ঘোষণা

করোনার বিষাদ ও মুক্তির আনন্দ

| শনিবার, ০৬ জুন ২০২০ | পড়া হয়েছে 25 বার

করোনার বিষাদ ও মুক্তির আনন্দ

আবুল মোমেন :

করোনার কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার মোক্ষম পথ মনে করা হচ্ছে নিজের ঘরে বন্দী থাকা। তবে এই শর্ত শতভাগ পালন করা সহজ না হলেও অনেকেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন বাড়িতে বন্দী থাকতে। নিজে বাজারে না গিয়ে কাউকে দিয়ে তা এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সবাই পারছেন কি না, জানি না। সেই ব্যক্তিকে ঘরে না ঢুকিয়ে বাজার কয়েক ঘণ্টা দরজার বাইরে রেখে তারপর থলে জীবাণুসংহার তরল দিয়ে শুদ্ধ করে আগে থেকে প্রস্তুত পানির গামলায় তা ঢেলে আবার দুই ঘণ্টা রেখে নিশ্চিন্ত হওয়ার প্রটোকল সবার পক্ষে সব সময় মেনে চলা সম্ভব কি না, বলা মুশকিল।

ঘরে ঘন ঘন গরম পানি ও আদা-লং দেওয়া চা পান, লবণজলে গড়গড়া, গরম পানির ভাপ গ্রহণও নিয়মিত চালু রাখা সহজ নয়। এদিকে এই বন্দি জীবনের দুমাস পেরিয়ে তৃতীয় মাস শুরু হলো। দেখা যাচ্ছে জীবন শুধু বাজার করে চলে না; ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন, চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ ও ওষুধ কেনা প্রভৃতিও অন্যের মাধ্যমে চলতে পারে বটে কিন্তু তার বাইরেও আকস্মিক/জরুরি প্রয়োজন দেখা দিতে পারে, যখন এই লকডাউনের শর্ত একটু শিথিল করতেই হয়। তা ছাড়া এই গা-বাঁচিয়ে চলা তথা প্রাণ বাঁচানোর মধ্যে মনপ্রাণ-দেহ সঁপে দিলে মনুষ্য-জীবনের কিছু ক্ষতি হতে পারে। মানবগোষ্ঠীর অভিযাত্রার মুখ্য বিষয় হলো বৈরী পরিস্থিতি-বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা। করোনা নতুনতর এবং কয়েক প্রজন্মের জন্যে ভয়ংকরতম এক চ্যালেঞ্জ।

এবারের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মূল ভূমিকায় দেশীয় স্তরে থাকছে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে এ ভূমিকা পালন করছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। প্রাচীনকালে ভারতবর্ষ এবং মধ্যযুগে মুসলিম সভ্যতা চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকলেও সেসব আজ ইতিহাসের কাহিনি। পশ্চিমের রেনেসাঁসের পথ ধরে পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে বিকাশ তারা ঘটিয়েছে, তাতে কখনো ছেদ পড়েনি। বিজ্ঞান-বিপ্লবকে প্রযুক্তি শিল্পবিপ্লবে উন্নীত করে তারা জনগণের জীবনে ব্যাপক কল্যাণকর পরিবর্তন ঘটিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি এর বাইরে থাকেনি। এই ধারাবাহিকতায় পশ্চিম আমাদের ছাপিয়ে সবদিকেই অনেক এগিয়ে গেছে। এখন বাস্তব জীবনে তাদের অনুসরণ করা ছাড়া আমাদেরসহ বাকি বিশ্বের আর কোনো পথ নেই।

এ মুহূর্তে করোনা মহামারি মোকাবিলায় দেশে একটি উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। তবে এর জন্য বিজ্ঞানসম্মত ও যুক্তিসংগত চিন্তায় সক্ষম নাগরিক তৈরির উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের তা অনুধাবনের ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা এবং বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা প্রাথমিক দায়িত্ব। এতকাল আমরা এদিকে মনোযোগ দিইনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বরাবরই প্রয়োজন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক কম ছিল। তবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তুলনামূলকভাবে চ্যালেঞ্জ ও নতুন চিন্তাভাবনা গ্রহণে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবনে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে যে সচেষ্ট, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটবে বলে আশা করা যায়। কেবল দুর্বোধ্য ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকল গণস্বাস্থ্য-উদ্ভাবিত করোনা নির্ণয়-কিটের মান পরীক্ষা নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। মানুষ এর সন্তোষজনক কোনো জবাব পায়নি।

করোনার অভিজ্ঞতা আমাদের জাতীয় চরিত্রে দুটি ক্ষেত্রে আশু সংস্কারের দাবি হাজির করেছে। প্রথমত, আমাদের বিশৃঙ্খল স্বভাব তথা শৃঙ্খলা না মানার মনোভাব আজ অচল; রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ব্যক্তিগত নানান শৃঙ্খলার প্রটোকল বা বিধিবিধান মেনে চলতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ট্রাফিক আইন মানতে হবে, সামাজিক পর্যায়ে আরও কিছুদিন হ্যান্ডশেক-কোলকুলি বাদ দিয়ে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে হাত ধোয়ার ও যখনতখন মুখে হাত না দেওয়ার এবং বাইরে বেরোলে মাস্ক পরার নিয়ম মানতে হবে। দ্বিতীয়ত, কেবল আশু বা তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানো বা ঠেকার কাজে দায়সারার অভ্যাস বদলে ঘটমান বর্তমানেই আটকে না থেকে নিত্যঘটিত বর্তমান এবং আশু ও সূদুর ভবিষ্যতের কথা ভাবতে এবং তার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করে কাজ করা শিখতে হবে। সে প্রক্রিয়ায় বহুমুখী ভাবনাকে পরিকল্পনার মধ্যে আনার অভ্যাস গড়ে উঠবে। সোজা ভাষায় আমাদের একচোখামি আর ঠেকা দিয়ে দায়সারার অভ্যাস পাল্টাতে হবে, চিন্তা ও মনোজগতের যেমন বহুমুখিতা-বহুগামিতা প্রয়োজন, তেমনি দূরদর্শিতা থাকাও জরুরি। হুজুগে বাঙালি এসব শিখবে কীভাবে ঠেকে না শিখলে? এলেবেলে মন ও এলোমেলো জীবনে সংক্রমণ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।
২.
এবার দুটি কাজের কথায় আসি। জীবনভর শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করেছি বলে এই বন্দী জীবনে তাদের কথাই বেশি মনে আসছে। আমরা ফুলকি থেকে ওদের জন্যে অনলাইনে একটা কাজ শুরু করেছি গত ৯ মে থেকে। নাম দিয়েছি ‘বন্দি জীবনে মুক্তির স্বাদ’। এর কোনো গণ্ডি নেই, যে যেখানে আছে শিশু-কিশোরেরা এতে নাম নিবন্ধন করতে পারে এবং বয়স অনুযায়ী একটি দলে যুক্ত হয়ে সপ্তাহে দুই দিনের দুই ঘণ্টার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে। এক দলকে ২০ জনে সীমিত রাখতে চাইছি। এ কার্যক্রমকে বলা যায় জীবনশৈলীর পাঠ। সভ্যতা, বিজ্ঞানসহ জানার নানা বিষয়, হাতের কাজের নানা কৌশল, সংগীত-আবৃত্তিসহ নানান কলা এবং বিভিন্ন মনীষীর জীবনকথা জানবে এই কার্যক্রমে। এটি একটি মুক্ত অঙ্গন, সব শিশু-কিশোরের জন্য উন্মুক্ত। যুক্ত হওয়ার জন্য নাম, বয়স ও একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর পাঠাতে হবে।

আর যে বলছিলাম মানুষের কেবল নিজের বা নিজ স্বজন-পরিজনের জন্যে বাঁচলে চলে না, তাতে যেন মানুষ থাকা যায় না; বাড়ির ছোটদের মানুষ হয়ে ওঠার পথেও বাধা আসবে। তাই শিশু-কিশোরদের জীবনশৈলী পাঠের মুক্ত অঙ্গন বন্দি জীবনে মুক্তির স্বাদ নিয়ে ব্যস্ততর পাশাপাশি আমরা অনেকেই কাজ করছি অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। কাজটি বড় পরিসরেই চলছে। এর মধ্যে ফুলকি তার শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে যুক্ত হয়েছে অন্তত ১০০টি পরিবারকে প্রতি সপ্তাহে ৪০০ টাকার কুপন দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। গত দেড় মাসে আমরা প্রতি ১০ দিনে একবার এ সহায়তা দিতে পেরেছি। এখনও সাপ্তাহিক অর্থাৎ মাসে তিনবারের স্থলে চারবারে পৌঁছাতে পারিনি। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম তিন মাস এ কার্যক্রম চালাতে পারলে চলবে, কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হবে এবং নিম্নবিত্তের পাশাপাশি নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশও চরম অভাবের সম্মুখীন হবে। ফলে এ ধরনের কার্যক্রমের পরিসর বাড়াতে হবে এবং তা আরও কিছুদিন, হয়তো এ বছরজুড়ে চালানোর প্রয়োজন হবে। এদিকে দাতাদেরও অনেকের সামর্থ্য কমে আসছে। তাই প্রয়োজন আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ, যাতে একজনের ওপর চাপ বেশি না পড়ে। এখানে অর্থ সহায়তা পাঠানো যায় বিকাশে, নম্বর: ০১৮১৮০৬৬২১৩।
৩.
কেন এসব কথা বলছি? কুণ্ঠা ও অস্বস্তি নিয়েও নিজেদের উদ্যোগের কথাগুলো জনসমক্ষে বলছি দুটি কারণে। প্রথমত, শিশু-কিশোরদের মনের ওপর বন্দিত্বের ও ভয়ের প্রভাব যেন বড় ক্ষতি তৈরি করতে না পারে ও তাদের মানসিক বিকাশ যেন বাধাগ্রস্ত না হয় এবং আকস্মিক অযাচিত অভাবের সম্মুখীন হয়ে অপ্রস্তুত, হতভম্ব, হতাশ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ। দ্বিতীয়ত, আমাদের নানা কাজের সূত্রে বহু সৃজনশীল মেধাবী তরুণ-তরুণী রয়েছে, তারা কেন কেবল বন্দি জীবনের হতাশায় ডুবে থাকবে? আবার মানুষ কেবল বেঁচে থেকে মানুষ থাকে না, তাকে কাজের ও ভূমিকার মাধ্যমেই মানবসত্তা রক্ষা করতে হয়। বাস্তবেও দেখা যাচ্ছে এ রকম চ্যালেঞ্জিং কাজের প্রস্তাব প্রত্যেকে লুফে নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে শিশু–কিশোর ও তরুণের সংখ্যা তো ৬-৭ কোটি। ফলে প্রয়োজন অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবকের। হ্যাঁ, এ সময়ে করোনাসংক্রান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুরক্ষার সব প্রটোকল মানতে হবে, কেবল তাকে কাজের সঙ্গে সমন্বয় করে নিতে হবে। এর জন্যে যোগ্যতার পাশাপাশি প্রয়োজন মনোবল, আত্মবিশ্বাস এবং শিশুসহ সব মানুষের জন্যে ভালোবাসা এবং মানবকল্যাণের জন্যে উৎকণ্ঠিত মন।

বাঁচার পাশাপাশি নিজের মনুষ্যত্বকে ধরে রাখার, সবাইকে নিয়ে উন্নত মানবসমাজ গড়ার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার কাজে সবাইকে হাত লাগাতে হবে।

সূত্র: প্রথম আলো

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১২:৩০ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৬ জুন ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত