ঘোষণা

হাসপাতালকে তার উৎসে ফিরে যেতে হবে

| শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | পড়া হয়েছে 23 বার

হাসপাতালকে তার উৎসে ফিরে যেতে হবে

মুহাম্মদ ফাওজুল কবীর খান : করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ধনী দেশ আমেরিকায় এক লাখের বেশি এবং এ দেশে কয়েকজন ধনকুবের ও বিশিষ্টজনের মৃত্যু আমাদের হকচকিত করেছে। হাসপাতালে রোগী গ্রহণ না করা, ভেন্টিলেটরের অভাব, সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে বহুসংখ্যক চিকিৎসকের মৃত্যুর পর হাসপাতালের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব মেডিসিন হাসপাতাল ব্যবস্থাকে মধ্যযুগীয় ইসলামি সভ্যতার উপহার হিসেবে বর্ণনা করে; দার আল–শিফা বা বিমারিস্তানকে আধুনিক হাসপাতালের পথিকৃৎ বলা হয়েছে। বাগদাদের খলিফা হারুনুর রশিদ ৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম সাধারণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। তার আগে ২৭১ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য সাম্রাজ্যে চিকিৎসাকেন্দ্র ও চীনা পর্যটক ফা–হিয়েনের বর্ণনায় ৪০০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষে চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের উপস্থিতির উল্লেখ আছে। প্রাচীন গ্রিসে চিকিৎসার দেবতা আসেপ্লিয়াসের নামে মন্দির ছিল, যেখানে রোগীদের পরামর্শ, ভবিতব্য ও আরোগ্য বিষয়ে সহায়তা দেওয়া হতো। রোমান সাম্রাজ্যে জনগণের জন্য না থাকলেও সেনা ও ধনীদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বর্তমানে আমরা হাসপাতাল বলতে যা বুঝি, তার গোড়াপত্তন মুসলিমদেরই হাতে।

ইসলাম ধর্মে আর্থিক সংগতি, পরিচয়নির্বিশেষে রোগীর চিকিৎসা বিষয়ে নৈতিক বাধ্যবাধকতা আছে। ফলে মুসলিমদের স্থাপিত হাসপাতালগুলো বৃহৎ নাগরিক অবকাঠামোর সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান ছিল। নারী–পুরুষ, সামরিক–বেসামরিক, শিশু–বৃদ্ধ, ধনী–গরিব, মুসলিম–অমুসলিম, নাগরিক, বিদেশি, চাকরিরত বা বেকার, অন্ধ কিংবা চক্ষুষ্মান, শিক্ষিত–অশিক্ষিতনির্বিশেষে সবার জন্য সেই প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত ছিল। রোগীর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচ্য বিষয় ছিল না। সব সেবাই মহান আল্লাহর করুণা হিসেবে দেওয়া হতো।

ইসলামিক হাসপাতালগুলোতে নানান সুবিধা, যেমন চিকিৎসাকেন্দ্র, অসুস্থতা ও দুর্ঘটনার পর সেরে উঠছে এমন রোগীদের আবাস, উন্মাদ আশ্রম, অবসরকালীন আবাস, বৃদ্ধ ও অচল মানুষের মৌলিক সেবাদানের ব্যবস্থা ছিল। হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, পরিচ্ছন্নতা বিশেষজ্ঞ, হিসাবরক্ষক, লাইব্রেরি, শল্যকক্ষ, পাঠদানের জন্য শ্রেণিকক্ষ, অপেক্ষাকৃত কম অসুস্থদের জন্য বহির্বিভাগ ও রোগীদের আরোগ্য ত্বরান্বিত করার জন্য কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি সংগীতের ব্যবস্থা ছিল। দশম শতাব্দী থেকে ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার বিধান রেখে আইন করা হয়।

রোগীর মৃত্যু হলে তা স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি ডাক্তারের অবহেলা, তা নির্ধারণ করা হতো। শেষোক্ত ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হতো। হাসপাতালগুলোতে পুরুষ ও নারী চিকিৎসকদের পৃথক আবাস ছিল। অর্থাভাবে কোনো রোগীকে ফেরত পাঠানো যাবে না, এমন আইনি বিধান ছিল। বিনা মূল্যের এসব হাসপাতালের ব্যয় ওয়াক্‌ফ থেকে নির্বাহ করা হতো। এমনকি কখনো কখনো রোগীকে হাসপাতাল ত্যাগের পর পরিপূর্ণ সুস্থ হওয়ার জন্য সামান্য বৃত্তিও দেওয়া হতো। কদাচিৎ কোনো কোনো চিকিৎসক তাঁদের সেবার জন্য ফি আদায় করতেন।

দেশের শীর্ষ শিল্প পরিবার এস আলম গ্রুপের পরিচালক মোরশেদ আলম চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লাহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। চট্টগ্রামে বেসরকারি খাতেও বেশ নামীদামি হাসপাতাল আছে—মেট্রোপলিটন, ম্যাক্স, ইম্পেরিয়াল, পার্ক ইত্যাদি। কোথাও তাঁর ঠাঁই হয়নি। আন্দরকিল্লাহ জেনারেল হাসপাতালটি নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতাল। এ হাসপাতালে তাঁর যাওয়ার কথা নয়। তিনি সেখানে যেতে বাধ্য হয়েছেন, কেননা চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত দুটি হাসপাতালের এটি একটি।

কয়েক মাস আগেই এক মরণাপন্ন রোগী (ধনাঢ্য) এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে এলেন। মরহুম মোরশেদ আলমের ক্ষেত্রেও তা–ই হওয়া স্বাভাবিক ছিল। সিঙ্গাপুরে তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা, স্থাপনা আছে। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ পেলেন না। কারণ, এখন সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, চেন্নাই, দিল্লিসহ কোনো শহর বা দেশই বিদেশি রোগীদের প্রবেশ করতে দেয় না। জনাব আলমের মৃত্যুর আরেকটি মর্মান্তিক দিক হলো, তাঁকে বাঁচানোর জন্য একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁর ভাইয়ের ভেন্টিলেটর খুলে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। তবে স্বস্তির বিষয়, তাঁর ভাই সুস্থ হয়ে উঠেছেন।

আন্দরকিল্লাহ জেনারেল হাসপাতালকে তড়িঘড়ি করে করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হলেও দেশব্যাপী এ ধরনের হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। ভেন্টিলেটর একটি জটিল ও দামি যন্ত্র। আইসিইউতে স্থাপিত এ যন্ত্রের জন্য জীবাণুমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। আইসিইউ পরিচালনা করতে অ্যানেসথেটিস্টসহ দক্ষ জনবল প্রয়োজন।

নিম্ন আয়ের রোগীদের আইসিইউর ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা কোথায়? এ দেশে কারও কারও মনোভাব এমন, একটা চাষা মরলে আরেকটা চাষা তার জায়গা নেবে, একজন শ্রমিক গেলে আরেকজন। এসব ব্যয়বহুল ব্যবস্থা থাকবে শুধু ধনী ও ‘ক্ষণজন্মা মহাপুরুষদের’ জন্য! আন্দরকিল্লাহ জেনারেল হাসপাতাল নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য, সেখানে ভেন্টিলেটর ও আইসিইউর পর্যাপ্ত সুবিধা তাই থাকার কথা নয়।

হাসপাতাল রোগী ফিরিয়ে দেবে কেন

শুধু হাসপাতালে চিকিৎসার অভাবে নয়, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে গিয়ে অনেক রোগীর পথেই মৃত্যু হচ্ছে। ধরে নেওয়া হচ্ছে, সব রোগীই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। কিন্তু মধ্যযুগের ইসলামিক হাসপাতালের জন্য কোনো রোগীকেই ফিরিয়ে না দেওয়ার বাধ্যবাধকতার আইন ছিল। শত শত বছর পর আজ তা নেই কেন?

কেন এ সমস্যা হলো

কারণ, হাসপাতালগুলোর তাদের প্রধান কাজ সেবার উৎস থেকে সরে আসা। চিকিৎসাকে অন্য যেকোনো সেবাপণ্যের সঙ্গে এক কাতারে নিয়ে আসা হয়েছে। বাজার অর্থনীতিতে এর প্রাপ্যতা নির্ভর করবে ক্রেতার আর্থিক সক্ষমতার ওপর। তাই এখন চিকিৎসা ব্যয়বহুল আরেকটি পণ্যে পরিণত হয়েছে। শুধু তা–ই নয়, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট ও সার্জারিও এখন চিকিৎসার নিয়মিত অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সস্তা বিধায় গণস্বাস্থ্যের টেস্টিং কিট অনুমোদন পেতে হেনস্তা, দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয়। শুনেছি, এখন নামীদামি চিকিৎসকের অনেকে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী হওয়ায় প্রসূতিরা সিজারিয়ান ছাড়াই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান প্রসব করতে সক্ষম হচ্ছেন।

সামনের পথ

আমাদের এগিয়ে যেতে হলে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশে্য ফিরে যেতে হবে। ধনী-গরিবনির্বিশেষে চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসাকে পণ্যতালিকা ও হাসপাতালকে ব্যবসার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। বিত্তবানদের কাছ থেকে চিকিৎসার ব্যয় আদায়ের পাশাপাশি অসমর্থদেরও অনুরূপ চিকিৎসাসেবা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় টেস্ট, সার্জারি পরিহার ও সাশ্রয়ী ওষুধ উৎপাদন করে চিকিৎসার ব্যয় কমাতে হবে। সব হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দিতে হবে। চিকিৎসার ব্যয় কমিয়ে এ খাতে বাড়তি বরাদ্দ দিতে হবে। অনেকেই বলবেন, সে তো অনেক খরচের ব্যাপার। এত অর্থসম্পদ কোথায়? আমাদের উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন বাজেট একেকটি অপচয়ের খনি। এখান থেকে স্বাস্থ্য খাতের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ আহরণ সম্ভব। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবধান ঘুচিয়ে দুটোকেই একই আপৎকালীন কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। সরকারের পাশাপাশি চিকিৎসা খাতে বেসরকারি খাতকেও মানবিক বিনিয়োগ করতে হবে।

দেশে দেশে করোনা মহামারি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা দেখা গেছে, যে দেশে (যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি) স্বাস্থ্যব্যবস্থা যত বাণিজ্যিক, সেসব দেশে তত বেশি প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে যেসব দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা যত গণমুখী (যেমন নিউজিল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা), সেসব দেশ তত কম প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে। তাই আমাদের এ দুইয়ের একটি পথ বেছে নিতে হবে। আগের মতো চলা এখন আর কোনো গ্রহণযোগ্য পথ নয়। হাসপাতালগুলোকে আমাদের গৌরবময় উত্তরাধিকার বিমারিস্তান বা দার আল–শিফার পথেই এগোতে হবে।

প্রথম আলো সৌজন্যে

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ৩০ মে ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত