ঘোষণা

বাংলাদেশে বন্যার তৃতীয় ঢল শুরু, অন্তত ১০ দিন থাকবে

অনলাইন ডেস্ক | মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 70 বার

বাংলাদেশে বন্যার তৃতীয় ঢল শুরু, অন্তত ১০ দিন থাকবে

কুড়িগ্রামের উলিপুরের আইরমারীর চরের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম পেশায় মাঝি। নৌকায় যাত্রী পারাপার করে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে তাঁর। গত ২৯ জুন ব্রহ্মপুত্রের পানি তাঁর বাড়ির দোরগোড়া পর্যন্ত আসে। কয়েক দিন পর নেমে গিয়ে ১২ জুলাই আবার বন্যার পানি তাঁর ঘরের ভেতরে চলে আসে। আর গতকাল সোমবার বন্যার পানি তাঁর ঘর প্রায় ডুবিয়ে দিয়েছে। ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে আপাতত নৌকায় আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

দুই দিন ধরে উজানে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় নতুন করে বন্যার পানি বাড়তে জেলাগুলোতে এবং সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ায় সিলেট অঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এতে পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস বলছে, বন্যার এই তৃতীয় ঢল ১০ থেকে ১৫ দিন থাকতে পারে। আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহের আগে বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। গত ২৭ জুন থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত ছিল বন্যার প্রথম ঢল। এরপর ধীরে ধীরে পানি কিছুটা কমতে থাকে। তবে ১১ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত আরেক দফা ঢলের কারণে বন্যার পানি বেড়ে যায়। এরপর চার দিন ধরে পানি কমছিল। কিন্তু গতকাল থেকে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। উজান থেকে আসা পানির এই প্রবাহকে বন্যার তৃতীয় ঢল বলা হচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, তৃতীয় দফার এ ঢলে বন্যা পরিস্থিতি আগের চেয়ে মারাত্মক হতে পারে। এ ঢলের সঙ্গে দেশে বৃষ্টিও বেশি হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ দফায় ২০ থেকে ২৫টি জেলা বন্যাকবলিত হতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গতকালের দুর্যোগ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের উত্তর–পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দী। বন্যার কারণে বাড়িঘর ও ফসল হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৬ লাখ মানুষ।

বন্যা বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা দিয়ে ভারতের আসাম থেকে বাংলাদেশে বন্যার পানি প্রবেশ করে। এর সঙ্গে তিস্তা দিয়েও সিকিম থেকেও ঢলের পানি আসে। এ দুই নদ–নদীর পানি যমুনা দিয়ে পদ্মা হয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়। বাংলাদেশের উজানে ভারতের আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম এবং পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে তিন দফায় ভারী বৃষ্টি হওয়ায় দেশের নদী অববাহিকার পানি অতীতের যেকোনো সময়ে তুলনায় এখন বেশি। ফলে এবারের বন্যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় রূপ নিতে যাচ্ছে।

সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৮টি জেলায় ৫ লাখ ৮০ হাজার পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় আছে। প্রতিটি পরিবারে ৫ জন সদস্য ধরলে বন্যার বিপদে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ। বন্যায় এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ২১ জন। আর অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। বাকিরা উঁচু স্থান, সড়ক ও বাঁধের ওপরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় এসব মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে গেছে।

এদিকে দুর্গম এলাকার বন্যার্ত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছাতে পরিবহন খরচ বাবদ তিন কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। প্রতি টন ত্রাণের জন্য প্রতি কিলোমিটারে ৩২০ টাকা করে পরিবহন খরচ ধরে ওই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আগে যেসব এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো হয়েছে, সেগুলোর খরচও বিল পরিশোধ সাপেক্ষে সরকার থেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আতিকুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত বন্যা মোকাবিলার মতো যথেষ্ট ত্রাণ মজুত আছে। যখন যেখানে যা দরকার, তা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

টানা বৃষ্টি এবং বন্যার পানির ঢলে রাজধানী খিলগাঁওয়ের নাসিরাবাদ এলাকায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দুদিন আগেও যেসব সড়কে পানি ছিল না, ওই সব সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, আরও দুদিন বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

নাসিরাবাদ এলাকাটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। এই ওয়ার্ড নিচু ভূমিতে অবস্থিত। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত রোববার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টিতে ফকিরখালী, ঈদেরকান্দি, বালুপাড়, দাসেরকান্দি ও বাবুর জায়গা এলাকার বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গেছে।

সংরক্ষিত আসনের স্থানীয় কাউন্সিলর নাছরিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এবার পানি প্রচুর বেড়েছে। বলা চলে ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের পুরোটাই পানিতে ডুবে গেছে। মানুষজন নৌকায় করে চলাচল করছে।

এদিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আজ মঙ্গলবারও দেশের বেশির ভাগ এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। উত্তরাঞ্চলসহ কয়েকটি এলাকায় অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা আছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির পাশাপাশি পানিবন্দী মানুষের কষ্ট বাড়বে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এবারের বন্যার একটি বিশেষত্ব হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পানি আটকে থাকছে। এমনিতেই করোনার কারণে মানুষের জীবন–জীবিকা বিপর্যস্ত। এর সঙ্গে বন্যার ভোগান্তি যোগ হয়েছে। এখন সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সহায়তায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত রাষ্ট্রের। পাশাপাশি পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাতে পুনর্বাসনের কাজ শুরু করা যায়, সেই প্রস্তুতিও রাখা প্রয়োজন।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:১৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত