ঘোষণা

মালিতে সেনা-অভ্যুত্থান, স্বৈরাচার এবং নিষ্পেষিত জনগণ

আলী রীয়াজ | বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 32 বার

মালিতে সেনা-অভ্যুত্থান, স্বৈরাচার এবং নিষ্পেষিত জনগণ

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে মঙ্গলবার সংঘটিত সেনা-অভ্যুত্থান বিশ্বের মনোযোগ দাবি করে। কয়েক দশক ধরে যখন সেনা-অভ্যুত্থানের ঘটনা হ্রাস পাচ্ছে, তখন মালিতে সেনা-অভ্যুত্থান এক ব্যতিক্রমী ঘটনা, যদিও তা বিস্ময়কর নয়। সেটি আমাদের বিবেচনার একটি দিক। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের পশ্চাৎযাত্রার এই সময়ে মালির ঘটনাপ্রবাহের আরও এক ধরনের তাৎপর্য আছে।

গণতন্ত্রের উল্টো যাত্রা নিয়ে যেসব তত্ত্ব আছে, এই সেনা-অভ্যুত্থান তার পক্ষে প্রমাণ হাজির করে। সেনা-অভ্যুত্থানের পটভূমি-ব্যাপক গণবিক্ষোভ এই প্রশ্নের সুযোগ করে দেয় যে ক্ষমতাসীনেরা যখন গণতন্ত্রকে জলাঞ্জলি দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠেন, তখন এই ধরনের সেনা-অভ্যুত্থান গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে কি না এবং তার পরে কী করণীয়।

মালিতে মঙ্গলবার বিদ্রোহী সেনারা প্রেসিডেন্ট কেইতা এবং প্রধানমন্ত্রী বোবোউ চিসেকে আটক করে এবং তাঁদের পদত্যাগে বাধ্য করান। দেশের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে। রাজধানী থেকে ৯ মাইল দূরে, কান্তি শহরে একটি সেনাঘাঁটিতে অভ্যুত্থানের সূচনা হয়। গত মার্চ মাসে দেশের পার্লামেন্ট নির্বাচনে জালিয়াতি করে প্রেসিডেন্ট তাঁর দলের লোকজনকে নির্বাচিত করানোর পরে দেশে অস্থিরতা চলছিল। মার্চের নির্বাচনের তিন দিন আগে বিরোধী দলের নেতাকে অপহরণ করা হয়, বেশ কিছু নির্বাচনী কর্মকর্তা অপহৃত হন, নির্বাচন কেন্দ্রে হামলা হয়। এপ্রিলে দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের সময়ও কয়েকটি এলাকায় সুষ্ঠু ভোট হয়নি।

পরে দেশের সাংবিধানিক আদালত ৩০টি আসনের ফল বাদ দিয়ে দেন, যাতে প্রেসিডেন্টের দলের ১০ জন প্রার্থীর সুবিধা হয়। ৫ জুন থেকে মালিতে আন্দোলন চলছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলার অজুহাতে গত ১২ জুলাই সাংবিধানিক আদালত ভেঙে দেন প্রেসিডেন্ট কেইতা। সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনে জালিয়াতি ছাড়াও দুর্নীতি এবং বিভিন্ন ধরনের চরমপন্থী সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার অভিযোগ আছে।

মালি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ইসলামপন্থী জঙ্গি সংগঠনের আক্রমণের মুখে আছে। ২০১২ সালে কাতি শহরের সেনাঘাঁটিতে বিদ্রোহের পর প্রেসিডেন্ট আমাদু টুমানি টোরেকে ক্ষমতাচ্যুত হন। সেই সময়েই দেশের উত্তরাঞ্চলে ইসলামপন্থী জঙ্গিদের কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়। ২০১৬ সালের পর থেকে জঙ্গিদের হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, ২০১৯ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট কেইতা ২০১৩ সালে নির্বাচিত এবং ২০১৮ সালে পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মালির এই সেনা-অভ্যুত্থানের নিন্দা করেছে আফ্রিকান ইউনিয়ন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইকোওয়াস এবং জাতিসংঘের মহাসচিব। সরকারবিরোধীরা একে স্বাগত জানালেও অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের এই চেষ্টাকে আন্তর্জাতিক সমাজ ইতিবাচক মনে করে না।

যদিও একসময় বিশ্বজুড়ে, বিশেষত আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় সেনা-অভ্যুত্থান এবং সেনাশাসন খুব স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। গত কয়েক দশকে ক্যু বা সেনা-অভ্যুত্থান হ্রাস পেয়েছে। সেন্টার ফর সিস্টেমিক পিসের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী ৫ লাখের বেশি নাগরিক আছে এমন দেশগুলোতে ১৯৪৬ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ২২৫টি সফল ক্যু হয়েছিল। দশকওয়ারি বিবেচনায় ১৯৪০-এর দশকে ১৪টি, ১৯৫০-এর দশকে ২১টি, ১৯৬০-এর দশকে ৬১টি, ১৯৭০-এর দশকে ৫৬টি, ১৯৮০-এর দশকে ৩৬টি এবং ১৯৯০-এর দশকে ২১টি ক্যু হয়েছে। এই শতকের প্রথম দশকে ১০টি সেনা-অভ্যুত্থান হয়, ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল সময়ে ৬টি। ওয়ান আর্থ ফিউচার বলে একটি সংগঠন বিভিন্ন দেশে সেনা-অভ্যুত্থানের আশঙ্কার হার বিষয়ে গবেষণা ও ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকে। তাঁদের ‘ক্যু-কাস্ট’-এর হিসাব অনুযায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ২০১৮ সাল হচ্ছে একমাত্র বছর, যখন কোথাও কোনো ক্যু হয়নি।

মালির সেনা-অভ্যুত্থানের হোতারা বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তাঁরা ক্ষমতায় থাকতে চান না। তাঁরা দেশে স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান এবং ‘যৌক্তিক সময়ের’ মধ্যে একটি নির্বাচন করে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আগ্রহী। তাঁদের এই কথাগুলো লক্ষণীয়। কেননা অতীতে এমনকি নব্বইয়ের দশকেও সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর কখন ক্ষমতা থেকে সরে যাবে, তা বলত না, যাকে গবেষকেরা ‘ওপেন এন্ডেড ক্যু’ বলেই বর্ণনা করেন। নব্বইয়ের দশক থেকে এই অবস্থা বদলে এক নতুন ধরনের সেনা-অভ্যুত্থানের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটছে।

অনেক দেশেই গণতন্ত্র উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। ন্যান্সি বারমিয়ো এক প্রবন্ধে যে তিন প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্রের পশ্চাৎযাত্রা বা ডেমোক্রেটিক ব্যাকস্লাইডিং হয় বলে বর্ণনা করেছেন তাঁর একটি হচ্ছে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল। একে তিনি বলেছেন ‘প্রমিসারি ক্যু’ বা প্রতিশ্রুতির অভ্যুত্থান (ন্যান্সি বারমিয়ো, ‘অন ডেমোক্রেটিক ব্যাকস্লাইডিং’, জার্নাল অন ডেমোক্রেসি, ভলিউম ২৭, সংখ্যা ১, জানুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা ৫-১৯)। এ ধরনের প্রতিশ্রুতির ক্যুর সংখ্যা ১৯৯০-এর দশকের পর বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯০-এর আগে এই ধরনের ক্যুর হার ছিল ৩৫ শতাংশ, ১৯৯০-এর পরে ৮৫ শতাংশ।

এই ধরনের সেনা-অভ্যুত্থান দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারে, ন্যান্সি বারমিয়ো তা মনে করেন না। ১৯৯০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত হওয়া ১২টি প্রমিসারি ক্যুর বিশ্লেষণ করে তিনি দেখান যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে গড়ালেও এই সব নির্বাচনে ক্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা তাঁদের পছন্দের ব্যক্তিরাই ক্ষমতায় আসেন। মালিতে ২০১২ সালের সেনা-অভ্যুত্থানকে বারমিয়ো এই ধরনের ক্যু বলেই চিহ্নিত করেছিলেন। সেই ক্যুর বিরোধী কোয়ালিশনের একজন নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও ইব্রাহিম বুবাকার কেইতা ক্যুর আগে সেনাবাহিনীর আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন এবং তাঁদের পছন্দ হিসেবেই পরে ক্ষমতাসীন হন।

ন্যান্সি বারমিয়ো যে দেশগুলোতে এই ধরনের ‘প্রমিসারি ক্যু’ বা প্রতিশ্রুতির অভ্যুত্থানের ঘটনা শনাক্ত করেছেন এবং পরে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যেখানে ‘বেসামরিক শাসন’ প্রতিষ্ঠা হতে দেখেছেন, সেই সব দেশ নিয়ে আরও গবেষণা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে বারমিয়োর আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। এই সব দেশের অধিকাংশেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেগুলোতে হাইব্রিড রেজিম বা দোআঁশলা শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাইব্রিড রেজিম হচ্ছে এমন এক ধরনের ব্যবস্থা, যেখানে দৃশ্যত কিছু কিছু গণতান্ত্রিক উপাদান থাকলেও যেমন নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠান, সংসদ, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দল করার অধিকার—কার্যত সেগুলো কর্তৃত্ববাদী শাসনমাত্র।

শুধু তা-ই নয়, গত কয়েক বছরে এটাও দেখা যাচ্ছে যে হাইব্রিড রেজিমগুলো—তা সেনা-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হোক অথবা অন্যভাবেই প্রতিষ্ঠিত হোক, এখন ক্রমাগতভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসনে রূপান্তরিত হচ্ছে। বৈশ্বিকভাবে গণতন্ত্রের উল্টো যাত্রা, প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কর্তৃত্ববাদী শাসকদের উত্থান, জনতুষ্টিবাদ বা পপুলিজমের বিকাশ, গণতন্ত্রের আদর্শকে মোকাবিলা করার জন্য বিকল্প অগণতান্ত্রিক আদর্শের বৈশ্বিক প্রচারণা, অর্থনৈতিক সংকট এই প্রবণতাকে শক্তি জোগাচ্ছে। এই নতুন কর্তৃত্ববাদী শাসন চিরায়ত স্বৈরতন্ত্র থেকে ভিন্ন, কিন্তু এগুলোতে নিপীড়ন কোনো অর্থেই কম নয়। ফলে মালির সেনা-অভ্যুত্থান দেশকে গণতন্ত্রমুখী করে তুলবে, সেই আশা করার কারণ নেই।

মালিতে কয়েক বছর ধরে কেইতা এবং তাঁর দলের স্বৈরাচারী শাসনের কারণে যে ক্ষোভ জমেছে এবং গণতন্ত্রের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তাঁর প্রকাশ ঘটেছে জুন মাস থেকে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে। এই পটভূমিকায় এই সেনা-অভ্যুত্থান সম্ভব হয়েছে। যে কারণে বিক্ষোভকারীরা এই ক্যুর প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। এই ক্যুর গ্রহণযোগ্যতা এইভাবেই তৈরি হয়েছে। এটিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু মালির জনগণকে এটা উপলব্ধি করতে হবে যে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সংগ্রাম শুরু হয়েছে মাত্র। সেটা বুঝতে না পারলে তাঁরা আবার ২০১২ সালেই ফিরে যাবেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রকামী মানুষের করণীয় কী? সেটার জন্য আলজেরিয়া ও সুদানের দিকে তাকানো যেতে পারে। সুদানে স্বৈরাচারী ওমর আল বশির আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করার পরে সেখানে বেসামরিক ব্যক্তি এবং সামরিক বাহিনীর সম্মিলনে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনী রাজনৈতিক সংস্কার করতে কম আগ্রহী, তথাপি তাঁদের ওপর চাপ আছে এবং রাজপথেও আন্দোলন অব্যাহত আছে।

আলজেরিয়ায় আন্দোলনের মুখে আবদুল আজিজ বুতাফলিকা সরে যেতে বাধ্য হলেও সেনাবাহিনীই এখনো ক্ষমতার শীর্ষে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেশকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যায়নি, সংবিধান সংস্কার হয়নি। কিন্তু আন্দোলন এখনো অব্যাহত আছে। মালির জনগণ কোন পথ বেছে নেবেন বা নিতে পারবেন, সেটা দেখার বিষয়। কিন্তু এই ঘটনা স্বৈরাচারী শাসনের জাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট মানুষের জন্য কিছু বিষয় তুলে ধরছে, যা লক্ষ করা দরকার।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:৪০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত