ঘোষণা

জাপান প্রেক্ষাপটে করোনা ও আমাদের শিক্ষা

| মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২০ | পড়া হয়েছে 24 বার

জাপান প্রেক্ষাপটে করোনা ও আমাদের শিক্ষা

আরিফুজ্জামান রাজীব :

করোনাভাইরাস পৃথিবীতে আবির্ভাব হয়েছে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ চীনের উহান প্রদেশে। এরপর এক এক করে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের ২০০-এর অধিক দেশে। এই করোনার ঢেউ প্রথমদিকে যেসব দেশে ছড়িয়ে পড়ে ভূ-উত্তলের দেশ জাপান তার মধ্যে একটি। জাপানে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় জানুয়ারি মাসের ১৫ তারিখ, যেটি ছিল চীনের বাইরে দ্বিতীয় কোনও দেশের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর। আর মৃত্যুর মিছিলে প্রথম নাম লিখিয়েছিল ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখ। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত জাপান সরকারের মধ্যে খুব একটা চিন্তা লক্ষ করিনি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগের মতো চললো, সুপার মার্কেটগুলোতেও খুব একটা কড়াকড়ি চোখে পড়েনি। এমনকি মার্চ মাসের ২৫ তারিখ থেকে স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছিল। এক কথায়, যখন পুরো বিশ্ব করোনা আতঙ্কে কুপোকাত, তখন জাপানিজদের মধ্যে কোনও বিকার আমাদের কারও চোখে পড়েনি। এরপর দেখলাম এপ্রিল মাসের শুরু থেকে ওরা কড়াকড়িতে গেলো। এপ্রিল মাসের ৭ তারিখে প্রথম ৬টা প্রিফেকচারে স্টেট অব ইমারজেন্সি ডাকলো প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। এরপর যখন দেখলো এতেও কাজ হচ্ছে না আক্রান্তের সংখ্যা দৈনিক বেড়েই চলেছে, তখন পুরো দেশজুড়ে স্টেট অব ইমারজেন্সি ডাকলো এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখ। এর ফলে আমরা যদি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার দিকে তাকাই, মে মাসের শেষ ১০ দিনে জাপানে মোট আক্রান্ত হয়েছে ২০০ জনের মতো, যেখানে এপ্রিলের মাঝামাঝিতে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬০০-৭০০ জন। পুরো ব্যবস্থার ফল জাপান পেয়েছে, তাদের বেঁধে দেওয়া সময়েরও ৭ দিন পূর্বে, যেখানে পুরো দেশের লকডাউন খোলার কথা ছিল মে মাসের ৩১ তারিখ, সেখানে জাপান তাদের লকডাউন শিথিল করতে সক্ষম হয়েছে মে মাসের ২৫ তারিখ।

মাত্র একমাসের কম সময়ের ব্যবধানে এমন অভূতপূর্ব উন্নতি সকলেরই নজর কেটেছে নিশ্চয়ই। আমরা যারা এই ভূ-উত্তলের দেশে এতদিন ধরে বসবাস করছি, আমাদেরও বেশ কৌতূহল ছিল, কীভাবে সম্ভব হলো? কী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি আমরা? আমার সেই কৌতূহল থেকেই আমি জাপান প্রবাসী কাছের কিছু মানুষ, জাপানিজ বন্ধু বান্ধব, প্রফেসর, প্রতিবেশী সার্বিয়ান বন্ধু, ব্যক্তিগত চিকিৎসক Sunny Sanda Sensei, সকলের কাছেই এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। তার সঙ্গে করোনাকালীন আমার গত ৫ মাসের অভিজ্ঞতা থেকে যা বুঝতে পারলাম, তার সারমর্মই নিচে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

জাপান আসলে তথ্য তত্ত্বের বাইরে কোনও কাজ করে না। তারা হুট করে কোনও সিদ্ধান্তেও যায় না, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে দশবার ভাবে কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে কার্যকরণে মনোনিবেশ করে। জাপান মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত পুরো পরিস্থিতি অবজার্ভ করেছে, হয়তো সময় একটু বেশি নিয়েছে বেশ কিছু কারণে—

১. ২০২০-এ জাপানে বিশ্ব অলিম্পিক হওয়ার কথা ছিল। ইতোমধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়ে গিয়েছিল। এই অবস্থায় ধীর সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া সরকারেও কোনও উপায় ছিল না। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে যখন জানা যায় অলিম্পিক ২০২১ মানে ১ বছর পেছানো হয়েছে। তখন জাপান কর্তৃপক্ষ তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছে।

২. জাপানে ৪৭টা প্রদেশ। প্রত্যেকটা প্রদেশের নিজস্ব স্থানীয় সরকার আছে। আবে প্রশাসন চাইলেই কোনও সিদ্ধান্ত স্থানীয় প্রশাসনকে চাপিয়ে দিতে পারে না, সঙ্গে ব্যক্তি স্বাধীনতাকেও জাপানিজরা খুব গুরুত্ব দেয়। এই পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বয় করতে একটু সময় বেশি লেগে গেছেহয়তো।

৩. WHO প্রথম দিকে যেসব কারণে করোনা ছাড়তে পারে বলে প্রচার করেছিল। যেমন—ক্লোজ কন্টাক্টের মাধ্যমে ছড়াতে পারে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না থাকলে ছড়াতে পারে, হাঁচি বা কাশির সময় টিস্যু ব্যবহার করার ওপর জোড় দিয়েছিল, হ্যান্ডসেকের কথা উঠেছিল, ভালো করে হাত ধোয়ার কথা বলা হয়েছিল। আসলে জাপানিজদের উপরিউক্ত সবই নতুন করে শেখার বা শেখানোর কিছু নেই। স্কুল থেকেই ওরা এসবের চর্চা ও আত্মস্থ করে আসছে। তাই ওরা করোনাকে ততটা পাত্তা দেয়নি। আর প্রথমদিকে যত রোগী শনাক্ত হয়েছিল প্রায় সবাই চীন ফেরত এবং কিছুক্ষেত্রে তাদের পরিবার। ডব্লিউএইচও পরীক্ষা বা পর্যাপ্ত রিসার্চ ছাড়া মনগড়াভাবে তথ্য দেওয়াতে জাপান সরকারের একটু বেগ পেতে হয়েছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে।

কিন্তু মার্চ মাসের মাঝ থেকে যখন সংখ্যাটা জ্যামিতিক হারে বাড়া শুরু করলো, তখন কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসলো। এপ্রিল মাসের ১ তারিখ জাপানের তোহো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক আবিষ্কার করলো মাইক্রো ড্রপলেটের মাধ্যমেও করোনা ছাড়তে পারে। প্রফেসর কোজিহিরো তাতেডা-এর তত্ত্বাবধানে একদল গবেষক লেজার বিমের মাধ্যমে কনফার্ম হলো হাঁচি কাশির সঙ্গে যেই ড্রপলেট বের হয় তার মধ্যে ম্যাক্রো ড্রপলেটগুলো সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে পড়ে যায়, কিন্তু ০.১ মাইক্রো মিটার রেঞ্জের ড্রপলেটগুলো বাতাসে ভাসার সক্ষমতা রাখে। এবং তারা এটাও বের করলো এই ভেসে থাকার সময় নির্ভর করে বাতাসের আর্দ্রতার ওপর (জাপানে তখনও বেশ ঠান্ডা ছিল, দিনের গড় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির মতো, রাতের সময় সেটা নেমে দাঁড়ায় ০-১ এর কাছে।) আর টোকিও সহ বড় বড় যেসব শহরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ঊর্ধ্বমুখী, কারণ সেসব শহরে ছিল অনেক পাতাল রেল। এসব পাতাল রেলে বায়ু চলাচলের খুব ভালো ব্যবস্থা ছিল না। আর জাপানিজদের সমীক্ষায় দেখা গেছে অনেক রোগীর ট্রেস পয়েন্ট পাতাল রেল। এই রিসার্চ জাপান সরকারের হাতে আসার পরপরই জাপান সরকার স্টেট অব ইমারজেন্সি ডাকতে আর দেরি করেনি। একটা জিনিস বলে নেওয়া দরকার, ইমারজেন্সি ডাকলেও কিন্তু স্বাভাবিক জীবন যাপনে কোনও প্রভাব পড়েনি। দ্রব্যমূল্যে প্রভাবিত হয়নি, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঠিকমতোই পাওয়া গেছে।

জাপানে মূলত তাপমাত্রা বাড়া শুরু করে এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে। আর একটা তথ্য দিয়ে নেওয়া ভালো, জাপানের বায়ু এতটা পরিষ্কার যে সূর্য থাকলে তাপমাত্রা যদি ২০ ডিগ্রি থাকে, সূর্য আড়াল হলেই ১০ ডিগ্রিতে নেমে আসে। খালি চোখে অনেকদূর আকাশ দেখা যায়। যখনই তাপমাত্রা বাড়লো সঙ্গেসঙ্গেই বাতাসের আর্দ্রতা কমে গেলো, আর ড্রপলেট বাতাসে ভাসার বাহক হারিয়ে ফেললো। করোনা প্রকোপও এক্সপোনেনশিয়ালি নিম্নমুখী হলো। এই করোনা প্রকোপ নিম্নমুখী হওয়ার পেছনে প্রকৃতি যেমন জাপানের পক্ষে কথা বলেছিল একপর্যায়ে, সঙ্গে জাপানিজদের ব্যক্তিপর্যায়ের সচেতনতাও ছিল চোখে পড়ার মতো।

আমাদের শিক্ষা:

এই পুরো অভিজ্ঞতা যদি বাংলাদেশের ছাঁচে ফেলা যায় তাহলে আমরা দেখবো—আমাদের মূল সমস্যাই শিক্ষা ব্যবস্থায়, মাইক্রোলেভেলে চিন্তা করলে প্রাইমারি শিক্ষায়। একটু বিশ্লেষণ করলে বুঝতে সুবিধা হবে—জাপানের করোনা উন্নতির বড় দুইটা কারণ—এক. সচেতনতা বা নিয়ম মানার প্রবণতা, দুই. প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। এই দুইটা জিনিসই ছোটবেলায় আত্মস্থ করতে হয়। এই বুড়ো বয়সে সামাজিক দূরত্ব, কোনও কাজ করার পর ভালোভাবে হাত ধোয়া, ঠান্ডা লাগলে মাস্ক পরা, সর্দি লাগলে মানুষের সামনে না আসা, এক কথায় মানবিক সচেতনতা সম্ভব না। এই মানবিক সচেতনতা স্কুল থেকেই শিখতে হয়, এরপর শুধু এর চর্চা চালিয়ে যেতে হয়। আমরা স্কুল থেকে একজন শিশুকে এসব মানবিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছি, আর এখন কীভাবে রাতারাতি এসব আউটপুট আশা করতে পারি!!

আর প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। এই বিষয়ের শিক্ষা জ্ঞানতো আরও নিচের কোটায়। ছোটবেলায় আমাদের পিটি করাতো ১ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ৪ দিন। সেখানে আমাদের কীভাবে সুস্থ রাখা যায় তার কসরত শেখানো হতো, কখনও তো আমার আশেপাশের প্রকৃতিকে কীভাবে সুস্থ রাখা যায়, সেটা তো শেখানো হতো না। আমার পাশের ওই ছোট জীব বা বড় জীব বা লতা-গুল্ম ওদের প্রতি আমার যত্ন কীভাবে নিতে হবে সেটাতো শেখানো হয়নি। যেই সুন্দরবন বছরের পর বছর আমাদের ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচিয়েছে, সুন্দরবনের প্রতি আমরা কী প্রতিদান দিচ্ছি! আমরা শুধু প্রকৃতিকে শাসনই করে গেছি, আজন্ম। কীভাবে আমরা ভাবতে পারি, প্রকৃতি আমাদের পক্ষে কথা বলবে! আমাদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে, আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ভালো আমাদেরই বুঝতে হবে। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষায় এখনই হাত দেওয়া দরকার। এই গাদাগাদা বই পডিয়ে কোনও ফায়দা নেই, যদি পড়ার মূল্যায়নই করতে না পারলাম। আমাদের প্রাথমিকে মানবিক সচেতনতা আর তার সঙ্গে ইকো লিটারেসি যোগ করা দরকার। আমরা যদি শিশুর ছোট্ট বয়স থেকেই পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রতি ভালোবাসা আর মানবিক সচেতনতার বীজ মননে বপন করে দিতে পারি, সেটাই হবে ভবিষ্যতে করোনার মতো অদৃশ্য শত্রু থেকে মুক্তির প্রথম ও শক্তিশালী হাতিয়ার।

লেখক: রিসার্চ ফেলো, সাইতামা ইউনিভার্সিটি, জাপান।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত