ঘোষণা

করোনা-পরবর্তী বিশ্বনেতৃত

| রবিবার, ২৪ মে ২০২০ | পড়া হয়েছে 26 বার

করোনা-পরবর্তী বিশ্বনেতৃত

হাসান জাবির :

ইতিহাসের এক নির্মম ঘটনা হিসেবে বিশ্বের বুকে আঘাত হেনেছে ভাইরাস নোভেল করোনা। সাম্প্রতিক কালে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একটানা দীর্ঘতম ছুটির অভিনব ঘটনায় বৈশ্বিক স্থবিরতার আরেক কাণ্ডে পৃথিবীই যেন জনশূন্য এক বিরানভূমি। নানা দেশে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বিশ্বজনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ একসঙ্গে ঘরবন্দি হয়ে আছেন। এতত্সত্ত্বেও প্রায় ৪০ লাখ সংক্রমণ, আড়াই লাখ মৃত্যুতে দুনিয়া ভীতসন্ত্রস্ত্র। এশিয়া থেকে ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে রাশিয়া সর্বত্রই করোনার সর্বগ্রাসী বিচরণে চরম সংকাটাপন্ন সব ধরনের ব্যবস্থাপনা। যদিও চীন, ইরান, রাশিয়া, ইউরোপ ও ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার পরিস্থিতি একবারেই ভিন্ন। আপাতত করোনার উত্পত্তিস্থল চীনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও বিশ্বের অন্যান্য অংশে এর প্রকোপ অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে উন্নত ব্যবস্থাপনা, বিস্তৃত পরিকাঠামো সত্ত্বেও অগণিত মৃত্যুর ঘটনায় ইউরোপ ও আমেরিকা রীতিমতো বিপর্যস্ত। উন্নত বিশ্বের এহেন দুরবস্থায় মারাত্মক জনভীতি সঞ্চারিত হচ্ছে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোতে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থবিরতার মুখে গভীর সংকটে পড়েছে মানুষের জীবন ও জীবিকা। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যবস্থায় বড়োসড়ো পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। এই সূত্র ধরে ভাইরাসের উত্পত্তি, তত্পরবর্তী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকা, পরিত্রাণের সম্ভাব্য উপায় এবং অসংখ্য মৃত্যু, আশু পদক্ষেপ ইত্যাদি বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে বিশ্ব। এক্ষেত্রে দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও চীন ইতিমধ্যে ভিন্ন মাত্রার উত্তপ্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। বরাবরের মতোই আমেরিকা তার ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমেরিকার অভিযোগ ভাইরাসের উত্পত্তি ও বিস্তার রোধে চীন তথ্য গোপন করে বিশ্বকে বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। কিন্তু চীন এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে নিজের স্বচ্ছতা প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের পালটা অভিযোগ মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে জটিল হচ্ছে বৈশ্বিক করোনা নিয়ন্ত্রণ। এতদুদ্দেশ্যে সিরিয়া ও ইরানের করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে ফোকাস করছে বেইজিং। আমেরিকার বিরুদ্ধে আনীত চীনের এই অভিযোগে সম্প্রতি ঘি ঢেলেছে আইএমএফ। উল্লেখ্য, মার্কিন চাপের মুখে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ৫০ বিলিয়ন ডলারের ঘোষিত প্যাকেজ বরাদ্দ থেকে ইরান ও সিরিয়াকে ঋণ দিতে গড়িমসি করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ। এদিকে পশ্চিমাদের বিপরীত অবস্থান নিয়ে রাশিয়া ও ইরান করোনা ইস্যুতে চীনের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। ফলে খুব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্বব্যবস্থায় একটি নতুন মেরুকরণ আসন্ন। প্রশ্ন হচ্ছে, চলমান এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত বিশ্বনেতৃত্বের লড়াইকে কোন দিকে নিয়ে যাবে?

বিশ্বের সর্ববৃহত্ অভিন্ন বাজার চীন। প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ লোকের দেশ চীনের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের মজবুত ভিত্তি আছে বিশ্বের অনেক দেশের। স্বয়ং আমেরিকা, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। অন্যদিকে আশির দশক থেকে দেশটির অর্থনৈতিক উত্থানজনিত জীবনমান বৃদ্ধির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ইউরোপ-চীন বাণিজ্যিক বাস্তবতা। যে কারণে চীন-ইউরোপ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার সৃষ্ট ঝুঁকি বিশ্ববাণিজ্যের গতিপথেই নানা মাত্রার চ্যালেঞ্জ যুক্ত করতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আফ্রিকায় নিজের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক দৃঢ়তা সচল ও নিরাপদ রাখাই গুরুত্ব পাবে চীনের কাছে। করোনা-উত্তর বিশ্বে আফ্রিকার দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নপূর্বক সেখানকার পরিস্থিতি অনুকূল রাখার বড়ো চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে চীনের জন্য। আফ্রিকায় করোনা বিস্তারের বর্ধিত আশঙ্কার মধ্যে সেখানে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত উপস্থিতি আসন্ন। আফ্রিকার করোনা নিয়ন্ত্রণের পরিক্রমায় চীনকে দূরে রাখার সুযোগ খুঁজবে পশ্চিমারা। এমনটি হলে অদূর ভবিষ্যতে পালটে যেতে পারে আফ্রিকার রাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্র, যা চীনের আকাঙ্ক্ষাকে একেবারে সীমিত করবে। একই সঙ্গে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় চীনের মজবুত নিয়ন্ত্রণ করোনা ডামাডোলের কারণে শিথিলের আশঙ্কায় পড়েছে। এখানকার সমীকরণে চীনের প্রতিকূলে কোনো ধরনের পরিবর্তন দেশটির পিঠকে নিঃসন্দেহে দেওয়ালে ঠেকাবে। তাই সমীকরণের সম্ভাব্য পরিবর্তনজনিত আশঙ্কার সমূহ বিপদ থেকে পরিত্রাণ পেতে চীনকে নিজের সামরিক নীতির রক্ষণশীলতা পরিহার করার পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। খুব পরিষ্কার যে আমেরিকার প্রধান লক্ষ্য হবে চীন ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকাণ্ডকে বিতর্কিত করা। মূলত চায়না সমাজতন্ত্র-সম্পর্কিত মার্কিন মনোভাবের নেতিবাচক দিকগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে এর সুফল নিজ আয়ত্তে নিয়ে আসা। চীনের কমিউনিস্ট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে করোনার সংবেদশীলতাকে কাজে লাগাতে যথেচ্ছ কূটনৈতিক ব্যবহার করবে আমেরিকা। এই ধারাহিকতায় চীনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কোনো উেসর সন্ধান পেলে আমেরিকাও চীনের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি নিতে পারে। অর্থাত্ চীনের কমিউনিস্ট ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ আঘাত করতে আমেরিকা নিজ সামর্থ্যের শেষটুকু ব্যবহার করবেন। এক্ষেত্রে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার করোনা পরিস্থিতির উত্তরণ প্রক্রিয়া এবং সামনের দিনগুলোতে ঐসব দেশের কূটনৈতিক ভূমিকা চীনের প্রতিকূলে গেলে আমেরিকার পাল্লা হবে ভারী।

অন্যদিকে ৫ হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাসকে পূর্ণতা দেওয়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চেতনা সমুন্নত রাখার সমস্ত প্রত্যয় এবং নিজের দায়িত্বশীলতা শুধু করোনার কারণে ভেস্তে যেতে দিতে চাইবে না চীন। এক্ষেত্রে বহির্বিশ্বে দেশটির ব্যাপক অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বেইজিংয়ের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহ চীনকে বিরক্ত করার পশ্চিমা প্রচেষ্টা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখলে সেটি হবে চীনের সবচেয়ে বড়ো সাফল্য। এতত্সত্ত্বেও এই মুহূর্তে মারাত্মক বেকায়দায় থাকা চীনের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজের বাণিজ্যিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে অক্ষুণ্ন রাখা। এজন্য দেশটিকে আগামী দিনগুলোতে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। যে কারণে নিজেদের অবস্থান-সম্পর্কিত স্বচ্ছতা বিশ্ববাসীর কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাই হবে চীনের প্রধান লক্ষ্য।

চীন-মার্কিন দ্বিধাবিভক্তির এ পর্যায়ে ইউরোপ, রাশিয়া, ভারত ও ইরানের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার মূল অভিযোগ হচ্ছে, করোনার বিস্তার রোধে খোলা মনে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে সহযোগিতা না করা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে করোনায় নাকাল রাশিয়া ও ইরান এখন পর্যন্ত চীনের পাশেই আছেন। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফরমে মার্কিন অভিযোগের বিপরীতে রুশ ভূমিকা চীনের জন্য স্বস্তি নিয়ে আসবে। একই সঙ্গে চীনের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের সম্ভাব্য পদক্ষেপের গ্রহণের প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলবে। খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফরমে করোনাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিতর্কে চীনের পাল্লা ভারী করতে নির্ধারণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে রাশিয়া। আর এখানেই নির্ধারিত হবে করোনা-পরবর্তী বিশ্বনেতৃত্বের লড়াইয়ে কারা এগিয়ে থাকবে। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে পাশে না পেলে চীনের ভোগান্তি বাড়বে।

করোনা-উত্তর বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনজনিত ধরন কী হতে পারে তা এখনই পরিষ্কারভাবে নিরূপণ করা দুরূহ। তবে একটুকু নিশ্চিত করেই বলা যায় যে বিশ্বের অর্থনৈতিক চেহারার একটি ব্যাপকভিত্তিক পরিবর্তন অত্যাসন্ন। যে প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরাসরি দুটি ধারা সক্রিয় হতে পারে। এই পথ ধরে আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে চায়না পণ্যের প্রবেশ কিছুটা জটিলতার মুখে পড়ার আশঙ্কাটিই চীনের জন্য সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার বিষয়। এক্ষেত্রে ইউরোপ-চীন বাণিজ্য কাটছাঁট অনিবার্য হলে তা উভয় অঞ্চলের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে। কিন্তু এর রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করবে আমেরিকা। এর বিপরীতে আফ্রিকায় নিজের অবস্থান ধরে রেখে উলটো পশ্চিমাকেই বিপদে ফেলতে পারে চীন। তাই এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাণিজ্য। যেটি বিশ্ব নেতৃত্বের আসন থেকে ছিটকে পড়া আমেরিকার জন্য একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সামরিক উত্থানের এ পর্যায়ে চীনের বিশ্বনেতৃত্ব দেওয়ার সামগ্রিক অভিপ্রায় কতটা বাস্তবসম্মত তার স্পষ্ট মহড়াই হচ্ছে করোনা-উত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের উত্তাপ। তাই আগামী বিশ্বনেতৃত্বের লড়াইয়ে চীন-মার্কিন চলমান দ্বৈরথের ফলাফল নিশ্চিত হতে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুদিন।

লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সূত্র : ইত্তেফাক

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২৪ মে ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত