ঘোষণা

বাঙালির ঐতিহ্য ঢেঁকি

রীতা আক্তার | সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১ | পড়া হয়েছে 148 বার

বাঙালির ঐতিহ্য ঢেঁকি

ঢেঁকি বাংলার একটি প্রচীন ঐতিহ্যের নাম । প্রচীন কাল থেকে ঢেঁকির ব্যবহার চলে আসছে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে।বর্তমান যুগের মতো আধুনিক মেশিন সে কালে ছিলো না ।কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার এই ঐতিহ্য। বাংলাদেশের শহর থেকে শুরু করে গ্রামে গঞ্জেও এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক ঢেউ লেগেছে। ফলে দিন দিন একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের এ যন্ত্রটি।

আর্য-ভারতে প্রধান দুটি শস্য, গম ও বার্লির খোসা ছাড়ানোর জন্য ইন্দো-আর্যগণ উদুখলা ও মুসালা ব্যবহার করত। উদুখলা (স্থানীয় ভাষায় উখলি নামে পরিচিত) প্রায় ৩৬ ইঞ্চি উচ্চতা ও ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট একখন্ড গোলাকার কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। কাষ্ঠখন্ডটির উপরের দিকে ১৮ ইঞ্চির মতো গভীর একটি চওড়া গোলাকার গর্ত করা হয়। মুসালা হচ্ছে ৯ ইঞ্চি ব্যাস এবং ৪৫ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট বেলনাকৃতির একটি শক্ত কাঠের গুঁড়ি বা মুষল। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে উদুখলা ও মুসালা এখনও ব্যবহৃত হয়।

সাধারণত ঢেঁকিতে প্রায় ৭২ ইঞ্চি লম্বা এবং ৬ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট একটি কাঠের ধড় থাকে। মেঝে থেকে প্রায় ১৮ ইঞ্চি উচ্চতায় ধড় ও দুটি খুঁটির ভিতর দিয়ে একটি ছোট হুড়কা বা বল্টু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এ হুড়কার উপরেই ধড়টি ওঠানামা করে। ধড়ের এক মাথার নিচের দিকে সিলিন্ডার আকারের প্রায় ১৮ ইঞ্চি দীর্ঘ এবং ৬ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট এক টুকরো কাঠ যুক্ত করে দেওয়া হয়। এ কাষ্ঠখন্ডের নিম্নপ্রান্ত একটি লোহার বলয় দিয়ে পরিবৃত করা হয় এবং এটি মুষলের কাজ করে। ধড় এটিকে উপরে তোলে, নিজের ওজনে এটি নিচে পতিত হয়। হুড়কা তার শক্তি বৃদ্ধি করে। মুষল থেকে ধড়ের মোট দৈর্ঘ্যের পাঁচ-অষ্টমাংশ দূরত্বে স্থাপিত হুড়কা উপস্তম্ভের কাজ করে থাকে।

সাধারণত ২-৩ জন মহিলা এ যন্ত্রে কাজ করেন। ১-২ জন মুষল উত্তোলনের জন্য ধড়ের এক প্রান্তে পা দিয়ে পালাক্রমে চাপ দিয়ে থাকেন এবং পা সরিয়ে নিয়ে মুষলকে নিচে পড়তে দেন। অপর মহিলা বৃত্তাকার খোঁড়ল থেকে চূর্ণীকৃত শস্য সরিয়ে নেন এবং তাতে নতুন শস্য সরবরাহ করেন। মুষলের আঘাত ধারন করার জন্য খোঁড়লটি কাটা হয় মাটিতে বসানো এক টুকরা শক্ত কাঠের গুঁড়িতে। ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার কাজ খুবই শ্রমসাপেক্ষ। কাজটিতে মহিলাগণ একে অপরের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু কোনো কোনো সময় একজন মহিলা সম্পূর্ণ কাজটি একাই করে থাকেন। এ কাজে তিনি একটি লম্বা হাতলের মাথায় নারিকেলের মালা (খোল) বেঁধে তৈরি করা চালুনির সাহায্যে খোঁড়লে শস্যদানা ভরা ও বের করার কাজ করেন। পরিশ্রম লাঘব করার জন্য এ কাজে নিয়োজিত মহিলাগণ কোনো কোনো সময় গান গেয়ে থাকেন।

বাঙালি জীবনাচারণের আরেকটি বড় অংশ ছিল নবান্ন উৎসব। গ্রামে এক সময় নতুন ধান ওঠাকে কেন্দ্র করে নবান্ন উৎসব হতো। সেই উৎসবে পরিবারের শিশু-কিশোররা কত না আমোদ-আহ্লাদে নাচতো আর গাইতো। বাঙালি জীবনের এই উৎসবটার সাথেও ছিল ঢেঁকির সম্পর্ক। ঢেঁকিতে ছাঁটা চালের আটা হতে তৈরি হত নানা উপাদেয় বাহারী সাজের রকমারি পিঠা। বাড়ি বাড়ি পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যেত। প্রবাদে আছে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। এক সময় ঢেঁকির সুরেলা শব্দ ফুটিয়ে তুলত নবান্ন উৎসব।
একসময় গ্রামগঞ্জে ধান ভানা, চাল তৈরি, গুঁড়ি কোটা, চিড়া তৈরি, মশলাপাতি ভাঙানোসহ বিভিন্ন কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হতো ঢেঁকি। অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে কৃষক ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে কৃষানিদের ঘরে ধান থেকে নতুন চাল ও চালের গুঁড়া করার ধুম পড়ে যেত। সে চাল দিয়ে পিঠা-পুলি, ফিরনি-পায়েস তৈরি করা হতো।

আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি এখন দু-চার গ্রাম খুঁজে পাওয়া ভার। প্রয়োজনের তাগিদে সময়ের সঙ্গে সমাজ ও সভ্যতার পরিবর্তন হচ্ছে।শুধু তাই নয়, ঢেঁকি বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের পরিচায়ক। কালের বিবর্তনে আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পাড়াগাঁয়ের কিছু লোক মিলে টাকা তুলে কাঠ দিয়ে ঢেঁকি বানিয়ে এখনো ঐতিহ্যের চিহ্নটুকু ধরে রেখেছেন। কিন্তু আমাদের অতি আধুনিক হওয়ার লোভের রোষানলে সেটুকুও বিলুপ্ত হতে বেশি সময় লাগবে না। অতি উন্নতির জোয়ারে ভাসতে গিয়ে আমরা প্রাচীন ঐতিহ্যকে বিসর্জন দিতে বসেছি। এমনটি কাম্য নয়।

বাংলার ঐতিহ্যগুলো রক্ষার্থে কাজ করতে হবে সবাইকে। নইলে এক সময় ঐতিহ্যগুলোর স্থান হবে জাদুঘরে এবং তা থাকবে শুধু পুস্তকেই সীমাবদ্ধ। বাংলায় এক সময় ঢেঁকির গুরুত্ব ও কদর ছিল অনেক। বর্তমানে বৈদ্যুতিক বা আধুনিক যন্ত্রপাতির ছোঁয়াতে তা বিলুপ্তির পথে। ঢেঁকির মতো অনেক বাঙালি ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা উচিত এ ঐতিহ্যগুলো।

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:২৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত