ঘোষণা

শ্রদ্ধাঞ্জলি

হুমায়ূন আহমেদের সুখ-দুঃখের স্রোতে

বদরুন নাহার  | রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 75 বার

হুমায়ূন আহমেদের সুখ-দুঃখের স্রোতে

১৯ জুলাই নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। তার অন্যতম উপন্যাস ‘সবাই গেছে বনে’র বিশ্নেষণ…

হুমায়ূন আহমেদের ‘সবাই গেছে বনে’ উপন্যাসটি হাতে নিয়ে পাঠের আগে হুমায়ূন আহমেদের পাঠকরা ভাবতে পারেন, হয়তো হিমুর মতো কেউ-বা ধানমন্ডি থানার ওসি জ্যোৎস্না রাতে বনে গেছে কিংবা হিমুর হাত ধরে রুপার বনে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন বইজুড়ে কীভাবে বারবার ভেস্তে যায়। কিন্তু এ উপন্যাসের নাম দেখে যারা আগেই ভেবে নিতে চাইবেন, তারা বড় রকমের একটা ধাক্কা খাবেন- তা নিশ্চিত। আবার উপন্যাসে পড়তে পড়তে কোথায়ও বনে যাওয়ার সেই রবীন্দ্রসংগীতের মতো মায়াময়, স্নিগ্ধ আর বিষণ্ণ আলোর চারপাশে গোল হয়ে বসে বসে জ্যোৎস্না উদযাপনের আখ্যান খুঁজে পাবেন না। বরং ক্রমাগত আনিস, সফিক, রাহেলা আর রুনকির জীবনের প্রতিটি দিনের সুখ-দুঃখের স্রোতে ভারাক্রান্ত হয়ে এক সময় পাঠক নিজেই বনে যাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে থাকবেন। তখন একেবারে শেষ প্যারাতে গিয়ে পড়বেন-

‘একদিন এই দুঃসহ শীত শেষ হবে। আসবে রোদ-উজ্জ্বল সামার। ছুটি কাটানোর জন্য আমেরিকানরা গাড়ি নিয়ে নেমে আসবে হাইওয়েতে। মন্টানা, সল্ট লেক, ইয়েলো স্টোন পার্ক। কতকিছু আছে দেখবার। সামারের রাতগুলো এরা বনের ধারে তাঁবু খাটিয়ে কাটাবেন। প্রচণ্ড জ্যোৎস্না হবে রাতে। যুবক-যুবতীদের বড্ড বনে যেতে ইচ্ছা করবে।’

পাঠ শেষে আপনি কী বুঝবেন, তা আপনার বিষয়। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, হুমায়ূন আহমেদ এতক্ষণ আমাদের বনের মধ্য দিয়েই ঘোরালেন। বনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমরা আনিসের চোখে, সফিকের কাজে, রাহেলার পরিবর্তিত জীবনে প্রচ জ্যোৎস্না খুঁজে বেড়িয়েছি। কিন্তু আমেরিকার ফার্গো টাউনে এলেই যেন জ্যোৎস্নার বড় অভাব। ‘সবাই গেছে বনে’ উপন্যাসের গভীরতা অন্য জায়গায়। স্বদেশ ছেড়ে থাকা বিষয়টি মানুষের জীবনে কত প্রকার শূন্যতা এনে দিতে পারে! দেশের ছায়া খুঁজে ফেরে কেউ কেউ সুদূর আমেরিকায়। লেখকের কলমে সে কথা কত সহজে উঠে আসে- ‘নিউইয়র্ক বা শিকাগো থেকে যেসব বাঙালি এখানে আসে তারা চোখ কপালে তুলে বলে, আরে এ তো আমাদের কুমিল্লা শহর। ভিড় নেই হইচই নেই। বাহ্‌ চমৎকার তো!’

আখ্যান নির্মাণে হুমায়ূন আহমেদ কেমন যেন মায়ার খেলায় মেতে ওঠেন! তার উপন্যাসের চরিত্রদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যকে ধরে রেখে সে আবেগ-অনুভূতি প্রকাশে কোনো পার্থক্য থাকে না। যে আবেগ তিনি সুখী নীলগঞ্জে দেখান, সেই একই শ্রেণির মানুষের প্রকাশভঙ্গি সুদূর আমেরিকার মতো প্রবাসেও তেমনই থাকে। পাঠক সহজেই খুঁজে পান- এটা হুমায়ূন আহমেদের চরিত্র। এই যে পাঠকের মনে এভাবে ছায়া ফেলার বিষয়টি; এটিই একজন লেখকের সার্থকতা। একজন লেখক নিজস্ব শৈলী নির্মাণ করতে পারলে তবেই পাঠানুভূতিতে এই বোধ হওয়া সম্ভব।

আশির দশকে লেখা এ উপন্যাসে বাঙালির প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতা, জীবনযুদ্ধ আর স্নেহ-মমতার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ। সে সময় প্রবাসীদের নিয়ে আমাদের সাহিত্যে খুব বেশি লেখা হয়ে ওঠেনি। সে ক্ষেত্রে এ উপন্যাসের যেমন গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি আমাদের শিক্ষিত নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গে মানসিক অবস্থানের এক দ্বৈত মনোভঙ্গির দ্বন্দ্ব স্পষ্ট উপন্যাসটিতে। হুমায়ূন আহমেদ সাধারণত যে সংলাপনির্ভর আঙ্গিকে উপন্যাস লেখেন, সেই ভঙ্গিতেই এ উপন্যাস লেখা। খুব বেশি মনোজাগতিক বিশ্নেষণ না করে, দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদান ছাড়াই মানুষের কথোপকথনের মাধ্যমে যে অবস্থানটি তুলে এনেছেন, তার সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। তত্ত্বীয় ভঙ্গিমায় না গিয়ে মানুষের সাধারণ কথাবার্তার ভেতর দিয়েই তিনি জীবনদর্শনের বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। একে আমরা জীবনঘনিষ্ঠ আখ্যান বলতে পারি। সাধারণত জীবনঘনিষ্ঠ এবং সাব-অলটার্ন সাহিত্যতত্ত্ব হিসেবে আমরা নিম্নবর্গীয় মানুষের আলেখ্যকে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু শহুরে মধ্যবিত্তের এ অবস্থানকে কেন বাংলাদেশিদের কণ্ঠস্বর হিসেবে মেনে নেব না? এ দেশের মানুষের মধ্যে এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যাকে অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। রাহেলা এবং আমিন সাহেবের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। যে আমিন সাহেব প্রথম জীবনে পিএইচডি করে ইমিগ্রেশনের জন্য অপেক্ষা করে, দেশে আসতে পারে না, এমনকি নতুন গাড়ি কেনার বিষয়টি, প্রথম সন্তান জন্মের কারণে তার বহুদিন দেশে ফেরা হয় না। যার স্ত্রী রাহেলাও একটি চাকরি পেল, যা অতি সামান্য। রিসার্চ ল্যাবে সূর্যমুখী ফুলের চারা বাছার কাজ। এভাবে তারা আমেরিকার মতো তথাকথিত উন্নত বিশ্বের পুঁজি ও নগরায়ণে অভ্যস্ত হয়ে গেল। তখন দেশে ফিরে তাদের ভালো না লাগারই কথা। রাতের বাংলাদেশ অন্ধকার, ঘরবাড়ি ঝকঝকে নয়- এসব বিষয়ই মুখ্য নয়। সেই সঙ্গে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনসাধারণের সামাজিক নিরাপত্তা পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ এবং গতানুগতিকভাবে মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশের দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে বসবাস করতে থাকে। তার পেছনে তো দু’দেশের অর্থনৈতিক অবস্থানটাও ভূমিকা রাখে। অথচ কোথায় যেন অপূর্ণতা থেকে যায়! আর তা যে তাদের মানসিক সংস্কৃতির বিষয়- ঔপন্যাসিকের একটা বার্তাও বটে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ পাঠককে কোনো জ্ঞানদানের গিনিপিগ ভাবেন না। তাই তার এ বার্তা কোনো অমোঘ বাণী হয়ে ফুটে ওঠেনি। তা পরিস্ম্ফুটিত হয় মানুষের জীবনের হাসি-কান্না, হেঁয়ালিপনার ভেতর থেকেই। সে বিষয়টা পাঠককে অনুভব করে নিতে হয়। অনেক সময় মানুষের অনুভূতিই মানুষকে প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধান দিতে পারে। খটোমটো বা গবেষণা গ্রন্থের অনেক বিষয় মানুষ প্রয়োজনে অনুসন্ধান করে জানে এবং জেনেও ভুলে যায়। অথচ সফিকের মতো একটি ছেলের পাগলামি চাইলেও ভুলতে পারে না। কারণ জীবনে বহু বিষয়ে পরাজিত সফিকের চরিত্রের মধ্যে একটা সরলতা, দেশপ্রেম এবং মানুষকে সুখী করার প্রবণতাগুলো ঔপন্যাসিক এমন সুন্দর আন্তরিকতায় গড়ে তুলেছেন যে, তা পাঠকের মনে গেঁথে যাবে- আহা বেচারা! এই দুঃখবোধ মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই দীর্ঘস্থায়ী হয়। অক্ষরের তত্ত্বের চেয়ে মানুষের ভাষা মানুষকে অনেক সময়ই বেশি আকৃষ্ট করে। এসব দীর্ঘশ্বাসময় সহানুভূতি বাঙালির মন-মানসে দীর্ঘদিন ধরে চাষবাস হয়ে এসেছে। এগুলোই এ দেশের মানুষের নিজস্ব সম্পদ। অন্যদিকে রুনকি চরিত্রটিতে তিনি এমন এক সংমিশ্রণ ঘটান, যেখানে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া মেয়ের বৈশিষ্ট্য আর বাঙালি বাবা-মার কাছে বেড়ে ওঠা বিষয়টির এক দ্বি-রূপের প্রকাশ ঘটে। রুনকি বাবা-মাকে ছেড়ে টমের সঙ্গে লিভ টুগেদার করছে, কনসিভ পর্যন্ত করে ফেলছে। আমেরিকায় জন্ম নেওয়া এবং বেড়ে ওঠা যে কোনো মেয়ের জন্য এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু লেখক রুনকির ভেতর দুটো সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। সফিক এলে সে বাংলাদেশি রান্না রাঁধতে চেষ্টা করে এবং উপন্যাসে আমরা যখন দেখতে পাই যে রুনকি সফিককে বলছে, ‘রান্না কেমন হয়েছে সফিক ভাই? মা’র মতো হয়েছে?’ এ কথা একটা কোনো আমেরিকান মেয়ের নয়। এটা বাংলাদেশি মেয়ের তৃপ্তি পাওয়ার বিষয়। অন্যদিকে রুনকির প্রেমিক টম প্রসঙ্গে যখন আমরা উপন্যাসে পড়ি- ‘টমের বাড়ি পছন্দ হয়ে গেল। রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি, পছন্দ না হয়ে উপায় আছে?’ এই ভাষাকে আমরা হুমায়ূন আহমেদীয় ভাষা বলতে পারি। আমাদের দেশের খুব কম লেখকের ক্ষেত্রে এভাবে ঘোষণা করা যায় যে, এটা তার ভাষা। এটা একজন লেখকের সাফল্য। অনেক আলোচকের মতে, হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে প্রধান দুর্বলতা কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভাব এবং চরিত্রপাতের বিকাশহীনতা। ‘সবাই গেছে বনে’ উপন্যাসের ক্ষেত্রে কেউ যদি কেন্দ্রীয় চরিত্র অনুসন্ধান করেন তবে ব্যক্তি-চরিত্রের মধ্যে তেমন কোনো চরিত্র খুঁজে পাবেন না। আমার মনে হয়েছে, এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বাঙালি মন, যা খুঁজে পাবেন সফিকের ভেতর; আনিস, সবার ভেতর যে আত্মিক যোগাযোগ, এই উপন্যাসের ভেতর দিয়ে যে জীবনের হাঁসফাঁস যন্ত্রণা, তা সবই এই বাঙালি মন। এখানে এই মনই কেন্দ্রীয় চরিত্রের ভূমিকায় আছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে প্রধান চরিত্র হিসেবে যেমন আমরা দেখতে পাই সময়কে। অন্যদিকে মালিশা নামে যে চরিত্রটি আমরা দেখতে পেলাম, তাকে হুমায়ূন আহমেদ বাঙালি বানাননি। সে আমেরিকান ছিল এবং তার চরিত্র বিশ্নেষণ করলে আমরা তাকে আমেরিকানই পাব। অবাস্তব চরিত্রের নির্মাণ তিনি করেননি। মালিশার মা ধনী। সে নিজের মেয়েকে নিজের নিরাপত্তার খাতিরে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। মালিশা অপেক্ষায় আছে- কবে মা মারা যাবে, সে অনেক টাকার মালিক হবে। এ রকম মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার সংস্কৃতি আমাদের দেশে এখনও গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে মালিশা টাকা পেলে খরচ করবে কী করে প্রসঙ্গে মালিশার বক্তব্য উল্লেখ্য, ‘প্রথমে প্লাস্টিক সার্জারি করাব। আমার বুক দুটি বড়ই ছোট। সিলিকন ব্যাগ দিয়ে বড় করব। আমাকে দেখে অবশ্য বোঝা যায় না, আমার বুক এত ছোট। আমি অন্য ধরনের ব্রা ব্যবহার করি। ফোম ব্রা।’

এই যে মালিশা এভাবে বলছে, এটা একজন আমেরিকান মেয়ের ভাষ্যই হতে পারে, বাঙালি মেয়ের নয় এবং আমরা উপন্যাসে দেখতে পাই মালিশা মিলিয়নেয়ার হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে। সেই সমাজে মানুষ এমনই মানসিক অবস্থানে বাস করছে। উপন্যাসে নানা জায়গায় যে বিষয়টি এসেছে তা হলো, তখনও আমেরিকায় বাংলাদেশ আলাদা দেশ হিসেবে মানুষ খুব একটা চেনে না। বাংলাদেশ বলতে তারা প্রথমত ইন্ডিয়াকে বোঝে। আমেরিকান অনেকেই বাংলাদেশ বলতে শুধু নেগেটিভ কিছু প্রসঙ্গ আনলে আনিস, সফিক যেমন বেশ অস্বস্তিতে পড়ে। সফিক তার পাগলামি বৈশিষ্ট্যে তা ভুল প্রমাণের চেষ্টা করে। আনিস ধীর-স্থিরভাবে যুক্তি বা প্রাসঙ্গিক তুলনামূলক বিশ্নেষণের মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবেলা করতে চায়। তারা বিদেশিদের এ কথার কিছুটা রাগের প্রকাশও ঘটায়। উপন্যাস থেকে বিষয়টি উল্লেখ্য, ‘আগে সত্যি কি-না। ডাস্টবিনের পাশে ছোট ছেলেমেয়েরা বসে থাকে কখন কেউ এসে খাবার ফেলবে সেই আশায়। বলো সত্যি নয়? নাকি তোমার স্বীকার করতে লজ্জা লাগছে?

আনিস ইতস্তত করে বলল, সত্যি নয়। বড় বড় অভাব হয়েছে। সে তো পৃথিবীর সব দেশেই হয়েছে। ইউরোপে হয়নি? আমেরিকাতেও তো ডিপ্রেশন হয়েছে।

তৃতীয় বিশ্বের ছোট একটি দেশের অধিবাসীদের নানা রকম প্রবাস যন্ত্রণায় পড়তে হয়। তা সে দেশে বসেও, যে দেশে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেশের অভিবাসীর সমাবেশ ঘটেছে, সেই আমেরিকাতে। আসলে আনিস, সফিক, রাহেলা, আমিন সাহেব এবং নিশানাথ বাবু- সবাই যেন নিজ নিজ মাতৃক্রোড় ছেড়ে বনে গেছে, যেখানে তাদের স্বস্তি নেই। আবার জ্যোৎস্নার সন্ধানে বনে না গিয়ে তাদের উপায়ও নেই। উপন্যাসে নিশানাথ বাবুর রুনকি কী ভুল করছে প্রসঙ্গে যে উত্তর দিয়েছিলেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘নিশানাথ বাবু গাঢ়স্বরে বললেন, খিদিরপুরের এক কলেজে অঙ্ক পড়াতাম, বুঝলি রুনকি। কী নিদারুণ অভাব গেছে আমার। আর এখন পাস বই দেখলে তুই চমকে উঠবি। আমি যদি খিদিরপুরে পড়ে থাকতাম সেটা ভুল হতো। আবার আমেরিকা আসাটাও ভুল হয়েছে। তাহলে ঠিক কোনটা?

রুনকি চুপ করে থাকে।’

এই প্রশ্নের জবাব মানুষ সহসা দিতে পারে না। বিশ্বের সব মানুষ পুঁজিবাদের শিকলে প্রতিনিয়ত বন্দি হয়।

উপন্যাসের গভীরে এ বিষয়টি লুকিয়ে আছে। হাসি-ঠাট্টা, সুখ-দুঃখ আর পাগলামির ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ কি আমাদের সে সত্যের মুখোমুখি করেন না, যে প্রশ্নের সমাধান এখনও পৃথিবীতে হয়নি? তিনি কোনো বৈপ্লবিক চরিত্রকে তৈরি করেননি। বিপ্লব ঘটানোর আহ্বান এ উপন্যাসে করা হয়নি, কিন্তু প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত আক্ষেপগুলোকে নিয়ে আসা হয়েছে। সামষ্টিক মানুষ তাদের জীবন থেকে যখন এই সত্যগুলো উপলব্ধি করবে তখনই প্রকৃত বিপ্লব সম্ভব। রুনকির বন্ধু টমের আক্ষেপ যে, লাল রংটার ব্যবহারই এখন পর্যন্ত শেখা হলো না! এই যে বিষয়টি নিয়ে কত কত সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, কত ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তার নিজস্ব ভঙ্গিতে বিপ্লবের কথা এনেছেন। পাঠককে তা বুঝে নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন- ‘কেউ তো কারও মতো হতে পারে না। একজন হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ূন আহমেদই থাকেন। একজন হুমায়ূন আহমেদ কখনও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হবেন না।’

নিজের সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদের এ বক্তব্য খুবই সত্যি। মেধাবী মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষার আশায় আমেরিকার মতো দেশে পাড়ি জমায় এবং সে দেশের আর্থ-সামাজিক জীবনে আকৃষ্ট হয়ে এক দোটানা জীবনে প্রবেশ করে। তিনি এ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে। বিষয়টি আমরা খুঁজে দেখলেই মিলিয়ে নিতে পারব। নদী যখন মৃত, জীবন যখন অন্য স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে, তখন সেই সময়ের সাহিত্যে আমরা পদ্মা নদীর মাঝির কথা খুঁজে পেতে পারি না। তখন আমরা শঙ্খনীল কারাগার, নন্দিত নরকে, আশাবরী, দেবী, সবাই গেছে বনে’র মতো জীবনকেই খুঁজে পাব- সময়কে সাহিত্যের আকার দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ সে কথা প্রমাণ করে গেছেন। লেখক হিসেবে তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, তা তার কলমেরই স্বীকৃতি।এখনো অমল

রেললাইনের পূর্ব পাশে বিহারি কলোনির পরের চত্বরেই শেকলঘেরা কুড়ি ফুট উঁচু শিবলিঙ্গের সদৃশ সাদা চুনকাম করা সিমেন্টের গায়ে আলকাতরা-কালো কালিতে ‘ঈমান-একতা-শৃঙ্খলা’ লেখা জিন্নাস্মারক থেকে শুরু হয়ে মোটামুটি সরলরেখার মতো আইয়ুব খানের উন্নয়ন-দশকে বানানো ষাট ফুটি সড়কটিই আমাদের লোকালয়ের রাজপথ। এলোপাতাড়ি গড়ে ওঠা জমাটি রিকশাস্ট্যান্ড আর এক ঘোড়ার প্রায় উচ্ছন্নের পথে যাওয়া টমটম স্ট্যান্ডের সামনে-পেছনে ভাতের হোটেল, হোলসেল ওষুধের দোকানের সারি, মাড়োয়ারিদের ডাল-খোল-ভুসির গুদাম এবং গদি দেখতে দেখতে পূর্ব দিকে এগিয়ে চলে সড়ক। তারপর জেলার সবচেয়ে বড় কলেজ, টুকটাক কিছু অফিস-দোকান আর নোয়াখালীপাড়ার কসাইদের গোশতের দোকানের দেখা পাওয়া যায় শহরের প্রাণকেন্দ্রের সিনেমা হলের আগপর্যন্ত। তার পাঁচশ’ গজ আগেই মুসলিম ইনস্টিটিউটের পুরোনো দালান। সেখানে অস্থায়ী আস্তানা গেড়েছে সরকারি পাবলিক লাইব্রেরি। দায়সারা চাকরি করা একজন লাইব্রেরিয়ান আর একজন পিয়ন। কোনো বই চাইতে গেলে আলমারি খুলতে হবে বলে নিতান্তই বিরক্ত বোধ করে। সেখানেই ছাতাপড়া হতচ্ছিরি বইগুলোর মধ্যেই রোদ্দুর খুঁজতে যায় ১৭-১৮ বছরের কয়েকজন তরুণ। এই ছোট্ট জনপদের বাইরে যে বিরাট বিশাল অকল্পনীয় বিস্তারের জগৎ আছে, বই সে কথা জানায় তাদের। আর দিনের পর দিন নিজেদের মধ্যে কথোপকথন থেকে, বইয়ের পর বই পড়ে, আলোচনা করে তারা জেনে যায় কিছু অমোঘ সত্য। তাদের উপলব্ধিতে আসতে থাকে যে, এই দেশে মানুষে মানুষে যে বৈষম্য, ধনী-গরিবে যে বৈষম্য, তা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় ঘটেনি; ঘটেছে মানুষের দ্বারাই। আর এই বৈষম্য টিকিয়ে রেখেছে মানুষই। তারা এটাও বুঝতে পারে যে, এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে যে প্রতিষ্ঠান, তার নাম রাষ্ট্র। আর পৃথিবীকে শাসন করে যে বস্তু, তার নাম পুঁজি। তরুণরা প্রচলিত রাজনীতির ওপর আস্থা হারায়। তারা ততদিনে এ কথা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে যে, মানুষকে অমানুষ করে রেখেছে এই প্রচলিত রাজনীতি।

তারা বিকেলে বিকেলে হাঁটতে যায় ডোমপাড়া মাঠ পেরিয়ে, জলকল পেরিয়ে, তরমুজের প্ল্যানটেশন পেরিয়ে পাগলা রাজার ইটবাঁধানো রাস্তা ধরে। গ্রীষ্ফ্মের নিদাঘ বিকেলে, যখন কোনো গাছের একটা পাতার মধ্যেও বিন্দুমাত্র কম্পন দেখা যায় না, তখনও দু’পাশের গগনশিরীষ গাছ থেকে যেন অলৌকিকভাবে ভেসে আসে না দেখা ঝিরঝির বাতাস। তারা নিজেদের জামা খুলে রাস্তার পাশে বসে। পড়ে নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’, অনিল মুখার্জীর ‘সাম্যবাদের ভূমিকা’, নীহার সরকারের ‘ছোটদের রাজনীতি’, ‘ছোটদের অর্থনীতি’। একদিন হঠাৎ করাতিদের দেখা যায় সেই রাজার আমলের শিরীষ গাছগুলোকে কাটার জন্য জমায়েত হতে। তারা তো হতভম্ব। এসব মহাপ্রাণকে কাটা হবে কেন? কারও কাছে কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। কারও কাছ থেকে কোনো প্রতিবাদ আসে না। তারা তখন নিজেরাই প্রতিবাদে উদ্যত হয়। বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে থাকে। সেই সময় দেখা যায় একজন শীর্ণকান্তি, দুর্বল, মাঝবয়সী মানুষ এগিয়ে এসেছে কয়েকগা সঙ্গী নিয়ে। তারা গাছগুলোর সামনে অবস্থান নিয়েছে নিজেদের শরীরকে ব্যারিকেড বানিয়ে। তখন শহরের মধ্যে একধরনের ছোট আলোড়ন বয়ে যায়। কমিউনিস্ট সন্তোষ মৈত্র শহরের গাছ কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে। তরুণরা হতচকিত হয়ে যায়। কমিউনিস্ট কেউ আছে! তাদের এই ছোট্ট শহরেই! সন্তোষ মৈত্রকে দেখে তাদের চোখ কপালে ওঠে। এই লোক কমিউনিস্ট! লোকটাকে না রোজ বিকেলে দেখা যায় গোপাল ডাক্তারের হোমিওপ্যাথির দোকানে বসে বসে দৈনিক সংবাদ পড়তে। ‘ইস্পাত’ উপন্যাসটি পড়ে, আর মাও সে তুংয়ের লংমার্চের বিবরণ পড়ে তরুণদের ধারণা হয়েছিল যে, কমিউনিস্টদের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে গায়ে আগুনের আঁচ টের পাওয়া যায়। কিন্তু এই লোক তো নেহায়েতই নিরীহদর্শন, চালশে পড়া বুড়োটে। শেষ পর্যন্ত কিন্তু সেই আধাবুড়ো মানুষটাই ঠেকিয়ে দিল গাছকাটার ষড়যন্ত্র।

তরুণদের তখন চুম্বকের মতো টানছে সন্তোষ মৈত্র। কিন্তু বাধা একটা যে রয়েছে মনের কোণে- কমিউনিস্ট হওয়া চলবে না। কারণ তারা আল্লাহ-খোদা মানে না। কিন্তু তরুণরা সবাই প্রায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি। আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব কল্পনা করাও তাদের সম্ভব নয় তখন। এদিকে যে আবার সন্তোষ মৈত্রের কাছে না গেলেও চলছে না। সাক্ষাতের প্রথমেই প্রশ্ন তোলা হলো ঈশ্বর বিষয়ে। হো হো করে হেসে এক নিমেষেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন তিনি- ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার। কে পালন করবে, আর কে করবে না, সেটা তার সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। আমরা কখনো কাউকে ধর্ম ত্যাগ করতে বলি না। আমাদের এক প্রতিষ্ঠাতা নেতা ছিলেন মওলানা হাসরত মোহানী। নাম শুনেছ তাঁর? না, তরুণরা শোনেনি। কিন্তু তারা শুনেছে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারে কমিউনিস্টরা কট্টর। আর অব্যাহত প্রচারণা তো রয়েছেই যে, ধর্মনিরপেক্ষতা আর ধর্মহীনতা একই কথা। তাহলে? উত্তর যেটা পাওয়া যায় তা এতদিনের ধারণার সাথে কিছুতেই মেলে না। তিনি জানালেন ইংরেজি মূল শব্দটা হচ্ছে সেক্যুলারিজম। যার বাংলা ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, ইহজাগতিকতা। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে আসলে একটা জগাখিচুড়ি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। রাষ্ট্র বা সরকার এর ফলে ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা দেখায়। তা দেখাতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই কোনো না-কোনো ধর্মের প্রতি বেশি পৃষ্ঠপোষকতা দেখাতে হয়। এতে অন্য ধর্মকে অপমানও করা হয় কিছুটা। আবার ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের সুযোগও সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে সেক্যুলারিজম যেমন কোনো ধর্মের বিরোধিতাও করবে না, তেমনি কোনো ধর্মকে সহায়তাও করবে না। রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়াই ধর্ম বিকশিত হতে পারে, মানুষ ধর্ম পালন করতে পারে। রাষ্ট্রের প্রধান কাজ ইহজাগতিক। সকল মানুষের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা-কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। কমিউনিস্টরা সেই রাষ্ট্রই তৈরি করতে চায়।

তরুণদের তখন ছাড়া ছাড়া হয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। ছোট মফস্বল শহর তার মেধাবী সন্তানদের এইচএসসি পাসের পর আর ধরে রাখতে পারে না। উচ্চশিক্ষার জন্য তাদের পাড়ি জমাতে হয় অন্য কোনো শহরে, অন্য কোনো অঞ্চলে।

গগনশিরীষতলার বৈঠকে তখন ভাঙনের সুর। কিন্তু তারা প্রতিজ্ঞা করেছে গণমানুষের পক্ষে থাকবে, ন্যায়ের পক্ষে কাজ করবে, সত্যের পক্ষে কাজ করবে, সংগঠন করবে। তারা নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে তো বটেই, কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক হবে না। শুধু একজন, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী, সব পরীক্ষায় খুব বেশি বেশি নম্বর পেয়ে পাস করে, দেশের অভিজাত প্রতিষ্ঠানগুলোয় যে অবলীলায় ভর্তি পরীক্ষায় উতরে গেছে, সে-ই কেবল বলতে পারে না যে, সে কোন পেশায় আত্মনিয়োগ করবে। কেননা সে তখন ভেতরে ভেতরে শিল্প-আক্রান্ত, এবং সাহিত্য-আক্রান্ত। তার পরেও সে পড়তে চলে যায় দূরশহরের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

দূরে দূরে থাকলেও তারা আকূল হয়ে খোঁজ রাখে পরস্পরের। একজনের সাফল্যের কথা শুনলে আরেকজনের বুক ফুলে ওঠে আনন্দে। তাদের একজন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে তরতর করে ওপরে উঠে যাচ্ছে। অচিরেই সংবাদ আসে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ছাত্র সংগঠনের প্রধান পদগুলোর একটি দখল করে ফেলেছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সে অবশ্যম্ভাবী বড় দুই পদের একটির দাবিদার। তার বাগ্মিতা, কর্মীদের ওপর তার প্রভাব, কেন্দ্রীয় পরিষদের সাথে তার লিয়াজোঁ- এইসব মিলিয়ে সে দক্ষ ডিপ্লোম্যাটের মতো ওপরে উঠছে তরতর করে। পরবর্তী সময়ে দেখা যাবে সে সত্যই ছাত্র সংসদে বড় পদে নির্বাচিত হয়েছে, তারপরে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা হয়েছে, তারপর জোটের রাজনীতিতে তার ক্ষয়িষ্ণু দলটিকে নিয়েই দাবার ছক কেটে কেটে এগিয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত দেশের সবচাইতে বড় আদালতের হাকিম হয়েছে।

এদিকে মেধাবী সাহিত্যকর্মী কিন্তু সংগঠনের সাথে মেলাতে পারছে না আদর্শকে। পদে পদে হোঁচট খাচ্ছে সে। দেখছে আদর্শের সাথে কর্মপন্থার কত ভিন্নতা! শুধু নিবেদিত কর্মকা ই সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ নয়, পদধারীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ না রাখলে কাজের কোনো মূল্যায়ন নেই। রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রকে যে কত গালি দেয় তারা শতমুখে, কিন্তু পার্টির মধ্যে আমলাতন্ত্র প্রবল আর প্রচ। দেখা গেল আদর্শের প্রতি আনুগত্য থাকলেই চলে না, পার্টি নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য দেখাতে না পারলে ওপরে জায়গা পাওয়া যায় না। আর ওপরে জায়গা না পেলে নীতি-নির্ধারণে, কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিপদেই হোঁচট খেতে থাকে সে। যত হোঁচট খাচ্ছে তত বাড়ছে তার জেদ। তত বেশি আঁকড়ে ধরছে সাহিত্যকে। একুশ বছর বয়সে সে শহীদ মিনারে একাকী দাঁড়িয়ে শপথ নিয়েছে যে, অন্যরা সবাই যা করে- নারী ও অর্থের পেছনে ছোটাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ- সে তা থেকে দূরে থাকবে। পার্টি থেকেও দূরে সরছে সে।

কিন্তু আদর্শ থেকে দূরে সরা হলো না তার। ১৯৯২ সালে ভেঙে গেল বার্লিন প্রাচীর। বিলুপ্ত হয়ে গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন। তখন সে দেখল মানুষকে পুঁজির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার শপথদৃপ্ত মানুষগুলোর দল ত্যাগের হিড়িক। কেউ কোনো পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে পর্যন্ত রাজি না। তখন সমাজতন্ত্র এই দেশে সবচাইতে অচ্ছুৎ একটা শব্দ। সে তখন পেশায় ঢুকেছে। কিন্তু পেশাকে ফেলে সে ঘুরে বেড়ায়। ঘুরে বেড়ায় শাহবাগে, টিএসসিতে, পল্টনে, মিরপুরে, জাহাঙ্গীরনগরে। কোহিনুর রেস্টুরেন্টে দু’জন এক টেবিলে বসে জোরে জোরে উচ্চারণ করে সমাজতন্ত্র শব্দটি। অন্য টেবিলের খদ্দেররা শব্দটি শুনলেই ঘুরে তাকায় তাদের দিকে। কারও চোখে বিস্ময়, কারও চোখে সহানুভূতি, কারও চোখে বিদ্রুপ। কিন্তু পরোয়া না করে সে কথায় কথায় শব্দটি উচ্চারণ করে চলে।

তারা যায় তাত্ত্বিকদের কাছে, পুরোনো নেতাদের কাছে, সাহিত্যের অঙ্গনের অল্প দুই-একজন যারা প্রগতিশীল মনোভঙ্গি থেকে তখনও সরে যাননি, তাদের কাছে- কিন্তু কোথাও প্রার্থিত উত্তর মেলে না। উত্তর তখন নিজেকেই খুঁজতে হয়। মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে, মানুষের চিন্তাচর্চার মধ্যে, মূল মার্কস-অ্যাঙ্গেলস রচনাবলি পাঠের মধ্যে সে উত্তর খুঁজতে চায়। বিপর্যয়ের ব্যাখ্যা খুঁজতে চায়, আর উত্তরণের পথ খুঁজতে চায়। একে একে পাঠ্যতালিকায় স্থান করে নিতে থাকেন আন্তোনিও গ্রামসি, টেরি ইগলটন, ফুকো, দেরিদা, ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল, উত্তর-আধুনিকরা এবং অতি অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ। এই জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে চলার পর্যায়ে তার সত্যিকারের উপশম হয়ে দাঁড়ান রবীন্দ্রনাথ। আর তার আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখার পথ্য জোগায় লেখালেখি। সে চাকরি নিয়ে চলে যায় একেবারে গ্রামে, মঙ্গাপীড়িত গ্রামে। বছরের পর বছর ধরে খুঁজে বেড়ায় সেই সূত্রটিকে, যে সূত্রটি বেঁচে থাকার দার্শনিক ভিত্তি জোগায় এই প্রান্তিক মানুষগুলোকে। খুঁজে পায় সেই গ্রামীণ সামাজিক আধ্যাত্মিকতা। এই আধ্যাত্মিকতার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের তেমন কোনো সম্পর্ক সেই। প্রথাসিদ্ধ ধর্মের নিজেদের মতো করে নেওয়া অংশ, বিভিন্ন লোকজ ধর্মের মিশেল, আংশিক বৈরাগ্য আংশিক বাস্তবমুখিনতা, বংশপরম্পরা বাহিত সামাজিক উপদেশমালা, কিছু মূল্যবোধ, দীর্ঘদিনের যোগাযোগ এবং আদান-প্রদানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা পারস্পরিক মমত্ববোধ- এইসব উপাদান মিলে তৈরি হয় গ্রামীণ সামাজিক আধ্যাত্মিকতা। দুই দশক পরে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই যখন নিশ্চিত হয়েছে যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প একটি গড়ে তুলতেই হবে, সবাই নতুন করে উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, পুঁজিবাদই ইতিহাসের শেষ কথা নয়, তখন সে নগরে ফিরেছে।

তার সেই তারুণ্যের বন্ধুরা তাকে দেখে বিমর্ষ মাথা নাড়ে- সবাই নিজ নিজ পেশাগত জীবনে দাঁড়িয়ে গেছে, শুধু শুধু তুই নিজের জীবনটা নষ্ট করলি। সবারই গাড়ি-বাড়ি-ব্যাংক ব্যালান্স হয়েছে, শুধু তোরই এখনও পেশার স্থিরতা নেই।

সে মৃদু হাসে। আবদুল মান্নান সৈয়দকে আদর্শ লেখক মনে করে না সে। কিন্তু তার কিছু কিছু কথার সাথে একমত হয়। তেমনি এক অন্তর্ভেদ্য বাক্য হচ্ছে- বাড়ি-গাড়ি-টাকা-নারী তো বয়স্কদের খেলনা। তা নিয়ে মত্ত থাকে প্রাপ্তবয়স্ক বালকরা। লেখক ওপথে পা বাড়াবেন কেন?

সে বন্ধুদের মুখের ওপর বলতে পারে না কথাগুলো। কারণ বন্ধুরা সত্যিকারের দরদ, শুভেচ্ছা আর বেদনাবোধ থেকেই কথাগুলো বলছে তাকে।

কিন্তু তার পক্ষে তো অন্যকিছু হওয়া সম্ভবই ছিল না।

অমলকান্তির মতো কেউ কেউ এখনো কেবল রোদ্দুরই হতে চায়।

সূত্র : কালের খেয়া

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:২৯ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত