ঘোষণা

সান্ধ্য মাংসের দোকান

অনলাইন ডেস্ক | শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 56 বার

সান্ধ্য মাংসের দোকান

শামীম হোসেন : সান্ধ্য মাংসের দোকানে তিনটি ছায়া নড়েচড়ে ওঠার আগেই রেজাউল ফরাজীর আত্মা সাইকেল চালিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। আজকাল বিকেল চারটা অবধি দোকান খোলা থাকলেও আমাদের আড্ডার কারণে ‘সান্ধ্য মাংসের দোকান’ হিসেবে দোকানটিকে চিহ্নিত করি। পাশের মহাসড়ক ধরে আমবোঝাই ট্রাকগুলো শাঁই শাঁই করে পেরিয়ে গেলেও মৃদু ধুলোর আস্তরণ ছায়া তিনটিকে আবছা করে দেয়। আমাদের আলোচনা পাক খেতে খেতে আকাশের কোথায় গিয়ে ঝুলে আছে তা দেখার জন্য একবার ছায়াগুলোর দিকে তাকিয়ে আকাশের দিকে মাথা উঁচু করি। সেই ঝুলন্ত আলোচনা আমাদের কারও নজরে এলো না। কেবল মাংসের দোকানের গুমোট একটা গন্ধ আমাদের নাক চেপে ধরল। সামনের পানের দোকানের বশির মিয়ার সন্তানসম্ভবা কন্যাকে নিয়ে কথার বিস্তার শুরু হলো। মহামারির রাত ও ভোরের সংযোগ সাঁকোর নিচে একে একে মৃত্যুসংবাদগুলো এসে জমা হচ্ছে। কে কীভাবে মারা যাচ্ছে, মারা গেলেও আরও কাকে কাকে মেরে যাচ্ছে- সেই হিসাব নিয়ে মহাতর্ক জুড়ে দিয়ে আমাদের কথার মোড় কোন দিকে ঘুরছে তা আমরা কেউই বুঝে উঠতে পারছি না। বশির মিয়ার পোয়াতি কন্যার মুখ আমাদের চোখের সামনে ঘোরাঘুরি করছে। আমরা পদ্মা সেতুর যুগ থেকে নিজেদের আরও কিছুটা এগিয়ে নিয়ে ভারত ও চীনের যুদ্ধের ভেতর ঢুকে পড়ি। সেখানে একজন বশির মিয়া কিংবা তার পোয়াতি কন্যা আমাদের পিছু নেয় না। মহামারি ছাপিয়ে কেবল মৃত্যু গণনা করি। মাংসের দোকানে বসে মৃত গরুগুলোর স্মরণে আমরা কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করি। চায়ের বন্দোবস্ত করতে আমাদের একজন উঠে গিয়ে একটা খয়রাতি পাগলকে ধরে নিয়ে আসে। আমরা পাগলের চোখের দিকে তাকিয়ে একটা নতুন যুগে প্রবেশ করি।

রেজাউল ফরাজীর আত্মা তার নীল সাইকেল নিয়ে আমাদের প্রতিটি গল্পের বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকে। পান দোকানি বশির মিয়ার কন্যা তার অনাগত শিশুর জন্য সুচিকর্মে ফুটিয়ে তোলে ছোট্ট সবজির বাগান, লাল বল ও বারবি পুতুল। কালো সুতো সুঁইয়ের ভেতর চালান দিয়ে বশির মিয়ার কন্যা পুতুলের চোখ দানের অপেক্ষায় থাকে। আমরা পকেট হাতড়ে কিছু টাকা মাংস কাটার কাঠের নিচে জমা করি। ‘রুমির বেলুন আছে ৪টি/বেলুন দেওয়া হলো ২টি’ রুমির কাছে কয়টি বেলুন হলো- এর উত্তর নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আমরা পারিজাত দিঘির মাছগুলো নিয়ে ভাবতে থাকি। আমরা গভীর মনোযোগসহ দেখার চেষ্টা করি মহামারি লকডাউনের সময়ে মাছের মুখে কোনো মাস্ক আছে কিনা! ‘বরফ পানিতে ভাসে কেন?’ একজন এই প্রশ্ন ছুড়ে দিলে আমরা তার দিকে আড়চোখে তাকাই। বরফ নিয়ে আমাদের আগ্রহের কমতি থাকায় লোকটি অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমরা আবার মাছের মুখে মাস্ক আছে কিনা তা দেখার চেষ্টা চালাই। ট্রাম্প মুখে মাস্ক পরেন কিনা কিংবা মোদি কবে লকডাউন তুলে নেবেন- এই আলোচনায় অংশ নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে বশির মিয়ার কন্যা। সন্তান ডেলিভারির খরচাপাতি নিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্বামীর সঙ্গে কাজিয়া বাধে বশির মিয়ার কন্যার। এমন সংবাদে আমরা আহত হই না। কেবল নির্ধারিত কর্মফলের দিকে চেয়ে থাকি।

মুছে ভাত খাওয়ার মধ্যে আনন্দ আছে। শেষ লোকমার ভাত যখন গলা বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামে, তখন দারুণ এক সুখ অনুভব হয়। এমন সুখের মুহূর্তে আলোচনা এগিয়ে নিতে পারভেজ ও জসিম তাদের উপস্থিতি জানান দেয়। ‘মৃত্যু মানে সংখ্যা নয়’ এক পত্রিকার বিশেষ আয়োজনে চোখ বুলিয়ে সরাতে না সরাতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গরম হয়ে ওঠে। এ রকম অনেক মাধ্যম বিবিধ ইস্যুতে গরম হয়ে উঠলে আমরা মাংসের দোকান থেকে উঠে পারিজাত দিঘির সিঁড়িতে বসে নয়া কথার বিস্তার ঘটাই। রেজাউল ফরাজীর নীল সাইকেলের টায়ারের দিকে তাকিয়ে আমাদের মাথায় চাকা বিষয়ক জটিলতা তৈরি হয়। বিনয় মজুমদারকে দিঘির জলে ফেলে চাকা মাথায় যে যার বাড়ির দিকে হাঁটা দিই।

‘একখণ্ড জমিও ফাঁকা রাখা যাবে না’- এমন সরকারি ঘোষণায় বসতবাড়ির পেছনের ধানিজমিটুকু নিয়ে স্বপ্ন বোনে শিউলি রানী রায়। কচি ধানপাতায় চোখ ঢেকে দু’মুঠো ভাত খাওয়ার আরাম তাকে ঘুমের ভেতর তাড়িয়ে বেড়ায়। কৃষক বাবার পড়ালেখা শেখা মেয়েটি মহামারির পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেলে ধানিজমিটুকুই তাকে আশ্রয় দেয়। মাদ্রাসাপড়ূয়া মেয়েটিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা মিলিয়ে যেতে যেতে নয়নপুরে পঞ্চম শ্রেণিপড়ূয়া মেয়েটি ধর্ষিত হলে পত্রিকায় ধর্ষকের ছবি ছাপা হয়। এসব সংবাদ আমাদের মনকে থ করে দিলেও লকডাউনের সন্ধ্যাগুলো নতুনভাবে উদযাপনের চেষ্টা করি। মাসুদ রানা নিয়ে কাজী আনোয়ার হোসেন ও শেখ আবদুল হাকিমের আইনি লড়াই কোথায় গিয়ে থিতু হবে- এ ব্যাপারে তর্ক চালিয়ে যাই। এত বাগ্‌বিস্তারের পরেও মাংসের দোকানের গুমোট গন্ধটা আমাদের পিছু ছাড়ে না।

হাঁচি-কাশির আদবকেতা মেনে চলার সময়ে ‘নীরব হাইপোক্সিয়া’ আমাদের তাড়া করে ফেরে। মাংসের দোকানের রক্তমাখা ছুরি-চাকুগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের খুন হওয়ার প্রণোদনা দেয়। শহরে সাইকেল চুরি বেড়ে যাওয়ায় রেজাউল ফরাজীর আত্মা তার নীল সাইকেল সামলিয়ে রাখে। মহামারিকালে ৩৩ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের নাটক শেষ হলে আমরা ৯ টুকরো হওয়া লাশের নাম মনে করার চেষ্টা করি কিংবা শহরের আবাসিক হোটেলে জোড়া খুনের রহস্য উদঘাটনের গল্প পড়ার জন্য গুগলের সার্চ ইঞ্জিনের দিকে আঙুল এগিয়ে নিই।

মার্কেজের ‘শুভ্র তুষারে রক্তরেখা’ গল্পের নায়িকার আঙুলে বিঁধে যাওয়া গোলাপকাঁটা গতরাতে আমাকে ঘুমোতে দেয়নি। শুধু ফোঁটা ফোঁটা রক্তকণা আমার স্বপ্নের ভেতর প্রবাহিত হয়েছে। আমি ঘুমের ঘোরে বারবার নিজের আঙুল নাড়াচাড়া করেছি। স্বপ্নটি ধীরে ধীরে অস্ত গেলে এক নতুন স্বপ্ন আমাকে তাড়া করেছে। একটা লাল ঘোড়া খুব জোরে দৌড়ে এসে মাথা দিয়ে আমার পেট বরাবর গুঁতো দিচ্ছে। তার তীক্ষষ্ট খুর দিয়ে আমার চোখ থেঁতলে দিয়েছে। আমি সকালে ঘুম থেকে উঠেই নিজের চোখ আবিস্কারের জন্য ছটফট করি এবং তা নিজ জায়গায় থাকায় স্বস্তি পাই। সান্ধ্য মাংসের দোকানের আড্ডায় পারভেজ ও জসিমের কাছে স্বপ্নটির ব্যাখ্যা চাইলে তারা গম্ভীর হয়ে ওঠে এবং চা খাওয়ার প্রস্তাব দেয়। নানাবিধ মারেফতি আলোচনায় আমরা ডুবে যেতে যেতে বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে নিহত মুখগুলো স্মরণে আনার চেষ্টা চালাই। তাদের ঘরের হাসিকান্না, পকেটে ভিজে থাকা মাস্ক, নদীতে ভেসে থাকা জামাকাপড়, টাকাকড়ি কিংবা ডাকটিকিটযুক্ত খাম আমাদের আলাপের অংশ হয়ে ওঠে।

মাংসকাটা কাঠের নিচে আমাদের জমানো টাকা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং হাসপাতাল বিষয়ক ভীতি আমাদের শরীর হিম করে দেয়। বাটি চালানের মতো যে যার দিকে তাকিয়ে থাকি। আত্মহত্যা বিষয়ে আমরা একটা নয়া থিওরি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করি। স্বেচ্ছামৃত্যুর পর আমরা গাছ হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে আকাশে ওড়া পাখির দিকে তাকিয়ে থাকি। মৃত্যুর গন্ধ পেয়ে রেজাউল ফরাজীর আত্মা তার নীল সাইকেলে ক্রিং ক্রিং শব্দ করে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা চালায়। আমরা বুঝেও না বোঝার ভান করে অন্য ভণিতা ধরি। আমাদের ছাতা প্রকল্পের কোনো ম্যানেজার না থাকায় রেজাউল ফরাজীর সাইকেল বেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ অনেক রাত অবধি কানের পাশে লেগে থাকে।

সান্ধ্য মাংসের দোকানে আজ আমরা অর্ধভেজা হয়ে পৌঁছিয়েছি। সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি। কখনও কখনও কালো মেঘে আকাশ তার মুখ ঢেকে ফেলে আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছে। বশির মিয়ার পানের দোকানের পাশে শজনেগাছের পাতায় পাতায় বৃষ্টির খেলাধুলা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় না কিংবা রেজাউল ফরাজীর নীল সাইকেলের সিট বেয়ে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটার দিকে আমরা মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি। রাত তার ডানা মেলে বাড়তে থাকলে হাউজ বিল্ডিং কনপোরেশনের মূল ফটকে পাঁচটি উজ্জ্বল আলো জ্বলতে থাকে। মহাসড়ক ধরে বৃষ্টির মধ্যে চলতে থাকা গাড়িগুলোর হেডলাইটের আলো আমাদের চোখে এসে পড়ে। আমরা গাড়িগুলোকে উদ্দেশ করে খিস্তি করার মুহূর্তে উদ্‌ভ্রান্ত শরীরে পানদোকানি বশির মিয়া আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল এবং আমার ঘাড়ে হাত রেখে ‘আয়নাল ভাই, আমার মেয়ে বোধহয় আর বাঁচবে না’ বলে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকল। কাঁদতে কাঁদতেই বশির মিয়া সড়ক ধরে হাঁটতে লাগল। আমার যে যার মুখের দিকে তাকিয়ে বশির মিয়ার পিছু পিছু হাঁটা ধরলাম।

হাসপাতালের মুখে আমরা রেজাউল ফরাজীর আত্মা ও তার নীল সাইকেলের উপস্থিতি টের পেয়ে কিছুটা ধন্দে পড়ে গেলাম। বলা যায়, এ রকম সময়ে তার উপস্থিতি আমাদের মনে কিছুটা শক্তি এনে দেয় কিংবা নিজেদের মনোবলের ওপরে ভরসা রেখে আমরা হাসপাতালে প্রবেশ করি। মহামারির কালে চিকিৎসা বিষয়ক সন্দেহ বশির মিয়ার শরীরে ভর করলে আমরা তাকে অভয় দিই। রাত গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টির খেলাধুলা আরও বাড়তে থাকলে লেবাররুমে বশির মিয়ার সন্তানসম্ভবা কন্যার প্রসব-ব্যথা বাড়তে থাকে। আমরা তার ‘পাশে আছি’ বলে বশির মিয়াকে আশ্বস্ত করলে তার মুখে স্বস্তির রেখা ফুটে ওঠে। মহামারির রাত ও ভোরের সংযোগ সাঁকোর নিচে একে একে মৃত্যুসংবাদগুলো জমা হওয়ার সময়ে আমরা ডেলিভারি ঘর থেকে নবজাতকের কান্নার শব্দ শুনতে পাই এবং বশির মিয়ার হাতজোড়া শুকরিয়া আদায়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রেজাউল ফরাজীর আত্মা ও তার নীল সাইকেলের সন্ধান করতে আমরা হাসপাতাল থেকে বেরোবার জন্য পা বাড়াই…

কালের কেয়া

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

বিটলবণের স্বাদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ফেরা

১৪ মার্চ ২০২০

জোছনায় কালো ছায়া

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০