ঘোষণা

উদ্ধত আচরণের জন্য একা হয়ে পড়ছে চীন

ব্রহ্ম চেলানি | সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 85 বার

উদ্ধত আচরণের জন্য একা হয়ে পড়ছে চীন

চলতি বছরের শুরুতে নববর্ষের ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ঘোষণা করেছিলেন, ২০২০ সাল হবে ‘একটি মাইলফলক’। প্রেসিডেন্ট সি ঠিকই বলেছিলেন, তবে তিনি যেভাবে আশা করেছিলেন, সেভাবে তা হয়নি। তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে চীনের বন্ধু আছে।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো তিনি বুক ফুলিয়ে যে দাবিটি করেছেন, তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের সুখ্যাতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার মিত্রদেশগুলো তার থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে এবং দেশটি এখন শুধু একটিই শাবল চালাচ্ছে, সেটি হলো নৃশংস ক্ষমতা। এতে তার শত্রুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ফলে সি চিন পিংয়ের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাভিলাষ মুখ থুবড়ে পড়াটা আসলে শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসবিদেরা ২০২০ সালকে মুখ্যত একটি কান্নাঝরা বছর হিসেবে দেখবেন। কোভিড-১৯ মহামারির ছোবলে দুনিয়াব্যাপী মানুষ মরেছে। সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এই মহামারিকে ধন্যবাদ, কারণ পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চীনের ওপর অতিনির্ভরতা যে কী ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে এবং চীনের প্রতি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বদলে গেছে তা কোভিড-১৯ না এলে হয়তো এত তাড়াতাড়ি বোঝা যেত না।

চীনের উহান শহর থেকে করোনাভাইরাসের বিস্তার শুরু হওয়ার পরও দেশটির সরকার গুরুতর অনেক তথ্য লুকিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন কথা উঠে আসার পর চীনবিরোধিতার স্রোত গড়াতে শুরু করে। তার চেয়ে ভয়ানক কথা হলো প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এই মহামারিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। চিকিৎসাসামগ্রীর বাজারে চীনের প্রাধান্য আছে। সেই সুযোগ নিয়ে তারা নিষ্ঠুর ব্যবসায়িক মনোভাব নিয়ে চিকিৎসাসামগ্রী বিক্রি বাড়িয়েছে। এটি বিশ্ববাসীকে ক্ষুব্ধ করেছে। আরেকটি হলো চীনের বিস্তারবাদী তৎপরতা; বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের দখলদারি ভাবনা এ এলাকায় চীনকে রুখে দেওয়ার মনোভাবকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দৃঢ় করেছে।

অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র—এই পাঁচ দেশের গোয়েন্দাদের সমন্বয়ে বহু বছর ধরে যে ‘ফাইভ আইজ’ বা কথিত ‘পাঁচ চোখ’ তৎপর রয়েছে, এবার তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জাপান। জাপান যোগ দেওয়ার পর যে ‘সিক্স আইজ’ হবে, সেটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুতর ভিত্তি হিসেবে দাঁড়াবে এবং চীনের সামরিক তৎপরতার একটি প্রতি-তৎপরতা হিসেবে কাজ করবে।

এর বাইরে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে রয়েছে একটি কথিত ‘কুয়াড’। এই গোষ্ঠীর মধ্যে আগে ভারত ছিল না। কিন্তু বছরের পর বছর চীনকে প্রশমিত করার চেষ্টা করেও ভারত ব্যর্থ হয়েছে এবং এরপরই তারা এতে যোগ দিয়েছে।

একটু দেরিতে হলেও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ব্রিয়েন বলেছেন, ‘চীন ভারতের সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণ করছে।’ গত এপ্রিলের শেষে চীনা সেনারা ভারতের দখলে থাকা লাদাখে ভারতীয় সেনাদের ওপর হামলা চালায়। এরপর থেকেই চীন গায়ে পড়ে ঝগড়া করার প্রবণতা দেখাচ্ছিল। এটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বিকল্প রাস্তায় হাঁটতে বাধ্য করেছে।

চলতি বছরের শেষ দিকে মালাবারে ভারত তার বন্ধুদেশ জাপান ও আমেরিকার সেনাদের নিয়ে নৌমহড়া দেবে। এ মহড়ায় অস্ট্রেলিয়াকে যুক্ত থাকার জন্য তাদের আমন্ত্রণ জানানোর কথা বিবেচনা করছেন মোদি। অনেক আগে এ মহড়ায় অস্ট্রেলিয়া থাকত। তবে ২০০৮ সালে তারা সেখান থেকে সরে যায়।

কুয়াড সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা বাড়তে থাকা মানে চীনের সামনে বড় ধরনের বিপদ আছে। গত জুনে অস্ট্রেলিয়া ও ভারত দ্বিপক্ষীয় সামরিক শক্তি বাড়াতে একটি চুক্তি করে। জাপানের সঙ্গেও ভারত একই ধরনের একটি চুক্তি করেছে।

এ মুহূর্তে চীনের বিস্তারবাদী আচরণে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হয়ে আছে ভারত ও জাপান। ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত আছে। সেই সীমান্তের একটি অংশ চীন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে এবং ভারত সে দাবি অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে জাপান সাগরে চীনের তৎপরতাকে সরাসরি উৎপাত হিসেবে দেখছে টোকিও। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামোকে ঝাঁকুনি দেবে তাতে সন্দেহ নেই।

হংকংয়ের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা আইন তৈরি করার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও চীনের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছে। ইউরোপে চীনের হুয়াওয়ে কোম্পানির ফাইভ জি নেটওয়ার্কের কাজ করার কথা ছিল। হংকং ইস্যুতে তা বাদ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে চীনা কোম্পানি বাইট ড্যান্সের টিকটক অ্যাপ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চীনের আরেক বৃহৎ কোম্পানি আলিবাবাকেও যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হতে পারে।

মোদ্দা কথা, চীন যদি তার বিস্তারবাদী কৌশল খাটানো থেকে ফিরে না আসে, তাহলে সে আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে। যে উদীয়মান শক্তি হিসেবে সে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছিল, তা মাঝপথেই হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
ব্রহ্ম চেলানি: দিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের অধ্যাপক, সূত্র : প্রথম আলো

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত