ঘোষণা

আমার মায়ের অনেক আচরণই আমি আমার কন্যার মধ্যে খুঁজে ফিরি

আসাদুজ্জামান জুয়েল | শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 1144 বার

আমার মায়ের অনেক আচরণই আমি আমার কন্যার মধ্যে খুঁজে ফিরি

মা… মা… মা…। পৃথিবীতে যত কিছু আছে মায়ের সাথে কোনো কিছুরই তুলনা করা যায় না। পৃথিবীতে যত কথা, যত শব্দ আছে মা শব্দের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো শব্দ খুঁজে পাইনি। এত মধুর, এত সুরেলা, এত মমতা মাখা, এত আবেগী একটা শব্দ যে মা ডাকাতেই তার স্বাদ পাওয়া যায়। অন্য কোনো ডাকে বা অন্য কোনো শব্দ উচ্চারণে এত প্রশান্তি লাভ করা সম্ভব নয়।
আমার মা নেই। বিগত ৩০ মার্চ ২০১২ তারিখে আমার মা আমাদের চির বিদায় দিয়ে পৃথিবী থেকে চলে গেছে। কোনো সান্তনাই মায়ের অভাব পূরণ করতে পারেনি। কোনো ডাকেই মায়ের মমতা মাখা আবেগ পূর্ণ করতে পারেনি। কোনো কিছুতেই মন শান্ত হয় না, আজও শান্ত হয়নি, আর হবেও না জানি। কারণ মা তো আর ফিরে আসবে না। মায়ের কাছে শত আবদার করেছি ফেরায়নি কোনো আবদারই। কত অভিমান করেছি মা মনে রাখেনি। শত রাগের পরেও খাবার সময় ঠিকই রাগ ভেঙে ডাক দিয়েছে। বাড়িতে ফিরতে দেরি হলে খোঁজ নিয়েছে। মুখ ভারি দেখলে সান্তনা দিয়েছে। ভিতরে হিংসা দেখলে উপদেশ দিয়েছে। এমন উদার গর্ভধারিণী জননী ছাড়া আর কে হতে পারে? এমন নির্লোভ ভালোবাসা মা ছাড়া আর কে দিতে পারে? সবই উপলব্ধি করতে পারছি এখন যখন মা আর কাছে নেই। মায়ের জন্য কিছুই করতে পারিনি-অপরাধবোধ কাজ করে প্রতিনিয়ত। কিন্তু মার কোনোদিন কোনো চাওয়া ছিল না আমার কাছে। কোনোদিন কিছু চায়ওনি। আর মায়েরা কোনোদিন কিছু চায়ও না, শুধুই দেয়। দিতে দিতে নিঃশেষ হয়ে যায় তবুও দেওয়া ফুরায় না। মাকে আর কিই বা দিব, কিই বা দেওয়ার আছে আমাদের। মায়ের মুখের মধুর ডাক এখনও কানে বাজে। আমার মা আমাকে বাবা বলেই ডাকতো। কী মধুর সে ডাক। এখন আর ডাকে না কিন্তু প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনি বাজে কানে। এখনও সমাধির পাশ দিয়ে যাওয়া-আসার সময়, নীরবে-নিভৃতে থাকার সময়, একলা পথ চলার সময় শুনি সেই মধুর বাবা ডাক। আমার মা আমাকে এতটাই বাবা ডেকেছে যে মায়ের মৃত্যুতে আমার কাছে মনে হয়েছে আমি মা হারাইনি আমার আদরের সন্তান হারিয়েছি। মা হারিয়ে প্রথমে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছি দেখে অনেকেই সান্তনা দিয়েছে। আস্তে আস্তে ডুকরে কাঁদা থেমে গেছে। এখনও কাঁদি। তবে নীরবে-নিভৃতে। বুকের ভিতর মা হারানোর ব্যথা যে কত কষ্টের তা পরিমাপের কোনো যন্ত্র নেই, প্রকাশের কোনো ভাষা নেই। এখন আর চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে না। মুখ ফ্যাকাশে হয় না। কিন্তু বুকের ভিতর চিনচিন ব্যথা হয়, কথা জড়িয়ে যায়, অনুভব করি তখন গর্ভধারিণী মা আর নেই, আর আসবে না। সব ব্যথা ভুলে যাওয়া যায় না। আঘাতের ব্যথা সেরে যায়, বন্ধুদের দেওয়া কষ্ট মুছে যায়, মা হারানোর ব্যথা শত চেষ্টায়ও ভুলে থাকা যায় না। ভুলবই বা কী করে? মায়ের যে অবদান, মায়ের যে আত্মত্যাগ, মায়ের যে ভালোবাসা, মায়ের যে উদারতা, মায়ের যে মমতা তার সাথে তো কোনো কিছুরই তুলনা করা যায় না! তাই মা হারানোর ব্যথা কখনো যায় না, যাবেও না। এখন দুঃখ পেলে মায়ের দেওয়া সান্তনাগুলো কানে বাজে, এখনো কষ্ট পেলে মায়ের কথাগুলো মনে পরে, এখনও মনে হিংসা-ক্রোধ দানা বাঁধলে মায়ের উপদেশগুলো কানে বাজে, শান্ত হয়ে যাই, উদার হতে চেষ্টা করি। একজন মা এতটা উদার, মমতাময়ী কী করে হয় ভেবে পাই না। তাই মনে মনে ভাবি, মা ছিল, মা থাকবে। লোকচক্ষুর আড়ালে গেলেও মায়ের অস্তিত্ব টের পাই, দেখানো পথে হাঁটতে চেষ্টা করি। চিরদিন যেন মায়ের দেখানো পথে হাঁটতে পারি আল্লাহ্র কাছে সেটাই চাই। মায়ের দোয়াতেই তো আজকের আমি, আমার অবস্থান, আমার সবকিছু।

দেখতে দেখতে অনেকটা বছর কেটে গেল। আমিও বাবা হলাম আবার। গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ আমি বাবা হয়েছি। আল্লাহ্র কাছে আমি একটা মা’ই চেয়েছিলাম। মহান আল্লাহ্ আমার মনের কথা শুনেছেন। আমাকে একটা কন্যা সন্তান দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। আমার মায়ের বিদায়ে আমি কেঁদেছি। আবারও কাঁদলাম আমার নতুন মায়ের কান্নার শব্দে, নতুন মাকে কোলে নিয়ে। আমার কন্যার নামও রেখেছি মায়ের নামের সাথে মিল রেখে। আমার মায়ের নাম ছিল রওশনারা বেগম। আমার কন্যার নাম রওশন আসাদ প্রিয়ন্তী। প্রিয়ন্তী একটু একটু করে বড় হচ্ছে। সে আস্তে আস্তে বিভিন্ন শব্দ করতে শিখছে। বুঝে কোনো শব্দ করে না জানি। কিন্তু প্রিয়ন্তীর মুখে প্রথমেই সেই মায়ের ডাক। আমার মা আমাকে সবসময় বাবা বলেই ডাকতো। প্রিয়ন্তী মুখ দিয়ে আব্বু আব্বু শব্দ উচ্চারণ করে! সকল শিশুই শুরুতে দাদা, দাদি, বু শব্দ উচ্চারণ করে। আমার কন্যা স্পষ্টই আব্বু শব্দ উচ্চারণ করে! আমি অভিভূত হই, অবাক হই না। আল্লাহ আমার মাকে নিয়ে আবার আমাকে মা দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের অভাব বোঝেন। তাই আমার কন্যা আমাকেই ডাকছে। কন্যার মুখে আব্বু শব্দ শুনে আমি মহান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার মায়ের গায়ের রং ছিল কালো কিন্তু অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জন্মেছিল। তার জ্ঞান গরিমায় তাকে মরহুম ফজলুর রহমান কোতোয়ালের মেয়ে না বলে অনেকে ছেলে বলতো!! আমার মায়ের গায়ের রং আমি পেয়েছি। আমার কন্যার গায়ের রং তার মায়ের মতো। কিন্তু প্রিয়ন্তী মুখের গড়ন পেয়েছে আমার মায়ের মতো। আমার মায়ের মুখ গোলাকার, সর্বদা হাসি মাখা। রাগলেও কখনো ধরা দিত না। শত কষ্ট, অভাব-অনটন আমার মায়ের মুখে ছাপ ফেলতে পারেনি। গোলাকার হাসিমাখা মায়ের সে মুখ আমি ভুলতে পারি না। সর্বদা আমার চোখের সামনে ভাসে। আমার মেয়ের গোলাকার হাসিমাখা মুখ দেখে আমি মায়ের মুখের সাথে মিলিয়ে ফেলি। প্রিয়ন্তীর মুখের দিকে তাকালে আমি আমার মায়ের কথা মনে করি। তাই প্রিয়ন্তীকে আমার নাম ধরে ডাকা হয়না। আমি মা বলেই ডাকি। আমি বাড়ি ফিরলে যেমন আমার মায়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে যেত। কন্যার মুখেও তেমনি আমি বাড়ি ফিরলে হাসি ঝরে পরে। আমার বাড়ি ফেরার পর সে ঘুমে থাকলেও জেগে ওঠে।

আমার মায়ের অনেক আচরণই আমি আমার কন্যার মধ্যে খুঁজে ফিরি। কিছু কিছু মিলে যায়। আমি দেখে আনন্দ পাই। আমি সবসময় বলি, আমার কন্যা যেন আমার মায়ের মতো বুদ্ধি পায়, মেধা, মননে যেন মায়ের মতো হয়। সে যেন আমার মায়ের মতো উদার, মমতাময়ী হয়। সে যেন সকলের প্রশংসা কুড়ায়। আমি আমার কন্যার ভিতর আমার মায়ের মুখ ও ডাক ফিরে পেয়েছি। সেই ডাক ও মুখ ফিরে পাই, কখনো বেশি পাই। কিন্তু মাকে ভুলতে পারি না, পারবোও না। ভাল থাকুক আমার নতুন মা, শান্তিতে থাকুক আমার মা………….।


———————————–
লেখক: আসাদুজ্জামান জুয়েল, আইনজীবী, কবি ও কলামিস্ট।
asadjewel@gmail.com

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৬:৪৪ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |