ঘোষণা

একটা বিড়াল ও কিছু মৃত্যু

সালাম তাসির | বুধবার, ১০ মার্চ ২০২১ | পড়া হয়েছে 183 বার

একটা বিড়াল ও কিছু মৃত্যু
রাতভর বৃষ্টি অথচ ভোরের আলোয় জোছনার ঝিলিক রয়েই গেছে। সে রাতে আকাশভরা নক্ষত্রগুলো চাঁদের  উঠোনে প্রদীপ জ্বেলে  দিয়েছিলো। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া গাছের সবুজ পাতায় সদ্যজাত সূর্যের উষ্ণতা প্রকৃতিকে রাঙিয়ে দিয়েছে। শাওন পড়ার টেবিলে বসে ভাবছে, পড়ায় মনোসংযোগ ঘটাতে পারছে না।
শোবার ঘরে একটি বিড়াল রোজ রাতে শাওনকে সঙ্গ দেয়। পৌষের শীতে লেপের উষ্ণতা নেয়।  ভাবটা এমন যেন খাওয়া আর ঘুম ছাড়া কোন কাজ নেই। মাঝে মাঝে ইঁদুর শিকারের পরিকল্পনা করলেও মায়ের দেয়া তিন বেলা খাবার তার পরিকল্পনায় জল ঢেলে দেয়। একদিন প্রচন্ড ক্ষুধার তাড়নায় বিড়ালটি ইদুরের পিছু নেয় কিন্তু শিকারে ব্যর্থ হয়ে বালিশে মাথা রেখে ক্লান্ত দেহে ঘুমিয়ে পড়ে।
শাওনের ভাবনার বিষয় ছিলো এটাই। মানুষের সান্নিধ্যে এবং ঘরেই যার আবাস। যে মানুষটা আদর করে আহার যোগায় সে তাকেই সমীহ করে চলে।  ডাকলেই সাড়া দিয়ে কাছে ছুটে আসে,ক্ষুধা লাগলে পায়ের কাছে ঘুর ঘুর করে। দারুণ প্রভুভক্ত এই প্রাণিটি মাঝে মাঝে প্রতিদানও দিতে চায়। তবে বিড়ালকে জামাই আদরে তিন বেলা খাওয়ালে তার কাছে উপকারের আশা করা অরণ্যে রোদন মাত্র। সেদিন ইচ্ছে করেই বিড়ালটিকে রাতের খাবার দেয়া হয়নি কারণ শাওন জানে অভাববোধ প্রাণিকে কাজে প্রবৃত্ত করে। খাদ্যের অভাব হলে সব প্রাণিই খাদ্যের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, শ্রেষ্ঠ জীব মানুষও। শাওনের মা বলতেন মাঝেমাঝে পোষা বিড়ালকে অভুক্ত রাখতে হয় তাহলে সে ক্ষুধার্ত বাঘের মত শিকারে মরিয়া হয়ে উঠবে। মায়ের স্ব-বিরোধী কথা শুনে শাওন হাসে তবুও মায়ের কথা প্রমাণ করতেই বৃষ্টিময় সেই রাতে বিড়ালকে কোন খাবার দেয়নি শাওন। অভুক্ত বিড়াল খাদ্যের সন্ধানে ইঁদুর ধরতে ব্যর্থ হলেও মায়ের বচন সত্য প্রামণে সাক্ষী হয়ে রইলো। মা এমন বচন আগেও বহুবার দিয়েছে কিন্তু শাওন কানে তোলে নি।
মায়ের অবাধ্য হয়ে শাওনের যে ক্ষতি হয়েছে তা কখনোই পুরণ হবার নয়।
একুশের বইমেলা থেকে সংগ্রহ করা প্রিয় কবি মাকিদ হায়দারের কবিতাগ্রন্থ “অদৃশ্য মুখগুলো” যত্নে রাখা ছিলো বইয়ের তাকে। কবি বইখানা অটোগ্রাফসহ উপহার দিয়েছিলেন শাওনকে। বই পড়ুয়া মেয়েটি কাব্যানুরাগী হয়ে ওঠে সহসাই। কবিতার প্রেমে নিজেকে উৎসর্গ করে। মাঝে মাঝে কবিতা লেখার চেষ্টা করে সবার অগোচরে। একদিন পূর্ণিমা রাতে অদৃশ্য মুখগুলো ভেসে ওঠে জোছনায়। অদৃশ্য মুখের আড়ালে কোন একজনের মুখ মনে পড়ে শাওনের। শাওন বইঘরে ছুটে যায় প্রিয় বইয়ের উপর চোখ রাখতেই বুকের উপর আকাশ ভেঙে পড়ে। ইঁদুর যত্নসহকারে বইয়ের তাকে গড়ে তুলেছে সুরম্য অট্টালিকা। বংশ বিস্তারেও পারঙ্গমতা দেখিয়েছে বহুগুণ। শাওন দেখে আর ভাবে এটাই তাদের স্বর্গরাজ্য এখানে অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই।

শাওনের পা কাঁপছে মনটা বিষণ্ন বিষাদে ন্যুয়ে পড়ছে। পাঠ্য বইয়ের সাথে তার প্রিয় কবিতার বই “এক পেয়ালা জোছনা” কেটে শীত নিবারনে বাচ্চাদের লেপ বানিয়েছে। রাগে ক্ষোভে মরে যেতে ইচ্ছে হলো শাওনের কিন্তু মানুষ ইচ্ছে করলেই তো মরতে পারে না তবে ইচ্ছে করলে সে নিজেকে মারতে পারে। যা আত্মহত্যা বলে স্বীকৃত। কষ্টের সময় দীর্ঘ হলে মনের যন্ত্রনা প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে ওঠে তাই সদ্য প্রসূত ইঁদুরের বাচ্চাগুলোকে মেরে মনের কষ্টটাকে লাঘব করার চেষ্টা করে। হত্যাযজ্ঞের পর  হঠাৎ শাওনের ভাবনার রাজ্যে নিজের অপরাধবোধ আর্তনাদ করে ওঠে।  মনের মধ্যে এক অস্বাভাবিক চেতনা ওকে অন্য প্রজাতির প্রাণিতে রূপান্তরিত করে।
বারবার স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে এই ভেবে যে মূল অপরাধী ধরা না পড়ায় তার সন্তানকে হত্যা করা কতটুকু সমীচিন হলো। শাওনের মনে নতুন চিন্তার জন্ম হলে কষ্টের পাহাড় আকাশ ছুঁয়ে যায়। শাওন ভাবে আমার ক্ষতির জন্য মা ইঁদুরটা অপরাধী কোন ক্রমেই তার বাচ্চাগুলো দায়ী হতে পারে না। অথচ শাওনের নিষ্পাপ হাতেই প্রাণ দিলো সদ্য প্রসূত বাচ্চাগুলো। জন্মে তো বাচ্চাগুলোর কোন হাত ছিলো না। তারপরেও শাওন নিজের মনকে প্রবোধ দেয় এই ভেবে যে বাচ্চাগুলো বড় হলে আরো বেশি ক্ষতি করতে পারতো।
শাওনের মা বলতো  বিড়াল ক্ষুধার্ত হলেই কেবল ইদুর শিকারে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। পোষা বিড়ালটিকে কখনো ক্ষুধায় কষ্ট করতে দেয়া হয়নি বলেই শাওনের হৃদয়ে ক্ষতের সৃষ্ট করে দিয়েছে ইঁদুর। রাত গভীর হলে শাওন ভাবে আমার যা ক্ষতি তা হয়তো একদিন পুষিয়ে নিতে পারবো কিন্তু আমার হাতে যে দশটি নিষ্পাপ ইদুরের বাচ্চা প্রাণ দিলো তাদের দেহে তো প্রাণের সঞ্চার করতে পারবো না কোন কালেই।

বিড়ালকে আজও খাবার দেয়নি শাওন। ক্ষুধার জ্বালা বুঝতে পেরে সে ইঁদুর শিকারে মরিয়া হয়ে ওঠে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাতের মধ্য প্রহরে বিড়াল কৌশলে মা ইঁদুরটাকে ধরে ঘরের মেঝেতে নিয়ে আসে।ঘরে তখন স্বল্প আলোর বাল্ব জ্বলছিলো। কি এক বিকট শব্দে শাওনের ঘুম ভেঙে যায়।চোখ খুলেই সে দেখতে পেলো ঘরের মেঝেতে জীবন-মৃত্যুর নির্মম খেলা।
মনের ভেতর প্রতিশোধের জ্বালা কিছুটা হলেও উপশম হবে এই আশায় শাওন নির্ঘুম রাত কাটালো। তবে যে প্রক্রিয়ায় বিড়ালটি ইদুর নিয়ে মৃত্যু খেলায় মেতেছে তা দেখলে মনের ভেতর মৃত্যু যন্ত্রনা হু হু করে কেঁদে ওঠে। এক ঘন্টার মতো ইদুরের রোমহর্ষক মৃত্যু দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার পর শাওন নিজেকে আবার অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেলো।
মানবিক মূল্যবোধের চেতনায় নিজেকে মানুষ ভাবতে শুরু করে।
জীবন- মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ইঁদুরের প্রাণপণে বাঁচার আকুতি দেখে শাওনের মনে করুণা হয়, ইঁদুরের প্রাণ বাঁচানোর বাসনা জাগে মনে কিন্তু ততক্ষনে প্রাণপ্রদীপ নিভে গেছে তার। তারপর বিড়ালটি ইঁদুরের মৃতদেহ নির্দয়ভাবে চিবিয়ে খেতে শুরু করে। শাওন স্বল্প আলোর বাল্বটি নিভিয়ে চোখ বন্ধ করে। সে রাতে আর ঘুম হয়নি তার।

সালাম তাসির,
কবি,প্রাবন্ধিক, গল্পকার,গীতিকার,নাট্যকার
রাজবাড়ী,বাংলাদেশ।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:২১ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১০ মার্চ ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীরব-নিথর অবয়ব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০