ঘোষণা

শেষ পর্যন্ত মানুষের মন

| শনিবার, ২০ জুন ২০২০ | পড়া হয়েছে 22 বার

শেষ পর্যন্ত মানুষের মন

যতীন সরকার : ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’ এমন কথা বলেছিলেন যে জীবনানন্দ দাশ- তিনি প্রকৃত কবি ছিলেন বলেই ছিলেন কান্তদর্শী। কান্তদর্শী কবিদের চৈতন্যেই যেমন ছায়া ফেলে তাদের সমকালের প্রকৃত রূপটি, তেমনি অতীত ও ভবিষ্যতের রূপটি তারা স্পষ্ট দেখতে পান। জীবনানন্দ দাশ যে তেমনটি পেরেছিলেন, সেটি তার বহুবিধ কবিতার মতো জীবিতকালে অগ্রন্থিত ‘তবুও মনকে ঘিরে’ কবিতাও তার প্রমাণ বহন করে।

বিগত শতকের চল্লিশের দশকের মধ্যবর্তীকালে তৎকালীন বাংলা তথা পুরো পৃথিবীতে যে অভূতপূর্ব বিপর্যয় ঘটে গিয়েছিল, সেই বিপর্যয়ের স্বরূপ জীবনানন্দের মতো আর কেউই উপলব্ধি করতে পারেননি। বিপর্যয়ের স্বরূপই নয় শুধু, তা থেকে পরিত্রাণের পথও তিনি সন্ধান করেছিলেন এবং মানুষের মনোজগতেই তার সন্ধান তিনি পেয়ে গিয়েছিলেন। মানুষের প্রতি বিশ্বাস থেকে অনায়াসেই তিনি বলতে পারতেন যে, অতীতের চেয়ে নিশ্চয়ই ভালো হবেরে ভবিষ্যৎ।

অনেক দিন আগেই জীবনানন্দের কাল অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, তবে এ কালেও আমরা নানাবিধ বিপর্যয়ের হাত থেকে মুক্তি পাইনি। বর্তমানে করোনাভাইরাস নামক ব্যাধিটি সারা পৃথিবীর মানুষকে যে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তেমনটি এর আগে আর কখনও দেখা যায়নি। কবে নাগাদ এর প্রকৃত প্রতিষেধক পাওয়া যাবে তা-ও কেউ বলতে পারছেন না।

তবুও ভরসা রাখতে হবে মানুষের ওপরেই। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যে বলেছিলেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ- সে কথাটি প্রতি মুহূর্তেই স্মরণে আনতে হবে। কবি জীবনানন্দ দাশও অন্য ভাষায় মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখার কথাটি বলে গেছেন। মানুষের মনোজগতেই যে সর্বপ্রকার বিপর্যয়ের প্রতিষেধকের বিদ্যমানতা আছে, সে সম্পর্কে কোনোরকম সন্দেহ পোষণ করা যাবে না। বিশ্বজগতের যে স্বভাবসঙ্গত রূপ, প্রাচীন ভারতে তাকেই বলা হতো ‘ঋত’। প্রাচীন ভারতের প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋজ্ঞ্বেদে বারবারই এই ঋতর কথা উঠে এসেছে। এই ঋত থেকেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুর সৃষ্টি। কবিতার সৃষ্টিও এই ঋত থেকেই। ঋজ্ঞ্বেদের কবিরাই তো এ উপমহাদেশের প্রাচীনতম কবি। সেই কবিরা প্রায় হাজার বছর ধরে রচিত হতে থাকা এই গ্রন্থের সর্বত্রই ঋতরই গুণগান করেছেন। প্রাকৃতিক ঋতজাত প্রকৃতিই প্রাকৃতিকৃত বা বৈশ্বিক নিয়ম-শৃঙ্খলার ধারক। প্রকৃতি বা বস্তু থেকেই বস্তুর ঋত বা ঋতী বিধানের অনুবর্তিতায় এক সময় প্রাণের উদ্ভব হয়। সেই প্রাণের বিবর্তন থেকেই এক সময় উদ্ভব ঘটে মানুষের এবং মানুষের সামাজিক ঋতর। কিংবা বলা যেতে পারে এই ঋত থেকেই আদিকালের মানুষের সমাজের সৃষ্টি। আদিযুগের সেই ঋতবান সমাজের প্রতিটি মানুষের ছিল সমান অধিকার ও সমান মর্যাদা। ঋতবান সমাজে শোষক বা শোষিত বলে কেউ ছিল না। সেই ঋতবান সমাজেই ঋজ্ঞ্বেদের ঋক বা কবিতাগুলো রচনার সূত্রপাত ঘটেছিল। কিন্তু কালের ব্যবধানে সেই ঋত নষ্ট হয়ে যেতে থাকে; অর্থাৎ সমাজে শোষক ও শোষিতের শ্রেণিবিভাজন ঘটে যায়। প্রাচীন ভারতেও ঋজ্ঞ্বেদের রচনার দীর্ঘকাল পরিসরেই তেমনটি ঘটে চলে। আর সে সময়কার প্রজ্ঞাবান ও সংবেদনশীল কবিবৃন্দ সমাজের ঋত নষ্ট হয়ে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। তাই ঋজ্ঞ্বেদের শেষ অংশে রচিত ঋক বা কবিতাগুলোতে ঋত ফিরিয়ে আনার তীব্র আকুতি ধ্বনিত হয়েছে। শুধু ঋজ্ঞ্বেদে নয়, সমাজ ঋতহীন হয়ে যাওয়ার সূত্রপাতের সময় থেকে আজ অবধি প্রতি যুগেরই প্রকৃত কবিবৃন্দ সেই ঋতপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত না করে পারেননি। কারণ প্রকৃত কবি অনৃত বা অসত্য-অন্যায়ের প্রতি আত্মসমর্পণ করতে পারেন না। অর্থাৎ প্রকৃত কবিমাত্রই সত্য শিব সুন্দরের সাধক। সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্যই শিব বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠিত না থাকলে সংখ্যালঘিষ্ঠ শোষকদের হাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শোষিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত হতে থাকলে সমাজে সত্যও থাকে না, সুন্দরও থাকে না। তাই প্রকৃত কবির সব কবিতাই কোনো না কোনোভাবে সামাজিক ঋতকে ফিরিয়ে আনা তথা অন্যায় সমাজবিধানের অবসান ঘটাবার বাণীর ধারক হয়। সে কারণেই আজকে আমাদের কামনা করতে হবে যে, সেই ঋত; যে ঋত নষ্ট হয়ে গেছে করোনাসহ বিচিত্রবিধ বিপর্যয়ের ফলে- তা যাতে ফিরে আসে। মানুষই যে সেই ঋতকে ফিরিয়ে আনতে পারে, জীবনানন্দের কবিতা থেকেও আমরা তার বার্তা পাই। বর্তমানের যে কবিরা আছেন তাদের সকলেরও মূল কাজটি হবে ঋত ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের কাব্য প্রতিভাকে নিয়োজিত করা।

এই যে পৃথিবীব্যাপী মৃত্যু, এমন অচিন্তিত বিপর্যয়- এ থেকে মুক্তির পথ, পরিত্রাণের আশাবাদও শেষাবধি মানুষের মনের ভেতরেই রয়েছে।

দুই.

সমাজ বিপর্যয় থেকে মুক্তির জন্য চাই মানুষে মানুষে ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলা। মানুষের মনের সঙ্গে মনের নৈকট্যই পারে সেই ব্যবধানকে দূর করতে। কিন্তু মানুষ আজ পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্নতা পাপ ও দুর্নীতিকে সহায়তা করে। সেই পাপ ও দুর্নীতির জন্যই মানুষ তার পাশের মানুষটিকেও যেন চিনতে চায় না আজকাল।

ধর্মশাস্ত্রে পাপ-পুণ্য সম্পর্কে অনেক অনেক কথা বলা হয়েছে। কোন পাপে পরলোকে কী ধরনের শাস্তি ভোগ করতে হবে আর কোন পুণ্যে পরলোকে থাকবে পুরস্কার- সেসবের অনুপুঙ্খ বর্ণনা আছে বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে। কিন্তু ধর্মশাস্ত্রে নিরপেক্ষভাবে যারা জীবন ও জগৎকে দেখে থাকেন, তারাও পাপ-পুণ্যের হিসাব না করে পারেন না। আমি তো গ্রামের সাধারণ মানুষকেও দেখেছি, ধর্মশাস্ত্রে নিরপেক্ষভাবে তারা ইহজীবনেই পাপের শাস্তি ও পুণ্যের পুরস্কার পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করেন। আমার ঠাকুরমার মুখে এ রকম অনেক দৃষ্টান্তই আমি শুনতে পেয়েছি। একটা লোক মরার পূর্বে সারা শরীর জ্বালায় ছটফট করছিল। ঠাকুরমা ওই লোকটিকে দেখে বললেন, ‘হবে না! লোকটি যে অমুকের বাড়িটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তখনই আমরা বলেছিলাম যে মরার সময় ও গায়ে জ্বলে-পুড়ে মরবে। সেটিই তো হচ্ছে এখন।’ এভাবেই অনেক পুণ্যবান লোকের ইহজীবনেই পুণ্যের ফল ভোগ করার দৃষ্টান্ত তিনি তুলে ধরতেন। তবুও বাস্তবে এমনটি যে সব সময় ঘটে না, তেমনটিও গাঁয়ের সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে।

কিন্তু আজকে আমরা যা দেখছি, তাতে তো মনে হয় অধিকাংশ মানুষেরই পরলোকের ওপর যেমন বিশ্বাস নেই, ইহলোকেও কুকর্ম বা পাপের জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে না বলেই তারা মনে করে। আর বাস্তবে তো হচ্ছে তেমনটিই। আমাদের সমাজের চিন্তাশীল ব্যক্তিরা একেই বলছেন ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। যদি সমস্ত কুকর্মের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হতো, তাহলে সামাজিক ঝামেলা শূন্যের কোঠায় না পৌঁছলেও অনেক পরিমাণে কমে যে যেত- সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ থাকা যায়। অথচ তার বিপরীতটি ঘটছে বলেই সমাজে পাপ তথা কুকর্মের এমন বিস্তৃতি ঘটছে। টিভির পর্দা কিংবা পত্রিকার পাতায় শিশু হত্যার যে বীভৎস চিত্র প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে কিংবা নারী ধর্ষণের যেসব খবর পাওয়া যায়, কিংবা বর্তমানের এই মহামারিসংকুল সময়ে চিকিৎসাহীন অসহায়ভাবে প্রতিদিন এই যে মানুষের মৃত্যুর সংবাদ- এসব দেখে-শুনে মানুষ যেন ক্রমাগতই বিশ্বাসের দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। এ রকমটি কেন হচ্ছে?

এই ‘কেন’র উত্তর দিতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিরা যে ধরনের আচরণ করে, সে ধরনের আচরণেই অনুসরণ করতে প্রবৃত্ত হয় কর্তৃত্বশীল ও কর্তৃত্বাভিলাষী সব মানুষ। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে যারা অবস্থান করছেন- চলতি বর্তমানে অথবা নিকট অতীতে; তাদের অনেকের আচরণই সদাচরণ বলে চিহ্নিত হতে পারে না। জনগণের প্রতিনিধিরূপে যারা ক্ষমতার মঞ্চে আরোহণ করেছেন তাদের অনেকেরই যেসব কীর্তিকলাপ সংবাদপত্রের পাতায় প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশিত হচ্ছে, তার সামান্য অংশও যদি সত্য হয়ে থাকে তবে বলতেই হবে, আমাদের রাষ্ট্রের অবস্থাটি হয়ে গিয়েছে একান্তই ভয়াবহ। সেই ভয়াবহ পরিবেশে কুকর্ম তথা পাপ কর্মেরই যে বিপুল বিস্তৃতি ঘটে থাকবে তাই তো একান্ত স্বাভাবিক।

তবে আমি বিশ্বাস করি, এই একান্ত অস্বাভাবিক স্বাভাবিক অবস্থাটি কোনোমতেই চিরস্থায়ী হতে পারে না। অতীতেও অনেকবার এ রকমটি ঘটেছে। বারবার সভ্যতার সংকট দেখা দিয়েছে, বারবারই মানুষ সেই সংকট অতিক্রম করে নতুন সভ্যতার সৃষ্টি করেছে। বিগত শতকে ফ্যাসিবাদের প্রবল প্রতাপ যখন সমস্ত মানবিক মূল্যবোধকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল, তখনই বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির অভ্যুদয়ে সমস্ত সংকট কেটে গিয়েছিল। এমনটি এখনও ঘটবে। কারণ মানুষের ভেতরে রয়েছে জীবনানন্দের সেই কবিতাটির ‘চিরায়িত আশা’র সঞ্চারি মন।

তিন.

কিন্তু মানুষ যুগের এই বিবিধ বিপর্যয় অতিক্রম করে তার মনের ভেতরের সেই শক্তি আর আশাকে কেন সঞ্চারিত করতে পারছে না! কারণ মানুষে মানুষে রয়েছে সাঁকো বাঁধতে না পারার ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতা শুধু কবির একার নয়, অনেকের মতে এ ব্যর্থতা এ-যুগেরই অন্তঃসার। এ ব্যর্থতার স্বরূপ ও নিদান সন্ধান করা সম্ভব হলেই, আমাদের যুগের সমস্ত সভ্যতার স্বরূপ ও নিদান একান্ত স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

এ সমস্যা যে একেবারে সাম্প্রতিক কালের, তা-ও নয়। সন্দেহ নেই, এ-কালে এ সমস্যার ব্যাপকতা ও জটিলতা অনেক বেশি; কিন্তু এর সূত্রপাত অনেক আগে, বলতে গেলে সভ্যতার প্রায় ঊষালগ্নে। একটু একটু করে জটিল হতে হতেই সমস্যাটি আজ দুঃসমাধেয়তার পর্যায়ে উন্নীত। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামরত যূথবদ্ধ আদিম মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি, মানুষে মানুষে সেতু না থাকার কোনো সমস্যাই সেখানে দেখা দেয়নি, তাই সেতুবন্ধনের কোনো সমাধান-সূত্র খোঁজাও ছিল অনাবশ্যক। কিন্তু সেই আদিম সত্যযুগের অবসান হয়ে ‘সভ্য যুগে’র সূচনা হলো যেদিন থেকে, সেদিন থেকেই বিচ্ছিন্নতারও সূচনা। কিছু সংখ্যক মানুষ বিপুল সংখ্যক মানুষকে প্রকৃতির সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেই সৃষ্টি করে এ বিচ্ছিন্নতার। শুধু বঞ্চক আর বঞ্চিতের মধ্যেই যে এ বিচ্ছিন্নতা, তা নয়। এই উভয় গোষ্ঠীর নিজের নিজের সীমানার মধ্যেও গড়ে ওঠে অনেক জাতের নদীনালা, খন্দক। এগুলোর কোনোটা কৃত্রিম, কোনোটা অকৃত্রিম। কোনোটা বস্তুগত, কোনোটা মনোগত। কিন্তু সবগুলোই ব্যবধানের স্রষ্টা। কোনো ব্যবধান দুর্মোচ্য, আবার কোনোটা একেবারে অমোচ্য। সেতু বেঁধে একটা ব্যবধান অতিক্রম করা যায় যদি-বা, মুখ ব্যাদান করে এসে দাঁড়ায় আরও দশটা ব্যবধান। ব্যবধানের এক অন্তহীন দ্রৌপদীর শাড়ি যেন।

তবু মানুষ কিন্তু এই ব্যবধানকেই অমোঘ ও চিরন্তন বলে মেনে নিয়ে তার কাছে নতি স্বীকার করে বসে থাকেনি। প্রতিটি যুগের মানুষই সচেতন প্রয়াসে বা সহজ প্রবৃত্তির তাড়নায় তার যুগসৃষ্ট ব্যবধানকে ঘোচানোর প্রয়াস পেয়েছে, সে প্রয়াসেই সৃষ্টি হয়েছে যুগান্তরের। মানুষের সমাজে পুরোনো ব্যবধান অতিক্রান্ত হয়ে নতুন ব্যবধানের জন্ম যেমন হয়েছে, তেমনি ব্যবধান জয়ের নতুনতর শক্তি প্রেরণাতেও মানুষ উদ্বুদ্ধ হতে পেরেছে। কিন্তু এমন করে করে এমন এক কালের তটে সমাজ এসে সংলগ্ন হয়, যে কালে ব্যবধানটাকেই মনে হয় একমাত্র সত্য। ব্যবধান ঘোচানোর জন্য সেতুবন্ধনের প্রয়াসটাকে পর্যন্ত মনে হয় অর্থহীন। ‘কোনো মানুষই দ্বীপ নয়’- এমন ধরনের উক্তি আর এ যুগের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকে না, তার বদলে বিভিন্ন ব্যক্তি-মানুষকেই মনে হয় চূড়ান্ত, ব্যক্তির অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের প্রশ্নটিই শেষ প্রশ্ন।

ব্যাপারটি কি আসলেই এমন নৈরাশ্যব্যঞ্জক? মানুষে মানুষে দ্বীপের ব্যবধানটাই যদি চূড়ান্ত হয়ে যেত, তাহলে সমাজ চলমানতা হারিয়ে এতদিনে পুরো স্থবিরত্ব লাভ করত, সভ্যতা শুকিয়ে ঝরে যেত। সমাজ সভ্যতার চাকাকে যারা সচল রাখে, উৎপাদন সংশ্নিষ্ট সেসব মেহনতি মানুষ ক্ষেতে-খামারে আর খনিতে-কারখানায় পরস্পরের চিত্তের সঙ্গে যুক্ত থেকেই প্রতিনিয়ত সৃষ্টিকর্মে নিরত। এক মুহূর্তের জন্যেও এ শ্রেণির একটি মানুষও বোধ হয় নিজেকে দ্বীপ-সদৃশ বলে ভাবতে পারে না। তাদের কাজের ধারাই তাদেরকে যূথবদ্ধতায় সংযুক্ত করে রাখে। নিজেদের মধ্যে সেতুবন্ধন করতে না-পারার কোনো সমস্যাই তাদের পীড়িত করতে পারে না। সমস্যাটা মূলত উৎপাদন-অসংশ্নিষ্ট মানুষের; শ্রমের সূত্রে মানুষে মানুষে স্বাভাবিক সংযুক্তি ঘটে না যাদের, সমস্যাটা তাদেরই। উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত নামে পরিচিত গোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যেই এ সমস্যা কমবেশি প্রকট। আবার এ গোষ্ঠীর হাতেই এ কালের সমাজের নায়কত্ব অর্পিত, এরাই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নিয়ন্তা, বুদ্ধিজীবীরাও এ-গোষ্ঠীরই অন্তর্গত এবং এ কারণেই সমাজে নিতান্ত সংখ্যালঘিষ্ঠ হয়েও এদের সমস্যাই সমগ্র সমাজের সমস্যা বলে কীর্তিত ও প্রচারিত হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।

যে প্রাকৃতজন শ্রমসূত্রে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্নিষ্ট, তাদেরকে শ্রমফল থেকে বঞ্চিত করেই জীবনের সুষ্ঠু বিকাশধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। এবং সে কারণেই, সেতুবন্ধনের উপকরণও আর তাদের হাতে নেই। এমনকি তাদের নিজস্ব শ্রেণিদর্শনটি থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন। তাহলে সমাজের মানুষে মানুষে সাঁকোটা বাঁধবে কে? যুগের বিপর্যয়কে ঠেকাতে মানুষ কি ঐক্যবদ্ধ কর্মের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বদলে প্রকৃতি ও সময়ের হাতে নিজেদের সঁপে দিয়ে বসে থাকবে! না, মানুষ তবু আশা বাঁধে তার চিরায়ত আশাবাদের স্বাভাবিক ধারায়। মানুষের কেন্দ্রীভূত শক্তি তার যে মনের ভেতরে থাকে, সেই মনকে ঘিরেই মানুষ উত্তরণের পথে আবর্তিত হবে। মানুষে মানুষে সাঁকো বাঁধার পথে যত অন্তরায়, তার সবগুলোকে অতিক্রম করার শক্তিও আছে এই মনের ভেতরেই। অবিচ্ছিন্ন মানব সমাজই পারবে সভ্যতার সমূহ বিপর্যয় ঠেকাতে।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২০ জুন ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত