ঘোষণা

উন্নয়ন কোথায় আটকে যায়?

মামুন রশীদ | বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 75 বার

উন্নয়ন কোথায় আটকে যায়?

বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্প্রতি ভারতের মতো অনেক ধাপ না পারলেও বেশ কিছুটা এগিয়েছে। আমার ধারণা, আমাদের সংশ্লিষ্ট মহল উন্নতির উপায়টা মোটামুটি ধরে ফেলেছে। এখন প্রয়োজন সব অংশীজনকে একসঙ্গে নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে লক্ষ্যে পৌঁছানো।

আমরা অনেক দিন ধরে ব্যবসা শুরু, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, দেউলিয়াত্ব ঠেকানোর কাঠামো এবং আরও অনেক সূচকে পুনর্দৃষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করে আসছি। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগ সহজতর করার কাজে বিগত ৩০ বছরের অধিক সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাইছি, দেশে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না হওয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালার অভাব, অতিনিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রণজনিত অনিশ্চয়তা, বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যাখ্যা কিংবা বিভিন্ন সরকারের অধীনে নিয়ন্ত্রণবিধির সুবিধাজনক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও সমধিক দায়ী।
দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হলো নিয়ন্ত্রণজনিত অনিশ্চয়তা বা ধোঁয়াশা। এর প্রতিকূল প্রভাব কার্যকারিতা খর্ব, উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে এবং ব্যয় বাড়ায়। এসব প্রধান বিনিয়োগ সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করে। ফলে বাংলাদেশ ও বাইরের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ হারায় এবং অন্যত্র চলে যায়। এসব অবশ্য কেবল উপরি পর্যায়ের (সারফেস লেভেল) পরিণাম। এ দীর্ঘমেয়াদি এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সমাধানের যেকোনো চেষ্টার গভীরতর পদ্ধতি নির্ণয় (ডায়াগনসিস) বড়ই জটিল। প্রাথমিক নকশা থেকে শুরু করে প্রয়োগ বা বাস্তবায়নোত্তর ধাপের যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণজনিত বিভ্রান্তি বিস্তার লাভ করতে পারে।

পূর্ব আলোচনা বা সংশ্লিষ্ট অংশীজন, বিশেষ করে ব্যক্তি খাতের সংশ্লিষ্ট লোকজনের মূল্যায়ন আমলে না নিয়ে প্রায়ই দেশে বিভিন্ন ধরনের নতুন আইন ও বিধি প্রণয়ন বা প্রকাশ করা হয়। এ অন্তর্ভুক্তিহীনতার কারণে প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণ নকশা ব্যবহারিক অন্তর্দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত বা বাস্তবতাবিবর্জিত হতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি হয় খুবই দুর্বল ও অপরিমিত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে। অনুমানগতভাবে অবশ্য নতুন বিধিগুলো ভালো হলেও এসব বিধি প্রকাশ বা বাস্তবায়নের আকস্মিক ঘোষণা চলমান ব্যবসায় ব্যাপকভাবে বিঘ্ন ঘটায়।

আইএফসি ও বিল্ডের সহায়তায় করা এক জরিপে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ৮৩ শতাংশ ব্যবসায়ী বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানই দৃঢ়ভাবে একমত পোষণ করেছে যে পূর্ব আলোচনা ও পরামর্শ ছাড়া আইন ও বিধি প্রণয়নই ব্যবসা করার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা। অধিকন্তু ৬৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারীই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তাঁদের ইনপুট বা পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি হয়নি এবং না হলে কেন হয়নি, সে সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় না। দুর্ভাগ্যক্রমে এ যোগাযোগ ব্যবধান কেবল সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিবর্গের মধ্যে নয়, বরং আন্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও বিরাজমান।

দেখা যাচ্ছে, নিজস্ব নিয়ন্ত্রণমূলক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব আন্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। এটা নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ বা কাজে ব্যাপক অধারাবাহিকতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে সম্ভাব্য দীর্ঘসূত্রতা ও ভুলের জন্ম দেয়। এতে দুঃখজনকভাবে ব্যক্তি খাতের সার্বিক বিনিয়োগ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতির মুখে পড়ে।

বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণজনিত অনিশ্চয়তা বা বিভ্রান্তির আরেক প্রধান কারণ, দালিলিক তথ্যপ্রমাণের অনির্ভরযোগ্যতা। এ সমস্যার দুটি জটিল উৎস রয়েছে। প্রথমত, হালনাগাদ প্রয়োজনের নিরিখে বিপুলসংখ্যক এসআরও (স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার) এবং আইনি ধারাগুলো পর্যালোচনা, পরিমার্জন, বাতিল বা সংশোধন করা হয় না। ১৯৪৭ সালের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট এখনো ব্যবহার হয় এবং সাত শতাধিক বন্ডসংশ্লিষ্ট এসআরও কেবল উপরি পর্যায়ে কার্যকর। ফলে পুরোনো ও অপ্রয়োজনীয় তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায়ী বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়, যা মোটেই সমকালীন বিনিয়োগ সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বড় কথা, ওই সব সিদ্ধান্ত অভিনবও হয় না।

দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য ভ্যাট, শুল্ক ও আয়কর আইন বা অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে কোনো ওয়ান-স্টপ গন্তব্য নেই। এটা নিয়ন্ত্রণমূলক তথ্য যাচাইয়ের পরীক্ষণ বা পুনঃপরীক্ষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ভয়াবহ জটিলতা তৈরি করে। এভাবে আলোচ্য আইন-বিধি ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক দোলাচল ও ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, যার দীর্ঘ ও স্বল্প উভয় মেয়াদি বিরূপ প্রভাব থাকতে পারে। জরিপে অংশ নেওয়া শতভাগ অংশগ্রহণকারীই একমত যে শুল্কসংশ্লিষ্ট বিধিগুলোর অসামঞ্জস্য ব্যাপকতর জটিলতা তৈরির কারণ।

তথ্যগত অস্পষ্টতা ও আরম্ভকালীন প্রাথমিক সমন্বয়ের অভাব, এখতিয়ারভুক্ত ক্ষমতার প্রয়োগ বা তার ঘাটতি ভয়াবহ প্রতিকূল পরিণাম সৃষ্টি করতে পারে। খুব কম নির্দেশনাসংবলিত (গাইডলাইন) নতুন নিয়ন্ত্রণমূলক আদেশের অদৃশ্য প্রকৃতি এখতিয়ারভুক্ত ক্ষমতাচর্চার ক্ষেত্রে বিবিধ ব্যাখ্যার পরিসর সৃষ্টি করে। সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে এটা বিনিয়োগকারী বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের দ্বিধায় ফেলতে পারে। নতুন কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ সংযুক্ত হলে, সে ক্ষেত্রে নেই কোনো স্থিতিশীল বিধিবদ্ধ ধারা। এ ধরনের দ্বিধার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন না হওয়া। আলোচ্য আইন-সম্পর্কিত অনুমান ও চপল বা অস্থির ঘোষণা সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যবসায়ীকে দ্বিধায় ফেলেছে। কিন্তু তাঁরা সংশ্লিষ্ট সম্পদে বিনিয়োগ করেছেন, অথচ কোনো সুফল পাননি।

অধিকন্তু দেশে দুর্বল ও অনিশ্চিত প্রতিকার বা নিষ্পত্তি ব্যবস্থাপনার উপস্থিতি বিরাজমান। এটা সুনির্দিষ্ট বিধির কারণে সম্মুখীন হওয়া জটিলতা বা অন্য কোনো ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অপারগতা বাড়িয়ে দেয়। এটা ব্যবসায়িক পরিবেশে গোলযোগ তৈরি করে। ফলে ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের নিজস্ব পছন্দ ছাড়াই অস্বচ্ছ ও অসংগতিপূর্ণ নির্দেশনার ভিত্তিতে ব্যবসা চালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং তাঁরা ব্যাপক ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের দিক থেকে কোনো স্পষ্টীকরণের আশা ত্যাগ করেন।

দুর্বল প্রতিকার ব্যবস্থাপনার সমস্যা একই সঙ্গে সম্পত্তি অধিকারে অনিরাপত্তারই স্মারক। বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক উভয় পরিস্থিতি বদলের কারণে চলমান কোনো প্রজেক্ট আগামী বছরগুলোয় চলবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণজনিত দুর্বলতা বা ব্যর্থতার শিকার হলো একুশে টিভি এবং সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এ ছাড়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও শক্তিশালীদের ক্ষেত্রে অন্যায্য আইনি ভঙ্গুরতা এখানে ব্যতিক্রমী প্রপঞ্চ নয়। এখানে একটি নিয়মিত দৃশ্য হলো, অর্থনৈতিক ঝুঁকির অযাচিত ধরনে ব্যবসায়ীদের নিত্য সতর্ক থাকা। তথাপি, প্রাধিকারমূলক আচরণের সগর্ব উপস্থিতির কারণে সৃষ্ট দুর্বল নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান এখানে পুরো ব্যবসায়িক পরিবেশে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এতে চূড়ান্তভাবে অনেক যোগ্য ও উদ্দেশ্যমুখীন বিনিয়োগকারী ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।

মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশ, এমনকি আরও বেশি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়েছে। এ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তর্কাতীতভাবে ব্যক্তি খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ আসতে হবে। আলোচ্য খাতকে ব্যাপকভাবে কার্যকর রাখতে হলে এটা খুব জরুরি। ব্যক্তি খাতের কার্যকারিতা নিশ্চিতের অন্যতম নির্ধারক ফ্যাক্টর সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণমূলক পরিবেশ তৈরি। আরও পরিষ্কারভাবে বললে, সুনির্দিষ্ট এখতিয়ার ও স্পষ্টতাসমেত যুগপৎভাবে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষগুলোর সামর্থ্য বা সক্ষমতা বজায় রাখা। এটি অর্জনে একটি সুদৃঢ় ও আন্তরিক পরিচালনগত হস্তক্ষেপ বাধ্যতামূলকভাবে দরকার।

একটি দৃঢ় নিয়ন্ত্রণজনিত প্রভাব মূল্যায়ন নীতি, নির্ভরযোগ্য নোটিশ ও মন্তব্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং একটি পদ্ধতিগত বিনিয়োগকারী সাড়া প্রক্রিয়া বা সিস্টেমেটিক ইনভেস্টর রেসপন্স মেকানিজম (এসআইআরএম) নিয়ন্ত্রণজনিত অনিশ্চয়তা নিরসনের অত্যন্ত কার্যকর উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে প্রায়ই এক ধাপ এগোলে অনেক ধাপ পেছাতে হয়। অর্থাৎ ধীর-স্থিরভাবে উল্লিখিত বিষয়গুলোর উন্নয়ন করলে দেশে আপনাতেই বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে বিশ্বাস।

অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণ, শিল্প খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যক্তির ব্যয়যোগ্য আয় বাড়ার কারণে বাংলাদেশ যেহেতু ইতিমধ্যে বিশ্ব বিনিয়োগ মহলে বেশ নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে—এমনকি কোভিডকালেও তা পুরোপুরি মিইয়ে যায়নি। আমাদের উচিত নীতি পরিবেশ উন্নতির সম্ভাব্য সব অ্যাজেন্ডা দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া—এমনকি পুরোনো আইনের আধুনিকীকরণসহ সংস্কার কার্যক্রমও।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক। সূত্র : প্রথম আলো

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১:০৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত