ঘোষণা

নজরুল ইসলাম (৬০), জাপানে সাত্তার নামেই অধিক পরিচিত

অনলাইন ডেস্ক | রবিবার, ১২ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 98 বার

নজরুল ইসলাম (৬০), জাপানে সাত্তার নামেই অধিক পরিচিত

জাপানে বাঙ্গালী ——— (১)

নজরুল ইসলাম (৬০), জাপানে সাত্তার নামেই অধিক পরিচিত।
বাংলাদেশে তাঁর বাড়ি ফুলগাজী উপজেলার ফেনী জেলায়।

দেশে কিশোরকাল কেটেছে তাঁর ফেনী জেলার ফুলগাজীতেই। পড়াশোনা করেছেন ফুলগাজীর স্কুলে সেখান থেকে এস এস সি (মাধ্যমিক) পরীক্ষায় উত্তির্ণ হবার পর চলে আসেন ঢাকা। ঢাকার মতিঝিল এলাকায় টি এন্ড টি কলেজ থেকে এইচ এস সি (উচ্চ মাধ্যমিক) দিয়ে পাশ করার পর ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। জগন্নাথ কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকুরী করার কিছুটা সুবিধা ছিল তাই সেই সুবিধা নিতে চাকুরীও করেছেন। চাকুরী করেছেন একটি ট্রাভেলিং এসেন্সিতে, নাম ছিল লিজা ট্রাভেলিং এজেন্সি। একই সাথে পড়াশোনা করেছেন একাউন্টিং সাবজেক্ট নিয়ে।

যেহেতু ট্রাভেলিং এজেন্সিতে চাকুরী করতেন তাই দেশে বিদেশ নিয়ে ছিল তার কিছুটা বাড়তি জানাশোনা। বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর কারণেই বিভিন্ন দেশের সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে তাঁর ধারনা থাকায় কলেজে (অনার্স-এ) ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করার আগেই অধিক উপার্জনের আশায় জাপান এসে পা রেখেছেন ১৯৮৫ এর মার্চ মাসে। তার পর থেকে তিনি জাপান প্রবাসী।

জাপান এসে প্রথম উঠেছিলেন টোকিওর কাৎস্যুশিকা কো (কাৎস্যুশিকা ওয়ার্ড) -র কেইসেই ট্রেন লাইনের কাছে কইওয়া এলাকায়। আগে থেকেই সেখানে অন্য বাংলাদেশিদের বসবাস ছিল। অন্যদের সহযোগিতায় সেই বাসায় উঠেছিলেন। তখন অলিখিত বেশ এজেন্ট জাপানে (দালাল বা ব্রোকার) ছিল। যারা নগদ টাকার বিনিময়ে বাসস্থান বা চাকুরী জোগাড় করে দিত। এমনই এক (পাকিস্তানি) এজেন্টের মাধ্যমে নগদ তিনশ (৩০০) ডলারের বিনিময়ে একটি ক্লিনিং কোম্পানিতে পার্টটাইম জব নিয়েছিলেন। সেটি ছিল টোকিওর ওতোরীতে।

প্রতিদিন তিনচার ঘন্টা কাজ করতে হতো এবং ঘন্টা প্রতি ৭০০ ইয়েন পেতেন। যে সময়ের কথা বলছেন তিনি, তখন ১ ডলারের বিনিময়ে পাওয়া যেতো ১৬০ ইয়েন। ভাষা না জানার কারণে কাজের জায়গাতে বেশি কাজ করাতে চাইতেন না মালিক পক্ষ। তবে সপ্তাহে পাঁচ (৫) দিন কাজ ছিল। মাঝে মধ্যে কাজের চাপ বেশি থাকলে শনি-রবিবারও কাজ করতে হতো। কাজটি তিনি তিন মাস সময় নিয়মিত করার পর অন্যত্র ভালো কাজ খুঁজে নেন।

জাপান আসার আগে জাপান সম্পর্কে পাঠ্য বইতে কিছুটা পড়লেও জাপানি ভাষার কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না। আসার পর এখানে প্রতিদিন টেলিভিশন দেখে ভাষা রপ্ত করেছেন। আসার পর থেকে তিনি টোকিও এবং তার আসেপাশেই থেকেছেন। টাকা বেশি পেলেও নানা সুবিধার কথা চিন্তা করে দূরে কোথাও যাবার কথা ভাবেননি তিনি। টোকিওতে জাপানি খাবারের রেস্টুরেন্ট গুলোতেই বেশি কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর।

কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত আসা এক মেয়ে গেস্টের সাথে তার দেখা, পরে কথা বলে ভালোবাসা পর্যন্ত গড়ায় দুজনের সম্পর্ক। সেই ভালোবাসার পরিনতি বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। বিয়ে করেছেন (১৯৯৩ সনে) একজন জাপানি মেয়েকে। মেয়ে গেস্টটি রেস্টুরেন্টে প্রায়ই খেতে আসতেন তার অন্য বান্ধবীদের নিয়ে। সেখানে কথা বলে ভালো লেগে যাওয়ার পর পরিনয় পর্যন্ত যায় বিয়ের আগেই। বাইরে বিভিন্ন জায়গায় তারা দুজন নিয়মিত ছুটির দিনে ঘুরতে যেতেন। বান্ধবী থেকে বিয়ে হয়ে স্ত্রীর মর্যাদায় তাদের সংসার বেশ সুখের ছিল, সন্তানও হয় দুটি। কিন্তু কোনো অজানা কারণে সংসারটি বেশিদিন টিকেনি।

দুই সন্তান হবার পর এখন থেকে বাইশ ২২ বছর আগে স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। বড় মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে চাকুরীতে যোগ দেয়, ছেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে। ছোট সময় মা চলে যাবার পর থেকে নজরুল ইসলাম সাত্তারই তাদের দেখভাল করেন। স্ত্রীর সাথে সংসার টিকে না থাকলেও জাপানি মহিলাদের সম্পর্কে খুব ভালো ধারনা পোষণ করছেন এখন পর্যন্ত তিনি।

বিয়ের পর দীর্ঘদিন এক পাকিস্তানির সাথে মিলে পুরাতন গাড়ির ব্যবসা করেছেন। পার্টনারের সাথে টাকা-পয়সার ঝামেলা হলে গাড়ির ব্যবসা ছেড়ে দেন। ব্যবসার ধরন ছিল পুরাতন গাড়ি কেটে সব পার্টস আলাদা করে যন্ত্রাংশ ফিলিপিন্সে রপ্তানী করতেন।

জাপানে কষ্টে উপার্জিত টাকা দিয়ে দেশে উত্তর বাড্ডা (ঢাকার) – তে পাঁচ (৫) কাঠা জমি কিনেছেন। সেটুকুই তার সম্পদ। এছাড়া দেশে আর কিছু করেন নি। চার ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি ছোট হলেও জাপানে চাকুরী করে সব ভাইবোনকেই কিছু না কিছু করে দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ এখন আর বেঁচে নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বড় একভাই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন।

চার বছর আগে হঠাৎ একদিন সকালে তার ব্রেইন ট্রোক করলে সাথে সাথে তাকে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেও বর্তমানে তিনি অসুস্থ অবস্থায়ই ঘরে অবস্থান করছেন। কাজ করার কোন উপায় নেই বলে ঘরে বসেই মোবাইলে ফেইসবুক চালানো, দেশের পত্রপত্রিকা পড়ে এবং নেটে দেশের টিভি-র সংবাদ দেখে সময় কাটান। শরীর ঠিক রাখতে সপ্তাহের তিন (৩) দিন রিহ্যাবিলিটিতে যেতে হয় তাকে। নজরুল ইসলাম সাত্তারের সাথে কথা বলে মনে হলো তার মনোবল এখনো বেশ শক্ত। জাপানে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকার কারণে এখনও ঘরে বসে ভাবেন কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনের কর্মকান্ড নিয়ে।

সর্বশেষ দেশে গিয়েছেন আজ থেকে দশ (১০) বছর আগে। জানালেন দেশে যাবার ইচ্ছ খুব কিন্তু দেশে গিয়ে করবেনটা কি, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না বলেই দেশে ফিরে যাবার ইচ্ছেটা মাঝে মধ্যে দুর্বল হয়ে যায়। কথার মাঝখানে বলেছেন, শেষ বয়সে ছেলে মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়ালে তাদের নিজেদের টিকে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে তারপর দেশে ফিরে যাবার কথা ভাবছেন। তারপরেও দেশে ফিরে যাবেন নাকী জাপানেই থেকে যাবেন এ নিয়ে দোটানায় আছেন বলে জানালেন। ি

মঃ সাত্তার জানালেন, তিনি জাপান এসে নিজেকে স্বার্থক মনে করছেন না। তিনি বললেন জাপানে আসা এবং পরবর্তীতে কাজ করা পর্যন্তই ঠিক ছিল। তবে জাপানে বিয়ে করাটা তার জীবনে ছিল বড় ভুল।

বর্তমান এই অবস্থায় ডাক্তার তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেন, সুস্থ হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই অবস্থায়ই বাকী জীবন কাটিয়ে দিতে হবে তাঁকে।

এপর্যন্ত থাইল্যান্ড, মালোয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান ঘুরেছেন। ছাত্র জীবনে খেলাধূলা এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে জড়িত ছিলেন। বেশ কিছু মঞ্চ নাটকও করেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

আমরা বিবেকবার্তার পক্ষ থেকে মিঃ নজরুল ইসলাম সাত্তারের বাকী জীবন সুন্দর ও সুখের হোক, শুভ কামনা করছি।

। মিথুন রিবেরু।
————————–
১২ জুলাই ২০২০, রবিবার

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ২:৩৭ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ১২ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |