ঘোষণা

জাতীয় ফুল ও পুষ্টিকর সুস্বাদু সবজি শাপলা

আলম শামস | বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | পড়া হয়েছে 132 বার

জাতীয় ফুল ও পুষ্টিকর সুস্বাদু সবজি শাপলা

আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা। নদী মাতৃক বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় উপজেলায় দেখা মিলে এই ফুলের। ২৩০টি নদ-নদী বেষ্টিত বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি নদী ও শাখা নদীর দু’কুলে এবং এর চর এলকায় শাপলা চোখে পড়ে। বাংলার গ্রামীণ জনপদে অসংখ্য খাল-বিল হাওড়, বাওড় রয়েছে। বর্ষা ও শরতে এসব খাল-বিল হাওড়-বাওড়,পুকুর-দীঘি, ডোবাসহ যে কোন জলাশয়ে এ ফুলের দৃষ্টি নন্দন উপস্হিতি আমাদের বিমহিত করে। শাপলা শুধু যে ফুল তা নয়। শাপলা একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিক সবজিও। এসময় সবজি হিসেবে এর ব্যপক চাহিদা বেড়ে যায়। কেউ কেউ শাপলাকে বানিজ্যিক পন্য হিসেবেও গন্য করে। বাংলাদেশের পয়সা, টাকা, দলিলপত্রে শাপলা ফুলবা এর জলছাপ আঁকা আছে।

শাপলাকে ইংরেজিতে Water lily বলা হয়, বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea nouchali ।বাংলায় নীল শাপলা ফুলকে শালুক বা নীলকমল, লাল শাপলা ফুলকে রক্তকমল বলা হয়।পুষ্প বৃক্ষ Nymphaeaceae পরিবারের এক প্রকার জলজ উদ্ভিদ শাপলা। এ পরিবারভূক্ত সকল উদ্ভিদই শাপলা নামে পরিচিত। সাদা শাপলা ফুল বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। এই ফুল সাধারণত ভারত উপমহাদেশে দেখা যায়। এই উদ্ভিদ প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। থাইল্যান্ড ও মায়ানমারে এই ফুল পুকুর ও বাগান সাজাতে খুব জনপ্রিয়। সাদা শাপলা বাংলাদেশ, ভারত,পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ইয়েমেন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন,কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া,মায়ানমার প্রভৃতি দেশের পুকুর ও হ্রদে দেখা যায়। এই ফুল পাপুয়া নিউগিনি এবং অস্ট্রেলিয়ার কিছু এলাকায়ও দেখা যায়।এই ফুল যেমন দেখা যায় চাষের জমিতে, তেমনই হয় বন্য এলাকায়।কাঁটা ধান ক্ষেতের জমে থাকা অল্প পানিতে এই ফুল ফুটে থাকতে দেখা যায়। বিশ্বে এই উদ্ভিদের প্রায় ৩৫টি প্রজাতি পাওয়া গেছে।

শাপলা ফুল দিনের বেলা ফোটে এবং সরাসরি কাণ্ড ও মূলের সাথে যুক্ত থাকে। শাপলার পাতা আর ফুলের কাণ্ড বা ডাটি বা পুস্পদণ্ড পানির নিচে মূলের সাথে যুক্ত থাকে। আর এই মূল যুক্ত থাকে মাটির সঙ্গে এবং পাতা পানির ওপর ভেসে থাকে। মূল থেকেই নতুন পাতার জন্ম নেয়। পাতাগুলো গোল এবং সবুজ রঙের হয় কিন্তু নিচের দিকে
কালো রঙ। ভাসমান পাতাগুলোর চারদিক ধারালো হয়। পাতার সাইজ ২০ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার এবং এদের ব্যাপ্তি প্রায় ০.৯ থেকে ১.৮ মি। শাপলা ফুল নানা রংয়ের দেখা যায় যেমনঃ গোলাপী, সাদা,নীল, বেগুনি। এই ফুলে ৪ থেকে ৫ টি বৃতি থাকে ও ১৩ থেকে ১৫টি পাপড়ি থাকে। ফুলগুলো দেখতে তারার মত মনে হয়। কাপের সমান বৃতিগুলো ১১-১৪ সেমি হয়ে থাকে। প্রায় বছরের সব সময় শাপলা ফুটতে দেখা যায় তবে বর্ষা ও শরৎ এই উদ্ভিদ জন্মানোর শ্রেষ্ঠ সময়।

এই ফুল শ্রীলংকারও জাতীয় ফুল। শ্রীলংকায় এই ফুল নীল মাহানেল নামে পরিচিত। শ্রীলংকার ভাষায় নীল থেকে এই ফুলকে শ্রীলংকায় বিভিন্ন পুকুর ও প্রাকৃতিক হৃদে এই ফুল ফোটে। এই জলজ উদ্ভিদের ফুলের বিবরণ বেশ কিছু প্রাচীন বই যেমন- সংস্কৃত, পালি ও শ্রীলংকান ভাষার সাহিত্যে প্রাচীনকাল থেকে নীলুপ্পালা, নীলথপালা, নীলুফুল নামে পাওয়া গেছে যাশ্রেষ্ঠতা, শৃঙ্খলা, পবিত্রতার প্রতীক। শ্রীলংকার বুদ্ধদের দৃঢ় বিশ্বাস গৌতম বুদ্ধের পায়ের ছাপে পাওয়া ১০৮ টি শুভ চিহ্নের মাঝে একটি ছিল এই শাপলা ফুল। শাপলার পরিবারএটি একটি গ্রিক শব্দের অনুবাদ। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো ও এরিস্টটল এর এক শিষ্য থিউফ্রাস্টাস বলেছেন, এই উদ্ভিদ প্রায় ৩০০ খ্রিষ্টপূর্ব পুরানো। তিনি আরো বলেছেন প্রাচীন গ্রীকে জল দেবীদের এই ফুল উৎসর্গ করে উপাসনা করার রীতি ছিল। প্রাচীন মিশরে, হাজার বছর ধরে নীল শাপলা ফুল, সাদা শাপলা ফুলের প্রতি অনুরাগী ছিল। মানুষ এই ফুল খেত, আঁকত এবং শ্রদ্ধা করত। কথিত আছে ভারতে হিন্দুদের সর্প দেবী মনসা পূজায় শাপলা ফুল দেয়া হয়।

শাপলা প্রাচীন যুগ থেকেই বিভিন্ন জাতীর প্রার্থনা বাবাগান সাজানোর পাশাপাশি খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যেমন: মিশর, চীন, জাপান ও এশিয়ার বিভিন্ন এলাকা। শাপলার কান্ড বা ডাটা বা পুস্পদন্ড সবজী হিসেবে খাওয়া হয়।পূর্ণবিকশিত শাপলা ফুলের গর্ভাশয়ে গুড়ি গুড়ি বীজ থাকে। আঠালো এই বীজ বাংলাদেশের গ্রামের মানুষদের খেতে দেখা যায়।এই বীজ ভেজে একধরনের খাবার খৈ তৈরি হয় যার নাম “ঢ্যাপের খৈ”। উদ্ভিদটির গোড়ায় থাকে আলুর মত এক ধরনের কন্দ যার নাম শালুক, অনেকে এটি সবজি হিসেবে খেয়ে থাকে। ভারতে আম্বাল নামের আয়ুর্বেদিক ঔষুধ বানাতে শাপলাকে ঔষধি গাছ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ঔষধ অপরিপাকজনিত রোগের পথ্য হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া গেছে এই উদ্ভিদে ডায়াবেটিক রোগের জন্য প্রয়োজনীয় ঔষুধি গুণাগুন রয়েছে। এই উদ্ভিদ পানি থেকে তুলে রোদে শুঁকিয়ে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।অনন্য সৌন্দর্যের জন্য সবার কাছে প্রিয় জাতীয় ফুল শাপলা।

পুষ্টিকর ও সুস্বাদু সবজি হিসেবে এর ব্যবহার সমান জনপ্রিয়।আমাদের গ্রামীণ জনপদের দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের একটা বড় অংশ জীবিকা নির্বাহ করছে শাপলা ফুল বিক্রি করে। বিলের স্বচ্ছ পানিতে ভেসে থাকা এ যেন সাদা-সবুজের খেলা। প্রকৃতি যেন
এই জলের বুকেই ছড়িয়ে রেখেছে রাজ্যের সব সৌন্দর্য্য। তবে পল্লী এলাকার গরীব কিশোর-কিশোরিদের লক্ষ্য ভিন্ন। তারা শাপলা বিক্রি করে অর্থ রোজগার করতে চায়। তাইতো সকাল হলেই তালের ডোঙ্গা বা কোসা নৌকায় করে নেমে পড়ে বিলে। শাপলা তুলে বিক্রি করে ¯’ানীয় বাজারে। অন্যান্য শাক-সবজির মতোই উপাদেয় তরকারি হিসাবে এখানকার মানুষের পছন্দের তালিকায় আছে শাপলাও। তাইতো এসব বাজারে এর ক্রেতাও অনেক। তবে অপরিকল্পিতভাবে বেড়ী বাঁধ ও সড়ক তৈরির কারনে ভরাট হয়ে যাচ্ছে এসব বিল। তাই শরৎ-হেমন্তে এসে আর পাওয়া যাচ্ছে না শাপলা।এর মূল কারণ ব্যাপকভাবে বিল-ঝিল জলাভূমি ভরাট ও জমিতে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বৈষ্ণয়িক উষ্ণতা ও জলবায়ুর পরিবর্তন শাপলা ফুল বিলুপ্তির এক অন্যতম কারণ। জাতীয় ফুলের এই অর্থকারি পরিচয়কে প্রতিষ্ঠা করতে বিল-জলাশয় রক্ষার উদ্যোগ নেয়া সময়ের দাবি ।

 

 

 

আলম শামস

কবি ও সাংবাদিক
দৈনিক ইনকিলাব, ঢাকা।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:২৪ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত