ঘোষণা

উড়ো চিঠি

পারমিতা রাহা হালদার | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 73 বার

উড়ো চিঠি

এই সুমি আজ আর বাইরে যাবি না, তোকে দেখতে ছেলের বাড়ি থেকে লোক আসবে, কেমন? সুমির মা বাণী দেবী বলতেই প্রতিবাদের সুরে ঝাঁজ নিয়ে সুমি, কেন মা এই তো সবে বি .এ পাশ করলাম । রআমি আরো পড়াশোনা করতে চাই”।

বড্ড কথা তোর, মেয়ে মানুষদের বেশি পড়াশুনা করে কি হবে শুনি? শেষে তো আমার মতো ওই হাতা খুন্তি নাড়া। তাছাড়া মেয়ে মানুষদের বেশি পড়াশুনা না করাই ভালো, বিয়ের পর সংসারে অশান্তি হয় বুঝতে পারলি, এডজাস্ট হয় না?

সদ্য বি. এ পাশ করা সুমি মায়ের কথাগুলো মেনে নিতে না পেরে বলে উঠলো, “মা তোমার ধারণা ভুল, মান্ধাতা আমলের। এখন ছেলে বা মেয়ে বলে কিছু হয় না সবাই সমান এখন। পড়াশুনা আজগের যুগে খুব প্রয়োজন । তা না হলে মেয়েরা কোনো দিনও সংসারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না”।

অবশ্য না। সেদিন সুমির কোনো কথাই মা বুঝতে চাইলো না। সময় মতো ছেলে পক্ষ এলো সুমিকে দেখতে । নেহাল আর্মি তে জোয়ান। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘোরা চাকরি। তাতে আপত্তি আছে কিনা সরাসরি জানতে চাইলো নেহাল। সুমি আস্তে করে ঘাড় নেড়ে অত্যন্ত মৃদু সুরে বল্লো “না”।

বিয়ের দিন পাকা হলো। বিয়ের আয়োজনে সবাই ব্যস্ত । কিন্তু কোথাও যেন সুমি মনমরা । এখনই পড়াশুনা ছেড়ে কোনো ভাবেই সংসার করতে চাই না, সেটা কাউকে বোঝাতেই পারলো না , এ তার দুর্ভাগ্য। এই দিকে মা, সুমিকে বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে সবাই কে মানিয়ে নিয়ে চলার পাঠ দিচ্ছেন। অবশেষে চার হাত এক হলো। বিয়ের অনুষ্ঠানের পরে বিদায়ের পালা। বাড়ির বড়োদের আশীর্বাদ নিয়ে মায়ের আঁচলে কণকাঞ্জলী দিয়ে রওনা দিল সুমি শ্বশুরবাড়ির পথে।

খুব জাঁকজমকের সাথে নতুন বাড়িতে নব বধূর প্রবেশ হলো। বৌমা যে খুব সুন্দরী ও লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে সে কথা আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে পাড়া প্রতিবেশী জনে জনে এসে জানিয়ে দিয়ে গেল সুমির শাশুড়িকে। বৌভাতের দুপুরে বৌ বাড়ির বড়োদের ভাত দিয়ে বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষ হতেই পোস্টম্যান এসে নেহাল কে একটা রেজিস্ট্রি চিঠি দিয়ে গেল। চিঠি খুলে পড়তেই মুখ অন্ধকার করে বল্লো নেহাল বিদেশী সৈন্যরা দেশ আক্রমণ করেছে। তাই আজই ফিরতে হবে ছুটি ক্যানসেল ।

দেশের প্রতি কর্তব্য পরায়ণ নেহাল চলে গেল বাধ্য হয়ে ফুলশয্যার অনুষ্ঠান ছেড়ে । যাওয়ার পরেই শ্বাশুড়ি বলে উঠলো অপয়া বৌ জুটেছে একটা, তা না হলে ফুলশয্যার রাতেই স্বামী কে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয়।

বেশ কিছুদিন কেটে গেল শ্বাশুড়ি বৌমা এক সংসারে দিন কাটাচ্ছে কিন্তু মন থেকে অপয়া ভেবেই শ্বাশুড়ি সুমিকে সহ্য করতে পারে না । মাঝে মধ্যেই কথা কাটাকাটি হয় দুজনের মধ্যে । সেই সংবাদ বাড়ি ছাড়িয়ে এখন পাড়াতে ও পৌঁছে গেছে ।

ভারত যুদ্ধে জয় লাভ করেছে সেই খবর এলো টিভি নিউজে ঠিকই কিন্তু নেহালের কোনো খবর এলো না। ছেলের অপেক্ষায় নেহালের মা এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়ে। সুমিই দায়িত্ব নিয়ে ডাক্তার ডেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে বহু চেষ্টা করলেও অবস্থার অবনতি হয় এবং কিছুদিনের মধ্যেই অসুস্থতায় বাড়াবাড়িতে ইহলোক ত্যাগ করেন শ্বাশুড়ি মা ।

শ্বাশুড়ির মৃত্যুর কিছু সময় পরেই সুমি একটা উড়ো চিঠি নিজের পরিবারের হাতে তুলে দেয়। চিঠিতে যা লেখা আছে তা দেখে শুরু হয় গঞ্জনা । সবাই সুমির কাছে জানতে চায় সে কেনো এত বড়ো একটা খবর গোপন করে গেছে। কিসের লোভে এই কাজ করেছে?

সুমি মাথা নিচু করে উত্তর দেয় কোনো লোভে না, তবে শোকাহত মায়ের পুত্র শোকে মৃত্যু, সেটা সে মানতে পারেনি আর তার জন্যই এই গোপনীয়তা।

প্রথম শ্বশুড়বাড়িতে আসা সেই সুলক্ষণা মেয়েটি আজ এক মুহূর্তে সবার কাছে অপ্রিয় হয়ে গেল। ছিঃ ছিঃ ছিঃ এই কাজ কেউ করে স্বামীর মৃত্যু সংবাদ এইভাবে দুই মাস ধরে চেপে রেখে সতী সাবিত্রী হয়ে ঘুরে বেড়ানো। এতো মহা পাপ। সকলেই ধিক্কার জানায় সুমি কে ।
সুমি সেদিনও কাউকে বোঝাতে পারে না শুধু অসহায় মায়ের মুখ চেয়ে সে এই কাজ করেছে।
উপরন্তু সকলের কাছে শুনতে হয় তুমি সত্যি অপয়া। তোমার শ্বাশুড়ি ঠিকই বলতো- বিয়ে করে এসেই নিজের স্বামী আর শ্বাশুড়িকে খেলে ।

সেদিন সুমির এতবড় স্বার্থ ত্যাগের কথা কেউ বুঝলো না। চোখের জলের সাথে সাদা বস্ত্র ধারণ করলো সুমি । শ্বাশুড়ির শেষ কৃতকার্য সম্পূর্ণ হলো শ্মশানে আর অপয়া তকমাতে তিরস্কার করে সবাই মিলে শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দিল সুমিকে ।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

বিটলবণের স্বাদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ফেরা

১৪ মার্চ ২০২০

জোছনায় কালো ছায়া

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০