ঘোষণা

কতটা নিরাপদ রাশিয়ার তৈরি করোনা ভ্যাকসিন?

দীপঙ্কর | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 357 বার

কতটা নিরাপদ রাশিয়ার তৈরি করোনা ভ্যাকসিন?

সংবাদ মাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া এমনকি লোকের মুখে মুখে এখন শুধু রাশিয়ার জয় জয় কার। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে করোনা ভ্যাকসিনের আনুষ্ঠানিক প্রয়োগ করলো রাশিয়া। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের মেয়ে নাকি প্রথম করোনা ভ্যাকসিন নিয়েছেন!

গোটা পৃথিবীর সংবাদ মাধ্যম এখন যেন উৎসবের মেজাজে। বিগত কয়েক মাস ধরে মানুষের আতঙ্ক আর অসহায়তার অবসান কি এবার হতে চলেছে? আমরা সবাই এর উত্তরের অপেক্ষায়!

কিন্তু এই ভ্যাকসিনের আসল সত্যিটা কি আমরা জানি? বা জানার চেষ্টা করছি? নাকি কেউ আমাদের জানানোর চেষ্টা করছে? আমরা সবাই পেষায় গবেষক বা বিজ্ঞানী নই ঠিকই। কিন্তু আমাদের মনেও কি প্রশ্ন এসেছে যে এটা সম্ভব কিনা? বা হলেও তা কিভাবে সম্ভভ?

একটু বিস্তারিত বলি…

যে কোনো ভ্যাকসিন তৈরির পর মানবদেহে তার সুরক্ষা আর কার্যকরীতার মূল্যায়ন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে হয় এবং এটি সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি পদ্ধতি। এই তিনটি পর্যায় সম্পন্ন না হলে কোনো ভ্যাকসিন মানুষের ব্যবহারের ছাড়পত্র পায় না (কোন বিশেষ রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া)। কারণ সেটা অনেক বেশী ঝুঁকিপূর্ণ এবং মারাত্মক হতে পারে।

WHO-র তথ্যের ভিত্তিতে রাশিয়ার তৈরি করোনা ভ্যাকসিনটি এখনও প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষাধীন। ইতিমধ্যেই কিছুদিন আগেই রাশিয়ান সরকার দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার সাফল্য দাবি করেছে। যদিও এই ভ্যাকসিন পরীক্ষার ফলাফল আজ পর্যন্ত কোথাও প্রকাশ করা হয় নি। যেখানে বিশ্বের বেশীরভাগ করোনা ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক তথ্যগুলি ইতিমধ্যেই প্রকাশিত।

তাই প্রশ্ন থেকে যায় রাশিয়া কি এই ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের (বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়) পরীক্ষা ইতিমধ্যেই সেরে ফেলেছে? যদি করে থাকে তাহলে এতো কম সময়ের মধ্যে কি করে তা সম্ভভ? তার ফলফলই বা কি হল?

এই সব অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু এখনো পাওয়া যায় নি। সারা বিশ্বের বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকরা এখন অন্ধকারেই। এমনকি রাশিয়া সরকারও এই ব্যাপারে কিছুই তথ্য দেয়নি। তাহলে এই ভ্যাকসিনের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা? সেটা আগামী দিন গুলোতেই বোঝা যাবে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল পাবলিক হেলথ আইন বিশেষজ্ঞ লরেন্স গোস্টিন বলেছেন, “আমার সন্ধেয় হচ্ছে যে রাশিয়ার তৈরি এই ভ্যাকসিনটি কেবল অকার্যকরই নয়, অনিরাপদও হতে পারে। ভ্যাকসিন তৈরির একটা সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে… ট্রায়াল আগে আসে, পরে তা মানুষের দেহে প্রয়োগ করা হয়।”

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ অ্যান্টনি ফৌসি গত সপ্তাহে ভ্যাকসিন ফাস্টট্র্যাক পদ্ধতির বিষয়ে বলেছেন- “আমি আশা করবো যে চীন এবং রাশিয়া মানুষের দেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার আগে তার সঠিক পরীক্ষা সম্পন্ন করবে, কারণ পরীক্ষা পদ্ধতির আগে ভ্যাকসিনের বিতরণ সর্বোপরি সমস্যাযুক্ত।”

প্রসঙ্গত, কিছুদিন আগে এই ভ্যাকসিন সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং কানাডা পশ্চিমী দেশের ল্যাবগুলি থেকে ভ্যাকসিন গবেষণা তথ্য চুরি করার অভিযোগও এনেছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে।

তাই বিজ্ঞানমহলে রাশিয়ার এই ভ্যাকসিন নিয়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রসঙ্গত, এটি রাশিয়ার প্রথম বিতর্কিত ভ্যাকসিন নয়। পুতিন এই বছরের গোড়ার দিকে উল্লেখ করেছিলেন যে রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা একটি ইবোলা ভ্যাকসিন তৈরি করেছিল যা বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকরী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে এবং আফ্রিকার ইবোলা জ্বরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রকৃত অবদান রেখেছিল।

উল্লেখ্য, রাশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুটি ইবোলা ভ্যাকসিনকে ঘরোয়া ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত দিলেও (একটি ২০১৫ সালে এবং অন্যটি ২০১৮ সালে) আফ্রিকাতে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে তেমন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় নি।

তাই সংবাদ মাধ্যম বা সাধারণ মানুষের কাছে এটা সাময়িক সুখের খবর হলেও, গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানমহল কিন্তু চিন্তিত। আগামী কিছু সপ্তাহ বা কিছু মাস পরে তার সদুত্তর পাওয়া যাবে। পেশায় একজন গবেষক হিসেবে ব্যাক্তিগতভাবে আমিও চিন্তামুক্ত হতে পারছি না। গোটা বিশ্ববাসীর মতো আমিও চাই করোনা ভ্যাকসিন তাড়াতাড়ি বাজারে আসুক, গোটা পৃথিবী করোনামুক্ত হোক। কিন্তু অবশ্যই তা বিজ্ঞান মেনে, সব পর্যায়ের পরীক্ষা উত্তীর্ণ করে। নাহলে সুরাহার থেকে বিপদের আশঙ্কাটাই বেশী।

আমি ভ্যাকসিনের বিরোধী নই। আমার লেখাটা মানুষকে নিরাশ করার জন্যেও নয়। বিজ্ঞানের একজন সদস্য হিসেবে বিজ্ঞানের দিকটা তুলে ধরার চেষ্টা করলাম মাত্র। সবাই ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। আশায় থাকলাম সব পরীক্ষা পর্যায় সম্পন্ন করে সুরক্ষিত করোনা ভ্যাকসিন খু্ব শীঘ্রই পৌঁছে যাবে আমাদের কাছে।

লেখক : ওসলো, নরওয়ে প্রবাসী

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত