ঘোষণা

মিশরীয়দের অদ্ভূত সব দেব-দেবী

বিবেক ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 77 বার

মিশরীয়দের অদ্ভূত সব দেব-দেবী

প্রাচীনকাল থেকেই মিশর বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। তাদের জীবন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাসে ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া। তাদের মমি আর পিরামিডের রহস্য তো সবাইকেই অবাক করেছে। সারা বিশ্বের তাবড় তাবড় গবেষকরা এখনো এর সমাধান বের করতে পারেননি।

মিশর সম্পর্কে যা কিছু জানা যায় তার কিছুটা প্রাপ্ত তথ্য আর বাকিটা নথি বিশ্লেষণ করে অনুমান করা। মিশরের নানা দিক কিন্তু আমাদের বাঙালি লেখকদের লেখায় উঠে এসেছে। সত্যজিৎ রায় কিংবা সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখাতেও এককালের সমৃদ্ধ মিশরের আখ্যান উঠে এসেছে।

খ্রিষ্ট জন্মের ৩১০০ বছর আগে রাজা মেনেস নীল নদের উভয় পাশের উত্তর এনং দক্ষিণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বসতিগুলোকে একত্রীভূত করে গোড়াপত্তন করেন মিশরীয় সাম্রাজ্যের। মেনেস হন প্রথম ফারাও। এরপর বংশানুক্রমে ৩১টি রাজবংশ শাসন করেছেন নীল নদের দেশ মিশরকে। মোটামুটিভাবে এখানেই শুরু ধরা হলেও এরও আগে এমনকি খৃস্টজন্মের সাত হাজার বছর আগের মিশরীয় সাম্রাজ্যের শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে।

আগের পর্বগুলোতে মিশরীয়দের জীবনযাপন, সভ্যতা, ফারাও, তাদের মমি, পিরামিড বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। আজকের দশম এবং শেষ পর্ব সাজানো হয়েছে মিশরীয়দের দেবতা ভক্তি নিয়ে। প্রাচীন মিশরে দুই হাজারেরও বেশি দেব দেবীর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই দেবদেবতাদের মধ্যে স্থান কাল এবং পাত্রের পার্থক্য ছিল। কোনো এক স্থানে যে দেবতা পূজিত হতেন অন্য স্থানে ছিলেন পৃথক কোনো দেবতা।

আবার মিশরীয় সাম্রাজ্যের গোড়ার দিকের দেবতারা পরবর্তীকালের দেবতাদের থেকে পৃথক। এদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন মিশরীয় রাজা বা ফারাও যারা পরবর্তীতে দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত হন। কেউ কেউ আবার ছিলেন ক্ষতিকর দেবতা। তাদের ছিল প্রধান সাত দেব-দেবী। এই সব দেব দেবীদের চমকপ্রদ সব তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের পর্ব-

আমুন এবং রা মূলত দুইজন দেবতা ছিলেন। মিশরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে দুই দেবতাকে এক করে আমুন–রা ডাকা হয়। আমুন হলো থিবস শহরের প্রধান দেবতা, অনেকে একে গ্রিক দেবতা জিউসের সঙ্গেও তুলনা দেন। বিশ্বাস করা হতো, আমুনের নির্দেশেই বায়ু প্রবাহিত হয়। আমুন দেখতে অনেকটা অভিজাত পরিবারের ছেলের মতো, যার মাথায় হামানদিস্তা সদৃশ মুকুট আছে।

এছাড়া তাকে রাজহংস বা মেষের মাধ্যমেও প্রকাশ করতো প্রাচীন মিশরীয় পুঁথিলেখকগণ। খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩৯-১২৯২ অব্দি আমুনের আরধনা চলতো আঞ্চলিকভাবে। থিবেসে আমুন দেবতার সম্মানে বিশেষ অনুষ্ঠান পালিত হত। এই দেবতাকে তুষ্ট করতে নীলনদে মিশরের পুরুষরা মাস্টারবেশন বা বীর্যদান করতেন।

মিশরের রাজধানী থিবসে স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকেই সারাদেশে আমুনচর্চা শুরু হয়। মন্দিরগুলোতে নতুন করে আমুনের মূর্তি গড়া হয়। পুরোহিতেরাও প্রচারে নামেন এই দেবতার। আগে শাসক শ্রেণির দেবতা হিসেবে পরিগণিত হলেও, সেসময় আমুনের পূজা শুরু করে সাধারণেরাও।

আমুন যেহেতু বাতাসের মতো অদৃশ্য বস্তুর নিয়ন্ত্রক। তাই একে ডাকা হতো লুকনো ঈশ্বর নামে। যুদ্ধজয়ের জন্য মিশরীয়রা তার পূজা করতো। আমুনের স্ত্রী ছিল আমোউনেত। মিশরের লুক্সর আর কারনাকের মন্দিরে আমুনের দৃষ্টিনন্দন অসংখ্য মূর্তি দেখা যায়।

তিনি ছিলেন সূর্যের দেবতা। সূর্য বরাবরই নীলনদ তীরের মানুষের কাছে ছিল গুরুত্ববহ। মানুষের দেহে বাজপাখির মাথা এমনই ছিল রা’এর বাহ্যিক আকৃতি। সেসময়ের লোকেরা ভাবতো ফারাওরা এই সূর্যদেবেরই অবতার। থিবসকে রাজধানী হিসেবে ঘোষণার পর এক করে দেয়া হয় দুই দেবতাকে। ফলে এর নাম হয় আমুন-রা। সম্মিলিত শক্তির ফলে আরও গ্রহণযোগ্যতা পায় এই দেবতারা।

অন্য দেবতাদের থেকে আইসিস ছিলেন বেশ ব্যতিক্রম। কারণ এখনো মিশর, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর পূজা-আর্চনা এখনো চলে। গ্রিক মিথোলজিতেও আইসিসকে আফ্রোদিতির অনুসারী হিসেবে পাওয়া যায়। বহু গবেষণাবিদ আইসিস এবং পুত্র হোরাসের সঙ্গে কুমারি মাতা মেরি ও যিশু খ্রিস্টের তুলনা দিয়েছেন। আইসিসকে খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮৬ সালের হায়রোগ্লিফিকে প্রথম পাওয়া যায়।

মূলত স্বামী আইরিসকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো এবং পাতালপুরীর দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই খ্যাতি লাভ করে এই দেবী। পরবর্তীতে দেবতা হোরাসের মা এবং জাদুবিদ্যার দেবী হিসেবে অধিষ্ঠিত হয় আইসিস। এছাড়াও একে দেবতাদের মাতা হিসেবেও মানা হয়। অভিজাত নারী বেশেই তাকে দেখা যায় বিভিন্ন লিপিতে।

মিশরীয় ইতিহাসে আনুবিসের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গাঢ়। মমিফিকেশন দিয়েই পুরো দুনিয়াকে চমকে দিয়েছিল প্রাচীন মিশর। স্থাপত্যের সঙ্গে যে রসায়নেও দক্ষতা ছিল মিশরীয়দের এসবই তার প্রমাণ। মৃতদেহের সৎকারের জন্য পালিত আচার অনুষ্ঠানের দেবতা ছিল আনুবিস। তিনি দেখতে ছিলেন অর্ধ শৃগাল বা শেয়াল আর অর্ধ মানব। তার মুখ ছিল শেয়ালের মতো দেখতে আর শরীর ছিল মানুষের।

আদিকালে কবরস্থান বা মৃতদেহ সৎকারের স্থানে শেয়াল, নেকড়ে ঘুরতে দেখা যেতো। সম্ভবত সেখান থেকেই এই দেবতার রূপ দেয়া হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ২৫৭৫ থেকে ২১৩০ সাল পর্যন্ত গোটা দেশেই আনুবিসের প্রতি আনুগত্য বজায় ছিল। পরে মৃত্যু দেবতা হিসেবে আনুবিসের পদ চলে যায় অসিরিসের হাতে। পুরাণ অনুসারে, অসিরিসের দেহকে মমি করার মধ্য দিয়ে আনুবিস মমিশিল্পের দেবতা পদে অধিষ্ঠিত হয়।

অসিরিসের জীবনের দুটো অংশ। প্রথম ভাগে অসিরিস ছিলেন একজন মিশরীয় রাজা। রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচে তারই ভাই সেথ এবং ইথিওপিয়ার রানির ষড়যন্ত্রে মারা পড়ে সে। সেথ ছলেবলে ভাইকে একটি কফিনে ঢুকিয়ে ডালা আটকে দেয় এবং নীলনদে নিক্ষেপ করে। অক্সিজেনের অভাবে অসিরিসের মৃত্যু হয়। তবে এতেই শেষ না। পরে অসিরিসের স্ত্রী আইসিস নীল নদের করাল স্রোত থেকে রক্ষা করে তাকে এবং ঈশ্বরের কাছে তার প্রাণ ভিক্ষা করে।

আইসিসের একনিষ্ঠ সাধনায় অসিরিস পুনরুজ্জীবিত হয়। সেই ক্ষণকালের মিলনের ফলে জন্ম নেয় দেবতা হোরাস। এরপরেই অসিরিসকে পাতালের দেবতা পদে আসীন করা হয়। অসিরিসকে মমিকৃত রাজারূপেই সর্বত্র দেখা যায়। তবে মূর্তি, লিপি প্রভৃতিতে তার সবুজাভ চামড়া আর স্নিগ্ধ সৌম্য মুখের উল্লেখ আছে। এছাড়াও মাথায় মুকুট ও হাতে শস্য মাড়াইয়ের ঝাড়াও বহন করে এই সাবেক রাজা। নীলনদ, উর্বরতা, মদ, কৃষিকাজ এবং পুনর্জন্মের দেবতা হিসেবে একে পূজা করতো প্রাচীন মিশরবাসী।

জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবতা থোত। অন্য দেবতাদের মতো বিধ্বংসী ও ষড়যন্ত্রের শিকার ছিল না এই দেবতা। মানবদেহের উপর সারস সদৃশ আইবিস পাখির অথবা বেবুনের মাথা নিয়ে গঠিত মিশরীয় জ্ঞানের এই কাণ্ডারি। হায়রোগ্লিফিক লেখন পদ্ধতি আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত এই আছে এর নাম। সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে বাণী পেতো থোত আর তাই লিখে রাখতো নিজের ভাষায়। অন্যান্য দেবতা যেসব জাদুবিদ্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল না, তাও ছিল থোতের কণ্ঠস্থ।

ঈশ্বরের পরম প্রিয় দেবতা থোতের উপর বর্তে ছিল এক বিশেষ দায়িত্ব। মৃত্যুর পর দেহ থেকে হৃদপিণ্ড বের করে তার পাপ ও পুণ্য পাল্লায় মাপতো এই দেবতা। সেই হিসাবের উপর ভিত্তি করেই শাস্তি বা পুনর্জন্মের ধরণ নির্ধারণ করতো দেবতা অসিরিস। নিজ গুণেই থোত এত দূর এসেছিল। পুরোবিশ্ব সুচারুভাবে পরিচালনা ছাড়াও গণিত, জাদুবিদ্যা, বিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, ভাষা, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতিতেও পণ্ডিত এই থোত। ৩৬৫ দিনে বছর ধরে পঞ্জিকা উদ্ভাবনও করে সে।

উশৃঙ্খল ও হিংস্র হিসেবে দুর্নাম আছে দেবতা সেথের। চরম বিশৃঙ্খলা, মরুকরণ ও ঝড়ের দেবতাও সে। আপন ভাই অসিরিসকে হত্যা করে মিশর দখলের পরিকল্পনা ছিল তার। পরবর্তীতে তা বিশাল যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুরাণ মতে, ভাই অসিরিসসহ অনেক দেবতারই মাথাব্যথার কারণ ছিল সেথ। তার ধ্বংসলীলায় বিরক্ত ছিল দেবরাজ্যের অধিকাংশ সদস্য।

তেমনি একালের গবেষকেরাও বেশ নাকানি চুবানি খাচ্ছেন এই দুষ্ট দেবতার আকৃতি নিয়ে। সেথের দেহ মানুষের মতো হলেও মাথা ছিল কোন বন্য প্রাণীর। তবে নির্দিষ্ট করে কোন প্রাণীর সঙ্গে এর সাদৃশ্য পাওয়া যায়নি। শূকরের মতো নাক, লম্বা কান, কিছু জায়গায় কুকুরের মতো সূচালো মুখের নিদর্শন মেলে। খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগে থেকেই সেথকে বিভিন্ন লিপিতে পাওয়া যায়।

মানুষের দেহে বাজপাখির মাথা জুড়ে নিলেই পাওয়া যায় দেবতা হোরাসকে। আকাশ, যুদ্ধ ও শিকারের এই দেবতার পিতা অসিরিস এবং মা আইসিস। সেই থেকে পরাভূত করে পিতা হত্যার প্রতিশোধ নেয় হোরাস। যুদ্ধক্ষেত্রে সেথের হাতে বাম চোখ হারালেও দেবতা থোতের সাহায্যে সেরে ওঠে তা। তার চোখের ছিল অলৌকিক ক্ষমতা। এমনটাই বিশ্বাস মিশরীয়দের।

তবে কীভাবে হোরাসের চোখ অলৌকিক বলে মানুষের মনে অধিস্ট হলো সে গল্পও খুব অদ্ভূত। যুদ্ধে সেথ হোরাসের বাম চোখ উপড়ে নিয়ে তা ছয় ভাগে কেটে ফেলে। এই প্রতিটি ভাগের সঙ্গে যুক্ত আছে সূর্য, নক্ষত্র ও চাঁদ সংশ্লিষ্ট মাপজোক।

সেই মাপটি হলো পুরো চোখের ডান অংশের মান ১/২, চোখের বাম পাশের মান ১/১৬, চোখের তারার মান ১/৪, চোখের ভ্রুর মান ১/৮, প্রতীকের বাকানো মতো অংশের মান ১/৩২ এবং চোখ থেকে পড়া অশ্রু বিন্দুর মান ১/৬৪। আর এই ছয়ভাগকে মানুষের শরীরের ছয় অংশের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

সেগুলো হলো গন্ধ, দৃষ্টি, চিন্তা, শ্রবণ, স্বাদ ও স্পর্শ। প্রাচীন মিশরের মানুষরা তাই তাদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার জন্য হোরাসের চোখের প্রতীক ব্যবহার করতেন। এই অংশগুলোর মান যোগ করলে হয় ৬৩/৬৪। স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে, বাকি ১/৬৪ কোথায়? মনে করা হয়, এই হারানো একটা অংশ হলো দেবতা থোতের ঐশ্বরিক ক্ষমতা, যা অন্য কারোর নেই।

আরেক মতানুসারে, এই অংশ দ্বারা বিশ্বজগতে ঈশ্বর ব্যতিত কোনো কিছুই যে নিখুঁত নয় তা নির্দেশ করা হয়। এছাড়াও মিশরীয়রা দুই হাজারের বেশি দেবতার পূজা করত। তবে এই সাত দেবতা বাদেও জেব, মুত, হাথোর, বাস্ত, বাবি, নুই, আতেন, খনসো প্রভৃতি দেবতার রহস্য ও রোমাঞ্চে পূর্ণ কাহিনী আছে মিশরীয় পুরাণে।

এর বেশিরভাগই কুসংস্কার ও মনগড়া। তবে প্রাচীন মিশরের পথে পথে যে আজো রহস্যের হাতছানি পাওয়া যায় তা কিন্তু মিথ্যে নয়। এমনকি ফারাওরা যে দেবতার পূজা করত বা অনুসারী ছিল। তাদের মূর্তি তাদের মমির সঙ্গে সমাহিত করা হয়। এমনকি দেবতার বাহন ছিল যেসব প্রাণী তাদেরও ফারাওদের সঙ্গে মমি করা হত। আধুনিককালে যত মমি পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে অনেকগুলোর সঙ্গেই ছিল প্রাচীন মিশরের দেবতাদের মূর্তি। এসব মূর্তি ছিল কাঠ, মাটি, বিভিন্ন উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:৩৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত