারপর শুধু একটা রাতের মধ্যে তাদের ভিতরে হলোটা কী!

রিনির মনে হতো, উপল কানাডা গেলে ঝগড়ায় কি কথা বন্ধ করে বসে থাকবে? কিন্তু অবাক হলো, পুত্রের সঙ্গে দূরত্বের শোকে তারা একজন আরেকজনকে আঁকড়ে ধরল।

সকালে ওঠার পর থেকে ব্যথায় শরীরটা বিছানায় ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করল রিনির। কিন্তু মঈন আজ বিশ দিন পরে ফিরছে, ভালো কিছু রান্না করতে হয়। মাসের বাজার রান্নাঘরে আর ফ্রিজে ঠাসা আছে। রিনি একা ওট্‌স আর দুধ-পাউরুটি দিয়েই চালিয়ে নিচ্ছিল। দু’দিন নিচে গিয়ে শিঙাড়াও কিনে এনেছে। বাজারের ছোট্ট দোকানে হঠাৎ কোনোদিন শিঙাড়া বানায়। টিনের চালের উপরে ধোঁয়া উঠতে দেখলে রিনি বোঝে, শিঙাড়া ভাজা হচ্ছে। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের লোকেরা ভাজাপোড়া ছাড়া কতদিন আর থাকতে পারে! ওখানে থাকতে থাকতে রিনিও সেই দলের হয়ে গেছে। তাই নাক-মুখ-হাত ঢেকে শিঙাড়ার লোভে গেরিলা কায়দায় গিয়ে ফিরে এসেছিল।

রিনিদের বিল্ডিংগুলোর দেখাশোনা করার কমিটির প্রধান বাড়ি বাড়ি এসে বলে গিয়েছিল যে গেট এখন থেকে বন্ধ থাকবে। মশা-মাছিও এপার-ওপার হতে পারবে না। তার দিন-পনেরো আগে অবশ্য লোকটাকে নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছিল। ভুঁড়ি নাচিয়ে হে হে করে হেসে বলেছিল, ‘শোনেন, আমাদের কিন্তু চিন্তা নাই। বিল্ডিংগুলাতে তিন জন ডাক্তার আছে। অসুবিধা হইলে তাদেরকে হাতের কাছে তো পাইলামই; আবার ধরেন ক্লিনিকে ভর্তি হইতে হইলেও পাইলাম।’ তারপর সপ্তাহ ঘুরতেই লোকটার চেহারা বদলে গেল। লকডাউন হতেই দেখা গেল ডাক্তারদের পরিবারগুলোর গতিবিধি তীক্ষষ্ট চোখে লক্ষ্য করছেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ডাক্তারদের উপরে নজরদারি বসানোর জন্য সমর্থন খুঁজছেন। কয়েকজনের সায় মিললে ডাক্তারদেরকে এখানে থাকা-না থাকার কথাটা বলে দেয়া যেত। রিনি বলেছিল, ‘ভাই, তাদের নিজেদের বাড়ি, আপনি কি বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলতে পারবেন?’ লোকটা আক্ষেপ করেছিল, ‘উহ্‌ ওই কয়টা লোকের জন্য আমরা এতগুলা মানুষ মারা পড়ব দেখতেছি!’

রান্নাঘরে গিয়ে রিনি ঠিক করল কী রাঁধবে। মঈনের পছন্দ সবজি। কালোজিরা আর রসুন দিয়ে মিষ্টিকুমড়া ভাজি তার প্রিয়। কুমড়া কাটতে কাটতে রিনি ভাবল, এই যে একজনের সঙ্গে এতদিন থাকা, তার পছন্দ-অপছন্দ তিল তিল করে জানা, তাকে খুশি করার আপ্রাণ চেষ্টা, এই সবকিছু অদ্ভুত আনন্দের। ফ্রিজ থেকে মাছ বের করবে ভেবেও মুরগি বের করল। মঈন বলে, মিষ্টিকুমড়ার সঙ্গে যায় মাংস। মুরগি হলে চলে তবে গরু হলে আরো ভালো। কিন্তু সিদ্ধ হতে সময় লাগবে, রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নেই রিনির। কেন যেন শুধু শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল। গলায় বেশ ব্যথা। আগে আদা-চা খেয়ে নিলে হয়। রিনির এত গলাব্যথা শুনে মঈন বাসায় থাকলে নিজেই লেবু বা আদা দিয়ে চা বানিয়ে দিত। রিনি চা পছন্দ করে বলে সিলেটের চা বাগান থেকে বন্ধুকে বলিয়ে চা আনিয়েছে মঈন।

চা খেতে খেতে উপলের ফোন।

রিনি দুটো কাশি দিতেই ওদিক থেকে উপল অস্থির হয়ে বলল, ‘কাশতেছ কেন, মা? কালকে রাতেও তুমি একবার কাশছিলা কিন্তু।’

‘আরে, কিছু না, ফ্রিজের মুরগি কাটতে কাটতে একটু ঠান্ডা পানি ঘাঁটাঘাঁটি করতেছি তো, তাই।’

উপল চিন্তায় পড়ল, ‘না মা, যাই বলো তুমি, লাইটলি নিও না। একবার টেস্ট করে ফেল।’

‘বাদ দে, এত চিন্তা করিস না। সিজনাল ঠান্ডা লাগালাগি আমার তো হইতেই থাকে। গরম পড়ছে না এখন?’

‘না মা, তোমার সুগার হাই, চান্স নিও না কিন্তু।’

‘ধুর, চুপ কর তো; আমার কিছু হবে না।’

রিনি ছেলেকে চুপ করিয়ে দিলেও নিজে ঠিকই সর্দি-কাশি নিয়ে ভেবেছিল। তাই পাশের বিল্ডিঙের একজন ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছিল, টেস্ট করা যাবে কিনা। ডাক্তার গতকাল বিকেলেই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। একজনকে পাঠিয়ে রিনির নাক থেকে স্যাম্পল নিয়ে গেছেন। টেস্ট করার আগপর্যন্ত একবারও ভয় লাগেনি। বেঁচে থাকতে থাকতে নিজেকে অমর মনে হয়। এমনকি নিজের আশপাশের প্রিয় মানুষগুলোও কখনো মরে যেতে পারে, ভাবা যায় না। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রিনি সে রকমই ভাবছিল। দীর্ঘদিন কলোনির বাচ্চাদের ক্রিকেট খেলা বন্ধ। গাড়ির চাকাও সামনের ঘাসগুলোকে এতটুকু চেপে দেয় না। নির্মাণ শ্রমিকদের আনাগোনা নেই। নেই ইটের খোয়া বা বালুর ঢিবি। দু’তিন দিনের বৃষ্টিতেই বাসার সামনের মাঠমতো জায়গাটা কচি ঘাসে সবুজ হয়ে উঠেছে। পা থেকে মাথা অব্দি কাগুজে পোশাকে স্যাম্পল নেয়া লোকটাকে রিনি সবুজের উপর দিয়ে আড়াআড়ি হেঁটে যেতে দেখেছিল। ব্যাপার হলো, ওই লোকটার যাওয়ার পথ ধরে রিনির ভয় ভয় লাগতে শুরু করল। তার পর থেকেই মনে হতে লাগল, খবর এলো বুঝি- এই জানা গেল টেস্টের রেজাল্ট পজিটিভ। কী করবে সে তাহলে? মঈন এসে পৌঁছানোর আগেই জানা যাবে কি? মঈনকে বলতে হবে বাইরের ঘরেই থাকতে, ওদিককার বাথরুমটা ব্যবহার করতে। কিন্তু রান্না করা এসব খাবার, ছোঁয়া লাগা বাসনপত্র আর আসবাব? কিছুই তো মঈনকে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না! রিনির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ফিরে যেতে বললে মঈন যদি সত্যিই চলে যায়? তার পক্ষে একা থাকা সম্ভব? আতঙ্কে শরীরে একটা ঝাঁকি খেল রিনি।

একবার রিনির চাচাত বোন ঢাকায় চাকরির পরীক্ষা দিতে এসে দিনসাতেক তাদের বাড়িতে থেকেছিল। রিনির সঙ্গে গল্প করে তাদেরকে রেঁধে-বেড়ে খাইয়ে কাটিয়েছিল কয়েক দিন। একদিন মুগ ডাল দিয়ে এমন মজার মুরগির মাংস রাঁধল যে মঈন অর্ধেকটা তরকারি খেয়ে ফেলল। চেটেপুটে খাওয়া দেখে রিনির যেমন ভালোও লাগছিল আবার বিরক্তিও। রিনির রান্না কি ভালো হয় না যে হঠাৎ মেহমানের রান্না খেয়ে ওরকম আহদ্মাদ দেখাতে হবে? এটা ভাবার জন্যে রিনির মনে মনে খানিকটা লজ্জাও লেগেছিল, কিন্তু ভাবনাটা থেকে মুক্তি হয়নি। কেন মঈন সব আনন্দ শুধু রিনির কাছ থেকে পেতে পারে না? কেন অন্যেও তাকে এতটা আনন্দিত করবে? মনে মনে চাচাত বোনের চলে যাবার দিনক্ষণ হিসেব করছিল রিনি। বলা যায় না, রিনি একবার শুনেছিল, পুরুষের পাকস্থলী দিয়ে শুরু করলে মনটা সহজে জয় করা যায়। ওদিকে চাচাত বোন দেখতে-শুনতেও খারাপ ছিল না। কয়েকটা দিন নিদারুণ আতঙ্কে কাটিয়েছিল রিনি।

আতঙ্কে থাকত মঈনও। বিশেষ করে যখন তাদের মধ্যে ঝগড়াপরবর্তী বিরহের কাল চলত। একই ঘরে উঠছে-বসছে কিন্তু কথা নেই। দু’জনেই যেন দু’জনের কাছে অদৃশ্য, তাই চোখে চোখ পড়াও নেই। ওরকম দিনগুলোতে মঈন একসময় চাইত রিনি তার সঙ্গে কথা বলুক। বাড়ির কোনো এক কোণে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে রিনির চলাফেরা দেখত। রিনি টেবিল মুছছে, রান্নাঘরে যাচ্ছে চা বানাতে, বানিয়ে নিয়ে টেবিলে বেশ শব্দ করে রাখছে যেন মঈন টের পায় আর ঠান্ডা হবার আগেই নিয়ে চলে যায়। মঈনের কখনো রাগ হতো, এতগুলো দিন গেল রিনি কথা বলছে না কেন? দোষ কি তার একার? পরপরই শিরশিরে ভয় তাকে চেপে ধরত, মার্জিত সুন্দরী রিনির কি হুট করে কারো সঙ্গে পরিচয় হয়ে যেতে পারে না? বাজারে যায়, ব্যাংকে যায়, কত লোকের সঙ্গে দেখা হয়! কিংবা আত্মীয়-বন্ধুদের মধ্যেই কারো সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক হবার সম্ভাবনাটাইবা কী করে উড়িয়ে দেয়া যায়? তাই বুঝি মঈনের সঙ্গে কথা না বলেই সে শান্তিতে আছে? মঈনের মাথায় চক্কর দিয়ে উঠত এরকম ভাবনা এলে। নিজেকে বলত, না না, রিনি তারই আছে, সামান্য অভিমান করেছে কেবল। কিন্তু ভাবনা দিয়ে আশঙ্কাকে কোনোমতেই উড়িয়ে দিতে পারত না। এইসমস্ত ভাবনা এলে প্রতিবার নতুন করে জানা হতো যে রিনিকে ছাড়া তার চলবে না। সেদিন ফ্যাক্টরিতে থাকতে যেতে হবে জানতেই ভাবনাগুলো মঈনকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। মুখে বলেছিল অন্য কথা, ‘রিনি, আমি চলে গেলে তুমি কী করে থাকবে একা বাড়িতে? উপলও তো নেই। বাইরে যাওয়ারও উপায় নেই!’ বলতে বলতে মনের কথাটাও বেরিয়ে এসেছিল, ‘শোনো রিনি, ভাইরাসটা ধরতে কিন্তু এক সেকেন্ডও লাগে না। খবরদার, বাইরে যাবে না। মোটেও আর কেউ যেন বাইরে থেকে বাড়িতে ঢুকতে না পারে, বুঝেছ?’

রিনি বুঝেছে। এসব চিন্তা কি আর তার মাথায় ছিল না? উপলটাও নেই আর মঈনও চলে যাচ্ছে; দিনের পর দিন আর রাতের পর রাত কাটবে কী করে? টেলিভিশনে আক্রান্ত আর মৃত্যুর খবর আর কতক্ষণ দেখা যায়! ফেসবুকে কারো হাসিমুখ দেখলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। একটা ভালো গান কি চার লাইনের কবিতা, তা-ও যেন অসহ্য। কিন্তু সেসব মনে চেপে রিনি বলেছিল, ‘আচ্ছা, কী তখন থেকে একা থাকব একা থাকব করছ? দুনিয়ায় হাজার রকমের ভিডিও কল আবিস্কার হয়েছে না? তুমি-আমি চাইলেও আর দূরে থাকতে পারব?’

‘মানে? চাইব কেন! কেন দূরে থাকতে চাইব বলো তো?’

‘আরে আমি কি তাই বলেছি নাকি? তুমি যাও, আমি এই দরজা বন্ধ করব আর তুমি এলে খুলব, হলো?’

রান্না শেষ করে রিনি একাই দুপুরের খাবার খেয়ে নিল। বহুদিন পরে ভাপ ওঠা ভাতের গন্ধ শুঁকে পেট চোঁ চোঁ করে উঠল। এতদিন যত্তসব আবোলতাবোল খাবার খেয়ে থেকেছে সে। দুপুরে খাবার মানে হলো গিয়ে ধোঁয়া ওঠা ভাত। কিন্তু খেতে গিয়ে কেন যেন মনে হলো, খিদে মরে গেছে কিংবা খিদে পাচ্ছে না। ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠল রিনি। সামান্য বাইরে যাওয়াতেই করোনা ধরে ফেলেনি তো তাকে? ইস্‌ কোন দুঃখে সে বিহারি রোডের শিঙাড়া খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছিল!

আধাখেঁচড়া খাওয়ার পর রান্নাঘরসহ বাড়িটা কোনোরকমে পরিস্কার করে নিল। কিন্তু মঈন আসার আগেই বিল্ডিঙের ডাক্তারের ফোন এলো। ডাক্তার আমতা আমতা করে বললেন, ‘ভাবি, হোয়াটসঅ্যাপে একটা ছবি পাঠাচ্ছি। আপনার টেস্ট রিপোর্ট। মনটা শক্ত রাখুন, মনোবলটাই আসল।’

রিনি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। ওদিক থেকে ক্রমাগত হ্যালো হ্যালো শুনে শেষে বলল, ‘ভাই, আমার কিন্তু সুগার বেশ হাই।’

‘হ্যাঁ, অনেক সাবধান থাকতে হবে। কাল-পরশু থেকে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। যা হোক, ভয় পাবেন না; রাতে ফিরে সামনাসামনি কথা বলব, কেমন? এর মধ্যে বেশি অসুবিধা মনে করলে মেসেজ দিয়েন। আমি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করব।’

কথা শেষ হলে রিনি হোয়াটসঅ্যাপ দেখল। ছোট্ট কয়েক লাইনের রিপোর্ট, পাতার উপরের দিকেই শেষ। তিন লাইনে নাম-ঠিকানা-বয়সের নিচে ছোট্ট করে লেখা, রেজাল্ট :পজিটিভ। রিপোর্টটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রিনির চোখ ঘোলা হয়ে এলো। চোখের উপরে কাচের মতো পানি জমল। পাতাটার বাকি খোলা জায়গায় রিনি চোখের পানির মতো স্বচ্ছ কিছু দিয়ে ক্রমাগত লিখে চলল, আমি বাঁচতে চাই, আমি বাঁচতে চাই, আমি বাঁচতে চাই।

সামান্য শ্বাসকষ্ট আর একটু জ্বরজ্বর, এতেই এতকিছু হয়ে যাবে কে জানত! শুনেছিল, টেস্ট করানোর জন্যেও নাকি বিশাল ধরাধরির ব্যাপার আছে। জরুরি হলে মন্ত্রীও ধরতে হতে পারে। কিছু লাগল না। কিন্তু এখন রিনি কী করবে? একে ডায়াবেটিস আর অনেকদিন হলো নিজের তেমন দেখাশোনাও করেনি। বাঁচার কি সুযোগ আছে? ভাবতেই কাশি শুরু হয়ে গেল। রিনি বুঝতে চেষ্টা করল- কাশিটা শারীরিক নাকি মানসিক? কথা হলো, মঈনের থেকে দূরে থাকতে হবে। সে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে। তার ব্লাড প্রেশার আর সুগার, দুটোই বেশি। কোয়ারেন্টিনে বাঁচতে এসে বেচারা সোজা করোনা রোগীর কোলের মধ্যে ঢুকে পড়বে, ভাবতেই রিনির মাথাটা ঘুরে উঠল। মঈনকে ফোন করা দরকার। সে ফিরে যাক। ফ্যাক্টরির হোস্টেলের কোনো একটা ঘরে নিজেকে বন্দি করে ফেলুক। রিনি ফোন ওঠাল। মঈনের ফোন ব্যস্ত। ক্রমাগত কয়েকবার নম্বর টিপে কাঁদতে কাঁদতে রিনি শোবার ঘরে আশ্রয় নিল।

আর তখনই বাসার দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ পেল। দরজা খুলে গেল। রিনি চোখ মুছে মুখ আর গলার ঘাম মুছে নিল। এতদিন পরে ফিরে এরকম কাঁদো কাঁদো মুখ দেখতে কেমন লাগবে মঈনের? কে জানে আর কয়দিনইবা দেখতে পায় তাকে!

রিনি দরজার ফাঁক দিয়ে মঈনের উপরে নজর রাখল। মঈন ঘরে ঢুকে রিনিকে ডাকল না। ভারী ব্যাগটা একদিকে নামাল। মাস্ক আর হ্যান্ড গ্লাভস ময়লার ঝুড়িতে ফেলে হাত ধুয়ে নিল। তারপর সোফায় গা দিল এলিয়ে। পাশে ফেলে রাখা ফোনটার দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকাল। উদাস চোখে সামনের জানালার দিকে তারপর। মানুষবিহীন পৃথিবীর ফুরফুরে বাতাসে সাদা পর্দাগুলো পতপত উড়ছিল। শিশু গাছের ডাল পাঁচতলার জানালা অব্দি উঠে এসেছে প্রায়। পাশে দাঁড়িয়ে রিনি শিশু গাছের ডগাটাকে প্রায়ই বলত, ‘রিনি আর মঈনের সংসার দেখতে এসেছ? আরেকটু লম্বা হতে হবে যে।’

রিনি পাশ থেকে মঈনকে দেখল। খুব ক্লান্ত? খাটনি গেছে নাকি এ ক’দিন? আহা! দেখতে দেখতে খুঁজে পেতে কেনা প্রিয় আসবাব, শখের টুকটাক জিনিসসহ সংসারটাকে আকস্মিক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য বলে মনে হলো। ঝকঝকে বাড়িটা ঝলমল করে উঠল। অথচ সে মরে গেলে এই সাম্রাজ্য বেদখল হয়ে যাবে! অন্য কেউ এই ঘরে উড়ে এসে জুড়ে বসবে নির্ঘাত। অন্য কারো গন্ধ ছড়িয়ে থাকবে। শিশু গাছের ডাল এসে অন্য কাউকে দেখবে মঈনের সঙ্গে। দেখবে অন্য কেউ তারই মতো করে মঈনকে জড়িয়ে ধরছে, জড়িয়ে ধরে মঈনকে. . . বেশিদূর ভাবতে পারল না। সিদ্ধান্তটা নিল দ্রুত। তারপর ধীরপায়ে মঈনের দিকে এগিয়ে গেল। সোফাতে হেলান দেয়ার জায়গাটা ছুঁয়ে হাত দুটো গড়িয়ে মঈনের দুই কাঁধে রাখল। পিছন থেকে রিনির হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠল মঈন। রিনির ঘাড়ের দু’পাশে হাত পেঁচিয়ে মুখটা টেনে নিল নিজের দিকে।

ফোনটা পাশে পড়ে থাকল যেখানে একটু আগে এক ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে মেসেজে কথা হচ্ছিল মঈনের। বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই রিনির ব্যাপারে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল মঈন। দুঃখ করে বন্ধু বলছিল, জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল খেয়ে তেমন লাভ নেই, দোস্ত। তোর রিপোর্ট এসেছে, রেজাল্ট : পজিটিভ।

সূত্র: কালের খেয়া

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:১৬ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ১২ জুন ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

বিটলবণের স্বাদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ফেরা

১৪ মার্চ ২০২০

জোছনায় কালো ছায়া

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০