ঘোষণা

পঁচাত্তরের ঘটনা এবং পরবর্তী অবস্থার আলোচনা

আইয়ুব ভুঁইয়া | শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 123 বার

পঁচাত্তরের ঘটনা এবং পরবর্তী অবস্থার আলোচনা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধর হত্যাকান্ডের পর খন্দকার মোশতাক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহন শেষে মঞ্চ থেকে নামার সময় জেনারেল জিয়া এগিয়ে এসে তাকে অভিনন্দন জানান। পাশে (ডানে) সেনাবাহিনীর তৎকালীন চীফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। ইতিহাসের এই জঘন্যতম হত্যাকান্ডের দিন জেনারেল জিয়ার নেতিবাচক এবং সেনা প্রধান জেনারেল সফিউল্লার অথর্ব কর্মকান্ড নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা হলেও সেনাবাহিনীর তৃতীয় শীর্ষ ব্যাক্তি ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফের বিতর্কিত ভুমিকা অনালোচিতই রয়ে গেছে। জেনারেল সফিউল্লাহ অভ্যুত্থান প্রতিরোধ এবং বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে ব্যর্থ হলেও কোন অবমাননাকর মন্তব্য করেননি। কিন্ত খালেদ মোশারফ শুধু বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্যই করেননি, তিনি সেদিন খুনি ফারুক-রশীদের অবস্থান শক্তিশালীকরণে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। পরবর্তিকালে ফারুক ও রশীদের যৌথভাবে লিখিত বইতে খালেদ মোশারফের নেপথ্য ভূমিকার প্রশংসা করা হয়।

৩ থেকে ৭ নভেম্বর খালেদ মোশারফ খুনিদের চেইন অব কমান্ডে ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে নিজের পদ-পদবী নিয়ে দেন-দরবারে বেশি সময় নষ্ট করেন। এসুযোগে খুনিরা বিদেশে পালিয়ে যায়। যাওয়ার আগে জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে। একই সংগে কর্ণেল তাহের তার অনুগতদের নিয়ে “সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই” হটকারি স্লোগান দিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে ঢুকে পড়ে। তাদের হাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশারফ নিজে, কর্ণেল নাজমুল হুদা ও মেজর হায়দারসহ অসংখ্য অফিসার নিহত হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক সময়কার চৌকষ গোয়েন্দা অফিসার জেনারেল জিয়া এই গোলযোগপূর্ণ পরিবেশকে সুক্ষ্মভাবে কাজে লাগিয়ে উঠে আসেন ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে। শুরু হয় ইতিহাসের আরেক অধ্যায়।

১৫ আগস্ট সকালের দৃশ্যপট বর্ণনা করতে গিয়ে রক্ষীবাহিনীর তৎকালীন উপপ্রধান কর্ণেল আনোয়ার উল আলম শহীদ লিখেছেন “ব্রিগেড কমান্ডারের কক্ষে ঢুকে দেখি একটা টেবিল ঘিরে খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিলসহ দু’তিনজন উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা বসে আছেন। ৩০-৩৫ জন সেনা কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের চেহারা দেখে আমরা বুঝতে পারলাম না তারা অভ্যুত্থানের পক্ষে না বিপক্ষে। তবে একটা রহস্যজনক নিরবতা লক্ষ করা গেল। ব্রিগেড কমান্ডারের নির্ধারিত চেয়ারে বসে ছিলেন খালেদ মোশাররফ। তার পাশে একটি চেয়ারে বসে ছিলেন ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত জামিল। টেবিলের অপর পাশে চেয়ার খালি ছিল। তারা সেখানে আমাদের বসতে বললেন। প্রথমেই খালেদ মোশাররফ যা বললেন তা শুনে তো আমাদের চোখ ছানাবড়া। তিনি ইংরেজিতে বললেন ‘shaheed-sarwar, I know you are patriots but we had do it because we do not want this country to be a Kingdom.’ তারপর বাংলায় বললেন, মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করতে হবে। দেশকে বাঁচাতে হবে ইত্যাদি। কিছুক্ষণ পর সীমাহীন হতাশা নিয়ে আমরা রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরে ফিরে আসি। ফেরার পথে ভাবতে থাকি খালেদ মোশাররফ আমাদের কি শোনালেন! ” (রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা, লেখক: আনোয়ার উল আলম, প্রথমা প্রকাশ, পৃষ্ঠা : ১৪৮)।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে জিয়াউর রহমানের কোর্সমেট ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু লে: কর্ণেল (অব:) এম এ হামিদ লিখেছেন “ভোর ৬ টার সময় সফিউল্লাহ খালেদ মোশাররফকে পাঠান ৪৬ ব্রিগেডে শাপায়াতের কাছে তড়িৎ ট্রুপ মুভ করাবার জন্য। তিনি সেখানে গিয়ে বলেন ‘কেউ মুভ করছেনা, বরং উল্লাস করছে।’ তার কথায় সফিউল্লাহ আরো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। বেলা ১১টায় ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে খালেদ ও শাপায়াত উভয়কেই দেখা যায় উল্লসিত মুডে। খালেদ মোশাররফ ঐ সময় অপারেশন নিয়ন্ত্রন করছিলেন এবং রক্ষীবাহিনীসহ অন্যান্য সবাইকে শান্ত করতে মহাব্যস্ত ছিলেন। তিনি ঐ মুহূর্তে একটি বড় কাজ করেন, তা হলো নিজ দায়িত্বে ফারুকের জন্য ট্যাংকের গোলা সরবরাহ করার জন্য জয়দেবপুর ডিপোকে নির্দেশ দেন। ট্যাংকের গোলা পেয়ে ফারুকের ট্যাংক বাহিনী বিরাট শক্তিতে পরিণত হয়। অথচ ভোরবেলা তার ট্যাংক ছিল গোলাবিহীন লৌহ শকট মাত্র। ঐ মুহূর্তে ব্রিগেডিয়ার খালেদ এবং কর্ণেল শাফায়াত জামিলের হাসিখুশি উল্লাস সবাইকে অবাক করেছিল। কারণ এ দু’জনই ছিলেন শেখ সাহেবের প্রিয় ব্যক্তি।” (তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা, পাতা প্রকাশ, পৃষ্ঠা: ৮১)।

১৫ আগস্টের বর্বরোচিত ঘটনার ৮ বছর পর ১৯৮৩ সালে ফারুক ও রশিদ হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গেয়ে ‘মুক্তির পথ’ নামে একটি বই লিখে। এতে তারা লিখেছে, ” জেনারেল খালেদ মোশাররফ ছিলেন ১৫ আগস্টের বিপ্লবী পদক্ষেপের অন্যতম জোরালো সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক। ১৫ আগস্টের বৈপ্লবিক কর্মকান্ড ও বিপ্লবের সামগ্রিক উদ্দেশ্যের প্রতি আন্তরিকভাবে আস্থাশীল এবং দেশমাতৃকার এই বীর সন্তান জেনারেল খালেদ মোশাররফকে ৩ ও ৭ নভেম্বরের ঘটনা প্রবাহের মধ্যে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয় তাকে গণধিকৃত রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দূরভিসন্ধিমূলকভাবে চিহ্নিত করে প্রকৃত ইতিহাস ও পরিস্থিতিকে অতি সুকৌশলে বিকৃত করা হয়। অথচ খালেদ মোশাররফ চেয়েছিলেন ষড়যন্ত্রকারীদের সৃষ্ট পথ থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে।” (মুক্তির পথ, লেখক : কর্ণেল রশিদ ও কর্ণেল ফারুক, পৃষ্ঠা : ৮৮)।

কর্ণেল ফারুকের পিতা মেজর (অব:) সৈয়দ আতাউর রহমান বাড়ি নং- ৩১৫, সড়ক নং-১৫/এ (নতুন ), ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা থেকে বইটি প্রকাশ করে। এর প্রথম সংস্করণ ১৯৮৩ সালের বিজয় দিবসে এবং দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৮৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারীতে প্রকাশিত হয়।
———-

আইয়ুব ভুঁইয়া ঃ সাংবাদিক

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:৪৮ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত