ঘোষণা

এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে দেখা হয়েছে বেশ, মনে রইল কথার রেশ

অনলাইন ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 43 বার

এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে দেখা হয়েছে বেশ, মনে রইল কথার রেশ

পি আর প্ল্যাসিড, সাইতামা, জাপান।

আশির দশকের কথা বলছি। দেশে রাস্তায় বেরোলে কোথাও না কোথাও কানে ভেসে আসতো ভারী কন্ঠের মন জুড়ানো কিছু গান। সে গ্রামে বা শহরে যেখানেই বলি সর্বত্র একই শব্দ। আর এমন সব ছিল গানের কথা যে, না চাইলেও ইচ্ছে অনিচ্ছার বালাই শাট, মুখে চলে আসতো গানের কথা। ”হায়রে মানুষ রঙ্গিন ফানুষ দম ফুরালে ঠুস”, ”সবাই তো ভালোবাসা চায়”, ”ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে”, ”আমার সারা দেহো খেয়ো গো মাটি”, ”তুমি মোর জীবনের ভাবনা” ” আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন”, ”ওগো বিদেশিনি”, ”আমার বুকের মধ্যে খানে” আরো কত যে গান, বলে শেষ করা যাবে না। এমন কি রিক্সায় চড়লে শুনতাম রিক্সার মধ্যেও রেডিওতে বাজছে এন্ড্রু কিশোরের সেই গান।

এমন সময় ছিল যে, খ্যাতিমান এই শিল্পীর গান শুনে নিজেরও ইচ্ছে হয়েছিল গান শেখার। তাই গান শিখতে ভর্তি হয়েছিলাম ওয়াইজঘাট বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে। সেখানে প্রথম দিন টাকা দিয়ে গানের কোর্সে ভর্তি হতে গিয়ে যখন মনে হলো আমার গলা দিয়ে গানের স্বর বের হবে না তখন গিটারের কোর্সে ভর্তি হই। ঐ সময় বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যখন দেখতাম শিল্পী তার শার্টের বুকের বুতাম খুলে গলায় বড় ক্রস ঝুলিয়ে হাত নেড়ে গান গাইছেন, তখন মন ভরে যেতো তা দেখে। তাকে ফলো করতে একসময় গলায় আমিও ক্রস ঝুলাতাম। এমনকি মুখে বড় দাঁড়িও রেখেছিলাম ছাত্র জীবনে। জাপানে এসেও তার ফলোয়ার হিসেবে মুখে চাপ দাঁড়ি রেখেছি আমি। কেউ কেউ আমাকে দাঁড়িতে দেখে তখন বলতেন এন্ড্রু কিশোরের মত দেখা যায়। যদিও তা শুনে মনে করতাম বিষয়টি সত্য নয়, তবুও শুনতে ভালো লাগতো।

প্রথম এন্ড্রু কিশোরকে খুব কাছ থেকে দেখি, রমনা ক্যাথিড্রালে প্রাগ বড়দিন উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হয়ে এসছিলেন তখনকার রাষ্ট্রপতি। আলোচনা ও কেক কাটা অনুষ্ঠান শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেছিলেন প্রয়াত সমর দাস। এরপর বিটিভিতে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে তাঁর সাথে। সেই বয়সে তার সাথে এগিয়ে গিয়ে কথা বলার কারণ ছিল একটি বিশেষ কারণে এবং সেটি ছিল তার গলায় ক্রুস ঝুলানো দেখে। এছাড়া কয়েকবার দেখা হয়েছে সদরঘাট ব্যাপ্টিস্ট চার্চে। যতটা মনে পড়ে সেখানে সমর দাসের সাথে দেখা করতেই এসেছিলেন উনি। আমি সেখানে এক এনজিওর হয়ে আশে পাশের বস্তিতে কিছু ঘর তৈরীর কাজ করেছিলাম যার বিল আনতে গিয়ে অফিসে তখনই দেখা হয়েছিল।

তাকে দেখলেই গুনগুন করে তার সেইসময়ের জনপ্রিয় গানের প্রথম কলি গুলো গাইতামা। একদিন অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে এন্ড্রু কিশোর এবং তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন মিলে কথা বলছিলেন, তখন সামনে গিয়ে বলেছিলাম, আমি আপনার খুব ভক্ত। বলেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম হ্যান্ডসেক করতে। উনি আমার হাত ধরে এমন জোড়ে চাপ দিলেন যে ব্যাথায় বসে পড়লাম। এরটর টেনে তুলে দাঁত বের করে হাসলেন। তখন তো চাইলেই আর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সুযোগ ছিলো না যে স্মৃতি ধরে রাখবো। তবে মনের ভিতর গেথে রেখেছি আজকের দিনে তাকে নিয়ে কিছু লেখার কথা ভেবে। পরে অবশ্য শুনেছিলাম সমর দাসের সাথে তার কোনো কারণে মনমালিন্য ছিল সেই সময়। বিষয়টি জানা সত্বেও তাঁর কাছে জানতে সাহস হয়নি তার খ্যাতির উচ্চতার কথা জেনে।

ফার্মগেইট এলাকার ছোট বড় সব রাস্তায় তখন রিক্সা চলতো। মাঝে মধ্যে দেখেছি তেজগাও কলেজের আশে পাশে রিক্সায় কোথাও যেতে। তাঁকে দেখে হাত উড়ালে চিনতে পারতেন, এটুকুই ছিল তখন আমার আনন্দ। এরপর জাপান আসার কয়েক বছর পর জাপানে একটি গোষ্ঠির আমন্ত্রণে এসেছিলেন সঙ্গীত পরিবেশন করতে। যতটা জানি সেই সময় আয়োজকদের বিরুদ্ধ গ্রুপ ইমিগ্রেশনে ইনফর্ম করেছিল যে তাদের সাথে বাড়তি লোক আসছে যাদের উদ্দেশ্য আর দেশে ফিরে যাবে না। এমন ইনফর্মেশনের কারণে নারিতা এয়ারপোর্টে তাদের কিছুটা ঝামেলা হয়েছিল।

ইমিগ্রেশন থেকে আয়োজকদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা সেখানে গিয়ে অতিথিদের নিয়ে আসতে যেতে ভয় পেয়ে যায় নি বলে শুনেছিলাম। তবে পরে কিভাবে নারিতা এয়ারপোর্ট থেকে এসেছিলেন জানি না। পরে তাঁর সাথে আমার টোকিওতে দেখা হলে আমি আমার নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলার পর, এন্ড্রু কিশোর আমার সাথে ভিশন ক্ষেপে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, পৃথিবীর অন্যান্য বেশ কিছু দেশেও গিয়েছেন প্রোগ্রাম করতে কিন্তু জাপানের মত খারাপ অভিজ্ঞতা তাঁর কোথাও আগে আর হয়নি। এমনকি বলেছিলেন আয়োজকদের কেউ তাদের ঠিকমত খোঁজ খবর নিচ্ছে না। নাস্তা পানির তো বালাই শাট।

এমনভাবে তিনি আমার সাথে কথা বলছিলেন যে, যেনো আমিই অপরাধ করেছি। সব দোষ আমার এই জন্য গালাগালি করছিলেন। অবস্থা দেখে ঘনিষ্ঠ একজন আমার পক্ষ নিয়ে বললেন, ওর কোনো দোষ নয়। ও আমাদের এখানে সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত। শোনার পর শেষ একটা কথাই এন্ড্রু কিশোর বলেছিলেন যে, বেঁচে থাকলে আর কখনও তিনি জাপান বাঙ্গালীদের কোন অনুষ্ঠানে আর আসবেন না। সেদিনের কথায় মনে হয়েছিল তিনি বোধ হয় খুব রাগী। কিন্তু তাঁর গান শুনে মনে হয় না যে তিনি এতটা রাগী।

যে সময় টোকিওতে তাঁর সাথে আমার দেখা হয় তখন আমার দেশে যাবার সুযোগ ছিল না। নিজের হাতে ফোন নাম্বার লিখে দিয়ে বলেছিলেন দেশে গেলে যেনো ফোন করে দেখা করি। কিন্তু তখন দেশে যাবার মত আমার এখানে কোনো বৈধ কাগজপত্র ছিল না, তাই লজ্জায় আর বলিনি আমার দেশে যাওয়া সম্ভব না। তাই বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলাম। আমি দেশে যাবার বৈধ কাগজপত্র হবার পর ১৯৯৯ সনে প্রথম জাপানি বধূকে দেশে নিয়ে যাই। তখন অবশ্য আমার বিচরণ ক্ষেত্রও ছিল ভিন্ন, যে কারণে দেশে যাবার পর কখনও আর দেখা করার কথা ভাবিনি।

যখন জেনেছি তিনি অসুস্থ এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে চিকিৎসা করানোর জন্য আর্থিক সহায়তা নিয়েছেন তখন একবার ভেবেছিলাম জাপানে তাঁর জন্য কিছু করার কথা ভেবেছিলাম। পরে যখন দেখলাম আমেরিকা, কেনেডা এবং ফ্রান্সে আমার এবং শিল্পীর পরিচিত-শুভাকাঙ্খী কেউ কেউ ফান্ড কালেকশনের চেষ্টা করছে তখন আমি এ নিয়ে কিছু করার কথা বাদ দিলাম। তারপর তো উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে পাঠানো হয় তাঁকে। ফিরে আসলেও খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিলাম, বেশিদিন হয়তো বাঁচার সম্ভাবনা নেই তাঁর।

সত্যি সত্যি তিনি চলে গেলেন পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে। জাপান আর কখনও আসা হয়নি এজীবনে গুনি শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের। একটি জরুরী কাজ করছিলাম এমন সময় দেশের পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে চোখ রাখতেই দেখি এন্ড্রু কিশোরের না ফেরার দেশে চলে যাবার সংবাদ। তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আমার ফেইসবুকে তাঁকে নিয়ে স্ট্যাটাস দিতে দিতে আমি শিল্পীর গান ইউটিউবে সার্চ দিয়ে বাজাতে শুরু করলাম, হায় রে মানুষ রঙ্গিন ফানুষ দম ফুরালেই ঠুস।

এরপর একেরপর এক তাঁর গান বাজছিল, একসময় গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তাঁর চলে যাওয়ায় দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা সত্যি। পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থণা করি তার আত্মার শান্তি ও স্বর্গে স্থান দেবার জন্য। ওপারে ভালো থাকবেন প্রিয় শিল্পী এন্ড্রু কিশোর। সেই প্রার্থণা করি।

———————
৭ জুলাই ২০২০, মঙ্গলবার

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হে অনন্তের পাখি

৩০ আগস্ট ২০২০