ঘোষণা

মার্ক্সবাদের ভবিষ্যত

মার্ক্সবাদ ও মানবজাতির আদর্শগত ভবিষ্যত

আবুল কাসেম ফজলুল হক | শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 76 বার

মার্ক্সবাদ ও মানবজাতির আদর্শগত ভবিষ্যত

১. চলমান আদর্শগত বাস্তবতা

প্রায় চার দশক ধরে পৃথিবীতে আদর্শগত (ideological) শূন্যতা বিরাজ করছে এবং পুরোনো পরিত্যক্ত সব সংস্কার-বিশ্বাসের ও ধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটছে। জনগণের জন্য মার্ক্সবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রকে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলা হয়েছে। ফলে এগুলো আর আদর্শরূপে কার্যকর নেই। এ জন্যই সৃষ্টি হয়েছে আদর্শগত শূন্যতা। আদর্শের অবলম্বন ছাড়া চলমান অপব্যবস্থা, দুর্নীতি, জুলুম-জবরদস্তি ও অসামাজিক কার্যকলাপের মধ্যে মানুষ অসহায় বোধ করছে। আদর্শগত শূন্যতার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে কেবল ধর্মের পুনরুজ্জীবন দেখে ১৯৮০-র দশক থেকেই অনেকে উদ্বেগের সঙ্গে বলে আসছেন, ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরছে।

দুনিয়াব্যাপী ইতিহাসের চাকাকে আবার সামনের দিকে ঘোরানোর কথা বলে যাঁরা তত্পর হয়েছেন, তাঁরা ধর্মের ও ধর্মের অনুসারীদের বিরুদ্ধে নেতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রতিবাদী আন্দোলন চালিয়েছেন। ইসলামপন্থীদের তাঁরা বলছেন মৌলবাদী আর ইসলামকে বলছেন মৌলবাদ। মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন ইসলামপন্থীদের জন্য উসকানিমূলক হয়েছে এবং তাতে ইসলামপন্থীরা উত্তেজিত ও সক্রিয় হয়েছেন আর ইতিহাসের পশ্চাদ্গতি দ্রুততর হয়েছে। যাঁরা ইতিহাসের চাকাকে আবার সামনের দিকে ঘোরানোর কথা বলেন, গণতন্ত্র কিংবা সমাজতন্ত্র নিয়ে তাঁরা অল্পই চিন্তা করেন। তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার কথা খুব বলেন এবং মৌলবাদবিরোধী, সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী, দুর্নীতিবিরোধী ও নারীবাদী আন্দোলন করেন।

এর মধ্যে কোনো কোনো মহল থেকে প্রচার করা হয় যে ধর্ম ও আদর্শের (grand narratives) দিন শেষ। রাষ্ট্রও গুরুত্বহীন হয়ে গেছে বলে তাঁরা মত প্রকাশ করেন। আর বিশ্বায়ন, বৈশ্বিক রাষ্ট্র, বৈশ্বিক নাগরিক, উদারনীতিবাদ, বিরাজনৈতিকীকরণ (নৈরাজ্যবাদ), বহুত্ববাদ, এনজিও, সুশীল সমাজ সংগঠন ইত্যাদি কথা ক্রমাগত উচ্চারিত হয়। জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্রকে গড়ে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না।

উনিশ শতকে রুশ দার্শনিক মিখাইল বাকুনিন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক-আন্দোলনের ধারায় নৈরাজ্যবাদ প্রচার করেছিলেন। Syndicalism-এর সঙ্গেও নৈরাজ্যবাদের ধারণা যুক্ত হয়েছিল। এখন বিরাজনৈতিকীকরণ দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য বিশ্বায়নবাদীদের অঘোষিত কর্মনীতি। নোয়াম চমস্কি চলমান বিশ্বায়নের ও সাম্রাজ্যবাদের কঠোর সমালোচক হয়েও ফেবিয়ান নৈরাজ্যবাদকে এবং বাকুনিনের চিন্তাধারাকে সামনে আনছেন। উনিশ শতকের শেষার্ধে ও বিশ শতকের শুরুতে এই সব মতাদর্শ মার্ক্স ও মার্ক্সবাদীদের দ্বারা অবাস্তব কল্পনা (utopian) বলে বিবেচিত হয়েছিল।

আমার মত এই যে, কিছু লোকে প্রবলভাবে ধর্মের অবসান চাইলেই ধর্ম অবসিত হবে না। সভ্যতার বিকাশে ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রতিটি ধর্মই উন্মেষপর্বে ও প্রথম পর্যায়ে নিপীড়িত জনগণের জন্য কল্যাণকর ও প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পর প্রতিটি ধর্মই কায়েমি স্বার্থবাদীদের দ্বারা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহূত হয়েছে। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের বেলায়ও একই ধরনের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ধর্মের কিংবা আদর্শের অবলম্বন ছাড়া চলতে পারে না। আদর্শহীন বাস্তবতায় ধর্মকে শেষ করে দেওয়ার জন্য যতই চেষ্টা করা হচ্ছে, মানুষ ততই ধর্মের আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। গণতন্ত্রকে পুনর্গঠিত কিংবা নবায়িত করে সর্বজনীন গণতন্ত্রে রূপ দিলে এবং জনগণের জন্য প্রাণশক্তিসম্পন্ন আদর্শ রূপে সামনে আনা হলে ঘটনাপ্রবাহ সম্মুখগতি লাভ করবে।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১২:০৩ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত