ঘোষণা

৩০ বছরে কোথায় গণতন্ত্র

সাদী মুহাম্মাদ আলোক | সোমবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 103 বার

৩০ বছরে কোথায় গণতন্ত্র

খায়রুল কবির খোকন, রুহিন হোসেন প্রিন্স ও শফি আহমেদ। (বাম দিকে থেকে)

দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করে স্বৈরাচার এরশাদ সরকার। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এক হয়ে তিনটি জোট গঠন করেছিল। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পরে এই ৩০ বছরে দেশ তো এগিয়েছে। কিন্তু, গণতন্ত্র কতটুকু এগোল? স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের তিন ছাত্রনেতার সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডেইলি স্টার।

ডাকসুর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ছাত্রনেতা খায়রুল কবির খোকন বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যুগ্ম মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘যে উদ্দেশ্যে নব্বইয়ের আন্দোলনটা আমরা করেছিলাম, আমাদের অনেক সহকর্মী জীবন দিলেন, মানুষের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা তো আজ বহু দূরে। আমাদের আশা ছিল একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসবে, মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে, স্বৈরাচার সরকার আর আসবে না, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে, সাংবিধানিক অধিকার আমরা ফিরে পাব, মানুষ ভোটাধিকার পাবে। অথচ আজকে ৩০ বছর পরে এসেও ভোটাধিকারসহ মানুষের মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসনের জন্য আমাদেরকে লড়াই করতে হচ্ছে।’

‘এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য যে স্বৈরাচার ব্যক্তির পতন হয়েছে, কিন্তু, স্বৈরাচার ব্যবস্থার পতন হয়নি। স্বৈরাচার ব্যবস্থা এখনো বিদ্যমান। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান যদি দলীয়করণ করে ফেলা হয়, সেখানে তো মানুষের মৌলিক অধিকার বলে কিছু থাকে না। সেই অবস্থায় আজ দেশের পরিস্থিতি। আজ গণতন্ত্রের সঙ্গে ফ্যাসিবাদের সংঘাত চলছে। তিন জোটের রূপরেখায় ছিল স্বৈরাচারকে আমরা কোনো আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবো না। কিন্তু, দুর্ভাগ্য আমরা তাদের লালন-পালন করে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করেছি। গত ৩০ বছরে অবকাঠামোগতভাবে দেশ কিছুটা এগিয়েছে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে যেটা মানুষের সবচেয়ে বড় বিষয়, সেই গণতন্ত্র আমাদের এখানে এখনো অধরা। আমাদের এখানে মুখে গণতন্ত্রের কথা বলা হয়, কিন্তু, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মুখে মধু, অন্তরে বিষ। কথা আর কাজের সঙ্গে কোনো মিল নেই’, বলেন তিনি।

‘স্বাধীনতার ৫০ বছরেও দেশের মানুষ পরাধীন’, উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আমরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছি, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। এখন স্বাধীনতার ৫০ বছরে স্বাধীন দেশে আমরা পরাধীন। স্বাধীনতার সুফল আমরা ভোগ করতে পারছি না। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। আমরা এখনো জাতীয় ঐক্যমতে আসতে পারিনি। শুধু ক্ষমতাকে আকড়ে ধরে রাখার জন্য যত রকমের নিপীড়ন-নির্যাতন, গুম-খুন, হামলা-মামলা, লুটপাট, দেশের বাইরে অর্থপাচার, সবই আমরা করছি। কিন্তু, আইনিভাবে এগুলোর কোনো বিহিত হচ্ছে না।’

নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার যে বিধান ছিল, সেটাকে বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে আজ তারা নির্বাচন করছে। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না জেনেও তারা এটা করছে। কারণ, তারা জানে যে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তারা পরাজিত হবে। তাই প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে তারা ক্ষমতা দখল করে আছে।’

‘বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজমান, এর বিরুদ্ধে আমাদেরকে আবারও লড়াই করতে হবে। আমার আশা, দেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের চেতনায় আবারও বর্তমান অবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে। হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনবে’, যোগ করেন খায়রুল কবির খোকন।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় নেতা ও ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘৩০ বছর পর এসে আজকে হিসাব মেলালে দেখি, সাধারণভাবে বলতে গেলে আমরা তো কোনো ব্যক্তির পতন ঘটাইনি; একটা ব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছিলাম। সেই ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে নতুন একটা ব্যবস্থা তৈরি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, সেটা আমরা পারিনি। প্রথমত, গণতন্ত্রকে এখনো আমরা একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। মানুষের ন্যূনতম ভোটের অধিকার ছিনতাই হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, তিন জোটের রূপরেখায় কথা ছিল আমরা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করব। কিন্তু, সেটা আজ ভূলুণ্ঠিত। অনেকে এটাকে ব্যবসায় পরিণত করেছে। তৃতীয়ত, আচরণবিধির মধ্যে অনেক কথাই ছিল। এর মধ্যে তিন নম্বর ধারায় ছিল আমরা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেবো না এবং সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রপাগান্ডা এলে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করব। আমরা দেখতে পাচ্ছি আজকে এই শাসক দলগুলোর ক্ষমতাশ্রয়ী ও নীতিহীন রাজনীতির কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।’

‘চার নম্বর আচরণবিধিতে একটা কথা ছিল যে, আমাদের পরস্পর সংকট হলে আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেটা মিমাংসা করব। কিন্তু, আমরা দেখছি, ক্ষমতাশ্রয়ী রাজনীতি আজ এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে, পরস্পর অসহিষ্ণুতা এমনভাবে ফুলে উঠেছে যে আমরা পরস্পরকে শক্র হিসেবে বিবেচনা করি এবং কোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন মনে করি না। আমরা যে নয় বছর আন্দোলন করেছিলাম, সেখানে গণতন্ত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিজস্ব দাবি ছিল। ছাত্র সমাজের ১০ দফাসহ প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষেরই দাবি ছিল। আজকে সেসব দাবিগুলো একেবারেই উল্টো পথে যাত্রা করেছে। সেগুলো ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের দাবিই মানা হচ্ছে না। অতএব এরকম একটা সংকটে দাঁড়িয়ে আমি স্বৈরাচারবিরোধী নয় বছরের সংগ্রামের একজন কর্মী হিসেবে জনগণকে নতুন করে আবার জাগ্রত হয়ে সেই চেতনা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি’, বলেন তিনি।

সঠিকভাবে নির্বাচন করা ও গণতন্ত্রকে একটা স্থায়ী রূপ দেওয়ার কথা থাকলেও তা আজ ভূলুণ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করেন রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, ‘আজ মানুষের ভোটের অধিকার নেই। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত। সুতরাং আমরা যে সংগ্রাম করেছিলাম, আজকে সেটা উপেক্ষিত। গণতন্ত্রের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জড়িত, অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন জড়িত, পরস্পরের সহিষ্ণু আচরণ জড়িত। কিন্তু, এগুলো কোনোটাই হয়নি। আরেকটা বিষয় ছিল যে, নব্বইয়ের পরে আমরা স্বৈরাচারকে কেউ আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবো না। কিন্তু, নীতিহীন রাজনীতি এই স্বৈরাচারকেই ব্যবহার করেছে।’

বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা ও তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফি আহমেদ বলেন, ‘আমাদের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল মানুষের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকারগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সঠিক ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত করা, একটা অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা, শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা, অন্যান্য শ্রেণি-পেশার দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা। এগুলো তো স্বাধীনতার পরিপূরক। স্বৈরাচার পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ৯১ সালে যে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে সেটি ছিল তুলনামূলক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। সেই নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় আসলো। পরবর্তীতেও যে দল ক্ষমতায় আসলো, কেউই সেই রূপরেখা ঠিকভাবে মানেনি।’

‘আমাদের অনেক দাবির মধ্যে একটা দাবি ছিল সংসদীয় গণতন্ত্র, যেটাতে আমরা এসেছি। কিন্তু, এর পাশাপাশি এটির সুরক্ষার জন্য বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা দরকার, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনসহ অনেকগুলো স্বাধীন কমিশন দরকার। যেগুলো সরকারের ওপর নির্ভর করবে না। আমরা চেয়েছিলাম সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করতে। সেভাবেই আমরা এগোচ্ছিলাম। কিন্তু, এখন আমরা সাম্প্রদায়িকতা দেখছি। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙল, মধু দার ভাস্কর্য ভাঙল, সামনে হয়তো আরও ভাঙবে, এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছে। আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল স্বৈরাচারে পতন। সেটা হয়েছে। কিন্তু, অন্যান্যা যে লক্ষ্য, সেখানে প্রাপ্তির জায়গায় আমরা কতটুকুই আর পেলাম?’

এই ৩০ বছরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই ৩০ বছরে গণতন্ত্র খরগোশ-কচ্ছপের গল্পের মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। অবকাঠামোগতভাবে যে দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু, মানুষের মৌলিক অধিকারকে হেয় করে কোনো ধরনের উন্নয়ন করাটা রাজনৈতিক সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না।’

সবশেষে তিনি বলেন, ‘এখন আমরা যে জায়গায় আছি, কোনো অপশক্তির সঙ্গে আপস করা যাবে না। যেমন: আমরা এরশাদকে ক্ষমতা থেকে সরতে বাধ্য করেছি, সেটা একটা অপশক্তি ছিল। এখন এরশাদের দল, জামায়াত, হেফাজত এগুলোকে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর যে টানা-হেচড়া, বিশেষ করে বড় দুই দলের, সেটা তো রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষিত করে ফেলেছে। সে জায়গা থেকে উদ্ধার পেতে হলে যারা গণতন্ত্রকে কলুষিত করতে চায়, তাদেরকে রুখতে হবে। এই সংগ্রামটা জোরদার করতে হবে। যাতে আগামী দিনগুলো সুন্দর হয়। ভোটাধিকারসহ মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার সংগ্রামটা জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে রাজনীতি থেকে ধর্মকে বিযুক্ত করতে হবে।’

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত