ঘোষণা

বিশ্বের ৮৬% ইলিশই বাংলাদেশে

বিবেক ডেস্ক | শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 72 বার

বিশ্বের ৮৬% ইলিশই বাংলাদেশে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক খুললেই ইদানীং ইলিশের ছবিসহ পোস্ট চোখ পড়ছে। বাজারেও সব মাছ ছাপিয়ে রুপালি ইলিশ যেন রাজার আসনে। শুধু তা–ই নয়, এবার বাজারে ইলিশের আকারও বড়। দামও তুলনামূলক কম।

মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের চলতি মাসের হিসাবে বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশ এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। অথচ চার বছর আগেও বিশ্বের মোট ইলিশের উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ আসত বাংলাদেশ থেকে। এই সময়ের মধ্যে এখানে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে ইলিশের উৎপাদন। সে তুলনায় প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে ইলিশের উৎপাদন কমেছে। বাংলাদেশের পরই ইলিশের উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে ভারত। পাঁচ বছর আগে দেশটিতে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ ইলিশ উৎপাদিত হতো। তবে চলতি বছর তাদের উৎপাদন প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশে নেমেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা মিয়ানমারে উৎপাদন হয়েছে ৩ শতাংশের মতো। ইরান, ইরাক, কুয়েত ও পাকিস্তানে উৎপাদন হয়েছে বাকি ইলিশ।

ভারতের কেন্দ্রীয় মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে দেশটিতে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে অন্যতম আলোচনার বিষয় ছিল বাংলাদেশে কীভাবে ইলিশের উৎপাদন বাড়ল। সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশের ইকোফিশ প্রকল্পের দলনেতা অধ্যাপক আবদুল ওহাব। তিনি বাংলাদেশের ইলিশের উৎপাদনের সাফল্য তুলে ধরে বলেন, এ দেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারি সংস্থাগুলো যে মডেল তৈরি করেছে, তা এখন বিশ্বের অনেক দেশ অনুসরণ করছে।

মা ও জাটকা ইলিশ ধরা বন্ধ করা, অভয়াশ্রম বাড়ানো ও জেলের সুরক্ষা দেওয়ায় এ সাফল্য এসেছে। অধ্যাপক ওহাবের গবেষণা প্রবন্ধটিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিভিন্ন নদ-নদীতে ইলিশের যে অভয়াশ্রম তৈরি করেছে, তা ধারাবাহিকভাবে এই মাছের উৎপাদন বাড়িয়েছে। ২০১৮-১৯ সালে বাংলাদেশের মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশ যৌথভাবে ইলিশের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও গতিবিধি নিয়ে প্রথম একটি গবেষণা করে। তাতে দেখা গেছে, মা ইলিশ যে নদীতে ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ইলিশ যেখানে বড় হয়, পরিণত অবস্থায় তারা সমুদ্র থেকে সেই নদীতেই ফিরে আসে। অন্য কোনো নদী বা জলাশয়ে যতই অনুকূল পরিবেশ থাকুক না কেন, তারা জন্মস্থানেই ফিরে আসে। বাংলাদেশে যেহেতু অভয়াশ্রমগুলোয় ইলিশের ডিম পাড়ার হার বেশি এবং বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, তাই সাগর থেকে তারা সেখানেই ফিরে আসছে। ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো অভয়াশ্রম তৈরি করে মা ও জাটকা ইলিশের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেনি।

এর আগে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী গবেষণা করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে ইলিশের সর্বোচ্চ টেকসই উৎপাদন ৫ লাখ ৩০ হাজার টন হতে পারে। কিন্তু সেই পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হয়েছে। চার বছরেই ইলিশের উৎপাদন সর্বোচ্চ ওই সীমা অতিক্রম করে গেছে। গত বছরের নভেম্বরে মৎস্য অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ডফিশের গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে ৬ লাখ ৭০ হাজার টন ইলিশের সর্বোচ্চ টেকসই উৎপাদন সম্ভব।

মা ও জাটকা ইলিশ ধরা বন্ধ করায় আমাদের এখানে এই সাফল্য এসেছে। ইলিশের বড় হওয়ার জন্য অভয়াশ্রমগুলো বাড়ানো এবং সুরক্ষা দেওয়াও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। ইলিশ ধরার জালের আকৃতি নতুনভাবে নির্ধারণ করায়, সামনের দিনগুলোয় ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে।

মা ইলিশ রক্ষা অভিযানের অংশ হিসেবে প্রতিবছর ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে এই মাছ ধরা বন্ধ থাকে। এ সময় সরকার তালিকাভুক্ত জেলেদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সহায়তা দেয়। এই কর্মসূচিও ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘মা ও জাটকা ইলিশ ধরা বন্ধ করায় আমাদের এখানে এই সাফল্য এসেছে। ইলিশের বড় হওয়ার জন্য অভয়াশ্রমগুলো বাড়ানো এবং সুরক্ষা দেওয়াও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। ইলিশ ধরার জালের আকৃতি নতুনভাবে নির্ধারণ করায়, সামনের দিনগুলোয় ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে।’

ওয়ার্ল্ডফিশ, মৎস্য অধিদপ্তর ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবার শুধু পরিমাণের দিক থেকেই নয়, আকৃতিতেও বাংলাদেশের ইলিশের ধারেকাছে নেই কোনো দেশ।

ওয়ার্ল্ডফিশ, মৎস্য অধিদপ্তর ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবার শুধু পরিমাণের দিক থেকেই নয়, আকৃতিতেও বাংলাদেশের ইলিশের ধারেকাছে নেই কোনো দেশ। ২০১৪ সালে এ দেশে ধরা পড়া ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫১০ গ্রাম। গত বছর তা বেড়ে ৯১৫ গ্রাম হয়েছে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে চলতি বছর তা আরও বেড়ে ৯৫০ গ্রাম হতে পারে। অন্যদিকে ভারত, মিয়ানমার বা আরব সাগরের তীরবর্তী দেশগুলোয় যে সামান্য পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়েছে, তার গড় ওজন ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের মধ্যে। পুষ্টিগুণ ও স্বাদের দিক থেকেও বাংলাদেশের ইলিশকেই সেরা বলে থাকেন বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা।

বাংলাদেশের ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার সব কটিই বৈজ্ঞানিক গবেষণানির্ভর ছিল। আর ইলিশের অভয়াশ্রম রক্ষা ও নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ না ধরার কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে একযোগে কাজ করেছে সরকারি সংস্থাগুলো। তারও সুফল এখন আমরা পাচ্ছি।

বরিশাল থেকে চাঁদপুর হয়ে চট্টগ্রামের ইলিশের অবতরণকেন্দ্রগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বাজারে বেশির ভাগ ইলিশের ওজন এক কেজি কিংবা তার কাছাকাছি। দেড়-দুই কেজির ইলিশও রয়েছে প্রচুর। পটুয়াখালীর কুয়াকাটার আলীপুর ইলিশ অবতরণকেন্দ্রের মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনসার আলী মোল্লা জানালেন, ওজন বেশি এবং দাম আগের চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম হওয়ায় বিক্রিও হচ্ছে ভালো।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশের ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার সব কটিই বৈজ্ঞানিক গবেষণানির্ভর ছিল। আর ইলিশের অভয়াশ্রম রক্ষা ও নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ না ধরার কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে একযোগে কাজ করেছে সরকারি সংস্থাগুলো। তারও সুফল এখন আমরা পাচ্ছি।’

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১:২৯ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত